বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়ন-অগ্রগতি বিশ্বের অনেক দেশের জন্য অনুপ্রেরণাদায়ক। বিশ্বে বাংলাদেশকে পরিচিত করার ক্ষেত্রে বর্তমান সময়ে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রাখছে তৈরি পোশাক শিল্প। শুধু গার্মেন্টসের ওপর নির্ভর করলে চলবে না। বাংলাদেশের অর্থনীতিকে টেকসই ও বহুমুখী করতে গার্মেন্টস বা তৈরি পোশাকশিল্পের বিকল্প গড়ে তোলাও অত্যন্ত জরুরি। প্রধানত প্রযুক্তিপণ্য, চামড়াজাত দ্রব্য, ফার্মাসিউটিক্যালস, কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং হালকা প্রকৌশলশিল্পে নজর দিয়ে রপ্তানি আয় বাড়ানো এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা সম্ভব। তরুণ প্রজন্মের দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে গ্লোবাল আউটসোর্সিং, সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট ও ডিজিটাল সেবায় বিলিয়ন ডলারের বাজার ধরা সম্ভব। হাই-টেক পার্কগুলো ইতোমধ্যে এই খাতের ভিত্তি তৈরি করছে। বাংলাদেশের চামড়ার আন্তর্জাতিক মান বেশ ভালো। বিশ্বমানের ব্র্যান্ডগুলোর জন্য জুতা ও ব্যাগ তৈরি করে গার্মেন্টস খাতের শূন্যস্থান অনেকাংশেই পূরণ করা সম্ভব। দেশীয় চাহিদার ৯৮ শতাংশ মিটিয়ে বাংলাদেশ বিশ্বের দেড় শতাধিক দেশে ওষুধ রপ্তানি করছে। এপিআই পার্ক চালুর মাধ্যমে কাঁচামাল উৎপাদনে স্বাবলম্বী হলে এই খাত আরও প্রসারিত হবে। আম, সবজি, মসলা ও মাছ প্রক্রিয়াজাত করে মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ ও আমেরিকায় রপ্তানির বিশাল সুযোগ রয়েছে। সাইকেল, মোটরপার্টস, ইলেকট্রনিক্স সরঞ্জাম ও গৃহস্থালি সামগ্রী তৈরি করে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা আয় করা যায়।
আমাদের দেশ ঘনবসতিপূর্ণ। জনসংখ্যা এবং শিক্ষার হার বৃদ্ধি পেলেও আমরা আমাদের জনসংখ্যা জনসম্পদে রূপান্তর করতে পারছি না। শিক্ষার হার বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে সমানুপাতিক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে বেকারত্ব। একটা দেশের যত প্রকার সম্পদ রয়েছে তার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ হলো সে দেশের জনসংখ্যা। জনসংখ্যাকে জনসম্পদে রূপান্তর করতে পারলেই একটা দেশ উন্নত হতে পারে। জনসংখ্যাকে সম্পদে পরিণত করার জন্য কর্মমুখী শিক্ষার প্রসার এবং জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গড়ে তোলা, দক্ষতা বৃদ্ধি ও প্রশিক্ষণমূলক কার্যক্রম সম্প্রসারণ, প্রযুক্তি ও কারিগরি শিক্ষার প্রসার, কৃষিভিত্তিক শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের সম্প্রসারণ, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তিকে অগ্রাধিকার প্রদান করতে হবে।
বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো তার প্রাকৃতিক সম্পদ, উর্বর ভূমি, অনুকূল আবহাওয়া এবং বিপুল কর্মক্ষম জনশক্তি। পৃথিবীর অনেক উন্নত দেশে বছরের একটি বড় সময় তীব্র শীত, তুষারপাত বা প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে উৎপাদন কার্যক্রম ব্যাহত হয়। অথচ বাংলাদেশে প্রায় সারা বছরই উৎপাদন, কৃষিকাজ এবং শিল্প কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগ রয়েছে। এই প্রাকৃতিক সুবিধাকে আমরা এখনো পুরোপুরি কাজে লাগাতে পারিনি।
আমাদের দেশে মৌসুমভিত্তিক বিপুল পরিমাণ ফলমূল উৎপাদিত হয়। আম, কাঁঠাল, লিচু, আনারস, পেয়ারা, কলাসহ অসংখ্য ফলের প্রাচুর্য রয়েছে। কিন্তু পর্যাপ্ত সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ সুবিধার অভাবে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ ফল নষ্ট হয়ে যায়। মৌসুমে যে ফলের দাম থাকে পানির দরের মতো, কয়েক মাস পর সেই একই সময়ে বিদেশি আপেল, কমলা বা অন্যান্য ফল আমদানি করতে কোটি কোটি ডলার ব্যয় করতে হয়। যদি আধুনিক কোল্ড স্টোরেজ, খাদ্যসংরক্ষণ এবং ফুড প্রসেসিং শিল্প গড়ে তোলা যায়, তাহলে দেশীয় ফল সারা বছর সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে। শুধু দেশের চাহিদাই পূরণ হবে না, বরং আন্তর্জাতিক বাজারেও রপ্তানির সুযোগ তৈরি হবে।
একই কথা কৃষি খাতের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। আজও আমাদের অনেক কৃষক অভিজ্ঞতার ওপর নির্ভর করে সার ও কীটনাশক ব্যবহার করেন। অথচ আধুনিক কৃষির মূল ভিত্তি হলো বিজ্ঞান। মাটির গুণাগুণ পরীক্ষা করে কোন জমিতে কী পরিমাণ পুষ্টি উপাদান প্রয়োজন, কোন ফসলের জন্য কী ধরনের ব্যবস্থাপনা দরকার এসব নির্ভুলভাবে নির্ধারণ করা সম্ভব। বিজ্ঞানভিত্তিক কৃষি ব্যবস্থাপনা চালু করতে পারলে উৎপাদনশীলতা বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে, উৎপাদন খরচ কমবে এবং কৃষকের আয় বাড়বে।
পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ ঘুরে দেখার সুযোগ হয়েছে আমার। চীনের বিভিন্ন প্রদেশ, ভারত, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ, তুরস্ক, সৌদি আরব, মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ এবং ইউরোপের কয়েকটি দেশ ভ্রমণ করে একটি বিষয় খুব স্পষ্টভাবে উপলব্ধি করেছি বাংলাদেশের সম্ভাবনা অসাধারণ। অনেক দেশ তাদের ভৌগোলিক সীমাবদ্ধতা, প্রাকৃতিক সম্পদের অভাব কিংবা সীমিত জনশক্তির কারণে নির্দিষ্ট কিছু খাতের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু বাংলাদেশ এমন একটি দেশ, যেখানে কৃষি, শিল্প, মানবসম্পদ, প্রযুক্তি এবং উদ্যোক্তা শক্তি সবকিছুর সমন্বয়ে বহুমাত্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়ন সম্ভব।
মালদ্বীপের অর্থনীতি মূলত পর্যটন ও মৎস্য খাতনির্ভর। শ্রীলঙ্কা চা, রাবার এবং সীমিত কিছু কৃষিপণ্যের ওপর নির্ভরশীল। মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশ তেল ও গ্যাসনির্ভর। কিন্তু বাংলাদেশের সামনে সম্ভাবনার ক্ষেত্র অনেক বিস্তৃত। আমাদের রয়েছে উর্বর ভূমি, বিপুল জনসংখ্যা, কৃষি উৎপাদনের সক্ষমতা, সমুদ্রবন্দর, নদীপথ এবং একটি কর্মক্ষম তরুণ প্রজন্ম। এই সম্পদগুলোকে সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারলে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিণত হতে পারে।
আমাদের দেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো মানুষ। কিন্তু দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, প্রতি বছর বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি বিদেশে অদক্ষ বা স্বল্প দক্ষ শ্রমিক হিসেবে কর্মসংস্থানের জন্য যান। ভাষাগত সীমাবদ্ধতা এবং পেশাগত দক্ষতার অভাবে তারা আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে কাঙ্ক্ষিত অবস্থান অর্জন করতে পারেন না। ফলে তাদের শ্রমের প্রকৃত মূল্যও অনেক সময় পাওয়া যায় না। আজ সময় এসেছে মানবসম্পদ উন্নয়নকে জাতীয় অগ্রাধিকারের পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার। মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায় থেকেই শিক্ষার্থীদের কারিগরি শিক্ষা, প্রযুক্তিগত দক্ষতা এবং আন্তর্জাতিক ভাষা শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রির পাশাপাশি বাস্তবমুখী দক্ষতাকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে। দক্ষ জনশক্তি তৈরি করা গেলে বিদেশে উচ্চ আয়ের কর্মসংস্থান যেমন বাড়বে তেমনি দেশেও নতুন শিল্প ও সেবা খাত গড়ে উঠবে। বাংলাদেশ ইতোমধ্যে জাহাজনির্মাণ শিল্পে আশাব্যঞ্জক অগ্রগতি দেখিয়েছে। এটি প্রমাণ করে যে সঠিক পরিকল্পনা, নীতি সহায়তা এবং উদ্যোক্তা উদ্যোগ থাকলে নতুন শিল্প খাতেও আমরা আন্তর্জাতিক বাজারে সফল হতে পারি। উত্তরবঙ্গ, দক্ষিণবঙ্গ এবং দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পরিকল্পিত শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলা হলে রাজধানীকেন্দ্রিক উন্নয়নের চাপও কমবে এবং স্থানীয় পর্যায়ে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পাবে।
আমাদের উচিত কৃষিকে শুধু উৎপাদনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে কৃষিভিত্তিক শিল্পের সঙ্গে যুক্ত করা। আধুনিক কোল্ড স্টোরেজ, ফুড প্রসেসিং, প্যাকেজিং এবং আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন সরবরাহব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। এতে কৃষকের আয় বাড়বে, খাদ্য অপচয় কমবে, আমদানিনির্ভরতা হ্রাস পাবে এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের নতুন সুযোগ সৃষ্টি হবে। বাংলাদেশের সম্ভাবনা অনেক। প্রয়োজন শুধু সঠিক পরিকল্পনা, দক্ষ নেতৃত্ব, বাস্তবভিত্তিক নীতি এবং জাতীয় ঐক্য। আমরা যদি আমাদের সম্পদ, শ্রম, মেধা এবং সুযোগগুলো সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারি, তবে আগামী প্রজন্মের জন্য একটি সমৃদ্ধ, আত্মনির্ভরশীল এবং মর্যাদাবান বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল। এখন প্রয়োজন সেই ভবিষ্যৎকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার সাহস, দক্ষতা এবং সুদূরপ্রসারী চিন্তা।
লেখক : বাজার বিশ্লেষক ও অর্থব্যবস্থাপনা পরামর্শক