সুরা আদিয়াতে আল্লাহতায়ালা বলেছেন, ‘শপথ তাদের যারা ছোটে দীর্ঘশ্বাসে। আগুনের ফুলকি ছিটিয়ে।’ (সুরা আদিয়াত, আয়াত ১-২) এখানে কারা দীর্ঘশ্বাসে ছোটে তার বলা নেই। আরবের তখনকার পরিস্থিতি বিবেচনা করে কোরআনের ব্যাখ্যাকারীরা বলেছেন, এখানে আল্লাহ ঘোড়ার কথা বলেছেন। কেউ বলেছেন, এখানে আল্লাহ উটের কথা বলেছেন। তৃতীয় একদল মুফাসসির বলেছেন, এখানে মানুষের কথা বলা হয়েছে। কেননা শপথ শেষে মানুষের অকৃতজ্ঞতার কথা বলেছেন আল্লাহ। ‘মানুষ তো তার প্রতিপালকের অকৃতজ্ঞ। সে মেতে আছে ধনসম্পদের লালসায়।’ (সুরা আদিয়াত, আয়াত -৬-৭।)
আজকের দুনিয়ার দিকে তাকালে মানুষকে ওই দীর্ঘশ্বাসে ছুটে চলা ঘোড়াই মনে হয়। যুদ্ধের ময়দানে ঘোড়া যেভাবে ছুটতে ছুটতে শত্রুর এলাকায় ঢুকে পড়ে, মানুষ সেভাবে দুনিয়ার লোভে দৌড়াতে দৌড়াতে শয়তানের জগতে, লোভের জগতে ঢুকে পড়ে। তখন তার মনমননে শুধু একটি চিন্তাই ঘুরপাক খায়-কীভাবে আরও সম্পদ করা যায়। কীভাবে আরও জমি কেনা যায়। কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা বানানো যায়। আসলে এই মানুষটি দুনিয়ার পাগল হয়ে গেছে। সে এতটাই পাগল হয়ে গেছে, কখন তার শৈশব গিয়ে যৌবন শেষ হয়েছে, কখন সে মৃত্যুর চৌকাঠে পা দিয়েছে, কোনো কিছুতেই খেয়াল নেই। খেয়াল থাকারও তো কথা না। ছুটন্ত ঘোড়া কি আর নিচের জমিনের দিকে ঠিকঠাক খেয়াল রাখতে পারে? যে দুনিয়ার পেছনে মানুষ এমন হন্য হয়ে ঘুরছে, এ দুনিয়া সম্পর্কে নবীজি (সা.) সাহাবিদের কী বলেছেন চলুন জেনে নিই।
একবার রসুল (সা.) সাহাবিদের নিয়ে বসে আছেন। কথা বলছেন দুনিয়া সম্পর্কে। দুনিয়া কীভাবে মানুষকে ধোঁকায় ফেলে। কীভাবে সংসারের জালে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলে আল্লাহর প্রতিনিধি মানুষকে-এসব বিষয় বলছিলেন যুক্তি ও আবেগ দিয়ে। একপর্যায়ে নবীজি (সা.) বললেন, এতক্ষণ তোমাদের যে থিওরি বলেছি, সংসারের বীভৎসতা দেখিয়েছি, তোমরা কী এখন তা নিজের চোখে দেখতে চাও? তাহলে চলো আমার সঙ্গে। সাহাবিদের নিয়ে নবীজি (সা.) এলেন মদিনার বাজারে। চলে গেলেন বাজারের পেছন দিকে। যেখানে ময়লা-আবর্জনার স্তূপ সেখানে দাঁড়িয়ে সাহাবিদের দিকে তাকালেন। সব সাহাবির চোখমুখে ঘিনঘিন ভাব। যে যেভাবে পেরেছে নাক চেপে ধরেছে। নবীজি (সা.) মুচকি হেসে বললেন, তোমরা নাক চেপে আছ কেন? সাহাবিরা বলল, প্রচণ্ড দুর্গন্ধ। নবীজি (সা.) বললেন, দুনিয়ার দুর্গন্ধ আরও বেশি। এবার নবীজি (সা.) বললেন, বাজারে একটি বকরির মূল্য কত? ধরি ১০ টাকা। আমি যদি এই বকরিটি তোমাদের কাছে ৫ টাকা মূল্যে বিক্রি করি তোমরা কেউ কি কিনবে বলেই আবর্জনার স্তূপে পড়ে থাকা একটি মৃত বকরির দিকে ইশারা করলেন নবীজি (সা.)।
সাহাবিরা বললেন, হুজুর! আপনি যদি ফ্রি দেন, তাহলেও তো এই বকরিটি আমরা নেব না। মানবতার মহান শিক্ষক মুহাম্মদ (সা.) বললেন, দুনিয়াও ঠিক এমনি। যারা বুদ্ধিমান, যাদের মনে আল্লাহর ভয় আছে, তাদের তুমি ফ্রি দিলেও দুনিয়া নেবে না। আফসোস! সেই মানুষের জন্য, যার সম্পর্কে আল্লাহ বলেছেন, ‘তোমরা দুনিয়ার জন্য আখেরাতকে বিক্রি করে দাও।’ হে আমার সাহাবিরা! যে মরা বকরি তোমরা ফ্রি দিলেও নেবে না বলেছ, সে মরা বকরিই কেউ কেউ রাজত্ব বিক্রি করে কিনে নিয়ে যাচ্ছে। চিন্তা করে দেখ, কত বড় অসচেতন হলে, মূর্খ হলে মানুষ এভাবে নিজের পায়ে কুড়াল মারতে পারে!
প্রিয় পাঠক! আমরা দুনিয়ার পিছে ছুটে ছুটে, সংসারের সমুদ্রে ডুবে ডুবেও বুঝতে পারছি না কী হারিয়ে ফেলছি। কত বড় ক্ষতি ডেকে আনছি আমাদের জন্য। দুনিয়া কিনে নিচ্ছি আখেরাত বিক্রি করে। অথচ এই বাজার থেকেই দুনিয়া বিক্রি করে আখেরাতের সদাই কেনার কথা ছিল। কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায় দুনিয়া পূজারির সুন্দর একটি চিত্র ফুটিয়ে তুলেছেন তাঁর কবিতায়। তিনি লিখেছেন, ‘বাঁ দিকের বুক পকেট সামলাতে সামলাতে/হায়! হায়! লোকটার ইহকাল পরকাল গেল!/অথচ আর একটু নিচে হাত দিলেই/সে পেত আলাদীনের আশ্চর্য প্রদীপ/তার হৃদয়!/লোকটা জানলই না।/ ‘তারপর একদিন/গোগ্রাসে গিলতে গিলতে/দু’আঙ্গুলের ফাঁক দিয়ে-/কখন খসে পড়েছে তার জীবন-/লোকটা জানলই না।’
আসলেই তো তাই। বাঁদিকের বুকপকেটের চিন্তায় ছুটছি আমরা। কীভাবে আরও বেশি টাকা কামানো যায়, আরও দুটো বাড়ি করা যায়, গাড়ি কেনা যায়-এসব ভাবতে ভাবতেই আমাদের জীবন চলে যাচ্ছে। কিন্তু নিজের আত্মাকে জানার চেষ্টা করছি না। পরম আত্মীয় আল্লাহকে পাওয়ার সাধনা করছি না। এভাবেই একদিন মৃত্যু এসে দুয়ারে দাঁড়ায়। হে দুনিয়ার মানুষ! দুনিয়ার পেছনে ছুটো না। আল্লাহর পেছনে ছুটো। তাহলে দুনিয়ায় তোমার পেছনে ছুটবে। নতুবা দেখবে, দুনিয়া একদিন তোমাকে এমন সর্বনাশে ফেলবে, যার কোন ক্ষতিপূরণ হবে না।
লেখক : প্রিন্সিপাল, সেইফ এডুকেশন ইনস্টিটিউট