পাবনা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে রাজস্ব শাখায় অফিস সহায়ক পদে সাম্প্রতিক নিয়োগটি একদিকে যেমন স্বচ্ছ ও দুর্নীতিমুক্ত নিয়োগের একটি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত হিসেবে প্রশংসিত হয়েছে, অন্যদিকে এটি বাংলাদেশের কর্মসংস্থান ও শিক্ষাব্যবস্থার একটি গভীর সংকটকেও নির্মমভাবে উন্মোচিত করেছে। প্রায় ৮ হাজার আবেদনকারীর মধ্য থেকে লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষার মাধ্যমে ১৮ জনকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।জেলা প্রশাসক স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, কোনো তদবির, রাজনৈতিক প্রভাব কিংবা অর্থ লেনদেন ছাড়াই সম্পূর্ণ মেধার ভিত্তিতে এ নিয়োগ সম্পন্ন হয়েছে। আমাদের সরকারি নিয়োগব্যবস্থায় যেখানে দীর্ঘদিন ধরে প্রশ্নফাঁস, দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ শোনা যায়, সেখানে এমন একটি স্বচ্ছ প্রক্রিয়া নিঃসন্দেহে অভিনন্দনযোগ্য।
কিন্তু এই নিয়োগের ফল আমাদের সামনে আরও বড় একটি বাস্তবতা তুলে ধরে। যে পদের ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা ছিল এসএসসি পাস, সেখানে নিয়োগ পাওয়া ১৮ জনের মধ্যে ১৭ জনই বিএসসি ইঞ্জিনিয়ার, টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ার, এমবিএ, অনার্স কিংবা মাস্টার্স ডিগ্রিধারী। এই তথ্য কেবল একটি নিয়োগের পরিসংখ্যান নয়; এটি দেশের উচ্চশিক্ষিত বেকারত্বের এক নির্মম প্রতিচ্ছবি। প্রশ্ন হলো, একজন প্রকৌশলী, একজন এমবিএ বা একজন মাস্টার্স ডিগ্রিধারী কেন এসএসসি পাসের একটি অফিস সহায়ক পদের জন্য প্রতিযোগিতা করবেন? এর উত্তর খুব কঠিন নয়। কারণ দেশে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে, অথচ সেই অনুপাতে দক্ষতা-সামঞ্জস্যপূর্ণ কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে না। উচ্চশিক্ষা শেষ করার পরও অসংখ্য তরুণ বছরের পর বছর উপযুক্ত চাকরির অপেক্ষায় থাকেন। শেষ পর্যন্ত জীবিকার তাগিদে তাঁরা এমন চাকরির জন্যও আবেদন করতে বাধ্য হন, যা তাঁদের শিক্ষা ও দক্ষতার সঙ্গে মোটেও সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নও উঠে আসে। অফিস সহায়ক পদ মূলত এমন একটি চতুর্থ শ্রেণির চাকরি-যার দায়িত্ব, কর্মপরিধি ও বেতনকাঠামো সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের। উচ্চশিক্ষিত একজন ব্যক্তি হয়তো বাধ্য হয়ে এই চাকরিতে যোগ দেবেন, কিন্তু তিনি দীর্ঘ মেয়াদে সেখানে থাকবেন-এমন নিশ্চয়তা কোথায়? আরও ভালো সুযোগ পেলেই তার চাকরি ছেড়ে দেওয়ার সম্ভাবনা অত্যন্ত স্বাভাবিক। এতে সরকারি দপ্তরকে আবারও নিয়োগপ্রক্রিয়ায় যেতে হবে, যা সময়, অর্থ ও প্রশাসনিক সক্ষমতার ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করবে।
নৈতিক দিক থেকেও নিয়োগ পরীক্ষাটি যোগ্য প্রার্থীদের ওপরে গুরুতর অনিয়মের দাবি রাখে। নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে ন্যূনতম যোগ্যতা এসএসসি পাস উল্লেখ থাকলেও বাস্তবে এমন পদগুলোর উদ্দেশ্য হলো অপেক্ষাকৃত কম শিক্ষিত নাগরিকদের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা। আইনগতভাবে উচ্চশিক্ষিতদের আবেদন নিষিদ্ধ না হলেও, বাস্তবে তাদের সঙ্গে এসএসসি পাস প্রার্থীদের প্রতিযোগিতা মোটেও সমান নয়। ফলে যাদের জন্য এ ধরনের পদ সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন, তারাই প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়েন। এটি কেবল পাবনার একটি জেলার ঘটনা নয়। গত কয়েক বছরে দেশের বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের নিয়োগে একই চিত্র দেখা গেছে। অফিস সহায়ক, নিরাপত্তাকর্মী, পরিচ্ছন্নতাকর্মী কিংবা নিম্ন পদের চাকরিতেও হাজার হাজার স্নাতক, স্নাতকোত্তর এবং প্রকৌশল ডিগ্রিধারী আবেদন করছেন। এই প্রবণতা স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেয়, আমাদের শ্রমবাজার ও উচ্চশিক্ষার মধ্যে একটি বড় ধরনের অসামঞ্জস্য তৈরি হয়েছে।
প্রতি বছর দেশের বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলো থেকে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করছেন। কিন্তু শিল্পায়ন, বেসরকারি বিনিয়োগ, প্রযুক্তিনির্ভর কর্মসংস্থান এবং দক্ষতাভিত্তিক চাকরির বাজার সেই হারে সম্প্রসারিত হচ্ছে না। ফলে শিক্ষিত তরুণদের একটি বড় অংশ তাদের অর্জিত যোগ্যতার তুলনায় অনেক নিচের স্তরের চাকরির জন্য প্রতিযোগিতা করতে বাধ্য হচ্ছেন। অর্থনীতির ভাষায় একে বলা হয়-যোগ্যতার তুলনায় নিম্নমানের কর্মসংস্থান, যা দীর্ঘ মেয়াদে ব্যক্তি, সমাজ, রাষ্ট্র এবং সবার জন্যই ক্ষতিকর। অতএব পাবনার এই নিয়োগকে একমাত্র স্বচ্ছতার সাফল্য হিসেবে দেখলে পুরো চিত্রটি ধরা পড়বে না। এটি যেমন দুর্নীতিমুক্ত নিয়োগের একটি ইতিবাচক উদাহরণ, তেমনি একই সঙ্গে এটি আমাদের কর্মসংস্থান পরিকল্পনা, উচ্চশিক্ষা নীতি এবং অর্থনৈতিক বাস্তবতার প্রতিও এক কঠিন প্রশ্ন ছুড়ে দেয়। স্বচ্ছ নিয়োগ অবশ্যই উদ্যাপনের বিষয়।
কিন্তু এমন একটি রাষ্ট্রব্যবস্থা কোনোভাবেই গৌরবের হতে পারে না, যেখানে একজন প্রকৌশলী, একজন এমবিএ কিংবা একজন মাস্টার্স ডিগ্রিধারী তরুণ জীবনের নিরাপত্তা খুঁজে পান এসএসসি পাসের একটি অফিস সহায়ক পদে। এই বাস্তবতা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়-সমস্যা নিয়োগ প্রক্রিয়ায় নয়, বরং কর্মসংস্থান সৃষ্টির সামগ্রিক কাঠামোয়। আজ তাই প্রয়োজন কেবল স্বচ্ছ নিয়োগ নয়; প্রয়োজন এমন একটি অর্থনীতি, যেখানে শিক্ষা ও দক্ষতার যথাযথ মূল্যায়ন হবে, উচ্চশিক্ষা হবে কর্মমুখী এবং একজন ইঞ্জিনিয়ারের স্বপ্নের শেষ ঠিকানা কখনোই একটি অফিস সহায়কের পদ হয়ে উঠবে না।
লেখক : চেয়ারম্যান, ওয়ার্ল্ড পিস অ্যান্ড হিউম্যান রাইটস সোসাইটি