ইতালি গিয়ে পরিবারের ভাগ্য বদলানোর স্বপ্ন দেখেছিলেন মাদারীপুর সদর উপজেলার পূর্ব রাস্তি গ্রামের মতিন মোল্লার ছেলে হেমায়েত মোল্লা (২৮)। সেই স্বপ্ন পূরণে পরিবারের শেষ সম্বল জমিজমা বিক্রি, ধারদেনা ও আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে টাকা জোগাড় করে দালাল চক্রের হাতে তুলে দেওয়া হয় ২২ লাখ ৭৩ হাজার ৩০০ টাকা। কিন্তু ইতালির বদলে তাকে পাঠানো হয় লিবিয়ায়। এরপর থেকেই নিখোঁজ হেমায়েত। তিনি বেঁচে আছেন, নাকি মারা গেছেন এখনো নিশ্চিত হতে পারেনি পরিবার। এ ঘটনায় হেমায়েতের ভাই বেলায়েত মোল্লা মানব পাচারকারী দালাল চক্রের পাঁচ সদস্যের বিরুদ্ধে গত ১৬ মার্চ মাদারীপুর মানব পাচার অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনালে মামলা দায়ের করেন। তবে মামলা দায়েরের তিন মাসেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত কোনো আসামি গ্রেপ্তার হয়নি। এতে চরম হতাশা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন মামলার বাদী ও পরিবারের সদস্যরা। মামলার আসামিরা হলেন সদর উপজেলার লক্ষ্মীগঞ্জ গ্রামের হেদায়েত লস্কর, আলো বেগম, মোতালেব লস্কর এবং ঝিকরহাটি গ্রামের আজাদ দর্জি ও পলি আক্তার। তাদের বিরুদ্ধে মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইন, ২০১২-এর সংশ্লিষ্ট ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে। মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে, দীর্ঘদিন ধরে বেকার থাকা হেমায়েতকে বাংলাদেশ থেকে সরাসরি ইতালিতে পাঠানোর প্রলোভন দেখায় সংঘবদ্ধ দালাল চক্র। উন্নত জীবনের স্বপ্ন দেখিয়ে তাকে লিবিয়ায় নিয়ে আটকে রেখে নির্যাতনের মাধ্যমে ২০২৫ সালের অক্টোবর ও নভেম্বর মাসে নগদ অর্থ, বিভিন্ন ব্যাংক হিসাব ও বিকাশের মাধ্যমে ধাপে ধাপে পরিবারের কাছ থেকে ২২ লাখ ৭৩ হাজার ৩০০ টাকা আদায় করা হয়। কিন্তু ইতালিতে পাঠানোর প্রতিশ্রুতি পূরণ করা হয়নি। বরং লিবিয়ায় নেওয়ার পর থেকেই হেমায়েতের সঙ্গে পরিবারের সব ধরনের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। পরিবার জানায়, ২০২৫ সালের শেষের দিকে লিবিয়ায় অবস্থানরত কয়েকজনের মাধ্যমে তারা জানতে পারেন, নির্মম নির্যাতনের পর হেমায়েত আর জীবিত নেই। তবে এ বিষয়ে কোনো সরকারি নথি বা নির্ভরযোগ্য প্রমাণ না থাকায় আজও নিশ্চিত হতে পারেনি পরিবার। নিখোঁজ হেমায়েতের ভাই ও মামলার বাদী বেলায়েত মোল্লা বলেন, ‘আমার ভাইকে ইতালি নেওয়ার কথা বলে ২২ লাখের বেশি টাকা নিয়েছে। পরে জানতে পারি, সে আর বেঁচে নেই। কিন্তু আজও কোনো আসামি গ্রেপ্তার হয়নি। আমরা দ্রুত আসামিদের গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানাচ্ছি।’ অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে অভিযুক্তদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তারা কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। স্থানীয় বাসিন্দা শরিফুল ইসলাম সুজন বলেন, ‘দালাল চক্র গ্রামের সহজ-সরল মানুষকে বিদেশে নেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে সর্বস্ব লুটে নিচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে দ্রুত জড়িতদের গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনতে হবে।’ মাদারীপুরের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ হাবিবুর রহমান বলেন, মাদারীপুর মানব পাচারপ্রবণ জেলা। এ ধরনের অপরাধ রোধে পুলিশ সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে। অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত করে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তবে মামলার বাদীপক্ষের দাবি, মামলা হওয়ার পরও দীর্ঘ সময় ধরে কোনো আসামি গ্রেপ্তার না হওয়ায় তারা বিচার পাওয়া নিয়ে শঙ্কিত। দ্রুত আসামিদের গ্রেপ্তার এবং নিখোঁজ হেমায়েতের প্রকৃত পরিণতি উদ্ঘাটনে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন তারা।