রাষ্ট্রেরও চরিত্র থাকে
কোনো কোনো সপ্তাহে চারটি আলাদা ঘটনা যেন একটি বড় গল্পের চারটি অধ্যায় হয়ে ওঠে। প্রথমে মনে হয়, এদের মধ্যে কোনো সম্পর্ক নেই। একটি কূটনীতি, একটি বাণিজ্য, একটি যুদ্ধ, আরেকটি নিছক জীবনদর্শন। কিন্তু একটু গভীরে তাকালে দেখা যায়, চারটির কেন্দ্রেই রয়েছে একটি শব্দ-বিচক্ষণতা। রাষ্ট্রের যেমন চরিত্র থাকে, মানুষেরও থাকে। রাষ্ট্র যেমন প্রতিটি প্রস্তাব গ্রহণ করে না, মানুষও তেমনি প্রতিটি শব্দের উত্তর দেয় না। রাষ্ট্র যেমন সব শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক রাখে, কিন্তু কারও অধীন হয় না; মানুষও তেমনি সবার সঙ্গে সৌজন্য বজায় রাখে, কিন্তু সবার জন্য নিজের ভিতরের দরজা খুলে দেয় না। এই সপ্তাহের ঘটনাগুলো যেন সেই পুরোনো সত্যটিকেই নতুন করে মনে করিয়ে দিল।
১. চীন, মালয়েশিয়া এবং সুযোগের রাজনীতি
প্রধানমন্ত্রীর মালয়েশিয়া ও চীন সফর নিয়ে রাজনৈতিক আলোচনা যতটা হয়েছে, অর্থনৈতিক আলোচনা ততটা হয়নি। অথচ আধুনিক কূটনীতির সাফল্য আর করমর্দনের ছবিতে মাপা হয় না; মাপা হয় বিনিয়োগ, প্রযুক্তি, কর্মসংস্থান, বাজার এবং আস্থার অঙ্কে। মালয়েশিয়া শুধু শ্রমবাজার নয়; দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত কেন্দ্র। অন্যদিকে চীন অবকাঠামো, শিল্প, উৎপাদন এবং বিনিয়োগে বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি অংশীদার। কিন্তু এই দুটি সফরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা অন্যত্র।
বাংলাদেশের সামনে এখন ‘কার সঙ্গে যাব’, এই প্রশ্ন নেই। প্রশ্ন হলো, কীভাবে সবার সঙ্গে সম্পর্ক রেখে নিজের জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ করা যায়। একসময় বিশ্বায়ন আমাদের শিখিয়েছিল দক্ষতার ভাষা। এখন ভূরাজনীতি শেখাচ্ছে স্থিতিস্থাপকতার ভাষা। সরবরাহ শৃঙ্খল বদলাচ্ছে, নতুন শিল্পাঞ্চল গড়ে উঠছে, উৎপাদনের মানচিত্র পুনর্লিখিত হচ্ছে। এই পরিবর্তনের ভিতরেই বাংলাদেশের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি হচ্ছে। কূটনীতি কখনো পক্ষ বেছে নেওয়ার শিল্প নয়; কূটনীতি হলো বিকল্প তৈরি করার শিল্প।
২. আমেরিকার জন্মদিন, ট্রাম্প এবং বাংলাদেশের পরীক্ষা
যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতা দিবস সামনে। ১৭৭৬ সালের সেই ঘোষণাপত্র শুধু একটি দেশের জন্ম দেয়নি; রাষ্ট্র, স্বাধীনতা এবং ব্যক্তিস্বাধীনতার একটি নতুন রাজনৈতিক ধারণারও জন্ম দিয়েছিল। কিন্তু আজকের আমেরিকা আর ১৭৭৬ সালের আমেরিকা এক নয়। ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রত্যাবর্তনের পর আবারও ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতি বৈশ্বিক বাণিজ্যকে নতুনভাবে রূপ দিচ্ছে। শুল্ক, প্রযুক্তি, সরবরাহ শৃঙ্খল এবং নিরাপত্তা এখন একই আলোচনার অংশ।
বাংলাদেশের জন্য এর অর্থ কী? অর্থ হলো, আমাদের সবচেয়ে বড় শক্তি কারও ঘনিষ্ঠ হওয়া নয়; বিশ্বাসযোগ্য হওয়া। যুক্তরাষ্ট্র আমাদের অন্যতম বৃহৎ রপ্তানি বাজার। ইউরোপ প্রধান ক্রেতা। চীন বড় বিনিয়োগকারী। ভারত অপরিহার্য প্রতিবেশী। জাপান উন্নয়নের দীর্ঘমেয়াদি সহযোগী। এদের কাউকে বাদ দিয়ে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ লেখা সম্ভব নয়। ছোট রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার ভারসাম্য। একজন দক্ষ মাঝি বাতাসের সঙ্গে যুদ্ধ করেন না; তিনি শুধু পাল বদলে দেন। রাষ্ট্র পরিচালনাও তেমনি। সময়ের পরিবর্তনকে অস্বীকার করে নয়, বুঝে এগোতে হয়। যে রাষ্ট্র নিজের কম্পাস নিজে ধরে রাখতে পারে, শেষ পর্যন্ত তারাই অন্যদের
কাছে নির্ভরযোগ্য অংশীদার হয়ে ওঠে।
তবে একটি বিষয় আমাদের কখনো ভুলে গেলে চলবে না। ভূরাজনীতিতে স্থায়ী বন্ধু বলে কিছু নেই, যেমন স্থায়ী শত্রুও নেই। স্থায়ী থাকে কেবল জাতীয় স্বার্থ। আজ যে দেশ আমাদের সবচেয়ে বড় বিনিয়োগকারী, কাল সে-ই কোনো বাণিজ্যিক ইস্যুতে কঠোর অবস্থান নিতে পারে। আবার যে দেশ আজ শুল্ক আরোপ করছে, আগামীকাল সে-ই নতুন বিনিয়োগের প্রস্তাব নিয়ে আসতে পারে। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের এই বাস্তবতাকে আবেগ দিয়ে নয়, প্রজ্ঞা দিয়ে বুঝতে হয়।
বাংলাদেশের সামনে আজ একটি বিরল সুযোগ রয়েছে। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে আমরা দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগস্থলে অবস্থান করছি। বঙ্গোপসাগর আজ আর শুধু সমুদ্র নয়; এটি জ্বালানি, বাণিজ্য, নৌ-নিরাপত্তা এবং বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ করিডর। যে রাষ্ট্র এই পরিবর্তন বুঝতে পারবে, ভবিষ্যতের অর্থনৈতিক মানচিত্রে তার অবস্থান আরও শক্তিশালী হবে।
কিন্তু একটি বন্দর নির্মাণের চেয়েও কঠিন কাজ হলো আস্থা নির্মাণ। বিদেশি বিনিয়োগ আসে শুধু কর-সুবিধা দেখে নয়; আসে নীতির ধারাবাহিকতা, আইনের শাসন, দক্ষ মানবসম্পদ এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর ভর করে। তাই কূটনীতির সাফল্য শেষ পর্যন্ত দেশের ভিতরের সুশাসনের সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্কিত। রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা বলেন, ছোট রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার সামরিক শক্তি নয়; তার বিশ্বাসযোগ্যতা। একটি নির্ভরযোগ্য রাষ্ট্রের সঙ্গে সবাই কাজ করতে চায়। কারণ সেখানে সিদ্ধান্ত হঠাৎ বদলে যায় না, নীতির ধারাবাহিকতা থাকে, আর প্রতিশ্রুতির মূল্য থাকে।
৩. যুদ্ধের সবচেয়ে বড় শিকার
আজকের পৃথিবীতে যুদ্ধ শুধু সীমান্তে হয় না; মানুষের মনেও হয়। একসময় যুদ্ধ শুরু হতো কামানের গর্জনে। এখন শুরু হয় একটি ভিডিও, একটি পোস্ট, একটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তানির্মিত ছবি কিংবা একটি বিভ্রান্তিকর শিরোনাম দিয়ে। মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক সংঘাত আবারও দেখিয়ে দিয়েছে, তথ্য এখন শুধু সংবাদ নয়; এটি একটি কৌশলগত অস্ত্র।
আমরা এমন এক যুগে বাস করছি, যেখানে তথ্যের অভাব নেই; বরং তথ্যের অতিরিক্ততাই মানুষকে বিভ্রান্ত করছে। সত্যকে গোপন করার চেয়ে তাকে অসংখ্য শব্দের ভিড়ে হারিয়ে দেওয়া এখন অনেক সহজ। রাষ্ট্রের জন্য এটি একটি বড় শিক্ষা। বিনিয়োগ আস্থার ওপর দাঁড়ায়, আস্থা দাঁড়ায় বিশ্বাসযোগ্য তথ্যের ওপর। তাই সাইবার নিরাপত্তা, তথ্যের নির্ভরযোগ্যতা এবং কৌশলগত যোগাযোগ আজ আর বিলাসিতা নয়; জাতীয় সক্ষমতার অংশ।
জর্জ অরওয়েল একসময় লিখেছিলেন, ক্ষমতা শুধু মানুষের ওপর নয়, সত্যের ওপরও প্রতিষ্ঠিত হতে চায়। ডিজিটাল যুগে সেই কথার নতুন অর্থ তৈরি হয়েছে। এখন যে বয়ান তৈরি করতে পারে, সে-ই অনেক সময় বাস্তবতাকেও প্রভাবিত করতে পারে। বাংলাদেশেরও তাই নিজের গল্প নিজেকেই বলতে হবে। অন্যের ভাষায় নিজের পরিচয় লিখতে গেলে, একসময় নিজের পরিচয়ই অস্পষ্ট হয়ে যায়।
৪. সব আলো পথ দেখায় না
জীবনের একটি বড় শিক্ষা হলো, সব আলো পথ দেখায় না। কিছু আলো শুধু চোখ ধাঁধিয়ে দেয়। সব শব্দের উত্তর শব্দ দিয়ে দিতে হয় না। কিছু ঝড়ের সবচেয়ে ভালো উত্তর জানালা বন্ধ করে দেওয়া। কিছু দূরত্ব সম্পর্ককে রক্ষা করে। কিছু নীরবতা মর্যাদাকে বাঁচিয়ে রাখে। আজ ব্যক্তি থেকে রাষ্ট্র, সবাই যেন প্রতিনিয়ত প্রতিক্রিয়া জানানোর চাপে আছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আমাদের এমন এক সংস্কৃতি তৈরি করেছে, যেখানে নীরবতাকে দুর্বলতা মনে করা হয়। অথচ ইতিহাস বলে, সবচেয়ে পরিণত সিদ্ধান্তগুলো প্রায়ই সবচেয়ে শান্ত পরিবেশেই নেওয়া হয়। বুদ্ধ নীরবতার শক্তি জানতেন। রবীন্দ্রনাথ নিঃসঙ্গতার শক্তি জানতেন। জীবনানন্দ জানতেন, মানুষের সবচেয়ে গভীর সংলাপ অনেক সময় নিজের সঙ্গেই হয়।
রাষ্ট্রের ক্ষেত্রেও তাই। যে রাষ্ট্র প্রতিটি উত্তেজনায় প্রতিক্রিয়া দেখায়, সে একসময় নিজের অগ্রাধিকার হারিয়ে ফেলে। কিন্তু যে রাষ্ট্র জানে কখন কথা বলতে হয়, কখন অপেক্ষা করতে হয়, আর কখন কেবল পর্যবেক্ষণ করতে হয়-দীর্ঘ মেয়াদে তারাই স্থিতিশীল থাকে। আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি, যেখানে তথ্যের গতি আলোর গতির মতো, কিন্তু প্রজ্ঞার গতি এখনো মানুষের বিবেকের ওপর নির্ভরশীল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আমাদের যুক্ত করেছে, কিন্তু একই সঙ্গে বিভক্তও করেছে। অ্যালগরিদম আমাদের পছন্দকে এমনভাবে পরিচালিত করে যে আমরা ধীরে ধীরে শুধু নিজের মতের প্রতিধ্বনি শুনতে অভ্যস্ত হয়ে পড়ি। ভিন্নমত তখন আর যুক্তি নয়, শত্রু বলে মনে হয়।
এই প্রবণতা শুধু সমাজের জন্য নয়, গণতন্ত্রের জন্যও একটি নীরব ঝুঁকি। কারণ গণতন্ত্রের প্রাণশক্তি মতের মিল নয়; মতের ভিন্নতাকে ধারণ করার ক্ষমতা। বাংলাদেশের মতো একটি বহুমাত্রিক সমাজে তাই সহনশীলতা শুধু নৈতিক গুণ নয়; এটি রাষ্ট্র পরিচালনারও অপরিহার্য শর্ত। আমরা যদি প্রতিটি মতপার্থক্যকে সংঘাতে পরিণত করি, তাহলে উন্নয়নের গতি থেমে যাবে। আর যদি ভিন্নমতকে আলোচনায় রূপ দিতে পারি, তাহলে সেটিই হবে আমাদের সবচেয়ে বড় শক্তি।
শেষ কথা
একজন প্রবীণ কূটনীতিক একবার বলেছিলেন, ‘রাষ্ট্রের পরিপক্বতা বোঝা যায় সে কত জোরে কথা বলে তা দিয়ে নয়; সে কত মনোযোগ দিয়ে শোনে তা দিয়ে।’ এই কথাটির ভিতরে আজকের বাংলাদেশের জন্য একটি বড় শিক্ষা লুকিয়ে আছে। আমাদের এখন শুধু বিশ্বকে বোঝানোর প্রয়োজন নেই; বিশ্ব কীভাবে বদলাচ্ছে, সেটিও মনোযোগ দিয়ে শোনার প্রয়োজন আছে। কারণ ইতিহাস কখনো স্থির থাকে না। যে রাষ্ট্র পরিবর্তনের ভাষা বুঝতে পারে, ভবিষ্যৎও অনেক সময় তার পক্ষেই কথা বলে। চারটি প্রসঙ্গ-চীন ও মালয়েশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, বিশ্ব সংঘাত এবং নীরবতার দর্শন। আপাতদৃষ্টিতে ভিন্ন, কিন্তু মূল শিক্ষা একটিই। রাষ্ট্র পরিচালনা শেষ পর্যন্ত শক্তির নয়, চরিত্রের পরীক্ষা।
আমরা এমন এক সময়ে দাঁড়িয়ে আছি, যখন বিশ্বের বড় শক্তিগুলো নিজেদের অবস্থান পুনর্নির্ধারণ করছে। এই পরিবর্তনের ভিতরে বাংলাদেশের সামনে যেমন ঝুঁকি রয়েছে, তেমনি বিরল সুযোগও রয়েছে। কিন্তু সেই সুযোগ কাজে লাগাতে হলে আমাদের প্রয়োজন আত্মবিশ্বাসী, ভারসাম্যপূর্ণ এবং দূরদর্শী রাষ্ট্রচিন্তা। সব দরজা খুলে রাখতে হয়, কিন্তু নিজের ঘরের চাবি কখনো অন্যের হাতে তুলে দেওয়া যায় না। মানুষের ক্ষেত্রেও তাই, রাষ্ট্রের ক্ষেত্রেও তাই। শেষ পর্যন্ত ইতিহাস তাদেরই মনে রাখে, যারা সবচেয়ে বেশি আওয়াজ করেনি; বরং সবচেয়ে স্পষ্টভাবে নিজেদের চিনেছিল।
লেখক : প্রেসিডেন্ট, সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ