শিরোনাম
প্রকাশ : শনিবার, ১৭ অক্টোবর, ২০১৫ ০০:০০ টা
আপলোড : ১৭ অক্টোবর, ২০১৫ ০১:৪৫

বকুল কোচ ও দ্রুত বিচার

নিজস্ব প্রতিবেদক

বকুল কোচ ও দ্রুত বিচার

বাণিজ্যের হাত থেকে রেহাই পাওয়ার কি কোনো উপায় আছে? মহাত্নাগান্ধীজির সাতটি Deadly sin অর্থাৎ মহাপাপের দুটি হলো Commerce without morality এবং Politics without principle, তাহলে ওই সময়ে কি গান্ধীজি তার প্রজ্ঞা দিয়ে এটা বলেছিলেন, নাকি সামনে বিরাজমান অবস্থা থেকে তিনি এটা অনুধাবন করেছিলেন। সে যাই হোক, আমি নিশ্চিত বর্তমান পরিস্থিতি আগের চেয়ে ভয়াবহ। বাণিজ্য কোথায় নেই? সরকারি অফিসে, ঠিকাদারিতে, যানবাহন চলাচলে, (ফিটনেস দেওয়া, তেল চুরি, গাড়ির পার্টস খুলে বিক্রি করা, গাড়ির ভাড়া আদায় এবং মালিককে পরিশোধ করা ইত্যাদি), চিকিৎসাসেবা, শিক্ষা, ওকালতি, পেশকারি, পাইকারি-খুচরা বাজার সর্বত্র।

চোখ খুলে তাকালে বাণিজ্য ছাড়া কিছুই দেখা যায় না। ইদানীং ডাক্তারি প্র্যাকটিসে এমন দামি উপঢৌকন দেওয়া হয় সেটাও কল্পনার অতীত। ৪০ বছরের পেশাগত জীবনের অভিজ্ঞতায় বর্তমানে এর উপদ্রব অনেক বেড়ে গেছে। ১৯৭৭ সালে যখন পেশাগত জীবন শুরু করি, তখন জামশেরুজ্জামান মে অ্যান্ড বেকার ফার্মা প্রায়ই ভিজিট করতেন, মোহাম্মদ আলী ভাই ফাইজারসহ অনেকে, তার অব্যবহিত পরে স্কয়ার কোম্পানির সাইফুল ভাই, যাদের কাছ থেকে ডাক্তার হিসেবে অনেক কিছু শিখেছি। কোন ওষুধ কখন লেখা যায় বা লেখা যায় না, কখন খাওয়া যায় বা যায় না। অনেক সময় নিজেরা স্বাদ নিয়ে বলতেন এটা ছোট বাচ্চাদের লিখো না, প্রচণ্ড তিতা। কখনো তাদের কাছ থেকে কোনো বাজে অফার পাইনি। বরং কোনো গরিব রোগীর জন্য ফ্রি ওষুধ চাইলেই পাওয়া যেত। ওষুধ কোম্পানির কাছ থেকে ওষুধ নিয়ে, আলমিরা ভরপুর করে রেখে দিতাম, যেন কোনো ওষুধের অভাব না হয় কোনো রোগীর জন্য। এখন নিজের জন্যই আমরা বেশি চাই। তাই রোগীর জন্য চাইতে পারি না। ওষুধ কোম্পানিগুলো দল বেঁধে ডাক্তারদের এসব উপঢৌকন না দিয়ে ওষুধের দাম কমালে কত উপকারই না হতো। ল্যাব বা ক্লিনিক কমিশন আগে কল্পনাতেই ছিল না। কারণ বাইরে তেমন কোনো ল্যাব ছিল না, প্রাইভেট ক্লিনিকের প্রশ্নই উঠত না। সবাই মেডিকেল কলেজসহ সদর হাসপাতালগুলোতে ভর্তি হতো। পরীক্ষা-নিরীক্ষা সবই সেখানে হতো। সুতরাং কমিশন কে কাকে দেবে। সামান্যটুকু যা ছিল তা শুধু রেডিওলজিসহ বিভিন্ন প্যাথলজি পরীক্ষায় সরকারি নিয়ম অনুযায়ী তাও কমিশন নয়, ঝুঁকিভাতা। আমার মেয়ের মতো একটা ছোট উপজাতি মেয়ে অনেক দিন ধরেই আমাদের পরিবারের সঙ্গে ছিল এবং আছে। আমাদের হাত ধরে বড় হলো। স্বাভাবিক নিয়মে বিয়ে হয়ে শ্বশুরবাড়ি চলে গেল। তারই নিজ এলাকায়। স্বল্পভাষী। কাজ করছে তো করছে। রাগ করতে কখনো দেখিনি। কখনো বলেনি চলে যাব। মেয়েটির নাম শশী রানী কোচ, স্বামী বকুল কোচ। যেমন বলেছি আমার মেয়ের মতো। বিয়ে এবং বিয়ের পরে আর্থিক এবং সামাজিক বন্ধন নিজের মেয়ের মতোই। সে যখন আমাদের পরিবারে, তখন তার বড় বোনের বিয়ে হয়। বড় বোনাই অর্থাৎ ভগ্নিপতিকে আমি আমার চেম্বারে কাজ দিয়ে নিয়ে আসি।

জানুয়ারি, ২০১০ সালে শশীর স্বামীর বিরুদ্ধে শেরপুরে একটি মামলা হয়। তার বাড়ি খলচান্দা, উপজেলা নালিতাবাড়ী। মামলাটি হলো কেস নম্বর ০১/২০১০ বিষয়বস্তু : বিশেষ আদালত ১৯৭৪ সালের ২৫ (বি) ধারা তিন কেজি চিনি চোরাচালানের জন্য। দায়রা জজ আদালত। যেহেতু আইন সম্পর্কে, আদালত সম্পর্কে কিছু জানি না তবে আইন এবং আদালতের প্রতি যথেষ্ট ভক্তি, শ্রদ্ধা ও সম্মান আমার রয়েছে। বিচারকদের প্রতি আরও গভীর শ্রদ্ধা। পরকালের বিচার দেখব কিনা জানি না, দ্রুত পুনর্জন্ম পেলে হয়তো বিচার হবে না। তবে সেখানকার বিচারক স্রষ্টা, যেমন অসীম দয়ালু, তেমনি অসীম ক্ষমতাবান।

জন্ম ডাক্তারবাড়িতে, ডাক্তার অশ্বিনীকুমার দত্ত, আমার ছোট দাদু। একান্নবর্তী পরিবার। ঠাকুরমা হলেন উকিলবাড়ির মেয়ে। তার বড় ভাই উকিল রমণী মোহন পাল। শুধু উকিল নন, ছোটবেলায় শুনতাম জাঁদরেল উকিল। উকিল দাদুর মেধার একটা উদাহরণ দিচ্ছি। মেডিকেল কলেজের প্রথম বর্ষের ছাত্র। হোস্টেল রুমে ‘সংবাদ’ পত্রিকা রাখি ও পড়ি। প্রথম কারণ দরবার-ই-জহুর এবং আরও দু-এক জনের লেখা পড়ার জন্য। দ্বিতীয় কারণ রুমমেটের তিনজন ছাত্র ইউনিয়ন, আমি একা ছাত্রলীগ। এক বৃহস্পতিবার একটা বক্স করা খবর ত্যাজ্য ঘোষণা’ এবং দৈনিক সংবাদের প্রথম পৃষ্ঠায়। দাদু রমণী মোহন পাল তার বড় দুই ছেলেকে (ললিত এবং সন্তোষ) ত্যাজ্য ঘোষণা করেছেন। অবশ্যই অনেক আগে থেকে তারা ত্রিপুরায় থাকেন এবং ভালো আছেন। ত্যাজ্য ঘোষণা বিজ্ঞপ্তিটি দেখে মনে খুব কষ্ট হলো। সঙ্গে সঙ্গে বাহাদুরাবাদ এক্সপ্রেস ট্রেনে কুমিল্লা চলে আসি। বাবাকে জিজ্ঞাসা করলাম ঘটনাটা কী? তিনি বললেন তুমি বুঝবে না’। আমি আবারও বললাম, মেডিকেল কলেজের লেখাপড়া অর্থাৎ অ্যানাটমি, ফিজিওলজি, বায়োকেমিস্ট্রি বুঝতে পারি, এ ক্ষেত্রে ত্যাজ্য ঘোষণার কারণ আমাকে ব্যাখ্যা করলে বুঝব না, এটা তো হয় না। অনেক পীড়াপীড়ির পর বাবা বলতে বাধ্য হলেন। বললেন পাকিস্তান সরকার শত্রু সম্পত্তি আইন করেছে। যে আইনে তার ছেলেরা ভারতে থাকলে অর্ধেক সম্পত্তি রাষ্ট্রের মালিকানায় চলে যাবে। এখন ওদের ত্যাজ্য করাতে সুবিধা হলো। তাদের সম্পত্তির অধিকার থেকে বঞ্চিত করে পুরো সম্পত্তি দেশে যে দুজন থাকে তাদের নামে লিখে দিতে পারবেন। একেই বলে উকিলের বুদ্ধি। এবং সে জন্যই বোধ হয় সব উকিল রাজনীতি করেন অথবা যারা রাজনীতি করেন তাদের অনেকেই ওকালতি পড়ে নেন। তবে বাংলাদেশে শুধু ব্যবসায়ীদের কাছেই রাজনীতিবিদ উকিলরা মাঝেমধ্যে ধরাশায়ী হয়ে যান বিভিন্ন নির্বাচনে।

বলছিলাম শশীর স্বামীর মামলার কথা, পাঁচ বছরে তার স্বামীর মামলার শুনানি শেষ হলো না। কিন্তু মাসে মাসে তারিখ পড়ে। বিবাদীর তিন কেজি চিনি চোরাচালানের মামলায় প্রতি মাসে উকিল, কোর্ট-কাচারি বাবদ প্রায় হাজার পাঁচেক টাকা চলে যায়। বিচারপতিরা আমার কাছে নমস্য। তবে বর্তমান প্রধান বিচারপতি শুধু নমস্য নন অত্যন্ত গতিশীল। কিছু দিন আগে আমার আত্মীয় স্বদেশ এবং জনকণ্ঠের আতিকউল্লাহ খান মাসুদের বিরুদ্ধে যে মামলাটি হয়েছিল তা ইতিহাসে রেকর্ড করা দ্রুততম সময়ে নিষ্পত্তি হয়েছে। স্বদেশ আমার আত্মীয় এবং øেহভাজন। তাই সকালে আদালতে যাই। তলব হওয়ার পরপরই স্বদেশকে বললাম, ‘আমার অতি আপনজন, দুজন ব্যারিস্টার আছেন তাদের কাছে যাও, তাদের তোমার উকিল হিসেবে ঠিক কর।’ স্বদেশ আমাকে জানাল, অনেককে অনুরোধ করা হয়েছে তারা নানানভাবে পাশ কাটিয়ে যাচ্ছেন। তারা কেউ হয়তো স্বদেশকে পছন্দ করেননি, তার লেখা হয়তো সত্যিই দোষণীয় বা অন্যায় হয়েছে, অথবা মামলায় জেতানো যাবে না। আমার পরিচিত ব্যারিস্টারদের না নেওয়ার কারণ জিজ্ঞাসা করলে বলল, তারা বর্তমান সরকারের আস্থাভাজন তাই নেননি। যুক্তিটা আমার কাছে গ্রহণযোগ্য হয়নি। তবে এটুকু বুঝতে অসুবিধা হয়নি যে স্বদেশ জ্ঞানী, প্রচুর লেখাপড়া করে, তবে রাজনীতি বা ধান্দা বোঝে না। প্রথম শুনানির দিন আমি আদালতে গেলাম। অজ্ঞতার কারণে সাংবাদিক না হয়েও আমি সাংবাদিকদের সঙ্গে এজলাসের ভিতরে চলে গেলাম। বুঝতে পারলাম এটা অন্যায়। যখন আদালত থেকে বেরিয়ে দেখলাম ড. মুনতাসীর মামুন বাইরে দাঁড়িয়ে তখন আর বুঝতে বাকি রইল না। প্রবেশটা অন্যায় হয়েছে। শুধু যে এজলাসে ঢুকেছি তাই-ই নয়, বরং আতিকউল্লাহ খান মাসুদ ও স্বদেশের মাঝে গিয়ে বসলাম। বিচারপতিরা এক এক করে চারজন, প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে এজলাসে বিচারকের আসনে এসে বসলেন। ৩ আগস্ট যেভাবে অতি দ্রুত, ১০ আগস্টের তারিখ দেওয়া হলো, আমার মতো আইনজ্ঞানহীন একজন অকালকুষ্মাণ্ডও বুঝতে পেরেছি স্বদেশের শাস্তি হবে। আমার অনুজপ্রতিম সুভাষ সিংহ রায় আমাকে বলল, স্বদেশ দা ক্ষমা চাইলেই পারেন। সবাই তো ক্ষমা চায়। কয়েক দিন আগেও যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালে ড. কামাল হোসেনের জামাতাকে নিয়ে একটি বিবৃতি দেওয়ার পরে এক এক করে সবাই ক্ষমা চাইলেন। এমনকি ডা. জাফরুল্লাহ টালবাহনা করেও পার পেলেন না। নিঃশর্তভাবে ক্ষমা চাইতে হলো। এর আগে অনেক সম্পাদকও আদালতে নিঃশর্ত ক্ষমা চেয়েছেন। কিন্তু এখন যেই দ্রুততার সঙ্গে অর্থাৎ ৩ আগস্ট, পরবর্তী তারিখ ১০ আগস্ট এবং বৃহত্তর বেঞ্চ নিয়ে চ‚ড়ান্ত রায় ১৪ আগস্ট। অর্থাৎ দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের চেয়েও দ্রুততম সময়ে বিচার শেষ। তাই এ দেশের একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে আমি গর্বিত। বিচারে স্বদেশের শাস্তি হয়েছে। আমার চিন্তা হলো, আমার মেয়ে শশীর স্বামীর মামলাটা কবে নিষ্পত্তি হবে, নয় তো, প্রতি মাসে এ বেচারাকে যে ফিস দিতে হয় তা আগেই বলেছি। সংশ্লিষ্ট সম্মানিত বিচারকের কাছে আমার আকুল আবেদনÑ বিচারটা শেষ করে যে শাস্তি তার হওয়া উচিত তাই দিন। শাস্তিটা ভোগ করে সে পারিবারিক কাজে মন দিক। আজকে আমার বার বার মনে হচ্ছে, আইন এবং আদালত সম্পর্কে সেই অমোঘ বাণী :

‘Justice delayed, Justice denied, Justice hurried, Justice buried’.আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার মতো যদি স্বদেশ এবং আতিকউল্লাহ খান মাসুদের মামলায় শুনানি হতো, শাস্তি দেওয়ার জন্য যে উপাদান বিবেচনায় আনা হলো তা যদি জনসমক্ষে আসত, জনগণ আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার মতো সব পড়ে জ্ঞান লাভ করতে পারত, বিবেক দিয়ে বিশ্লেষণ করতে পারত। তাহলে বিভিন্ন লেখক এ মামলা থেকে শিক্ষা নিতে পারত। ব্যাপারটাও অত্যন্ত পরিষ্কার হতো।

স্বদেশ অন্যায় করেছে, শাস্তি পেয়েছে। সর্বোচ্চ আদালতের বয়োজ্যেষ্ঠ বিচারকের মাধ্যমে যে রায় এর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা। এই মাত্র খবর পেলাম আমার মেয়ে শশীর স্বামী বকুল কোচের মামলাটি নিষ্পত্তি হয়ে সে খালাস পেয়ে গেছে। ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা বিচার বিভাগের প্রতি।

হলেখক : সাবেক উপাচার্য, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়


আপনার মন্তব্য