শিরোনাম
প্রকাশ : বুধবার, ৩০ নভেম্বর, ২০১৬ ০০:০০ টা
আপলোড : ২৯ নভেম্বর, ২০১৬ ২৩:১০

ধর্মতত্ত্ব

সময় থাকতে নিতে হবে আখেরাতের প্রস্তুতি

মাওলানা সেলিম হোসাইন আজাদী

সময় থাকতে নিতে হবে আখেরাতের প্রস্তুতি
Google News

বাংলার ঋতু ঘরের দুয়ারে হেমন্ত ও শীত মুখোমুখি দাঁড়িয়ে। হেমন্ত বের হলেই শীত ঢুকবে। শীতের খুব তাড়া। তাই দুয়ারে দাঁড়িয়েই আগমনী বার্তা শোনাচ্ছে। যে কারণে হেমন্তের সকাল দেখে বলা মুশকিল এ কী হেমন্ত না শীত। শীতের যত তাড়াই থাকুক, হেমন্তের আগে চলে আসা যেমন অসম্ভব, তেমনি সময়ের আগে হেমন্তের বিদায় হওয়াও অসাধ্য। আসা-যাওয়ার এ খেলা এবং সময়ের বাধাধরা নিয়ম শুধু শীত-হেমন্ত কিংবা ঋতুচক্রের পালাবদলেই নয় বরং প্রতিটি সৃষ্টির ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। এ সম্পর্কে জ্ঞানগ্রন্থ কোরআনে বলা হয়েছে, ‘লিকুল্লি আজালিন কিতাব’। অর্থাৎ প্রত্যেক বিষয়ের জন্য একটি নির্দিষ্ট মেয়াদ রয়েছে। (সূরা আর-রা’দ : ৩৮।) মূলত এ মেয়াদের কারণেই একে অন্যের মুখোমুখি দাঁড়িয়েও সময়ের অপেক্ষা করতে হয়। যেমন অপেক্ষা করছে আমাদের রুহ বা আত্মা। যখন সময় হবে রুহ পাখি উড়াল দিয়ে চলে যাবে পরমাত্মার সান্নিধ্যে। নির্দিষ্ট সময়ের একমুহূর্ত আগেও না একমুহূর্ত পরেও না- যথাসময়েই রুহ পাখি উড়াল দেবে দেহখাঁচা ছেড়ে। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেন, ‘প্রত্যেক উম্মতের জন্যই একটি নির্দিষ্ট কাল-সীমা রয়েছে, যখন তাদের সে সময় এসে যাবে তখন একমুহূর্ত সময়ও এদিক সেদিক হবে না। (সূরা আ’রাফ : ৩৪, সূরা ইউনুস : ৪৯ ও সূরা নাহল : ৬১)।

সময়ের আগে শীত না এলেও আল্লাহর নির্দেশেই শীত তার আগমনী বার্তা শোনায়। আল্লাহর বান্দা যেন শীতের প্রস্তুতি নিতে পারে। একইভাবে রুহ পাখি উড়াল দেওয়ার আগেই বান্দার মাঝে কিছু নিদর্শন প্রকাশ করে। যেন আখেরাতের প্রস্তুতি সঠিকভাবে নেওয়া যায়। আফসোস! এসব নিদর্শন দেখা সত্ত্বেও মানুষ ভাবলেশহীন জীবনযাপন করে সময় নষ্ট করছে। আল্লাহর নবী হজরত ইদরিস (আ.)-এর জীবন থেকে একটি ঘটনা বলছি। একদিন হজরত ইদরিস (আ.) মালাকুল মউত আজরাইল (আ.)কে বললেন, ‘ভাই আজরাইল! আপনি তো আমার জান কবজ করবেন। আপনার কাছে আমার অনুরোধ! জান কবজের আগে দয়া করে আমাকে একবার সতর্কসংকেত বা আগমনী বার্তা দেবেন।’ এর কয়েক বছর পর আজরাইল (আ.) এসে বললেন, ‘নবীজী প্রস্তুত হোন। একটু পরেই আপনার জান কবজ করা হবে।’ ইদরিস (আ.) বললেন, ‘আপনি তো আমাকে কোনো সতর্কসংকেত দেননি।’ এ কথা শুনে আজরাইল (আ.) বললেন, ‘আমি আপনাকে তিনটি সতর্কবার্তা দিয়েছি। ১. যখন আপনার সামনে অন্য মানুষের রুহ পাখি কেড়ে নিয়েছি, ২. যখন আপনি রোগাক্রান্ত হয়েছেন এবং ৩. যখন আপনার চুল-দাড়ি সাদা হয়ে গেছে। এ তিনটি অবস্থাই ছিল আপনার জন্য সতর্কবার্তা। কিন্তু আপনি তা বুঝতে পারেননি। এমনিভাবে প্রত্যেক মানুষের দুয়ারেই মৃত্যু এবং মৃত্যুর নিদর্শন দাঁড়িয়ে থাকে। কিন্তু দুনিয়ার খেল তামাশায় জড়িয়ে মানুষ মৃত্যুকে একদম ভুলে যায়।’ মৃত্যু এক অবশ্যম্ভাবী বিষয় জেনেও তাকে ভুলে যাওয়া অসুস্থ আত্মারই পরিচয়। ইসলাম নামক শান্তি সংঘের কোনো সদস্যই যেন মৃত্যুকে ভুলে না থাকে, তাই রসুল (সা.) উম্মতকে মৃত্যুর কথা স্মরণের উপদেশ দিতেন বার বার। তিনি (সা.) সাহাবিদের প্রায়ই বলতেন, সেই মৃত্যুকে স্মরণ কর, যা তোমাদের হাসি-আনন্দকে মলিন করে দেবে। (ইবনে আবিদ দুনয়া।) অন্যত্র তিনি (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা মৃত্যুকে বেশি করে স্মরণ কর। মৃত্যুর স্মরণ তোমাদের পাপ থেকে দূরে রাখবে এবং মোহময় জীবনযাপনে অনাসক্ত করে তুলবে।’ রসুল (সা.)কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল সবচেয়ে বুদ্ধিমান কে? রসুল (সা.) বললেন, ‘যে বেশি করে মৃত্যুর কথা স্মরণ করে এবং মৃত্যু-পরবর্তী জীবনের জন্য প্রস্তুতি নেয়। (ইবনে মাজাহ।) মরণকে স্মরণের তাৎপর্য উল্লেখ করে রসুল (সা.) বলেছেন, ‘যে দৈনিক ২০ বার মৃত্যুকে স্মরণ করবে এবং তার জন্য প্রস্তুতি নেবে আল্লাহতায়ালা তাকে শহীদের মর্যাদা দেবেন। (তিবরানি)।

মরণের স্মরণ আমরা ভুলে গেছি। তাই দুনিয়ার অস্থায়ী রংমহল আমাদের কাছে প্রিয় হয়ে গেছে। অথচ মরণ এক চরম সত্য। ইরশাদ হচ্ছে, কুল্লু নাফসিন জা ইকাতুল মাওত। অর্থাৎ প্রত্যেক প্রাণীকেই মরণের স্বাদ গ্রহণ করতে হবে। এ আয়াত আমরা মানি আর না মানি, বিশ্বাস করি আর অবিশ্বাস করি- মৃত্যু একদিন আসবেই আসবে। তাই বুদ্ধিমানের কাজ হলো মরণের পরের জীবনের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করা। দুনিয়া নামক বাজার থেকে চিরস্থায়ী আবাস আখেরাতের জন্য সদাই কেনাই প্রকৃত বুদ্ধিমানের কাজ। যেমনটি রসুল (সা.) বলেছেন— ‘আদ-দুনইয়া উ মাজরাআতুল আখেরাহ। অর্থাৎ এ পৃথিবী আখেরাতের শস্য খেত।’ এখানে যেমন ফসল লাগাব আখেরাতে তেমন ফল পাব। আখ গাছ লাগিয়ে যেমন ধান পাওয়া অসম্ভবের চেয়েও অসম্ভব, তেমনি মৃত্যু ভুলে পাপের জিন্দেগি যাপন করে সুখের আবাস জান্নাত পাওয়াও অসম্ভব।

হে মৃত্যু ভোলা মুসলমান! কীসে তোমাকে মৃত্যুর কথা ভুলিয়ে রেখেছে? তুমি কি জান আজকের দিনটিই হতে পারে তোমার জন্য শেষ দিন। তাহলে কেন ফিরে আসছ না প্রভুর বন্দেগির পথে। কেন ডুবে আছ গন্ধময় জীবনে। আমার প্রিয় একটি উক্তি দিয়েই শেষ করছি আজকের লেখা। ‘পৃথিবী আমার আসল ঠিকানা নয়/মরণ একদিন মুছে দেবে সকল রঙিন পরিচয়।’

প্রিয় পাঠক, পরকালে জান্নাত পেতে হলে সমকালীন এই জীবনেই তা নিশ্চিত করে যেতে হবে। তবেই আপনি হবেন বুদ্ধিমান এবং জান্নাতি।  হে আল্লাহ, আমাদের শুভবুদ্ধি দান করুন।

লেখক : বিশিষ্ট মুফাসসিরে কোরআন ও গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব।

www.selimazadi.com