Bangladesh Pratidin || Highest Circulated Newspaper
শিরোনাম
প্রকাশ : শুক্রবার, ২১ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০ টা
আপলোড : ২০ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ২৩:৪২

ধর্মতত্ত্ব

কারবালা : জীবনের চেয়ে আদর্শ বড়

মুহাম্মদ সাহেব আলী

কারবালা : জীবনের চেয়ে আদর্শ বড়

রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উম্মতদের কাছে মহররম মাসের তাৎপর্য অপরিসীম। এ মাসের ১০ তারিখে ইরাকের কারবালা প্রান্তরে ইয়াজিদ বাহিনীর হাতে শহীদ হন রসুল-দৌহিত্র হজরত ইমাম হোসাইন (রা.)। অসত্য, অন্যায়, অসাম্য ও ভোগবাদের বিরোধিতা করতে গিয়ে শাহাদাতবরণ করেন এই পুণ্য পুরুষ। পাপিষ্ঠ ইয়াজিদ প্রস্তাব দিয়েছিল তাকে খলিফা হিসেবে মেনে নিলে হোসাইন (রা.) ও তাঁর অনুসারীদের জানমালের নিরাপত্তা বিধান করা হবে। তাঁদের সসম্মানে যেখানে ইচ্ছা যেতে দেওয়া হবে। হজরত হোসাইন (রা.) অন্যায়কারীদের সঙ্গে আপস করার চেয়ে জীবন উৎসর্গ করাকেই শ্রেয় বলে বেছে নেন।

চতুর্থ খলিফা হজরত আলীর (রা.) আমলে খিলাফত নিয়ে হজরত মুয়াবিয়া (রা.)-এর সঙ্গে বিরোধ দেখা দেয়। খিলাফতের ঐক্য রক্ষায় হজরত আলী (রা.) উমাইয়াদের সঙ্গে সমঝোতায় উপনীত হন। এ সমঝোতা অনুসারে হজরত আলীর (রা.) পর খিলাফতের অধিকারী হবেন মুয়াবিয়া- এ শর্ত নির্ধারিত হয়। তারপর আবার খিলাফত ফিরে যাবে হজরত আলী ও ফাতিমা (রা.)-এর সন্তানদের হাতে। এ সমঝোতা ভঙ্গ করে উমাইয়ারা। মুয়াবিয়া (রা.)-এর মৃত্যুর পর তার মদ্যপ পুত্র ইয়াজিদকে খলিফা হিসেবে ঘোষণা করা হয়। উমাইয়ারা ইয়াজিদের পক্ষে আনুগত্য লাভে উঠেপড়ে লাগে। তৎকালীন রীতি অনুযায়ী কোনো রাষ্ট্রে রাষ্ট্রপ্রধান পরিবর্তনে বিশিষ্ট নাগরিক তথা রাষ্ট্রের বিভিন্ন এলাকার অধিবাসীরা রাষ্ট্র-প্রধানের আনুগত্য গ্রহণ করতেন। সেই ধারাবাহিকতায় রাষ্ট্রের বিশিষ্টজনেরা ইয়াজিদের কাছে বাইয়াত গ্রহণ করেন। ইমাম হোসাইন (রা.) ইয়াজিদের বাইয়াত গ্রহণে অস্বীকৃতি জানান। ইয়াজিদের বিরুদ্ধে মদ্যপান ও নারী লোলুপতার অভিযোগ ছিল। তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি, রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুণ্ঠন ও স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগ ছিল। তিনি খেলাফতের অবসান ঘটিয়ে রাজতন্ত্র কায়েম করতে চেয়েছিলেন। হজরত ইমাম হোসাইন (রা.) ইসলামী চেতনা-বিরোধী কর্মকা- প্রতিরোধে উদ্যোগী হন। তিনি ইয়াজিদের বিরুদ্ধে জনসচেতনতা সৃষ্টিতে কুফা সফরের সিদ্ধান্ত নেন। মক্কা থেকে কুফা যাওয়ার পথে অনুসারীদের উদ্দেশে প্রদত্ত ভাষণে সুস্পষ্টভাবেই বলেন, ‘আমার সফরের উদ্দেশ্য হলো কপট উমাইয়া শাসকদের স্বরূপ উন্মোচন করা, অত্যাচারী শাসকের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো এবং সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করা। এ ছাড়া আমার অন্য কোনো উদ্দেশ্য নেই।’

উল্লেখ্য, ইয়াজিদকে খলিফা হিসেবে ঘোষণার বিরোধিতা করে কুফার দেড় শতাধিক বিশিষ্ট ব্যক্তি ইমাম হোসাইন (রা.)-এর আনুগত্য স্বীকার করে চিঠি লেখেন ও তাঁকে কুফা গমনের আমন্ত্রণ জানান।

হজরত হোসাইন (রা.)-এর কুফা সফরের প্রস্তুতিতে ইয়াজিদ শিবিরে আতঙ্ক সৃষ্টি হয়। তারা কুফার বিশিষ্ট ব্যক্তিদের ওপর নিপীড়ন-নির্যাতন চালিয়ে তাদের নিজেদের পক্ষে আনার চেষ্টা করে। এ অপচেষ্টা সাময়িকভাবে সফলও হয়। ইতিমধ্যে ইমাম হোসাইন (রা.) ও তাঁর সহযাত্রীদের অবরুদ্ধ করা হয় ইয়াজিদের নিয়োজিত কুফার গভর্নরের নির্দেশে। এক মাস অবরুদ্ধ থাকার পর ইমাম হোসাইন কারবালার প্রান্তরে ইয়াজিদ বাহিনীর মুখোমুখি হন। অন্যায়ের কাছে মাথা নত না করার শপথে তিনি ঘোষণা করেন ‘অপমানজনক জীবনের চেয়ে সম্মানজনক মৃত্যু শ্রেয়।’ ইয়াজিদ বাহিনী ইমাম হোসাইন (রা.) শিবিরের পানি সরবরাহ বন্ধে ফোরাত নদের তীরে অবরোধ সৃষ্টি করেছিল। ইমাম পরিবারের শিশুদের জীবন রক্ষায় তিনি সে অবরোধ ভাঙার সিদ্ধান্ত নেন। শুরু হয় নির্দয় ইয়াজিদ বাহিনীর সঙ্গে ইসলামী আদর্শের প্রতি অনুগত ইমাম হোসাইন (রা.)-এর অনুসারীদের যুদ্ধ। সেই অসম যুদ্ধের একদিকে ইমাম হোসাইনের (রা.) পক্ষে ছিলেন মাত্র ৭২ জন সৈন্য। অন্যদিকে ইয়াজিদের পক্ষে ছিল ৪ হাজার সৈন্য। যুদ্ধে ইমাম হোসাইন (রা.)-এর সহযোদ্ধাদের একে একে সবাই শাহাদাতবরণ করেন। পবিত্রতা ও শুদ্ধতার প্রতীক ইমাম হোসাইন (রা.) একাই শেষ লড়াই চালিয়ে যান। তাঁকে অত্যন্ত নির্মমভাবে হত্যা করে ইয়াজিদের সৈন্যরা।

কারবালার প্রান্তরে অসম যুদ্ধে ইমাম হোসাইন (রা.) শাহাদাতবরণ করেন। রক্ত দিয়ে তিনি প্রমাণ করেন জীবনের চেয়ে আদর্শ বড়।

ইসলামের আদর্শ সমুন্নত রাখতে তাঁর শাহাদাতবরণ কিয়ামত পর্যন্ত মুসলমানদের কাছে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

লেখক : ইসলামবিষয়ক গবেষক


আপনার মন্তব্য