শিরোনাম
প্রকাশ : মঙ্গলবার, ১১ জুন, ২০১৯ ০০:০০ টা
আপলোড : ১০ জুন, ২০১৯ ২২:৪২

‘সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা’ ও জাতীয় বাজেট

ডা. কাজী রকিব

‘সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা’ ও জাতীয় বাজেট

রোগ নিয়ন্ত্রণ ও নিরাময়ের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের বেশ কিছু অর্জন রয়েছে যা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ও প্রশংসিত। এর মধ্যে রয়েছে নবজাতক, শিশু ও মাতৃ মৃত্যুহার কমানো, টিকাদান কর্মসূূচির সফলতা, খর্বকায় শিশুর হার কমে আসা এবং পাকা পায়খানা স্থাপনের হার বৃদ্ধি। ক্যান্সার, হৃদরোগের চিকিৎসাসহ অনেক জটিল রোগের চিকিৎসাও এখন দেশেই সম্ভব হচ্ছে। মানুষের গড় আয়ু বৃদ্ধি পেয়েছে উল্লেখ করার মতো। কিন্তু স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে জনতুষ্টি আসেনি। স্বাস্থ্যসেবা নিতে গিয়ে দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যাওয়া জনগোষ্ঠীর হার কমছে না এবং এ ক্ষেত্রে ব্যক্তির পকেট খরচের হার ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পাচ্ছে যা অনেক প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে নিঃস্ব করে দিচ্ছে। এখানে মনে রাখতে হবে, স্বাস্থ্যসেবা প্রদান চিকিৎসক ও চিকিৎসা-সংশ্লিষ্ট পেশার সঙ্গে যুক্ত কর্মীবাহিনীর দায়িত্ব হলেও এটা তাদের একার বিষয় নয়। এটা বহুলাংশে নির্ভর করে এ বিষয়ের নীতিনির্ধারক তথা সরকার ও তদারককারী সংস্থা অর্থাৎ মন্ত্রণালয় থেকে মাঠ পর্যায় পর্যন্ত বিস্তৃত প্রশাসনের দূরদর্শিতা, কর্মসূচি প্রণয়নের দক্ষতা ও তা বাস্তবায়নের সুব্যবস্থাপনার ওপর। এ ছাড়া নির্ভর করে জনগণের শিক্ষা ও স্বাস্থ্য সচেতনতা, খাদ্যাভ্যাস, পুষ্টির উন্নয়ন, প্রকৃতি ও পরিবেশ এবং সর্বোপরি জনগণের অর্থনৈতিক ভিত্তির ওপর। বাংলাদেশের গত দুই দশকের বাজেট পর্যালোচনায় দেখা যায়, স্বাস্থ্য খাতের বাজেট জাতীয় বাজেটের ৪.২৬ থেকে ৬.৮০%-এর মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। বিভিন্ন দেশের ২০১৪ সালের জাতীয় বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি)-এর অংশ ছিল বাংলাদেশে ০.৮, ভারতে ১.৪, নেপালে ২.৩, শ্রীলঙ্কায় ২, ব্রাজিলে ৩.৭ ও চীনে ৩.১%। এখানে উল্লেখ্য, ভারত সরকার ২০২৫ সাল নাগাদ এ হার ২.৫%-এ উন্নীত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিবেদন অনুযায়ী ২০১৫ সালে স্বাস্থ্যসেবার মাথাপিছু খরচ ছিল (টঝ ডলার হিসেবে) আফগানিস্তানে ৬০, বাংলাদেশে ৩২, ভুটানে ৯১, ব্রাজিলে ৭৮০, ভারতে ৬৩, ইরানে ৩৬৬, ইথিওপিয়ায় ২৪, নেপালে ৪৪ ও পাকিস্তানে ৩৮। ২০১৭ সালে প্রকাশিত ২০১০ সালের এক সার্ভেতে দেখা যায় স্বাস্থ্যের অর্থায়নে বাংলাদেশে ব্যক্তির পকেট খরচ ছিল ৬৩.৩%। বর্তমানে যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬৭%। কিন্তু আমাদের পাশের দেশ নেপালে ৪৮, শ্রীলঙ্কায় ৪২ আর মালদ্বীপে এ হার মাত্র ১৮%। (সূত্র : প্রথম আলো, ৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯)। বিভিন্ন পরিসংখ্যান ও প্রকাশনা থেকে দেখা যায়, মাথাপিছু খরচ ও জিডিপির অংশ হিসেবে সর্বোচ্চ খরচ হয় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের। অন্যান্য উন্নত বিশ্বের মাথাপিছু খরচের তুলনায় যুক্তরাষ্ট্রের খরচ দ্বিগুণের বেশি। যুক্তরাষ্ট্রে জিডিপির অংশ সরকারি (৮.৫%) ও বেসরকারি (৮.৫%) সমান সমান এবং মোট জিডিপির ১৭% খরচ হয় স্বাস্থ্য খাতে। যদিও উন্নত বিশ্বে ২০১৭ সালে স্বাস্থ্য খাতে জিডিপির গড় খরচ ছিল ১০.২২% এবং সে ক্ষেত্রে ব্যক্তির বা বেসরকারি খাতের খরচ ছিল ২.৭%। অন্যপক্ষে মধ্যম আয় ও নিম্নমধ্যম আয়ের অন্যান্য দেশের তুলনায় স্বাস্থ্য খাতে কিউবার বরাদ্দ বেশি (২০০৫-২০১৪ পর্যন্ত ১০ বছরে গড়ে জিডিপির প্রায় ১০%) এবং ২০১৭ সালে স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সমাজকল্যাণমূলক কাজে তারা ব্যয় করেছে জাতীয় বাজেটের ৫১%। শিক্ষা ও স্বাস্থ্যে দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সবচেয়ে কম ব্যয় করে বাংলাদেশ। নবজাতক ও শিশু মৃত্যুর হার ও প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবাসহ স্বাস্থ্য সূচকের অনেক জায়গায় যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে তুলনামূলক কম খরচ করেও এগিয়ে আছে উন্নত বিশ্বের বেশ কিছু দেশ এবং কিউবা। কারণ এ ক্ষেত্রে বাজেট ছাড়াও স্বাস্থ্যসেবার নীতি নির্ধারণ ও ব্যবস্থাপনাও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ফলে অনেক দিন ধরেই যুক্তরাষ্ট্রে দাবি উঠেছে ব্যক্তির ব্যয় কমিয়ে মানসম্পন্ন স্বাস্থ্যসেবা প্রদানের মাধ্যমে স্বাস্থ্যসেবা উন্নয়ন করার। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা ও টেকসই উন্নয়নের জন্য জাতীয় বাজেটে জিডিপির বরাদ্দ বৃদ্ধি জরুরি। যদি স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি করা হয় তবে স্বাস্থ্যসেবা নিতে গিয়ে দরিদ্র হওয়ার হার কমে যাবে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মহাপরিচালকের মতে স্বাস্থ্যসেবার ব্যয়কে খরচ হিসেবে মনে না করে একে বিনিয়োগ হিসেবে ভাবতে হবে, কারণ এর মাধ্যমে দারিদ্র্য কমে, চাকরি বৃদ্ধি পায়, কর্মক্ষমতা বৃদ্ধি পায় এবং বাড়ে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি। ফলে তৈরি হয় সুস্থ, সবল ও নীতিনিষ্ঠ সমাজ। বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী ২০১৫ সালে নানা রোগব্যাধিতে বাংলাদেশে মৃতের সংখ্যা ছিল ৮ লাখ ৪৩ হাজার। এর মধ্যে পরিবেশ দূষণের কারণে মৃত্যু হয়েছে ২ লাখ ৩৪ হাজার মানুষের, যার মধ্যে বায়ুদূষণে মৃত্যু মোট মৃতের প্রায় ২১%। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, স্বাস্থ্য খাতে বৈশ্বিক হিসাব  অনুযায়ী স্বাস্থ্যসেবায় বর্তমানে জিডিপির (সরকারি ও ব্যক্তির খরচসহ) প্রায় ১০% খরচ হচ্ছে এবং এতে ব্যক্তির পকেট থেকে খরচ হচ্ছে ৩৫% আর সরকার থেকে হচ্ছে ৫১%। এ অবস্থায় বাকি খরচ অন্যান্য ক্ষেত্র থেকে মেটানোর পরও বিশ্বে প্রতি বছর ১০ কোটি মানুষ চরম দারিদ্র্যসীমায় চলে যাচ্ছে। এক তথ্যানুযায়ী বাংলাদেশে স্বাস্থ্যসেবার খরচ মেটাতে গিয়ে প্রতি বছর দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যায় প্রায় ৬০ লাখ মানুষ (যা মোট জনসংখ্যার ৩.৮%)। জাতিসংঘের মতে টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যে ২০৩০ সালের মধ্যে ‘সর্বজনীন স্বাস্থ্য’ নিশ্চিত করতে প্রয়োজন স্বাস্থ্য খাতকে শক্তিশালী করা, এ খাতে যথাযথ বাজেট বরাদ্দ এবং প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা। ২৭ এপ্রিল, ২০১৯ জাতীয় প্রেস ক্লাবে ‘সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা’র ওপর এক মতবিনিময় সভায় বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কউন্সিলের সভাপতি অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ সহিদুল্লা বলেন, ‘ব্যক্তির মাত্রাতিরিক্ত চিকিৎসা ব্যয় কমানোর জন্য রাষ্ট্রের বিনিয়োগ বৃদ্ধি প্রয়োজন। তবে শুধু বিনিয়োগ বৃদ্ধি করলেই হবে না, রাষ্ট্রীয় অর্থ ব্যয়ের দক্ষতা এবং স্বচ্ছতাও নিশ্চিত করতে হবে।’ সুতরাং বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ‘সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা’ নিশ্চিত করতে অন্যান্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের পাশাপাশি আসন্ন জাতীয় বাজেট থেকেই স্বাস্থ্য খাতে বাজেট বৃদ্ধি করে ক্রমান্বয়ে ১২% বরাদ্দ প্রদান এবং বাজেটে জিডিপির অংশ ৩-৫%-এ উন্নীত করা আজ সময়ের দাবি।

 

লেখক : সাধারণ সম্পাদক, ডক্টরস ফর হেলথ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট এবং সাবেক সদস্য, কেন্দ্রীয় কার্যকরী পরিষদ, বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন (বিএমএ)।


আপনার মন্তব্য