Bangladesh Pratidin || Highest Circulated Newspaper
শিরোনাম
প্রকাশ : বৃহস্পতিবার, ২২ আগস্ট, ২০১৯ ০০:০০ টা
আপলোড : ২১ আগস্ট, ২০১৯ ২৩:০৮

কাশ্মীরের কথা

তসলিমা নাসরিন

কাশ্মীরের কথা

কাশ্মীরে বেড়াতে গিয়েছিলাম ’৮৮ সালে। ডাল লেকে হাউজবোটে ছিলাম কয়েকটি দিন। বোটের ভেতরে লেকের পচা পানির গন্ধ আসত। বোটের বাথরুমে স্নান করতে হতো লেকের ওই পচা পানিতেই। শামীম নামে একটা ছেলে কাজ করত হাউজবোটে। ওকে দিয়ে খাবার পানি আনাতাম ঘরে। তখন শীতকাল। শীত থেকে বাঁচার জন্য শামীম তার পরনের আলখাল্লার নিচে একটা হাতলওয়ালা মাটির পাত্রে জ্বলন্ত কয়লা রাখত। ওটা নিয়েই হাঁটাচলা করত। আমার ভয় হতো শামীমের গায়ে কখন না আগুন ধরে যায়। মাটির পাত্রটি একটু হেলে পড়লেই তো দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারে। শামীম দুটো পয়সার জন্য আকুল হয়ে থাকত। শামীমের মতো যুবকদের কাশ্মীরে আরও দেখেছি, দারিদ্র্য তাদের সর্বাঙ্গে। কাশ্মীরের প্রকৃতিকেই শুধু সুন্দর দেখেছি, বসতবাড়ি, দোকানপাট, পাড়া-মহল্লা, কিছুই আধুনিক নয়। মলিনতা, ধূসরতা, বিবর্ণতা কাশ্মীরের সর্বত্র। শালিমার বাগান তখন মরে রয়েছে। মানুষের চোখে-মুখে হতাশা। শিকারায় চড়েছি। চারদিকে সুন্দরী মেয়ে। কারও মুখে হাসি নেই।

কাশ্মীরে কত ধর্মের, কত বর্ণের, কত জাতের, কত দেশ-দেশান্তরের লোক যে এসেছে, বসত করেছে, তার শেষ নেই। জম্মু থেকে কাশ্মীরের একটি সেতুর নামই তো গ্রিক সম্রাট আলেকজান্দারের ঘোড়ার নামে, বুসাফেলাস। সম্রাট অশোক এসেছেন, সঙ্গে বৌদ্ধ ধর্ম নিয়ে এসেছেন। বৌদ্ধ ধর্মের প্রচার কাশ্মীর থেকে লাদাঘ, লাদাঘ থেকে তিব্বতে পৌঁছেছে। পঞ্চম শতাব্দীর আগে কাশ্মীর হয়ে উঠেছিল প্রথমে হিন্দু ধর্ম এবং পরে বৌদ্ধ ধর্মের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। নবম শতাব্দীতে কাশ্মীরে শৈব মতবাদের উত্থান ঘটে। পাহাড়ের গুহায় গুহায় তখন শিবমন্দির। ত্রয়োদশ থেকে পঞ্চদশ শতাব্দীতে কাশ্মীরে ইসলাম ধর্মের বিস্তার ঘটে। কিন্তু তাতে অতীতের ধর্মগুলো হারিয়ে যায়নি, বরং নতুন ইসলামী সংস্কৃতির সঙ্গে মিলেমিশে এক হয়েছে। অনেকে বলে কাশ্মীরিয়ানা বা কাশ্মীরি সুফিবাদের জন্ম এভাবেই।

সুলতান শাসন করার পর, সুলতানকে সরিয়ে মুঘল এলো কাশ্মীর শাসন করতে, মুঘলকে সরিয়ে আফগান দুররানি এলো, তারপর শিখরা দখল করে নেয় কাশ্মীর। ইংরেজের সঙ্গে শিখরা যুদ্ধে পরাজিত হলে ইংরেজের কাছ থেকে জম্মুর রাজা কিনে নেন কাশ্মীর। কাশ্মীর উপত্যকার ওপর লোভ সবার ছিল। বৃহত্তর কাশ্মীরের এক টুকরো এখন ভারতের, এক টুকরো পাকিস্তানের, আরেক টুকরো চীনের।

দেশভাগের পর থেকে ভারত অধিকৃত কাশ্মীর যে আলাদা মর্যাদা পেত ভারতের কাছ থেকে, সেটি সম্প্রতি তুলে নিয়েছে ভারত। সংবিধানের ৩৭০ ধারাটি বাতিল করেছে। কাশ্মীরকে মূল ভারতের অংশ করে নিয়েছে। ৩৭০ ধারাটি সাময়িক ছিল, এই সাময়িক ব্যবস্থাটিই টিকতে টিকতে ৭০ বছর টিকেছে। তোমার প্রতিরক্ষা, তোমার নিরাপত্তা ইত্যাদির দেখভাল করব, কাশ্মীরি ছাড়া বাইরের কেউ কাশ্মীরের জায়গা জমি কিনতে পারবে না এই আইন করে দেব, তোমাকে আলাদা সংবিধান দেব, আলাদা পতাকা দেব, কিন্তু উপত্যকায় বিচ্ছিন্নতাবাদ আর সন্ত্রাসবাদের চাষ করতে থাকবে। তা কেন করতে দেব? পাকিস্তান থেকে সন্ত্রাসীরা আসতেই থাকবে উপত্যকার যুবসমাজকে ভারতবিদ্বেষ দিয়ে মগজধোলাই করে করে সন্ত্রাসী বানাতে। কথায় কথায় পাকিস্তানের পতাকা উড়িয়ে ভারতের বিরুদ্ধে ঘৃণা ছুড়বে, তা আর কতকাল করতে দেব? এখন তো অবশ্য পাকিস্তান থেকে আর সন্ত্রাসীদের আসতে হয় না ভারতের বিরুদ্ধে সন্ত্রাস করার জন্য। এখন সন্ত্রাসী কাশ্মীরেই জন্মাচ্ছে। পুলওয়ামারের সন্ত্রাসী তো ভারত অধিকৃত কাশ্মীরেরই ছিল, যে সন্ত্রাসী আত্মঘাতী বোমা হয়ে ৪০ জন ভারতীয় জওয়ানকে হত্যা করেছে। ৩৭০ ধারাটি উঠে যাওয়ার পর ভারতীয়রা এখন তীর্থযাত্রায় বাধার সম্মুখীন হবে না, কাশ্মীরে জমি জায়গা কিনতে চাইলে কিনতে পারবে, কাশ্মীরি হিন্দুরা নিজেদের বাড়িঘরে ফেরত যেতে পারবে। উন্নয়ন হবে কাশ্মীরের। ভারতীয় হিন্দুরা ভীষণ খুশি। এত খুশি যে, মোদি সরকারের জনপ্রিয়তা এখন তুঙ্গে। কিন্তু মুসলমানদের অধিকাংশই ভীষণ হতাশ। তাদের দুশ্চিন্তা, কাশ্মীরে এখন হিন্দুরা যাবে আর অবাধে জমি জমা কিনবে। কাশ্মীর আর কাশ্মীরি মুসলমানদের থাকবে না। কাশ্মীরকে ভারতের অবিচ্ছেদ্য অংশ করে ফেলায় অনেকে আবার ভীষণ অখুশি। কাশ্মীরের নেতাদের গৃহবন্দি করে রাখা, ইন্টারনেট ফোন ইত্যাদি যোগাযোগ বন্ধ করে দেওয়া, কার্ফু চালু রাখা, স্কুল-কলেজ, অফিস-আদালত, রাস্তা-ঘাট, বাজার-হাট সব বন্ধ করে দেওয়া, ঘরে ঘরে গিয়ে কাশ্মীরি যুবকদের ধরে নিয়ে যাওয়া, বহু বছর ধরে তো কাশ্মীরি যুবকদের নিয়েছে মিলিটারি, বহু যুবকের হদিস আর পাওয়া যায়নি- এভাবে কি কেউ কোনো আইন পরিবর্তন করে? গণতান্ত্রিক পদ্ধতি না মেনে জোর-জবরদস্তি করে ভালো ব্যবস্থা আনে কেউ অন্যের জন্য? না, এই পদ্ধতিটি পরিবর্তন আনার জন্য ভালো নয় মোটেও। কাশ্মীরি নেতাদের সঙ্গে কথা বলে, ওঁরা রাজি হলে যদি ৩৭০ ধারা উঠিয়ে নেওয়া হতো, তাহলে চমৎকার হতো। কেউ কেউ বলে কাশ্মীরি এক একজন নেতা কাশ্মীরকে বেচে খাচ্ছিলেন, প্রাচুর্যে ডুবে ছিলেন একেক জন। ওঁরা কোনো দিনই কাশ্মীরের আলাদা মর্যাদাকে বাতিল করায় রাজি হতেন না।

এই পরিবর্তনে সব কাশ্মীরি পন্ডিত খুশি, তা নয় কিন্তু। কাশ্মীরি পন্ডিতদের একটি অংশ জানিয়েছেন, উপত্যকার মানুষের সঙ্গে আলোচনা না করে কেন্দ্রীয় সরকার যেভাবে   একতরফা জম্মু ও কাশ্মীরের সাংবিধানিক মর্যাদা ও অধিকারে হস্তক্ষেপ করেছে, তা অত্যন্ত আপত্তিকর। এই নিন্দায় সুর মিলিয়েছেন কাশ্মীরের ডোগরা এবং শিখ অধিবাসীদের একটি অংশ।

আলোচনা করে নিলে হয়তো কোনো দিনই সম্ভব ছিল না ৩৭০ নামের এই ধারাটি বাতিল করার। ক্রীতদাস প্রথা বাতিল করার সময় জনগণের সমর্থন খুবই কম ছিল। ভারতবর্ষে সতীদাহ বন্ধ হয়েছে, বিধবা বিবাহ চালু হয়েছে, কোনোটিই মানুষের সমর্থন নিয়ে নয়। কিছু কিছু ভালো কাজ দ্রুত করে ফেলতে হয়, মূর্খ অন্ধ মানবাধিকারবিরোধী নারীবিরোধী মৌলবাদীরা বাধা দিলেও করে ফেলতে হয়, বছরের পর বছর, যুগের পর যুগ ফেলে রাখতে হয় না। কিছুদিন আগে তিন তালাক বাতিল হলো ভারতে। পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি মুসলিম দেশে তিন তালাকের আইন নিষিদ্ধ। কিন্তু ভারতের মুসলিমদের ভোট নিলে কিন্তু অধিকাংশই তিন তালাকের পক্ষেই বলত। বড় বড় শিক্ষিত মুসলিম নেতাই তো তিন তালাক বাতিল করা চাননি। অভিন্ন দেওয়ানি বিধি ভারতের অধিকাংশ মুসলমানই চান না। তাহলে কি সমানাধিকারের ভিত্তিতে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি ভারতে আনতে হবে না? মুসলমান মেয়েরা ধর্মীয় আইনের কারণে সমানাধিকার থেকে বঞ্চিত হতেই থাকবে? মুসলমান পুরুষেরা বহুবিবাহ করতেই থাকবে? সন্তানের ওপর মায়ের চেয়ে বেশি বাবার অধিকারই বহাল থাকবে?

কাশ্মীরে নতুন নিয়মটি আসায় কাশ্মীরের কী কী ক্ষতি হলো? অকাশ্মীরীরাও কাশ্মীরিদের কাছ থেকে জমি কিনতে পারবে, এ ছাড়া আমি তো আর কিছু দেখছি না আপত্তিকর। আপত্তিরই বা কী আছে! কাশ্মীরিদের কেন কাশ্মীরেই বাস করতে হবে? ভারতের যে কোনো অঞ্চলে কাশ্মীরিরা বাস করছে না? করছে। ভারতের যে কোনো স্কুলে কলেজে কাশ্মীরিদের পড়ার অধিকার আছে, যে কোনো অফিসে চাকরি করার অধিকার আছে, যে কোনো জায়গায় ব্যবসা করার অধিকার আছে। তাহলে চিড়িয়াখানার মতো কাশ্মীরিদের কেন কাশ্মীরেই পড়ে থাকতে হবে?

৩৭০ ধারা বাতিল করার আগে কাশ্মীর কী এমন স্বর্গ ছিল, কী এমন সুখ শান্তি ছিল ওখানে যে হঠাৎ নষ্ট হয়ে গেল সব? মানুষ যারা এই কারণে কাঁদছে তারা কেন কাঁদছে? দীর্ঘকাল যাবৎ ভারতীয় সেনা আর কাশ্মীরের যুবকদের মধ্যে যুদ্ধ চলছে, গুলি আর ইটপাটকেলের অসম যুদ্ধ। গুম হচ্ছে, খুন হচ্ছে। রক্তপাতের শেষ ছিল না।

ভারত অধিকৃত কাশ্মীরের কেউ কেউ ভারতের অংশ হতে চায়, কেউ পাকিস্তানের সংগে মিশে যেতে চায়, কেউ আলাদা কাশ্মীর রাজ্য চায়। এই তিন ইচ্ছের একটি ইচ্ছেকে মূল্য দিতে গেলেই গোল বাধবে। পাকিস্তানের সংগে ভারত কেন তার কাশ্মীরকে যেতে দেবে! পাকিস্তান অধিকৃত আজাদ কাশ্মীর তো আছেই, যেখানে পাকিস্তানি সেনারা ভারতবিরোধী সন্ত্রাসের ঘাঁটি বানিয়ে রেখেছে। কাশ্মীরের এই একাংশ কোথায় যেত? কী খেত? তার চেয়ে এই ভালো। কাশ্মীরের দায়িত্ব আপাতত ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার নিল। এটিই অবশ্য শেষ কথা নয়, সুপ্রিম কোর্ট রাজি না হলে ৩৭০ ধারা রদ করা যাবে না।

একবার ভারত ভাগ করেই সন্ত্রাসী প্রতিবেশীর জন্ম দিয়েছে ভারত। আর কত সীমানায় গড়ে উঠতে দেবে সন্ত্রাসের আঁতুড়ঘর! সম্ভবত কাশ্মীর বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলে সীমানার আরও অনেক রাজ্য জোরেশোরে বিচ্ছিন্ন হওয়ার চেষ্টা করবে। এতটা ভারত সামলাতে পারবে না। একটা বড় দেশকে টিকিয়ে রাখতে হলে যা করতে হয় ভারত তাই করার চেষ্টা করছে। ১৯৪৭ সালের ভুলটি এই দেশ আর করতে চায় না। পাকিস্তান কিন্তু ক্ষেপে উঠেছে। মুসলমান মুসলমান ভাই ভাইয়ের রাজনীতি ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে। ভারত অধিকৃত কাশ্মীরকে অগণতান্ত্রিকভাবে লুফে নিয়ে এখন আজাদ কাশ্মীরের দিকে হাত বাড়াবে ভারত- পাকিস্তান অভিযোগ করে বেড়াচ্ছে। ভারত পাকিস্তানে ঝগড়া হলে বড় ভয় হয়। হাতে ওদের পারমাণবিক বোমা। ট্রিগার টিপ্লেই হলো। মরে সব ছাই হয়ে যাবে।

আশা করছি কাশ্মীর নিয়ে লড়াইটা বন্ধ হবে। দুই দেশে বন্ধুত্ব হবে। কাশ্মীরিরা আনন্দে থাকবে। মিলিটারিরা অত্যাচার করবে না ওদের। ওরাও সন্ত্রাস করবে না। মানুষই পারে অশান্তি আনতে। এই মানুষই পারে শান্তি আনতে। অশান্তিটা পলিটিক্সের অংশ। শান্তি কবে পলিটিক্সের অংশ হবে?

         লেখক : নির্বাসিত লেখিকা।


আপনার মন্তব্য