শিরোনাম
প্রকাশ : রবিবার, ২৫ আগস্ট, ২০১৯ ০০:০০ টা
আপলোড : ২৪ আগস্ট, ২০১৯ ২৩:১২

ডেঙ্গু ও ছাদকৃষি উদ্যোক্তাদের সচেতনতা প্রসঙ্গ

শাইখ সিরাজ

ডেঙ্গু ও ছাদকৃষি উদ্যোক্তাদের সচেতনতা প্রসঙ্গ

বর্তমান সময়ে আতঙ্কের অন্য নাম ডেঙ্গু। পৃথিবীর বেশ কয়েকটি দেশে এটি মহামারী আকার ধারণ করেছে। আমাদের দেশেও ডেঙ্গুর ভয়াবহ প্রকোপ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। হাসপাতালগুলো ধারণক্ষমতার বেশি রোগীকে সেবা দিয়ে যাচ্ছে। রোগীদের সেবা দিতে গিয়ে নির্ধারিত সময়ের বেশি শ্রম দিতে হচ্ছে ডাক্তার ও নার্সদের। যে কোনো দুর্যোগেই প্রথম চ্যালেঞ্জ হচ্ছে আতঙ্কগ্রস্ত মানুষকে সচেতন করা। আমরা টেলিভিশনে ডেঙ্গু প্রতিরোধে মানুষকে সচেতন করতে ফিলার তৈরি করে প্রচার করছি। ডেঙ্গু নিয়ে টেলিভিশন, পত্রিকায় নানান প্রচার অভিযান চলছে। এর মাঝে মিরপুর থেকে এক গৃহিণী আমাকে ইমেইলে লিখলেন ছাদকৃষিতে এডিস মশার বংশ বিস্তার হচ্ছে এমন অভিযোগে তার ছাদ-কৃষি নষ্ট করে দেওয়া হয়েছে। শুধু মিরপুর থেকে নয়, যাত্রাবাড়ী থেকে একজন ফোনে জানালেন প্রতিবেশীরা তার ছাদকৃষিকে মশার বংশ বিস্তারের জন্য দায়ী করছে। চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি ও অ্যানিমল সায়েন্সেস বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশারিজ রিসোর্স ম্যানেজমেন্ট বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান ড. শেখ আহমাদ আল নাহিদ সেদিন ফোন দিয়ে জানালেন তিনিও তার ছাদকৃষি গবেষণা নিয়ে প্রতিবেশীদের রোষে পড়েছেন। ছাদকৃষির বিবিধ দিক নিয়ে কথা হলো তার সঙ্গে। নাহিদ মেধাবী, চিন্তাশীল, তরুণ শিক্ষক। ছাদকৃষি নিয়ে গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন নিরন্তর। ‘ছাদকৃষি’ নিয়ে তার গবেষণার বিষয়ে কথা হলো বিস্তর। আমাদের হুজুগে মেতে ওঠার কুখ্যাতি আছে। কয়েকদিন আগে ‘গলাকাটা আতঙ্কে’ সারা দেশ ছিল তটস্থ। সোশ্যাল মিডিয়ার এই সময়ে কেউ কিছু একটা বললেই, নিমেষে ছড়িয়ে পড়ে। সত্যতা ও যৌক্তিকতা যাচাই-বাছাইয়ের ধার ধারছে না কেউ। আসলে মানুষের যাচাই-বাছাই না করার এ প্রবৃত্তির জন্য সোশ্যাল মিডিয়াকে দায়ী করা যাবে না, কারণ সোশ্যাল মিডিয়া জাল বিস্তারের আগেই কবি শামসুর রাহমান লিখে গেছেন, ‘কান নিয়েছে চিলে, চিলের পিছে মরছি ঘুরে আমরা সবাই মিলে’। ছাদকৃষি নিয়ে কাজ করছি সেই আশির দশক থেকে। তখন বলতাম ‘ছাদবাগান’। কারণ, সে সময় এটা যতটা না ছিল প্রয়োজনের, তার চেয়ে বেশি ছিল শখ বা বিলাসের। কিন্তু বর্তমান সময়ে যখন বৈশ্বিক তাপমাত্রা বাড়ছে, প্রশ্ন উঠেছে নিরাপদ খাদ্যের বিষয়ে, এমনকি এ সময়ে ঢাকা শহরের বাসযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে- যুক্তরাজ্যের ইকোনমিস্ট ইনটেলিজেন্স ইউনিটের বৈশ্বিক বসবাসযোগ্য প্রতিবেদনে বিশ্বের ১৪০টি শহরের তালিকায় ঢাকার অবস্থান ১৩৯। তখন সেটা আর শখ বা বিলাসের পর্যায়ে নেই। সারা বিশ্বই এখন ছাদকৃষি বা নগরকৃষির বিষয়টিতে সচেতন ও সোচ্চার। তাই ছাদকৃষি হয়ে উঠেছে প্রয়োজনীয় অনুষঙ্গ। চ্যানেল আইয়ে আমি প্রায় ১৫০টির ওপর ছাদকৃষি পর্ব প্রচার করেছি। দেশের বিভিন্ন শহরের ছাদকৃষি দেখেছি। দেখেছি অবসরে চলে যাওয়া সরকারি-অসরকারি চাকরিজীবী, কিংবা ব্যবসায়ী-শিল্পপতি নিজেদের অবসর সময়টাকে ফলপ্রসূ করে তুলছেন ছাদে একটুকরো ছাদকৃষির সঙ্গে যুক্ত হয়ে। তারা বলেছেন, ছাদকৃষি দিয়েছে আত্মিক প্রশান্তি। যার নিজস্ব ভবন ও ছাদ রয়েছে তারা নিজেদের ছাদে একস্তর বা দ্বিস্তরবিশিষ্ট ছাদকৃষি গড়ে তুলছেন। আবার যাদের নিজস্ব বাড়ির ছাদ নেই, তারা বাড়ির মালিকের সঙ্গে কথা বলে ছাদের একপাশে বা বারান্দায় গড়ে তুলেছেন নিজস্ব ছাদকৃষি। এ ছাদকৃষি দিয়ে তিনি খাদ্যের চাহিদা পূরণ করছেন, মিটছে পারিবারিক পুষ্টি, পাচ্ছেন মানসিক প্রশান্তি। পাশাপাশি পালন করছেন একটা জাতীয় দায়িত্ব। শহরকে সবুজায়নে ও নগরে অক্সিজেনের মাত্রা বাড়াতে সহায়তা করছেন। এক চিলতে ছাদের একদিকে চাষ হচ্ছে ফুল, অন্যদিকে ফল, বাদ যাচ্ছে না প্রয়োজনীয় সবজির আবাদও। সঙ্গে ছাদের এক কোণে নানান ওষুধি গাছগাছরাও লাগাচ্ছেন অনেকে। অনেকেই গাছের পাশাপাশি মাছের চাষও করছেন ছাদে। ছাদকৃষির ভূমিকা অর্থনৈতিকভাবে যতটুকু তার চেয়েও বেশি সামাজিক মেলবন্ধনে। কৃষির চর্চা মানসিক প্রশান্তি দেয়। কৃষির সান্নিধ্য মনের বর্জ্য দূর করে।

যা হোক, এডিস মশার বিস্তারে ছাদকৃষি বিষয়টিও এখন আলোচনা-সমালোচনায় এসেছে। ছাদকৃষি ও ছাদভিত্তিক মাছ চাষের প্রকল্পে এডিস মশা বংশবিস্তার করতে পারে এমন আশঙ্কায় জনমনে ছাদকৃষি নিয়ে নেতিবাচক ধারণা তৈরি হচ্ছে। কিন্তু গবেষণা ও তথ্যপ্রমাণ বলছে ভিন্ন কথা। পরিকল্পিত ও যথাযথ ব্যবস্থাপনা নিয়ে তৈরি ছাদকৃষিতে এমন ঝুঁকির সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই যারা ছাদকৃষি করেন, তাদের ছাদ অপেক্ষা বাগানবিহীন ছাদ বেশি অপরিষ্কার ও অধিক ঝুঁকিসম্পন্ন। কারণ, ছাদকৃষি উদ্যোক্তারা নিয়মিত ছাদে যান এবং ছাদে লাগানো গাছপালার যত্ন ও পরিচর্যা করেন। যারা সত্যিকার অর্থে ছাদকৃষির সঙ্গে যুক্ত তাদের ছাদের টবে কখনই পানি জমে থাকে না। কারণ, তারা জানেন টবে পানি জমলে গাছের ক্ষতি, গাছ মরে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। অন্যদিকে যে ছাদে ছাদকৃষি নেই, সেই ছাদে কেউ তদারকি ও পরিচর্যা করে না, যার ফলে ছাদ থাকে অপরিচ্ছন্ন। গত কয়েকদিনে আমি ১০-১২টি ছাদকৃষি ঘুরে দেখে এসেছি। তাদের ছাদে এমন কোনো টব বা ড্রাম দেখিনি যেখানে পানি জমে আছে। তার পরও যারা ছাদকৃষি করছেন তাদের প্রতি পরামর্শ থাকবে- ছাদকৃষির টবের মাটি প্রস্তুতির সময় যদি ৫% মাটি, ৮০% নারকেলের ছোবড়া বা তুষ, ১০% বালি এবং ৫% জৈবসার দিয়ে প্রস্তুত করেন, তাহলে অল্প পানি ব্যবহারেই টব অনেক সময় ধরে ভেজা থাকবে। টবের নিচে ছিদ্র থাকলে পানি কখনই জমে থাকবে না। ছোট ও লতাজাতীয় গাছ লাগানোর ক্ষেত্রে তলানি ও পাশে ছিদ্রযুক্ত ঝুলন্ত টব ব্যবহার করা যেতে পারে। এ ছাড়া টবের পাশাপাশি একদিকে ঢালু অবকাঠামো তৈরি করেও গাছ লাগানো যেতে পারে অথবা টব বসানোর ভিত্তিটি সামান্য একদিকে ঢালু রাখা যেতে পারে। এর ফলে টবে আর পানি জমার সম্ভাবনা থাকবে না। ছাদে লাগানোর জন্য উপযুক্ত গাছ নির্ধারণেও কিছু বিষয় খেয়াল রাখা বাঞ্ছনীয়। যে গাছগুলো কম পানিতে হয়, যেমন ড্রাগন, অ্যালোভেরা, মরিচ, ক্যাপসিকাম ইত্যাদি প্রজাতির গাছ ছাদে বেশি লাগাতে পারেন। অন্যদিকে অতিরিক্ত ঝোপ সৃষ্টি করে এমন প্রজাতির গাছ লাগানো থেকে বিরত থাকুন। আপনারা হয়তো জানেন, কিছু প্রজাতির গাছ যেমন লেবু, গাঁদা, লেমন গ্রাসের গন্ধ মশা সহ্য করতে পারে না। তাই ছাদে অন্য গাছের সারির মাঝে মাঝে মশা তাড়ানোর জন্য এ ধরনের গাছ লাগাতে পারেন।

ছাদে মাছের ট্যাঙ্কে বা চৌবাচ্চায় এডিস মশার ঝুঁকি নিয়ে অনেকেই সন্দিহান। মাছের ট্যাঙ্কের পানিতে মাছ বেশির ভাগ সময়ই চলমান থাকে যার ফলে পানিতে স্রোত ও ঘূর্ণন তৈরি হয়। আমার বাসার ছাদেও ছোটখাটো একটা ছাদকৃষি আছে। আমার স্ত্রী শাহানা সারা দিনই তা নিয়ে ব্যস্ত থাকেন। বলা বাহুল্য, সতেজ ও নিরাপদ খাদ্যের তাগিদ এবং সবুজের সান্নিধ্যে মানসিক প্রশান্তি লাভের জন্যই এ ছাদকৃষির আয়োজন। অ্যাকুয়াপনিক্স পদ্ধতিতে ছাদকৃষি হওয়ায় ছাদের ট্যাঙ্কে কিছু মাছেরও চাষ করা হচ্ছে। সেখানে আমি লক্ষ্য করেছি, এডিস মশা যেহেতু বদ্ধ পানিতে ডিম পাড়ে তাই মাছ চাষের ট্যাঙ্কে এদের ডিম পাড়ার সম্ভাবনা নেই। এতেও যদি ঝুঁকি থেকে যায় তবে ট্যাঙ্কে বা চৌবাচ্চায় এয়ারেটর ব্যবহার করা বা মোটর দিয়ে কৃত্রিম পানির স্রোত বা ঝরনা তৈরি করা যেতে পারে যাতে মশা জন্মানোর ঝুঁকি যেমন কমবে, সঙ্গে সঙ্গে বাড়বে ছাদের সৌন্দর্য। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে মশা নিধনে গাপ্পি, মসকুইটো ফিশ ও অন্যান্য লার্ভাভুক মাছ নালা-নর্দমা বা বদ্ধজলাশয়ে ছাড়ার নজির দেখা যায়। কারণ, মশার ডিম ও লার্ভা এদের অতিপ্রিয় খাদ্য। এডিস মশার বিস্তার নিয়ন্ত্রণে সম্প্রতি ফিলিপাইনের বিভিন্ন ফিশারিজ অর্গানাইজেশন সে দেশে নালা-নর্দমায় গাপ্পি মাছ ছাড়ার ব্যাপক কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। গাপ্পি, মস্কুইটো ফিশ ছাড়াও আমাদের দেশীয় খলিশা মাছ মশার ডিম ও লার্ভা নিয়ন্ত্রণে কার্যকর। উল্লেখ্য, বাংলাদেশে গাপ্পি মাছ আমদানি করা হয়েছিল মশা নিয়ন্ত্রণ করার জন্যই, যা এখন একটি জনপ্রিয় অ্যাকুরিয়াম মাছ। অবিভক্ত ঢাকার প্রথম নির্বাচিত মেয়র মোহাম্মদ হানিফ মশা নিধনে বাংলাদেশের নালা-নর্দমায় গাপ্পি মাছ ছাড়ার উদ্যোগ নেন। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক ২০১৭ সালে একটি গবেষণায় বিভিন্ন ড্রেনের ও নর্দমার প্রচন্ড নোংরা পানিতে প্রচুর ‘মশাভুক মাছ’ পাওয়া গিয়েছিল যার ওপর পরীক্ষার ফলস্বরূপ মশা নিধনে এসব মশাভুক মাছের ব্যবহারের চিন্তা আরও জোরদার হয় আমাদের দেশে। তাই এ ধরনের মাছের প্রজাতি এডিস মশা থেকে বাঁচতে ছাদ -কৃষিতে লালন করা যেতে পারে। গাছে পানি সরবরাহের জন্য নালা বা চ্যানেল তৈরি করেন অনেকেই। এ ক্ষেত্রে সেসব নালা বা চ্যানেলে গাপ্পি ও অন্যান্য লার্ভাভুক মাছ ছাড়া যেতে পারে। সাম্প্রতিক সময়ে ডেঙ্গু, মশার বিস্তার ও ছাদকৃষি প্রসঙ্গে কথা বলেছিলাম ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র জনাব আতিকুল ইসলামের সঙ্গে। তিনিও বলেছেন, ছাদকৃষি এডিস মশার বংশ বিস্তারের জন্য দায়ী নয়, তবে ছাদে যদি পানি জমে থাকে তবে সেটা আশঙ্কার বিষয়। সিটি করপোরেশন বিভিন্ন বাসাবাড়িতে অভিযান চালিয়ে অপরিচ্ছন্ন ও এডিস মশার লার্ভা থাকার জন্য যে জরিমানা করেছে বলে সংবাদে দেখছি তা সত্যি প্রশংসনীয়। আমাদের অধিকাংশই নাগরিক হিসেবে নিজের দায়িত্ব পালন করি না। নিজের বাড়ির আঙিনা ও চারপাশ পরিচ্ছন্ন রাখা নাগরিক দায়িত্ব। যে কোনো সমস্যা সমাধানে সবচেয়ে আগে যে বিষয়টি দরকার তা হলো সবার সচেতনতা ও দায়িত্বশীল আচরণ।

ছাদকৃষি উদ্যোক্তাদের সচেতন থাকতে হবে যেন ছাদের কোথাও টবে বা ড্রামে পানি না জমে থাকে। ছাদকৃষিকে ডেঙ্গুর ঝুঁকিমুক্ত রাখতে প্রয়োজন সচেতনতা ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা। যেখানে এসি, রেফ্রিজারেটরের জমা পানিতে মশা জন্মানোর ঝুঁকি থাকার পরও তার ব্যবহার নিয়ে মানুষের নেতিবাচক চিন্তা নেই, সেখানে ছাদবাগানের ঝুঁকি চিন্তা করে এতে নিরুৎসাহিত হওয়া অবশ্যই যুক্তিযুক্ত নয়। সরকার ছাদকৃষিও ওপর বিভিন্ন প্রকল্প হাতে নিয়েছে, বিশ^বিদ্যালয়গুলোতেও চলছে নানাবিধ গবেষণা, পৌর-দফতরও ছাদকৃষি উদ্যোক্তাদের সহযোগিতা দিচ্ছে। সর্বোপরি সবার সহযোগিতায় ছাদকৃষি নগর সবুজায়নে বেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। ছাদকৃষি যেমন আমাদের শহরের জন্য প্রয়োজন। তেমনি প্রয়োজন ডেঙ্গু প্রতিরোধে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা। ডেঙ্গুর এ ভয়াবহ প্রকোপ থেকে রক্ষা পেতে প্রয়োজন পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনা। অযৌক্তিকভাবে ছাদকৃষির মতো সবুজ আন্দোলনের বিরোধিতা না করে, যৌক্তিক গবেষণার মাধ্যমে এ আন্দোলনকে বেগবান করার আহ্বান রইল সংশ্লিষ্ট সবার প্রতি।

মিডিয়া ব্যক্তিত্ব।

[email protected]


আপনার মন্তব্য