শিরোনাম
প্রকাশ : শনিবার, ২৩ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ টা
আপলোড : ২২ নভেম্বর, ২০১৯ ২৩:৫০

বাংলাদেশ-ভারত ক্রিকেট কূটনীতি ও তিস্তা চুক্তির সম্ভাবনা

নজরুল ইসলাম


বাংলাদেশ-ভারত ক্রিকেট কূটনীতি ও তিস্তা চুক্তির সম্ভাবনা

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক অধ্যয়নে ক্রীড়া কূটনীতি (Sports Diplomacy) একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়; যা মূলত খেলাধুলার মাধ্যমেই সম্পন্ন হয়। ১৯৭১ সালের এপ্রিলে চীনের মাটিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের টেবিল টেনিস খেলার মাধ্যমে পিং-পং ডিপ্লোম্যাসি(Ping-pong Diplomacy) ব্যাপক আলোচনা লাভ করে। ফলে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে ২০ বছর পর কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনঃস্থাপিত হয়। বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার বিপরীত অবস্থানই মূলত পিং-পং ডিপ্লোম্যাসির নেপথ্যে ভূমিকা পালন করে। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর বিভিন্ন ইস্যুতে ভারত-পাকিস্তানের দ্বন্দ্ব শুরু হয়; যা পরবর্তীতে দক্ষিণ এশিয়ার ক্রিকেট রাজনীতিতেও প্রভাব বিস্তার করে। এখানে ক্রিকেটের জনপ্রিয়তার ইতিহাসও দীর্ঘদিনের। ভারত-পাকিস্তানের পাশাপাশি শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ ও আফগানিস্তানের শক্তিশালী অবস্থান দক্ষিণ এশিয়ার ক্রিকেটকে দিন দিন আরও জটিলতর করে তুলছে। এমনকি ক্রিকেট দেশগুলোর ঐতিহাসিক সুসম্পর্ককেও চ্যালেঞ্জের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। ক্রিকেটই হচ্ছে দেশগুলোর জাতীয় ঐক্যের অন্যতম ভরসা। ক্রিকেটের পাশাপাশি খেলোয়াড়রাও রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাবক হিসেবে ভূমিকা পালন করেন। চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ভারত-পাকিস্তান এ পর্যন্ত তিনবার ক্রিকেট কূটনীতির মাধ্যমে কাশ্মীর সীমান্তে উত্তেজনা প্রশমন, সীমান্ত চুক্তি, সন্ত্রাস দমন চুক্তি, হটলাইন স্থাপন, কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনঃস্থাপনসহ বিভিন্ন বিরোধ সমাধান করে। তিনবারই ভারতের আমন্ত্রণে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জিয়াউল হক (১৯৮৭), প্রধানমন্ত্রী ইউসুফ রাজা গিলানি (২০১১) ও প্রেসিডেন্ট পারভেজ মোশাররফ (২০১৫) ভারতের মাটিতে সরাসরি খেলা উপভোগ করেন। কাশ্মীর সীমান্ত উত্তেজনার এক চরম মুহূর্তে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জিয়াউল হক ১৯৮৭ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি স্ত্রী-সন্তানসহ ৬০ সদস্যের একটি বিশাল বহর নিয়ে ভারত সফর করেন। পরদিন জিয়াউল হক জয়পুর টেস্টের দ্বিতীয় দিনের প্রথম সেশন খেলা দেখেন। বুলেটপ্রুফ বক্সে বসে তাকে সঙ্গ দিয়েছিলেন ভারতের প্রবীণ টেস্ট খেলোয়াড় অমরনাথ লালা। খেলা-পরবর্তী সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে জেনারেল জিয়া বলেন, ‘মাঝেমধ্যে ক্রিকেটের স্পিন ও গুগলির ব্যবধান না বুঝলেও আমি ভারতে এসেছি শান্তির বার্তা নিয়ে।’ তার পর থেকেই ‘ক্রিকেট কূটনীতি’ এশিয়ার রাজনীতিতে ব্যাপক আলোচিত। আমাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা স্পিন-গুগলির ব্যবধানসহ ক্রিকেটের প্রায় সবকিছুই বোঝেন। নিয়মিত খবর রাখেন বাংলাদেশের ক্রিকেট ও ক্রিকেটারদের। ভালো খেলা বা জয়ের উল্লাসে তৎক্ষণাৎ অভিনন্দন জানান সরাসরি কিংবা টেলিফোনে। তার সরকারের আমলে বাংলাদেশ টেস্ট ও এক দিনের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে সদস্যপদ লাভ করে। পাশাপাশি কূটনৈতিক রাজনীতিতেও তিনি বর্তমান বিশ্বের অন্যতম সফল একজন প্রধানমন্ত্রী। যার কারণে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তিনি একাধিকবার প্রশংসিত ও পুরস্কৃত হয়েছেন। বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক ঐতিহাসিক, বন্ধুত্বপূর্ণ ও বহুমাত্রিক। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতাযুদ্ধে ভারতের সহযোগিতা এ দেশের জনগণ চিরকাল কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করবে। কিন্তু দীর্ঘদিনের কিছু অমীমাংসিত ও গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু দেশ দুটির জনগণের মনে কিছুটা হলেও অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সদ্যস্বাধীন বাংলাদেশ থেকে দ্রুততর সময়ের মধ্যে মিত্রবাহিনীর সৈন্য ফেরত পাঠানোর মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের একটি ইতিবাচক সূচনা করেন; যা পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল এবং ইন্দিরা-মুজিবের আন্তরিকতার ফসলও বটে। ’৭২ সালের ১৯ মার্চ বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যে শান্তি ও সহযোগিতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে ২৫ বছর মেয়াদি একটি ‘মৈত্রী মুক্তি’ স্বাক্ষরিত হয়। ১৯৯৭ সালের ১৯ মার্চ চুক্তিটির মেয়াদ শেষ হলেও শেখ হাসিনা সরকার চুক্তিটির মেয়াদ বৃদ্ধি করেনি। অতীতে এ চুক্তির অধীনেই বাংলাদেশ-ভারতের ৫৪টি অভিন্ন নদ-নদীর পানি বণ্টনের জন্য যৌথ নদী কমিশন গঠিত হয়। হাসিনা সরকারের প্রথম মেয়াদে গঙ্গার পানি চুক্তিসহ বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুর সমাধান হলেও তিস্তার পানি সমস্যা, ’৭৪ সালের ইন্দিরা-মুজিব সীমান্ত চুক্তির বাস্তবায়নসহ বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপক্ষীয় ইস্যু অমীমাংসিত থেকে যায়। এ সময় ভারতের সঙ্গে মার্কিন কোম্পানির সহায়তায় তেল-গ্যাস রপ্তানি চুক্তিতে রাজি না হওয়ায় হাসিনা সরকারের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি ঘটে।

২০০১ সালে তেল-গ্যাস রপ্তানিসহ বিভিন্ন ইস্যুতে একটি নমনীয় নির্বাচনী ইশতেহারের মাধ্যমে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার গঠন করে। কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ধর্মীয় মৌলবাদের উত্থান, সেভেন সিস্টার্সকেন্দ্রিক স্বাধীনতাকামী ভারতীয় বিদ্রোহীদের সমর্থন ও চট্টগ্রামে ১০ ট্রাক অস্ত্র উদ্ধারের ঘটনাসহ বিভিন্ন ইস্যুতে ভারতের সঙ্গে খালেদা জিয়া সরকারের সম্পর্কের অবনতি ঘটে। ফলে বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় ইস্যুতে তেমন উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি। ২০০৯ সালে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে মহাজোট সরকার গঠন করার পর মুজিব-ইন্দিরা সীমান্ত চুক্তি বাস্তবায়ন, তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তিসহ বিভিন্ন ইস্যুতে বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যে ইতিবাচক আলোচনা শুরু হয়; যার পরিপ্রেক্ষিতে ২০১১ সালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং বাংলাদেশ সফর করেন। এ সময় পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি বাংলাদেশে আসার কথা থাকলেও না এসে তিস্তার পানি চুক্তি ইস্যুতে দি¦মত পোষণ করেন। ফলে সীমান্ত প্রটোকলসহ বেশকিছু ইস্যুতে চুক্তি স্বাক্ষরিত হলেও কাক্সিক্ষত তিস্তার পানি বণ্টন ইস্যু সমাধান হয়নি। ২০১৫ সালের ৭ মে ভারতের সংসদের নিম্নকক্ষ লোকসভা সংবিধানের ১১৯তম সংশোধনীর মাধ্যমে ইন্দিরা-মুজিব সীমান্ত চুক্তি পাস হয়। জুনে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ঢাকায় সফর করেন। তারপর ৩১ জুলাই মধ্যরাতে বাংলাদেশ ১১১টি (১৭,১৬০ একর) ও ভারত ৫১টি (৭,১১০ একর) ছিটমহল অধিগ্রহণের মাধ্যমে ৬৮ বছরের বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত সমস্যার সমাধান হয়। কিন্তু তিস্তার পানি বণ্টন সমস্যার সমাধান না হওয়ায় বাংলাদেশের জনগণের মধ্যে ভারতের প্রতি বিরূপ মনোভাব বৃদ্ধি পেতে থাকে। ২০১৮ সালের মে মাসে ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদির আমন্ত্রণে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কলকাতায় সফর করেন। কিন্তু রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে হাসিনা-মোদি-মমতা একই মঞ্চে উপস্থিত হলেও তিস্তা ইস্যুতে ইতিবাচক তেমন কোনো অগ্রগতি হয়নি। তিস্তা ইস্যুতে মমতার এই অনড় অবস্থান ভারতের বিজেপি সরকারের জন্য বেশ বিব্রতকর। এ অবস্থায় পশ্চিমবঙ্গে মমতার রাজনীতিকে চ্যালেঞ্জ করার জন্য বিজেপি বিভিন্ন কৌশলও খুঁজতে থাকে। ‘প্রিন্স অব কলকাতা’ খ্যাত সৌরভ গাঙ্গুলি ভারতের ক্রিকেট ইতিহাসে একজন জনপ্রিয় অধিনায়ক। পাশাপাশি কলকাতায় বাঙালিদের মাঝেও তার জনপ্রিয়তা আকাশচুম্বী। পরপর দুই মেয়াদে কলকাতার ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশন অব বেঙ্গলের (সিএবি) সভাপতির দায়িত্ব পালনকালে সৌরভ গাঙ্গুলি ভারতীয় কেন্দ্রীয় ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিসিআই) প্রেসিডেন্ট অথবা কোচের দায়িত্ব পালনে আগ্রহ প্রকাশ করেন। বিজেপি পশ্চিমবঙ্গে মমতার বিকল্প জনপ্রিয় ব্যক্তিত্ব হিসেবে সৌরভ গাঙ্গুলিকে ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিসিআই) বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত করে। পাশাপাশি ক্রিকেট বোর্ডের সচিব ও কোষাধ্যক্ষ পদে বিজেপির সভাপতি ও কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের ছেলে জয় শাহ ও কেন্দ্রীয় মন্ত্রী অনুরাগ ঠাকরের ভাই অরুণ ধুমাল নির্বাচিত হন। এভাবেই সৌরভ বিজেপির প্রভাববলয়ে সরাসরি সম্পৃক্ত হন। এ সময় সৌরভকে টুইটারে অভিনন্দন জানিয়ে মমতা বলেন, ‘ক্রিকেট বোর্ডের প্রেসিডেন্ট পদে সর্বসম্মতিভাবে নির্বাচিত হওয়ার জন্য অভিনন্দন সৌরভকে। তুমি ভারত ও বাংলাকে গর্বিত করেছ। আরেকটা দুর্দান্ত ইনিংসের অপেক্ষায় থাকলাম তোমার।’ ধারণা করা হচ্ছে, ২০২১ সালের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার নির্বাচনে বিজেপি সৌরভের জনপ্রিয়তাকে কাজে লাগানোর পাশাপাশি বাংলাদেশ-ভারতের সম্পর্কের ক্ষেত্রেও তাকে ‘ক্রীড়াদূত’ হিসেবে মনোনয়ন দেয়। কারণ, দুই বাংলায় জনপ্রিয় ক্রিকেটার হিসেবে শেখ হাসিনা ও মমতার কাছে সৌরভের গ্রহণযোগ্যতাও রয়েছে ব্যাপক। ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের ইতিহাসে কনিষ্ঠতম প্রেসিডেন্ট হিসেবে সৌরভ গাঙ্গুলি দায়িত্ব গ্রহণের পর শেখ হাসিনা, নরেন্দ্র মোদি ও মমতা ব্যানার্জিকে কলকাতায় বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যকার দ্বিতীয় টেস্ট খেলা দেখার আমন্ত্রণ জানান। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সম্মতির পর ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিও শেখ হাসিনাকে আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ জানান। গতকাল ২২ নভেম্বর কলকাতার ইডেন গার্ডেনকে স্মরণীয় করে তোলার জন্য ভারতে প্রথমবারের মতো দিবারাত্রির টেস্ট ম্যাচ, গোলাপি বল ব্যবহার, সোনার কয়েনে টস, হেলিকপ্টারে প্যারাকমান্ডোর মাধ্যমে ট্রফির আগমন, ঢাকায় বাংলাদেশের অভিষেক টেস্ট ম্যাচে অংশগ্রহণকারী বাংলাদেশ-ভারতের সব খেলোয়াড়কে সংবর্ধনার ব্যবস্থা করা হয়। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ইডেনের ঐতিহাসিক ঘণ্টা বাজিয়ে খেলা উদ্বোধন করেন এবং কিছুক্ষণ খেলা দেখেন। ইডেনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি উপস্থিত ছিলেন। খেলা দেখার পাশাপাশি তারা দুই দেশের সম্পর্কোন্নয়নে কথা বলেছেন বলে আমাদের বিশ্বাস। ২২ নভেম্বর কলকাতার ইডেন গার্ডেনকে কেন্দ্র করে যে কোনো সময় তিস্তার পানি বণ্টন ইস্যুতে একটি ইতিবাচক ঘোষণা আসতে পারে- এমন আশায় আমরা বুক বাঁধতে চাই। জয় হোক ইডেন গার্ডেনের। জয় হোক বাংলাদেশ-ভারত ক্রিকেট কূটনীতির।

লেখক : পিএইচডি গবেষক ও শিক্ষক, স্পোর্টস সায়েন্স বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

[email protected]

 


আপনার মন্তব্য