শিরোনাম
প্রকাশ : শনিবার, ২৮ মার্চ, ২০২০ ০০:০০ টা
আপলোড : ২৭ মার্চ, ২০২০ ২৩:২৮

এই সপ্তাহে শুরু হয়েছে চার কিংবা পাঁচের নামতা!

আমিনুল ইসলাম

এই সপ্তাহে শুরু হয়েছে চার কিংবা পাঁচের নামতা!

আমেরিকায় এখন সবচাইতে বেশি করোনা রোগী। ইতালি ও চীনের চাইতেও আমেরিকায় এখন করোনা রোগীর সংখ্যা বেশি; প্রায় ৮৫ হাজার! এই যখন অবস্থা, তখন বাংলাদেশের ভাগ্যে কী অপেক্ষা করছে; তা সহজেই অনুমান করা যায়। এ লেখাটি বর্তমান করোনা পরিস্থিতি নিয়ে। তবে পুরো ব্যাপারটা ব্যাখ্যা করার জন্য অন্য আরও অনেক কিছু ব্যাখ্যা করা প্রয়োজন। বিজ্ঞান যেখানে উত্তর দিতে অপারগ, কল্পকাহিনির শুরু সেখন থেকেই।

একটা সময় মনে করা হতো কোনো অদৃশ্য শক্তি মানুষের ওপর বিরক্ত হয়ে ঘূর্ণিঝড়-ভূমিকম্প এসব দিচ্ছে। মানুষ তখন ঘূর্ণিঝড় হলে অদৃশ্য শক্তি যেন তাদের ওপর বিরক্ত না হয়, এজন্য প্রার্থনা করত, মানত করত। একটা সময় মানুষ প্রশ্ন করা শুরু করল- কেন এমন হয়? যেই না মানুষ প্রশ্ন করা শুরু করল, সেই সঙ্গে তখনকার সময়ের ধ্যান-ধারণাগুলোর সমালোচনা করা শুরু করল; দেখা গেল মানুষ নতুন নতুন সব আবিষ্কার কিংবা উত্তর নিয়ে হাজির হচ্ছে। এই যেমন একটা সময় মানুষ বুঝতে শিখল ঘূর্ণিঝড় আসলে কোনো অদৃশ্য শক্তির কাজ নয় বরং বায়ুর চাপ কিংবা ইত্যাদি কারণে ঘূর্ণিঝড় হয়। অর্থাৎ মানুষ তাদের প্রশ্নের উত্তরগুলো জানতে শুরু করল। যে প্রশ্নের উত্তরই তারা দিতে পারত না; সেটা থেকে যেত অলৌকিক কিছু কিংবা কল্পকাহিনির আড়ালে।

একটা সময় মানুষ মনে করত সূর্য পৃথিবীর চারদিকে ঘোরে। এরপর মানুষ নিজেরাই প্রশ্ন করতে শুরু করেছে- কেন? উল্টোও তো হতে পারে? এরপর এই মানুষই আবার আবিষ্কার করেছে- আসলে সূর্য নয়, পৃথিবী সূর্যের চারদিকে ঘুরে। এই যেমন ধরুন বারমুডা ট্রায়াঙ্গেল নামে একটা জায়গা আছে; সেখানে অতীতে অনেক বিমান ও সমুদ্রজাহাজ গিয়ে আর ফেরত আসেনি। বিজ্ঞানীরা সেই প্রশ্নের সমাধান দিতে না পারার কারণে এ নিয়ে তৈরি হয়েছে হাজার রকম কল্পকাহিনি।

বেশিদূর যেতে হবে না। এই তো বছর কয়েক আগে মালয়েশিয়ান এয়ারলাইনসের একটা বিমান উধাও হয়ে গেল। আজ অবধি সেই বিমানের কোনো খোঁজ কেউ করতে পারেনি। বিমানটা শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে বিধ্বস্ত হলো- এ প্রশ্নের সঠিক উত্তর আজ অবধি কেউ দিতে পারেনি। যার কারণে এই নিয়েও এখন নানান সব কল্পকাহিনি চালু আছে।

অর্থাৎ বিজ্ঞানীরা যখনই কোনো একটা প্রশ্নের সঠিক উত্তর দিতে পারেননি, তখনই সেটা নিয়ে কল্পকাহিনি চালু হয়েছে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে- সঠিক উত্তর দেওয়ার জন্য তো প্রশ্ন করতে হবে আগে। প্রশ্ন না করে নিশ্চয় আপনি ওই প্রশ্নের উত্তর দিতে পারবেন না।

আমাদের দেশের কিংবা ভারতীয় উপমহাদেশ অথবা মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সমস্যা হচ্ছে- সেখানে আপনি প্রচলিত কোনো কিছু নিয়ে প্রশ্নই করতে পারবেন না! যেমন ধরুন অতীতে পদার্থবিদ্যা কিংবা গণিতের অনেক সূত্র ভারতীয় কিংবা আরবের বিজ্ঞানীরা আবিষ্কার করেছেন।

তাহলে ভারতীয় উপমহাদেশ কিংবা আরবরা জ্ঞান-বিজ্ঞানে এত পিছিয়ে কেন?

এর কারণ হচ্ছে, সেখানকার রাজা-বাদশাহ ও সরকারগুলো এ ধরনের আবিষ্কারকে কোনো দিন পছন্দ করেনি। কারণ এ ধরনের আবিষ্কার প্রচলিত কল্পকাহিনিগুলোর উত্তর দিয়ে দিতে সক্ষম। আর আপনি যদি এসব কল্পকাহিনির উত্তর দিয়ে দেন, তাহলে মানুষ সবকিছু জেনে-বুঝে যাবে; তখন রাজা-বাদশাহরা আর মানুষের শাসন-শোষণ করতে পারবে না!

যার কারণে এসব আবিষ্কারকে আমাদের মতো দেশগুলোয় কখনো ব্যবহার করা হয়নি উল্টো যারা আবিষ্কার করেছেন, তাদের মৃত্যুদ- দেওয়া হয়েছে।

অথচ ওই আবিষ্কার কিংবা তত্ত্বগুলো নিয়ে ইউরোপ-আমেরিকানরা জ্ঞান-বিজ্ঞান প্রযুক্তিতে অনেক এগিয়ে গেছে। বলছি না, ইউরোপ-আমেরিকার রাজা-বাদশাহরা এমন ছিল না। তারাও ছিল। তারাও তাদের দেশের বিজ্ঞানীদের আবিষ্কারকে স্বাগত জানাত না। একটা সময় তারা তাদের ভুল বুঝতে পেরে ওই জায়গা থেকে সরে এসেছে এবং সব ধরনের প্রশ্নকে তারা স্বাগত জানাতে শুরু করেছে।

আর আমাদের দেশে? আপনি প্রশ্ন করবেন! তাহলেই হয়েছে! উল্টো আপনাকে জেলে ভরে দেবে কিংবা বেঘোরে প্রাণটাও চলে যেতে পারে। যে জায়গাগুলোয় সবচাইতে বেশি জ্ঞান-বিজ্ঞানের চর্চা হওয়া উচিত, বিশ্ববিদ্যালয়গুলো হচ্ছে অন্যতম। সেই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় ছাত্ররা যদি শিক্ষককে প্রশ্ন করেন, শিক্ষক উল্টো বকা দিয়ে বসেন! আমি নিজেই হাজারবার এ অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হয়েছি। যদি বকা নাও দেন, একটা প্রচ্ছন্ন হুমকি তো আছেই- পরীক্ষায় ফেল করিয়ে দেবেন কিংবা কম নম্বর দেবেন!

এটাই আমাদের সংস্কৃতি! কোনো প্রশ্ন করা যাবে না! সবকিছু মেনে নাও! আমি দেশ এবং বিদেশ মিলিয়ে চারটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছি। ইউরোপের তিনটি বিশ্ববিদ্যালয় পৃথিবীর যে কোনো র‌্যাংকিংয়ে সেরা ১০০ বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে আছে। সুইডেনের লুন্ড ইউনিভার্সিটি, নেদারল্যান্ডসের লাইডেন ইউনিভার্সিটি আর ইংল্যান্ডের অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি। এসব লিখতে ইচ্ছা করে না। এতে মানুষ আবার মনে করে বসতে পারে, আমি নিজেকে জাহির করার জন্য বলছি। নিজেকে জাহির করার কোনো ইচ্ছা আমার নেই। স্রেফ ব্যাপারটা বুঝিয়ে বলার জন্য লেখা। ইংল্যান্ডের অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটিতে পড়তে গিয়েছি। প্রোগ্রামের হেড প্রথম দিন আমাদের বললেন, আমরা যা বলি, সবকিছু মেনে নেবে না। শিক্ষকরা যা পড়ান, সবকিছু মেনে নেবে না। সব তত্ত্ব বা থিওরি এক কথায় মেনে নেবে না। মনের মাঝে যে প্রশ্নেরই উদয় হবে, করে ফেলবে। প্রশ্ন না করলে আমরা এগোবো কী করে?

এই হচ্ছে জগৎসেরা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকের কথা- প্রশ্ন না করলে এগোবো কী করে?

আর আমরা! আপনাদের জানিয়ে রাখি, গতকাল বাংলাদেশ সরকার একটা ঘোষণা দিয়েছে। আপনারা অনেকেই হয়তো জানেন না। সেই সরকারি ঘোষণায় বলা হয়েছে- দেশের সব মূলধারার টেলিভিশন ও সংবাদপত্রগুলো যাতে করোনা নিয়ে কোনো গুজব ছড়াতে না পারে এজন্য দেশের নানান সব মন্ত্রণালয়ের একেকজন সচিবকে একেকটা টেলিভিশনের জন্য নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। কোন সচিব, কোন টেলিভিশনের তদারকি করবেন, সে নামগুলোও দিয়ে দেওয়া হয়েছে।

অর্থাৎ সরকার ধরে নিয়েছে, দেশের মূলধারার টেলিভিশনগুলো করোনা নিয়ে গুজব ছড়াচ্ছে!

কি চমৎকার ব্যাপার, তাই না?

এই যে গতকাল দেশের বিভিন্ন বাড়ি থেকে মাঝরাতে আজান দেওয়া হলো (মাঝরাতে আজান দিলে নাকি করোনা হয় না!); এ গুজব কি টেলিভিশনগুলো ছড়িয়েছে?

এই যে এত দিন ধরে বলা হলো মুসলমানদের করোনা হয় না; এ গুজব কি টেলিভিশনগুলো ছড়িয়েছে?

এই যে এত দিন ধরে বলা হলো করোনা হচ্ছে অমুসলিমদের ওপর গজব; এ গুজব কি টেলিভিশনগুলো ছড়িয়েছে?

তাহলে আপনাদের সব রাগ-ক্ষোভ কেন টেলিভিশনগুলোর ওপর গিয়ে পড়েছে? টেলিভিশনগুলোর ওপর নজরদারি করার জন্য আলাদা করে কেন সচিব নিয়োগ দিতে হয়েছে?

উত্তরটা কিন্তু খুব সোজা! কারণ টেলিভিশনগুলো খবর করছে- দেশের নানা প্রান্তে করোনা সন্দেহে মানুষ মারা যাচ্ছে। করোনা রোগীর সংখ্যা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হচ্ছে কিংবা যতটা সম্ভব মানুষকে তারা সচেতন করার চেষ্টা করছে! সেটা কেন আপনাদের ভালো লাগবে?

আপনাদের তো সেটা ভালো লাগার কথা নয়! টেলিভিশন কিংবা মূলধারার মিডিয়া কিংবা লেখক হিসেবে আমি নিজেও প্রশ্ন করি কিংবা প্রশ্ন করতে পছন্দ করি। প্রশ্ন করলেই না উত্তর পাওয়া যাবে; এগোনো যাবে। সেই প্রশ্ন আপনাদের ভালো লাগবে কেন?

প্রশ্নের উত্তর জেনে গেলে যে আপনাদের সমস্যা! তাই না?

গুজব তো আসলে আপনারাই ছড়ান। আপনারা চান দেশে গুজব থাকুক। যাতে খুব সহজে সাধারণ মানুষকে দমন করা যায়। এরপর আপনাদের লোকজন এসে প্রথম তিনের নামতা পড়বে এক সপ্তাহজুড়ে! গত এক সপ্তাহে প্রতিদিন তিনজন করে করোনা রোগী এ বাংলাদেশে পাওয়া গেছে। এই সপ্তাহে অবশ্য শুরু হয়েছে চার কিংবা পাঁচের নামতা!

আপনারা মনে করছেন, এ দেশের মানুষ এখনো ক্লাস ফোর কিংবা ফাইভে পড়ে; এদের চার কিংবা পাঁচের নামতা পড়িয়ে চুপ রাখা যাবে!

ভালো করে জেনে রাখুন, এ দেশের মানুষ এখন চার-পাঁচের নামতা নয়; ৪০-৫০-এর নামতাও গড়গড় করে বলে দিতে পারে। যে সচিবগুলো নিয়োগ দিয়েছেন টেলিভিশনগুলোকে তদারকি করার জন্য; তাদের কি অন্য কোনো দায়িত্ব দেওয়া যেত না? করোনা সন্দেহে অনেক মানুষকে হাসপাতালগুলো নিতে চাইছে না। ডাক্তাররা নিজদের প্রটেক্ট করার জন্য সঠিক পোশাক পাচ্ছেন না। আপনাদের তো উচিত ছিল এ ব্যাপারগুলো দেখার জন্য আলাদা করে সচিব নিয়োগ দেওয়া। তা না করে কিনা আপনারা টেলিভিশনগুলো যাতে গুজব না ছড়ায় এজন্য সচিব নিয়োগ দিয়েছেন!

কথায় আছে- ‘বিপদে বন্ধুর পরিচয়’।

বাংলাদেশ শুধু একা নয়, পুরো পৃথিবী এখন মহাবিপদের মাঝ দিয়ে যাচ্ছে। এ বিপদের সময় আপনারা কেমন আচরণ করছেন, এর ওপর নির্ভর করবে- আপনারা আমাদের বন্ধু নাকি শত্রু! (ফেসবুক থেকে সংগৃহীত)।


আপনার মন্তব্য