শিরোনাম
প্রকাশ : বৃহস্পতিবার, ২১ মে, ২০২০ ০০:০০ টা
আপলোড : ২০ মে, ২০২০ ২৩:০৭

হাওরপাড়ের গল্পকথা

অসীম কুমার উকিল

হাওরপাড়ের গল্পকথা

ভাটি অঞ্চলের মানুষ, হাওর এলাকার কৃষক মুখ ভরাট করে বলে এ বছর এত ধান হয়েছে যে আগামী দু-তিন বছর যদি ফসল দৈব-দুর্বিপাকে নষ্টও হয়ে যায় তবু ভাটির মানুষ ভাতের কষ্ট পাবে না। এবার ধান উৎপাদন হয়েছে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে যা সচরাচর হয় না। সবচেয়ে বড় কথা, কৃষক এবারে শতভাগ ধান কেটে ঘরে তুলতে পেরেছে। সর্বোপরি কৃষক পেয়েছে তার পরিশ্রমের সর্বোচ্চ মূল্য। ধান কাটার শুরুতে নিচু জমিতে ভেজা ধান খেতের পাশে বিক্রি হয়েছে ৮৩০ টাকা মণ দরে, পরে যা ৭২০ থেকে ৭৩০ টাকায় এসে স্থির হয়। ভাটি অঞ্চলের প্রতিটি ঘরে আজ আনন্দের বন্যা। আর এটিই হলো নেত্রকোনা-কিশোরগঞ্জ-সুনামগঞ্জ তথা হাওরের মানুষের মুজিব শতবর্ষের উপহার। আজ প্রায় দুই মাস হলো একটানা আমি আমার নির্বাচনী এলাকার গ্রামের বাড়িতে বসবাস করছি। করোনা আক্রান্ত বিশ্বে এলাকাবাসীর পাশে থেকে জনসেবা করাটাই মূল লক্ষ্য। রাজধানী ঢাকা থেকে যখন এলাকায় আসি তখন দু-চার দিনের প্রস্তুতি নিয়েই এসেছিলাম। কিন্তু এলাকায় এসে সাধারণ মানুষের পাশে থেকে কাজ করতে করতে মনে হলো এ সময়টাতে এলাকাতেই থাকা দরকার। দলের নেতা-কর্মী ও সাধারণ মানুষের প্রত্যাশাও এটুকু। তারা বিপদে-আপদে দুর্যোগ-দুর্বিপাকে নেতাকে পাশে চায়। আর নেতার উপস্থিতিতে প্রশাসনের সকল পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারী যেমন দায়িত্বপ্রবণ হয়, সজাগ থাকে, দলও সকল পর্যায়ে থাকে সক্রিয়। হাওর-বাঁওড়, নদ-নদী, খাল-বিল সমৃদ্ধ গারো পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত সীমান্তবর্তী জেলা নেত্রকোনা। প্রাচীনকাল থেকেই এ জেলায় কোনো শিল্প গড়ে ওঠেনি এবং অদূর ভবিষ্যতে এখানে কোনো শিল্প গড়ে উঠবে বলেও মনে হয় না। তার পরও এ জেলার মঙ্গা বা খাদ্যাভাব দেখা দেয়নি কখনো। ভাটি ও উজানে ধান হয় প্রচুর যা নিজেদের চাহিদা মিটিয়ে দেশের অন্যান্য অঞ্চলেও সরবরাহ করা হয়। হাওর নদী খাল বিলে প্রচুর সুস্বাদু মাছ পাওয়া যায় সারা বছর। তরিতরকারি শাকসবজির চাষও হয় চোখে পড়ার মতো। সর্বোপরি আধুনিক পদ্ধতিতে গরু-ছাগল, হাঁস-মুরগির খামার ও আধুনিক পদ্ধতিতে মাছ চাষ তো আছেই। এক কথায় বলা চলে, মাছে-ভাতে বাঙালি যে ঐতিহ্য নেত্রকোনা জেলা তা ধারণ করে আছে সর্বাঙ্গে। এত কিছুর মধ্যেও এবারের ধান উৎপাদন একটা বিশেষ জায়গা দখল করে নিয়েছে নানা কারণে। এমনিতেই বর্তমান সরকার ও সরকারপ্রধান প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধুকন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা কৃষি ও কৃষকবান্ধব সরকার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে ধান চাষ মেশিনের সাহায্যে ধান কাটা ও সংগ্রহ, বাজারজাতকরণ, আধুনিক উৎপাদনশীল বীজ সরবরাহ, কীটনাশক সহজলভ্য করুন, শতভাগ বিদ্যুতায়নের মাধ্যমে কৃষিজমিতে প্রয়োজনীয় পানি সরবরাহ নিশ্চিতকরণ, সরবরাহসহ প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে বর্তমান সরকার। ধান কাটার আধুনিক মেশিন এসেছে মূলত জাপান থেকে। কিন্তু জাপানি ফরমুলার এ মেশিন প্রস্তুত হয়েছে চীনে। চীনে প্রস্তুত হওয়ায় প্রতিটি মেশিনের দাম কমে দাঁড়ায় ৩০ লাখ টাকার মতো। তার পরও প্রধানমন্ত্রী কৃষি মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দিয়েছেন এ মেশিনগুলো কৃষকের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে নিয়ে আসার জন্য। কৃষকের কাছে এই আধুনিক মেশিনগুলো সহজলভ্য করার জন্য কৃষি মন্ত্রণালয় প্রথমে শতকরা ৫০ ভাগ সাবসিডি এবং পরে শতকরা ৭৫ ভাগ ভর্তুকি দিয়ে নেত্রকোনা-কিশোরগঞ্জ-সুনামগঞ্জের হাওরের প্রকৃত কৃষকের মধ্যে বিতরণের উদ্যোগ নেয়। ফলে ফসল তোলা অনেকাংশেই সহজ হয়ে যায় এবং ধান কাটার মজুরিও হ্রাস পায় অনেকাংশে। করোনার প্রকোপের মাঝে কৃষিশ্রমিক পাওয়াটা খুবই কষ্টসাধ্য ছিল। কিন্তু আমাদের জেলায় একসময় কৃষিশ্রমিকের প্রয়োজনীয়তা নেই বলে ঘোষণা করা হয়। কারণ আমাদের হাতে তখন পর্যাপ্ত মেশিন এসে গেছে। সুদূর নওগাঁ, নাটোর, পাবনা, টাঙ্গাইলসহ বিভিন্ন জেলা থেকেও ধান কাটতে এসেছে আমাদের হাওরাঞ্চলে। হাওরের ধান কাটা শেষ হলেই উজানের ধান কাটা শুরু হয়। কাজেই উজানের মেশিনগুলো বসে না থেকে হাওর এলাকায় চলে আসে ধান কাটার জন্য। মেশিনের মালিকের দুই পয়সা বাড়তি আয়ও হয় একই সঙ্গে দেশের কাজও হয়। আমি স্থানীয় নেতাদের নিয়ে নেত্রকোনার হাওরের বিভিন্ন অঞ্চল চষে বেরিয়েছি এবারকার ধান কাটার মৌসুমে। জন্মসূত্রেই বিভিন্ন সময়ে আমার হাওর এলাকায় যাওয়ার অভিজ্ঞতা আছে। কিন্তু এবারকার অভিজ্ঞতাটুকু সম্পূর্ণ ভিন্ন। কেন ভিন্ন তা তুলে ধরার জন্যই এ লেখা। আমার কেন্দুয়া থেকে রওনা হয়ে আটপাড়া-মদন-উচিতপুর হয়ে খালিয়াজুরী উপজেলার ধনু নদের পাড় পর্যন্ত যেতে লাগে মাত্র এক ঘণ্টা।

মদন উপজেলার উচিতপুর থেকেই শুরু হয় সত্যিকারের হাওর এলাকা। এ এলাকার জনগণ সেখান থেকে ভরা বর্ষায় নৌপথে যাতায়াত করে নেত্রকোনা-কিশোরগঞ্জ-সুনামগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায়। ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাগত এক এলাকা থেকে অন্য এলাকায় যেতে। অথচ আমি কেন্দুয়া থেকে রওনা হয়ে উচিতপুর ভায়া চলে যাচ্ছি খালিয়াজুরীর ধনু নদের পাড় পর্যন্ত মাত্র এক ঘণ্টায়। কীভাবে সম্ভব হলো তা জানতে হলে ঢাকায় টিভি সেটে বসে টক-শো করলে জানা যাবে না। কারণ সাবমারসিবল রোড এ এলাকাগুলোকে যাতায়াতের ক্ষেত্রে যুগান্তকারী বিপ্লব এনে দিয়েছে। একজন প্রকৌশলীর পক্ষে এ বিষয়ে বিস্তর জানা হয়তো সম্ভব। কিন্তু প্রচন্ড  জ্ঞানের অধিকারী হয়েও নিজ চোখে না দেখলে এ বিষয়ে জ্ঞানার্জন খুব সহজ নয়। যে রাস্তাটুকু ছয় মাস পানির নিচে থাকবে পানি সরে গেলে সে রাস্তাটি ভেসে উঠবে অবিকৃত অবস্থায় যাতায়াতের উপযোগী হয়ে। ভাটির শার্দূল হিসেবে খ্যাত মহামান্য রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ, বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ সহকর্মী মরহুম আবদুল মোমেন, বঙ্গবন্ধুর আরেক সহযোদ্ধা সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী মরহুম আবদুস সামাদ আজাদ, বিশিষ্ট পার্লামেন্টারিয়ান প্রয়াত সুরঞ্জিত সেনগুপ্তরা এ বিষয়গুলোয় কাজ শুরু করেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আন্তরিক উদ্যোগ এ প্রকল্প বাস্তবায়নে সর্বাত্মক সহযোগিতা করেছে।

                লেখক : রাজনীতিবিদ, সংসদ সদস্য।


আপনার মন্তব্য