শিরোনাম
প্রকাশ : বৃহস্পতিবার, ১৩ আগস্ট, ২০২০ ০০:০০ টা
আপলোড : ১২ আগস্ট, ২০২০ ২৩:১৬

আর একজন দুলাল হবে না

বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক

আর একজন দুলাল হবে না

জন্মিলে মরিতে হবে

অমর কে কোথা কবে

কবির এ দুই পঙ্তিতে যে চিরন্তন বাস্তবিকতা রয়েছে, অনেক মৃত্যুর ক্ষেত্রেই তা মেনে নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। সাবেক আইন সচিব শেখ জহিরুল হক দুলাল তেমনি এক মৃত্যুঞ্জয়ী যার স্থান পূরণ করার লোক খুঁজে পাওয়া সহজ হবে না। করোনার রুদ্র হাত এমনি আরও অনেককে অসময়ে শেষ পরিণতিতে নিয়ে গেছে যাদের স্থানও পূরণ হওয়ার নয়। এর মধ্যে রয়েছেন পদ্মভূষণ অধ্যাপক আনিসুজ্জামান, প্রকৌশলী জামিলুর রেজা চৌধুরী, অ্যাডভোকেট সাহারা খাতুন, শেখ মোহাম্মদ আবদুল্লাহ, বদর উদ্দিন আহমদ কামরান প্রমুখ। মৃত্যুর দরজা থেকে ফিরে এসেছেন অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন এবং জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক আবেদ খান। এঁরা সবাই মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পক্ষের এক একজন সফল দুর্গ ছিলেন। বঙ্গবন্ধুর আদর্শের অকৃত্রিম অনুসারী ছিলেন, অসাম্প্রদায়িক চেতনার অকুতোভয় যোদ্ধা। সততা, নিষ্ঠা, প্রজ্ঞা, দেশপ্রেম, নীতির প্রশ্নে আপসহীনতা এবং বিরল মেধার ধারক হিসেবে তাঁরা থাকবেন চির-অম্লান।

দুলালের সঙ্গে পরিচয় নব্বই দশকের শেষে, যখন হাই কোর্টে বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলা চলছিল। বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে আমি জ্যেষ্ঠ অ্যাডভোকেট সিরাজুল হক সাহেবের নেতৃত্বে প্রসিকিউশন দলের একজন সদস্য ছিলাম। আইন মন্ত্রণালয়ের যে দুজন কর্মকর্তা আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করতেন তার মধ্যে ছিলেন জনাব সাহাবুদ্দিন চুপ্পু এবং দুলাল। বঙ্গবন্ধু পরিবারের পক্ষে যোগাযোগ করতেন জনাব নজিব। প্রথম দিনের পরিচয়েই দুলালের মধ্যে দেখতে পেয়েছিলাম বঙ্গবন্ধুর আদর্শের প্রতি, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার প্রতি তাঁর দৃঢ় প্রত্যয়। সততায় দুলালের সমকক্ষ খুঁজে পাওয়া ভার। বহু বছর তিনি নিম্ন আদালতসমূহে বিচারকের দায়িত্ব পালন করেছেন। বেশ কয়েক বছর সচিব হিসেবে কর্মরত ছিলেন। অথচ অবিশ্বাস্য হলেও সত্য এই যে, অবসরের পর তাঁর ব্যক্তিগত একটি গাড়িও ছিল না। সততা তাঁর পারিবারিক ঐতিহ্য।

পিতা ছিলেন পুলিশ সুপার, সততার জন্য যাঁর সুনাম সর্বজনবিদিত। কোনো লোভ তাঁকে প্রভাবিত করতে পারেনি। হাই কোর্টের বিচারপতির আকর্ষণীয় সাংবিধানিক পদটি পাওয়ার জন্য বহু লোক নিরলস ধরনা দিয়ে থাকেন। অথচ হাই কোর্টে বিচারপতির পদ পাওয়ার সুযোগ দুলালের কাছে বহুবার  এলেও তিনি তা সহাস্যে প্রত্যাখ্যান করেছেন। আমি কারণ জিজ্ঞাসা করলে দুলাল বলতেন, ‘স্যার! আইন মন্ত্রাণালয়ে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সরকারের পক্ষে কাজ করার প্রয়োজনেই আমার মন্ত্রণালয়ে থাকা উচিত।’ আর সে দায়িত্ব তিনি পালন করেছেন সব ভয়ভীতি, চোখ রাঙানি উপেক্ষা করে। সময়টি ছিল সস্বীকৃত পাকিস্তানি সেনাদের সহায়তাকারী এবং দুর্নীতিগ্রস্ত প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার গভীর ষড়যন্ত্রের। ওই শান্তি কমিটির সদস্য সিনহা প্রতিদিনই ষড়যন্ত্র করছিলেন, পাকিস্তান সুপ্রিম কোর্টের পথ অনুসরণ করে একটি বিচার বিভাগীয় অভ্যুত্থানের মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সরকারের পতন ঘটানোর। সে সময় সিনহার সেই ষড়যন্ত্র যে কজন ব্যক্তি নির্ভয়ে এবং সফলতার সঙ্গে ফাঁস করতে সক্ষম হয়েছিলেন, দুলাল তাদের অন্যতম। কাজটি মোটেও সহজ ছিল না। প্রধান বিচারপতি শুধু প্রটোকলে দেশের ৪ নম্বর ব্যক্তিই নন, তিনি রাষ্ট্রের তিনটি অঙ্গের একটির প্রধান। একজন সচিবের পক্ষে দেশের প্রধান বিচারপতির বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া মানে ছিল কুমিরের বিরুদ্ধে জলে বাস করা। কিন্তু দুলাল তা-ই করেছেন প্রধান বিচারপতি সিনহার চোখ রাঙানি এবং হুমকি-ধমকি উপেক্ষা করে। এজন্য অবশ্য তাঁকে সিনহার হাতে বহুবার লাঞ্ছিত হতে হয়েছে। সিনহা দুলালের বিরুদ্ধে বেআইনিভাবে আদালত অবমাননার মামলা করে তাঁকে পাঁচ-ছয় দিন সুপ্রিম কোর্টের কাঠগড়ায় দিনভর দাঁড় করিয়ে এবং শ্রুতিকটু ভাষায় ভর্ৎসনা করেছিলেন, জেলে পাঠানোর ভয়ও দেখিয়েছিলেন। মহামান্য রাষ্ট্রপতির নির্বাহী নির্দেশও উপেক্ষা করে সিনহার নির্বাহী নির্দেশ পালন করতে তিনি তাঁর ক্ষমতার অপব্যবহার করে দুলালকে জেলে পাঠানোর পথেই এগোচ্ছিলেন, আর জেল হলে তো দুলাল চাকরিচ্যুতও হতেন। কিন্তু ধর্মের কল বাতাসে নড়ে ছিল। দুর্নীতির রাজা সিনহা তার আগেই বিদায় নিয়েছিলেন আপিল বিভাগের অন্য চার মাননীয় বিচারপতি তার সঙ্গে আদালতে না বসার সিদ্ধান্ত নেওয়ার কারণে। আমি সে সময় অবসরপ্রাপ্ত। তাই আমার স্নেহধন্য দুলাল প্রায়ই আমার সঙ্গে দেখা করতে আসতেন। বলতেন, ‘স্যার! মাননীয় প্রধান বিচারপতি আমাকে জেলে পাঠানোর সব প্রস্তুতি শেষ করেছেন। তাঁর ক্ষমতার শেষ নেই। ক্ষমতার অপব্যবহার করার ক্ষমতা তাঁর রয়েছে। আমি জেলে যাব, চাকরি হারাব। কিন্তু আজীবন ধারণ করা ন্যায়নীতি থেকে সরব না।’ সিনহা পরেশ শর্মা নামে নিম্ন আদালতের এক জেলা জজকে বিচার বিভাগীয় চাকরি কমিশনের সচিবের দায়িত্ব দিয়েছিলেন। অথচ বিচারক শর্মার বিরুদ্ধে নারী ও শিশু আদালতের বিচারক থাকাকালে কয়েক লাখ টাকার উৎকোচ গ্রহণ করে ধর্ষণ মামলার আসামিকে বেকসুর খালাস দেওয়ার অভিযোগে তদন্ত চলছিল। প্রধান বিচারপতি সিনহা পরেশ শর্মার ফাইলটিই গায়েব করেছিলেন। কিন্তু দূরদ্রষ্টা দুলাল তার আগেই ফাইলের সব কাগজ কপি করে রেখেছিলেন। হাই কোর্ট যে কজন কর্মকর্তা যথা রেজিস্ট্রার জেনারেল, উপ-রেজিস্ট্রার জেনারেল সাব্বির ফয়েজ, বিশেষ সহকারী আনিস, হোসনে আরাসহ যারা সিনহার দুর্নীতির জোগানদাতা ছিলেন, তাদের দুর্নীতির কর্মকান্ড প্রকাশ্যে এনে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের পথ সুগম করে দিয়েছিলেন দুলাল। দুলাল প্রধান বিচারপতি সিনহার দুর্নীতির বহু তথ্য গোপনে উদ্ঘাটন করতে পেরেছিলেন। আর এটা সম্ভব হয়েছিল কারণ প্রধান বিচারপতি সিনহা দুর্নীতি করতেন সুপ্রিম কোর্টের হাতে গোনা কজন কর্মকর্তার যোগসাজশে। তাদেরও অপসারণ করা হয়েছে। তারাও এখন তদন্তাধীন। প্রধান বিচারপতি সিনহা যে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সরকারকে পাকিস্তানি কায়দায় বিচার বিভাগীয় অভ্যুত্থানের মাধ্যমে উৎখাতের পরিকল্পনা করেছেন, বিচক্ষণ দুলালের তা বুঝতে দেরি হয়নি। তিনি এ কথা সংশ্লিষ্ট সবাইকে জানিয়েছিলেন। দেশের প্রধান বিচারপতির বিরুদ্ধে একজন সাধারণ আইন সচিবের এ ধরনের অবস্থানের নজির সারা পৃথিবীতে নেই। দেশের প্রধান বিচারপতির সামনে সচিব একজন অতি খুদে। এজন্য যে সাহসিকতার প্রয়োজন ছিল, দুলালের তা ছিল বলেই তিনি ছিলেন মহান। জেল হতে পারে, চাকরি যেতে পারে জেনেও তিনি নীতিভ্রষ্ট হননি। চারিত্রিক দৃঢ়তার কারণে তাঁর শত্রুর অভাব ছিল না। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যখন দুলালের চাকরির মেয়াদ দুই বছর বাড়িয়েছিলেন, তখন এসব কুচক্রী  হাই কোর্টে সেই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে রিট করেছিলেন, যদিও তারা সফল হননি। অন্যদিকে প্রজ্ঞা, সততা এবং নিষ্ঠার কারণে তাঁর সমর্থকের এবং শুভাকাক্সক্ষীর সংখ্যাও কম নয়। এমনকি দুলাল মাননীয় প্রধানমন্ত্রীরও আস্থাভাজন ও স্নেহভাজন ছিলেন। তাঁর মৃত্যুর ব্যাপারে আমার অগ্রজসম সাবেক স্বাস্থ্য উপদেষ্টা ডা. সৈয়দ মোদাচ্ছের আলী নিশ্চিত হওয়ায় আমাকে বলেছিলেন, ‘দেখ মানিক! দুলাল এক দুষ্প্রাপ্য হীরকখন্ড।’ জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক স্বদেশ রায় কান্নাজড়িত কণ্ঠে বললেন, ‘আর একজন দুলাল পাওয়া যাবে না।’ অধ্যাপক মুনতাসীর মামুনসহ বহু বিজ্ঞজন একই ধরনের মন্তব্য করেছেন।

আজ যখন মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিরোধী শক্তিরা ষড়যন্ত্রে লিপ্ত, তাদের ষড়যন্ত্র নস্যাতের জন্য দুলালের প্রয়োজন মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসীরা পদে পদে অনুভব করবেন। দুলাল সব সময় বলতেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের এই সরকারকে বিপন্মুক্ত রাখাই আমার মূল কাজ।’ তাঁর প্রয়াণের পর কবিগুরুর ভাষায় বলতে হয়, ‘তুমি রবে নীরবে হৃদয়ে মম’। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার অনুসারীদের হৃদয়ে দুলাল সব সময় বেঁচে থাকবেন।

লেখক : সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি।


আপনার মন্তব্য