শিরোনাম
প্রকাশ : শনিবার, ১৩ মার্চ, ২০২১ ০০:০০ টা
আপলোড : ১২ মার্চ, ২০২১ ২৩:২৩

৫০ বছরে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি- শেখের বেটি

সৈয়দ বোরহান কবীর

৫০ বছরে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি- শেখের বেটি

আফ্রিকার মুক্তির মহানায়ক নেলসন ম্যান্ডেলার একটি সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন উইফ্রে অপরাহ। ‘ও’ ম্যাগাজিনের ওই সাক্ষাৎকারে অপরাহ জিজ্ঞেস করেছিলেন আফ্রিকার ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য কী প্রয়োজন? ম্যান্ডেলা উত্তর দিলেন নেতৃত্ব। পরের প্রশ্ন। এ অঞ্চলের দারিদ্র্য, ক্ষুধা দূর করার জন্য কী দরকার? ‘নেতৃত্ব’। ম্যান্ডেলার উত্তর। তৃতীয় প্রশ্ন, বিভক্তি দূর করার জন্য কী করণীয়। ‘নেতৃত্ব’। ম্যান্ডেলা উত্তর দিলেন।

একটি জাতির উত্থান, বিকাশ, উন্নয়ন এবং অগ্রযাত্রা সবকিছুর জন্য সবার আগে দরকার একজন ভালো নেতা। বিচক্ষণ নেতা। স্বপ্নচারী মানুষ। এ সত্য বাংলাদেশের থেকে ভালো কে বুঝবে? বাংলাদেশ এখন স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদ্্যাপন করছে। আমাদের এ প্রিয় মাতৃভূমি, আমাদের প্রাণের জাতীয় সংগীত, আমাদের রক্তস্নাত পবিত্র পতাকা- এসব কিছুই আমরা পেয়েছি এক নেতার দীর্ঘ সংগ্রাম, নেতৃত্ব এবং প্রাজ্ঞতায়। তিনি আমাদের জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমান। কিন্তু যে স্বপ্ন বুকে ধারণ করে জাতির পিতা এ দেশের মুক্তির সংগ্রামে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন সে স্বপ্ন তিনি পূরণ করে যেতে পারেননি। বিজয়ের সাড়ে তিন বছরের মধ্যেই অস্তিত্বের সংকটে পড়ে দেশটি। বাংলাদেশ একটি ক্ষুধা ও দারিদ্র্য পীড়িত রাষ্ট্রের মডেল হবে এমন ভবিষ্যদ্বাণী করেছিল বিশ্বব্যাংক। এ রাষ্ট্র কবে নিঃশেষিত হবে তা-ই ছিল অর্থনীতিবিদদের গবেষণার বিষয়। বলা হয়েছিল, বাংলাদেশ ‘দুর্ভিক্ষের চক্র’ থেকে যদি বেরোতে পারে তাহলে বিশ্বে দুর্ভিক্ষ থাকবে না। এ রকম এক বাস্তবতায় ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষ বাংলাদেশ সম্পর্কে এসব ভবিষ্যদ্বাণীকেই যেন সত্য বলে প্রতিষ্ঠিত করেছিল। এরপর ’৭৫-এর ১৫ আগস্ট। স্বপ্নহীন পথহারা এক বিবর্ণ বাংলাদেশ। সেখান থেকে আজকের বাংলাদেশের রূপান্তর যেন রূপকথার গল্প।

বাংলাদেশে উন্নয়ন এবং প্রাপ্তি ফিরিস্তি দেওয়া হয় নানা পরিসংখ্যান দিয়ে। মানুষের মাথাপিছু আয়, গড় আয়ু, শিক্ষার হার ইত্যাদি বলে দেখানো হয় বাংলাদেশের অর্জনগুলো। অনেকেই বাংলাদেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতির দৃশ্যমান উদাহরণ দিতে পছন্দ করেন। পদ্মা সেতু, রূপপুর পারমাণবিক প্রকল্প, বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট, মেট্রোরেল ইত্যাদি উন্নয়নের ফিরিস্তি দেওয়া হয়। বিরোধী পক্ষ আবার এর মধ্যে দুর্নীতি খোঁজে। বিএনপিসহ সব বিরোধী দলই বলার চেষ্টা করে মেগা প্রকল্পে মেগা দুর্নীতি হচ্ছে। অস্বীকার করার কোনো কারণ নেই উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে দুর্নীতি বেড়েছে। বৈষম্য বেড়েছে তারও বেশি। ব্যাংকের টাকা লুট করে পালিয়ে যাওয়ার ঘটনা এখন গুনে শেষ করা যাবে না। হাজার হাজার কোটি টাকা পাচার হয়ে যাচ্ছে। সুইস ব্যাংকে কাদের টাকা জমা আছে মানুষ জানে, মুখ ফুটে বলে না। কারা কানাডায় বেগমপাড়ায় বিত্তের পাহাড় গড়েছে তাও মানুষ জানে। অপ্রতিরোধ্য অগ্রযাত্রার পাশাপাশি দুর্নীতিরও লাগামহীন ঘোড়া ছুটে চলেছে। কিন্তু সাফল্য এবং ব্যর্থতার মিশেলে এ বাংলাদেশ এখন এক সম্ভাবনাময় সফল দেশ। দুর্নীতি, মানবাধিকারের নাজুক অবস্থা, ভঙ্গুর গণতন্ত্রের পরও বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে। এ দেশের মানুষ স্বপ্ন দেখে। তারা তাদের অফুরন্ত সম্ভাবনা উজাড় করে দেয়। কঠিন পরিশ্রম করে, তিল তিল করে ভবিষ্যতের সিঁড়ি বিনির্মাণ করে। আর এটি সম্ভব হচ্ছে একজন মানুষের নেতৃত্বের জন্য। তিনি হলেন শেখ হাসিনা, শেখের বেটি।

বঙ্গবন্ধু যে বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখতেন সে বাংলাদেশের নাম ‘সোনার বাংলা’। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাছ থেকে শুধু ‘সোনার বাংলা’ শব্দটি ধার করেছিলেন শেখ মুজিব। সোনার বাংলার এক রূপকল্প এঁকেছিলেন জাতির পিতা। বঙ্গবন্ধু তাঁর বিভিন্ন বক্তৃতা এবং কাজে সোনার বাংলার অবয়বটা পরিষ্কার করেছিলেন। কিন্তু সোনার বাংলার স্বপ্নে পৌঁছানোর জন্য একজন নেতা প্রয়োজন ছিল। এমন একজন মানুষের দরকার ছিল যিনি দাঁতে দাঁত চেপে, সব প্রতিকূলতা মাড়িয়ে কাক্সিক্ষত বন্দরে নিয়ে যাবেন প্রাণের স্বদেশকে। বঙ্গবন্ধু হত্যাকা-ের পর সে রকম নেতা ছিল না আমাদের। বাংলাদেশের সৌভাগ্য যে ’৭৫-পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনীতিতে আমরা সেই নেতা পেয়েছি। শেখ হাসিনা। যিনি এ দেশের মানুষের আস্থার প্রতীক। যিনি বাংলাদেশের মানুষকে স্বপ্ন দেখাতে শিখিয়েছেন। যিনি এ দেশের মানুষকে সাহসী, আত্মপ্রত্যয়ী করে তুলতে উদ্বুদ্ধ করেছেন। যাকে মানুষ বিশ্বাস করে।

শেখ হাসিনা কি বঙ্গবন্ধুর মতো? না। কোনোভাবেই নয়। বঙ্গবন্ধু মানুষকে উদ্দীপ্ত করতে পারতেন। তিনি ছিলেন হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালা। শেখ হাসিনার সে সম্মোহনী শব্দের ঝরনাধারা নেই। বঙ্গবন্ধু ছিলেন স্থপতি। তিনি স্বপ্নের বুননে এক অসম্ভব সুন্দর বাংলাদেশের নকশা বানিয়েছিলেন আর শেখ হাসিনা হলেন সেই নকশার বাস্তবায়নকারী। একজন নির্মাতা। শেখ হাসিনা রাজনীতিতে বঙ্গবন্ধুর অনিবার্য উত্তরাধিকার ছিলেন না। ’৭৫-এর ১৫ আগস্টের ঘটনা না ঘটলে রাজনীতির নেতৃত্বে তিনি হয়তো আসতেনও না। শেখ হাসিনার বাংলাদেশের রাজনীতিতে নেতৃত্ব গ্রহণ এক নিষ্ঠুর বাস্তবতা। পাকিস্তানের জুলফিকার আলী ভুট্টো যেমন তিল তিল করে তাঁর কন্যা বেনজির ভুট্টোকে তাঁর উত্তরসূরি হিসেবে গড়ে তুলেছিলেন। জওহরলাল নেহরু যেমন ইন্দিরা গান্ধীকে রাজনীতির জন্য প্রস্তুত করেছিলেন। ইন্দিরা যেমন সঞ্জয় গান্ধীকে হাতে-কলমে শেখাতে চেয়েছিলেন, তেমনটি শেখ হাসিনার ক্ষেত্রে ছিল না। ছাত্রজীবনে তাঁর রাজনৈতিক জীবনের যে অধ্যায় তা ৩২ নম্বরের পরিবেশ এবং আবহাওয়ার কারণে। এরপর সংসারজীবনেই থিতু হয়েছিলেন। এমনকি ’৭৫-এর পর আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব যখন শেখ হাসিনাকে দেওয়া হয় তখন তা দেওয়া হয়েছিল দলটির অস্তিত্ব রক্ষার জন্য। বিভক্তি ঠেকাতে। আওয়ামী লীগের সভাপতি হিসেবে শেখ হাসিনা নির্বাচিত হওয়ার পরও অনেকে তাঁকে নিয়ে খুব একটা কিছু প্রত্যাশা করেননি। বরং তিনি একজন আলঙ্কারিক, প্রতীকী সভাপতি হিসেবে থাকবেন, এমনটাই প্রত্যাশা করেছিলেন আওয়ামী লীগের অনেক বড় নেতা। শেখ হাসিনা দেশে এসে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন তিনি অলঙ্কার নন, তিনিই প্রকৃত নেতা। পরিবারের শিক্ষা, ছাত্ররাজনীতির অভিজ্ঞতা এবং পিতার আদর্শ সম্বল করেই দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলের নেতৃত্ব নিয়েছিলেন শেখ হাসিনা। একটু গবেষণা করলে দেখা যায়, দায়িত্ব নিয়েই আওয়ামী লীগে চরম প্রতিকূল অবস্থার মুখোমুখি হয়েছিলেন শেখ হাসিনা। একদিকে খুনি মোশতাকের মন্ত্রীরা আওয়ামী লীগের নেতা হিসেবে বসছেন শেখ হাসিনার পাশে। অন্যদিকে ভীরু কাপুরুষ নেতারা শেখ হাসিনাকে রাজনীতি শেখাতে ব্যস্ত। এর মধ্যে শেখ হাসিনার নির্ভরতার জায়গায় পরিণত হয় তৃণমূলের বিপুলসংখ্যক কর্মী। যারা শেখ হাসিনার মধ্যেই বঙ্গবন্ধুকে দেখতে পায়। যারা শেখ হাসিনার নেতৃত্বেই বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার চায়। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে শেখ হাসিনার পার্থক্য অনেক। কিন্তু একটি বিষয়ে দুজন দাঁড়িয়ে একবিন্দুতে। তা হলো মানুষের প্রতি ভালোবাসা আর আস্থা। জাতির পিতা মানুষকে প্রচন্ড ভালোবাসতেন। তিনি যা কিছু করেছেন পুরোটাই ভালোবাসার টানে। শেখ হাসিনাও মানুষকে প্রচন্ড ভালোবাসেন। তাঁর সব কাজের কেন্দ্রে থাকে মানুষের প্রতি ভালোবাসা। বঙ্গবন্ধুর যেমন শক্তির জায়গা ছিল জনগণ, তেমনি শেখ হাসিনার শক্তির কেন্দ্র জনগণ। এ দেশের মানুষই যেমন শেখ মুজিবকে অবিসংবাদিত নেতা বানিয়েছে ঠিক তেমনি জনগণই শেখ হাসিনাকে নিয়ে গেছে নেতৃত্বের অনন্য উচ্চতায়। আজ আওয়ামী লীগের ভরা মৌসুমে শেখ হাসিনাকে প্রতিদিন নিত্যনতুন উপাধি দেওয়া হয়, কেউ বলেন জননেত্রী, কেউ দেশরত্ন, কেউ রাষ্ট্রনায়ক- আরও কত কী! কিন্তু যে কৃষক প্রচন্ড পরিশ্রম করে ফসল ফলায়, যে শ্রমিক গার্মেন্টে নিখুঁত বুননিতে বৈদেশিক মুদ্রা আনে, দূর দেশে যে শ্রমিকটি এক বেলা খেয়ে দেশে টাকা পাঠায় তাদের কাছে শেখ হাসিনার পরিচয় ‘শেখের বেটি’। এসব মানুষের কাছে উন্নয়ন, প্রবৃদ্ধি, তথ্যের ফানুস মূল্যহীন।

এ মানুষগুলো মন্ত্রীদের লাগামহীন কথায় যখন বিরক্ত হয় তখন বলে, ‘শেখ হাসিনা একে মন্ত্রী রাখছে কেন?’ এ মানুষগুলো যখন এমপিদের পদস্খলন দেখে তখন বলে, ‘এরাই শেখ হাসিনাকে ডোবাবে।’ এ মানুষগুলো যখন আমলাদের ক্ষমতার দৌরাত্ম্য দেখে আঁতকে ওঠে তখন বলে, ‘শেখ হাসিনাকে এরা ভুল বোঝাচ্ছে।’ এ দেশের প্রায় সব মানুষের চাওয়া-পাওয়া, আশা-আকাক্সক্ষার কেন্দ্রে এভাবেই শেখ হাসিনা। একমাত্র শেখ হাসিনা আছেন এ জন্য বন্যায় সর্বস্বান্ত হওয়া একটি মানুষ ভয় পায় না, বলে শেখের বেটি আছে নিশ্চয়ই কিছু করবে। রোগে-শোকে জর্জরিত একজন নারী বলে, শেখের বেটি আছে, চিকিৎসার একটা ব্যবস্থা হবে। বেকার তরুণ বিশ্বাস করে শেখ হাসিনা তাদের জন্য কিছু করবে। এ দেশে একজন ব্যবসায়ী যখন শিল্প উদ্যোগে পদে পদে বাধাগ্রস্ত হন তখনো তিনি শেষ ভরসার জায়গা হিসেবে মানেন শেখ হাসিনাকে। একজন নির্যাতিত নারী তার আর্তনাদের কথা বলার জন্য শেখ হাসিনাকে চিঠি লেখেন বা তার সঙ্গে দেখা করতে চান। এ দেশের প্রায় প্রতিটি মানুষ বিশ্বাস করে তার সমস্যার কথাটি শুধু শেখ হাসিনার কাছে পৌঁছাতে পারলেই হলো, তিনি তার ন্যায্য সমাধান করে দেবেন। এমনকি বেগম জিয়ার পরিবারের সদস্যরাও যখন তাঁর মুক্তির পথের কোনো কূলকিনারা পাচ্ছিলেন না তখন তাঁরা শেখ হাসিনার দ্বারস্থ হন। প্রবল প্রতিপক্ষ, যিনি শেখ হাসিনাকে রাজনীতি থেকে নয় পৃথিবী থেকেই চিরবিদায় করতে চেয়েছিলেন তাঁকে শেখ হাসিনা জামিনের ব্যবস্থা করে দিলেন। আর কারও ওপর মানুষের আস্থা থাক না থাক, সব মানুষ বিশ্বাস করে শেখ হাসিনা অন্যায় প্রশ্রয় দেন না, অনিয়মকে সমর্থন করেন না, ন্যায়বিচার নিশ্চিত করেন। তাই একজন মন্ত্রী যখন দুর্নীতিতে নিজেকে গলা পর্যন্ত ডুবিয়ে দেন তখন চায়ের আড্ডায় মানুষটি বলে ওঠে, ‘দেখ না, শেখ হাসিনা ওরে ক্যামনে সাইজ করে।’ কোনো এমপি যখন নিজেকে ‘জেলার রাজা’ ঘোষণা করে তখন সাধারণ মানুষ মুচকি হেসে বলে, ‘তোমার দিন ঘনাইয়্যা আইছে, দেখো তোমারে শেখ হাসিনা কী করে?’ আমলা যখন বাড়াবাড়ি করে তখন সাধারণ মানুষ বলে, ‘দেখো ওরে শেখ হাসিনা কী করে?’ আবার অনেক ক্ষেত্রেই যখন কিছু হয় না তখন অস্থির মানুষ একে অন্যকে প্রশ্ন করে, ‘শেখ হাসিনা কি এসব দেখে না। ঘটনা কী?’

অর্থাৎ মানুষের জায়গা একটাই ‘শেখের বেটি’। তিনিই এখন এই বাংলাদেশের অভিভাবক। তাই কৃষকের ঋণ মওকুফ থেকে পরিচ্ছন্নতা কর্মীর বেতন, ধর্ষিতার কান্না থেকে প্রবীণের অসহায়ত্ব- সবকিছুর দিকে খেয়াল রাখতে হয় একজন মানুষকে। শেখ হাসিনা। তিনিই এখন মানুষের একমাত্র আস্থার জায়গা। তিনি একাই সব সামলাচ্ছেন। সব দিকে খেয়াল, নজরদারি তাঁরই।

এ একক নির্ভরতা নিয়ে ইদানীং বেশ সমালোচনাও শোনা যায়। বিশেষ করে এ দেশের সুশীলসমাজের মধ্যে। তারা এটাকে মিনমিনিয়ে ‘কর্তৃত্ববাদী’ শাসন বলার চেষ্টা করেন। কেউ কেউ একে ‘একনায়কতান্ত্রিক’ শাসনের উত্থানও বলেন। কিন্তু একজন নেতার প্রতি মানুষ যখন আস্থা রাখে, বিশ্বাস রাখে, তার কাছেই সব প্রত্যাশা আর আবদার করতে চায় তখন এটা কি তার জনপ্রিয়তা না কর্তৃত্ববাদ? তাহলে তুমুল জনপ্রিয় নেতা মানেই কি কর্তৃত্ববাদী? শেখ হাসিনা জানেন শেষ পর্যন্ত মানুষ তাঁর দিকেই তাকিয়ে থাকে। মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকেই তিনি সবকিছুর দিকে দৃষ্টি রাখেন। এটাই একজন নেতার সব থেকে বড় যোগ্যতা। এখন যখন বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে আমরা আমাদের অর্জনের গল্প শুনছি তখন প্রশ্ন উঠতেই পারে ৫০ বছরের বাংলাদেশে সব থেকে বড় প্রাপ্তি কী?

বাংলাদেশের খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা? গার্মেন্ট বিপ্লব? নারীর ক্ষমতায়ন? অর্থনৈতিক উন্নয়ন? কমিউনিটি ক্লিনিক? পদ্মা সেতু? যুদ্ধাপরাধের বিচার? ডিজিটাল বাংলাদেশ? নাকি অন্য কিছু?

আমার মতো বাংলাদেশের সিংহভাগ মানুষই বিশ্বাস করে, ৫০ বছরে বাংলাদেশের সব থেকে বড় প্রাপ্তি একজন শেখ হাসিনা। শেখ হাসিনাকে আমরা পেয়েছি বলেই এ উন্নয়ন, অগ্রগতির মহাযজ্ঞ। স্বল্পোন্নত দেশ   থেকে উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বাংলাদেশের আত্মপ্রকাশ। ক্ষুধা-দারিদ্র্য মুক্ত এক বাংলাদেশের বিকাশ। শেখ হাসিনাই আমাদের আশা, স্বপ্নের সারথি। শেখ হাসিনা এ দেশের মানুষের মনের ভাষা বোঝেন, তিনি মানুষের প্রত্যাশার কথা জানেন। জনগণের সঙ্গে তাঁর একটা সংযোগ রয়েছে। আর এ কারণেই বাংলাদেশ জন-আকাক্সক্ষার ধারায় এগিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু এ অর্জনকে কি আমরা ধরে রাখতে যথেষ্ট সচেতন?

আজ এটা পরিষ্কার, শেখ হাসিনার সঙ্গে জনগণের সংযোজন বিচ্ছিন্ন করতে পারলেই বাংলাদেশকে আটকে দেওয়া যাবে। শেখ হাসিনার সঙ্গে জনগণের দূরত্ব হলেই এসব উন্নয়ন পরিসংখ্যান অর্থহীন হবে। মুখ থুবড়ে পড়বে বাংলাদেশ।

তাই ’৭১-এর পরাজিত শক্তি, ’৭৫-এর অপশক্তির লক্ষ্য এখন একটাই- শেখ হাসিনাকে জনগণের থেকে আলাদা করা। জনগণের চাওয়া-পাওয়া, ভালোলাগা-মন্দলাগা যেন শেখ হাসিনা জানতে না পারেন। জনগণ এবং শেখ হাসিনার মধ্যে একটা দেয়াল তৈরি করতে পারলেই বাংলাদেশের সব অর্জনকে ব্যর্থ করে দেওয়া যায়। সে দেয়াল নির্মাণের কাজ কি নীরবে চলছে? যারা প্রকাশ্যে শেখ হাসিনাকে ‘কর্তৃত্ববাদী’ শাসক বলেন তারা তো প্রকাশ্য অপশক্তি। কিন্তু আওয়ামী লীগ এবং সরকারের ভিতরে থেকে যারা ওই দেয়াল বানাতে চায় তারা আরও ভয়ংকর শত্রু। সরকারের মধ্যে হঠাৎ হয়ে যাওয়া কিছু আওয়ামী লীগ-কাম-আমলা শেখ হাসিনার কানে তুলা দিতে ব্যস্ত। এরা শেখ হাসিনাকে সত্য জানতে দিতে ভয় পায়। জনবিচ্ছিন্ন কিছু মন্ত্রী, যারা নিজেদের ‘চেয়ার’কে জীবনের চেয়ে মূল্যবান মনে করেন তারা শেখ হাসিনাকে ভুল তথ্য দেন। কিছু চাটুকার, সুবিধাবাদী নেতা সারাক্ষণ মিথ্যা ভাষণে সত্যকে আড়ালের চেষ্টা করে। এদের নিয়ে এখন আমার খুব ভয় হয়। এদের কারণে আমরা আমাদের সব থেকে বড় সম্পদকে হারাব কিনা সে আশঙ্কা এখন অনেক মানুষের। কারণ আমরা তো জানি, শেখ হাসিনাকে জনবিচ্ছিন্ন করতে পারলেই আমাদের সবচেয়ে বড় অর্জনটা নষ্ট হয়ে যাবে।

লেখক : নির্বাহী পরিচালক, পরিপ্রেক্ষিত।

[email protected]