শিরোনাম
প্রকাশ : সোমবার, ১৫ মার্চ, ২০২১ ০০:০০ টা
আপলোড : ১৪ মার্চ, ২০২১ ২৩:৩৮

ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনামের বিশেষ সাক্ষাৎকার

প্রিন্ট মিডিয়াতেই পাঠকের শেষ আস্থা

প্রিন্ট মিডিয়াতেই পাঠকের শেষ আস্থা
Google News

ডেইলি স্টার সম্পাদক ও সম্পাদক পরিষদের সভাপতি মাহফুজ আনাম বলেছেন, প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার চ্যালেঞ্জ করোনাকালের আগে থেকেই শুরু হয়েছে। এখন আবার যুক্ত হয়েছে করোনাভাইরাস পরিস্থিতি। এখানে ইলেকট্রনিক মিডিয়ার তুলনায় প্রিন্ট মিডিয়া বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিশেষ করে ডিজিটাল প্ল্যাটফরমগুলো প্রিন্ট মিডিয়াকে চ্যালেঞ্জের মধ্যে ফেলে দিয়েছে। তারপরও পাঠক সব মিডিয়াতেই খবরের খোঁজে যাবে। কিন্তু পাঠকের শেষ আস্থা প্রিন্ট মিডিয়া। পাঠক ধরে রাখতে প্রিন্ট মিডিয়ার সেই নির্ভরযোগ্যতা, দৃঢ়তা ও গুণগত মান বজায় রাখা জরুরি। ডিজিটাল মিডিয়া, অনলাইন মিডিয়া বা সোশ্যাল মিডিয়া ভবিষ্যতে হয়ে যাবে সংবাদের উৎস। প্রিন্ট মিডিয়া হবে সংবাদের ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ। গবেষণা, মতামত দিয়ে পাঠকের মন জয় করতে হবে প্রিন্ট মিডিয়াকে। মনে রাখতে হবে, ডিজিটাল মিডিয়া যখন পূর্ণতা পাবে তখন সেও কিন্তু বিশ্লেষণধর্মী সংবাদের দিকে যাবে। সুতরাং প্রিন্ট মিডিয়াকে নিউজ প্লাস তথ্য দিতে হবে। মাহফুজ আনাম সংবাদ ও সংবাদমাধ্যম নিয়ে ১৪ বছর কাজ করেছেন ইউনেস্কোতে। ইউনেস্কো ছেড়ে দিয়ে দেশে ফিরে প্রখ্যাত সাংবাদিক এস এম আলীর সঙ্গে বের করেন ডেইলি স্টার। তিনি ন্যায়নিষ্ঠ ও জনকল্যাণ চিন্তার ধারক।  তাঁর সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মাহমুদ আজহার ও জয়শ্রী ভাদুড়ী

 

প্রশ্ন : করোনাকালে বিশ্ব মিডিয়াকে চ্যালেঞ্জ নিয়ে চলতে হচ্ছে। বাংলাদেশও এর বাইরে নয়। গণমাধ্যমের বর্তমান চ্যালেঞ্জ কীভাবে মোকাবিলা করা যায়?

মাহফুজ আনাম : চ্যালেঞ্জ কিন্তু করোনাভাইরাস সংক্রমণ শুরু হওয়ার আগে থেকে ছিল। ডিজিটাল প্ল্যাটফরমগুলো মিডিয়াকে চ্যালেঞ্জের মধ্যে ফেলে দিয়েছে। এই চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হচ্ছে প্রিন্ট মিডিয়া ও টেলিভিশনগুলো। এটা একটা বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ। কেননা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ নানা ডিজিটাল মাধ্যমে সংবাদ মানুষের হাতে পৌঁছে যাচ্ছে। এখন করোনাভাইরাস পরিস্থিতি চ্যালেঞ্জ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। এখানে ইলেকট্রনিক মিডিয়ার তুলনায় প্রিন্ট মিডিয়া বেশি চ্যালেঞ্জে পড়েছে। প্রিন্ট মিডিয়ার কর্মীরা আগের মতো স্বাধীনভাবে ঘুরে তথ্য সংগ্রহ করতে পারছিল না। লোকজনের সঙ্গে কথা বলতে পারছিল না। আর যেটা সত্যিকারার্থে সংবাদপত্রকে বেশি আঘাত করেছে তা হলো মানুষজন ছাপা কাগজ কেনা বন্ধ করে দিয়েছিল। সেটা এখন আমরা কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করছি। এখন মানুষজন আবার পত্রিকা বাসাবাড়িতে নিচ্ছেন। তবে আগের জায়গায় এখনো ছাপা পত্রিকা যেতে পারেনি। এমনটাও হতে পারে, আগের জায়গায় ছাপা পত্রিকা নাও যেতে পারে। এই ধাক্কা থেকে উত্তরণের একটা পথ হচ্ছে সংবাদপত্রকে আধুনিকায়ন করা। ডিজিটাল প্ল্যাটফরমগুলোকে এখন আপন করে নিতে হবে। যেমন কভিড-১৯-এর জন্য মানুষজনের সঙ্গে আমরা উঠাবসা কমিয়েছি। আবার জুম আসার ফলে একাধিক সেমিনার করছি। সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে যোগাযোগ করছি। শারীরিকভাবে উপস্থিত না থাকলেও কাজটা হচ্ছে। ভবিষ্যতে করোনা নিয়ন্ত্রণে এলেও আমরা জুম বা অন্যান্য প্রযুক্তি ব্যবহার করব। এটার উত্তরণ হচ্ছে নতুন সব ডিজিটাল প্ল্যাটফরম ব্যবহার করা এবং সাংবাদিকদের নতুন প্ল্যাটফরমের ব্যবহারে আরও পারদর্শী করা। এটাও ঠিক অনেকে দায়িত্বজ্ঞানহীনভাবেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করছে। কিন্তু এটা তো তার মত প্রকাশের একটি ক্ষেত্র তৈরি করেছে। স্থানীয় পর্যায়ের নিউজও এখন চলে আসছে ডিজিটাল প্ল্যাটফরমে। এক সময় ছিল সাংবাদিকরাই সংবাদের উৎস। এখন সাধারণ মানুষও সংবাদ পরিবেশক। সেখানে আমাদের সংবাদকর্মীদের আরও বেশি পারদর্শী ও পরিশ্রমী হতে হবে। জনগণের স্বার্থের কথা চিন্তা করতে হবে এবং সাংবাদিকতাকে গণমুখী করতে হবে।

 

প্রশ্ন : সাংবাদিকতায় গত তিন দশকের তুলনায় বর্তমান সময়ে চ্যালেঞ্জগুলো কী কী? বিশেষ করে পেশাদারিত্ব, গুণগত মান উন্নয়ন-প্রভৃতি ক্ষেত্রে আপনার বিশ্লেষণ কী?

মাহফুজ আনাম : তিনটি ইস্যু এখানে ধরা যায়। একটা হচ্ছে বাহ্যিক বা বাইরের দিক। কোন পরিবেশে আমরা সাংবাদিকতা করছি। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মাধ্যমে সাংবাদিকতা ব্যাপকভাবে ব্যাহত হয়েছে। সাংবাদিকদের যে আইনের মাধ্যমে গ্রেফতার করা বা মামলা করা-এতে আমরা বড় ধরনের আতঙ্কের মধ্যে চলে গেছি। অনেকে এখন সেলফ সেন্সরশিপও করছেন। এ ছাড়া ভিতরের দিকটা যদি বলি, অনেকেই আমরা পেশাদারিত্ব সম্পর্কে সচেতন নই। সাংবাদিকদের যে মূল আদর্শ বস্তুনিষ্ঠতার সঙ্গে সংবাদ পরিবেশন করা, সত্যটাকে উদঘাটন করে তুলে আনা সেটা আমরা যথেষ্ট করছি কি না সেখানে আমার সন্দেহ আছে। আরেকটি হলো আমরা অনেক বেশি রাজনৈতিকভাবে বিভক্ত। কিছু সাংবাদিক আছেন যারা কোনো একটি রাজনৈতিক দলকে পছন্দ করেন এবং তাদের ত্রুটি দেখতে পান না। এটা তো সাংবাদিকতা হতে পারে না। আমাদের সবারই একটি রাজনৈতিক আদর্শ থাকতে পারে। কিন্তু তার জন্য সাংবাদিকতার দায়িত্ববোধ, নীতি থেকে বিচ্যুত হওয়া উচিত নয়। সবকিছু মিলিয়ে বলব, গণমাধ্যমে বৈরী একটা পরিবেশ চলছে। আমাদের নিজেদের দক্ষতা বাড়াতে হবে। রাজনৈতিকভাবে বিভক্তি হওয়া যাবে না। এখন নতুন প্ল্যাটফরমের চ্যালেঞ্জও আমাদের সামনে।  

 

প্রশ্ন : রাজনৈতিক মতাদর্শ কি সাংবাদিকতা নিয়ন্ত্রণ করছে? স্বাধীন ও নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার অন্তরায়গুলো কী বলে মনে করেন?

রাজনৈতিক মতাদর্শ সাংবাদিকতাকে নিয়ন্ত্রণ করছে বলব না কিন্তু প্রভাবিত করছে। যে প্রভাবটা না থাকলে স্বাধীন সাংবাদিকতা আরও সুন্দরভাবে বিকশিত হতো। স্বাধীন সাংবাদিকতার অন্তরায়গুলো হচ্ছে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, আমাদের দক্ষতার ঘাটতি, রাজনৈতিকভাবে বিভক্তি হওয়া, নতুন প্ল্যাটফরমের চ্যালেঞ্জ এবং বৈরী মনোভাব বা বৈরী পরিস্থিতি। সমালোচনার ব্যাপারে আরও সহিষ্ণু হতে হবে। সমালোচনা সহায়ক শক্তি সেটা বুঝতে হবে। সরকারের তথ্যের উৎস হলো দল, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং বিভিন্ন সংস্থা। দলের লোকজন কি সব সময় সত্য কথা বলবে। সরকারি প্রজেক্ট হচ্ছে। যারা সেখানে কাজ করছেন তারা কি এই প্রজেক্টের খারাপ বলবে। সরকারকে নেতিবাচক তথ্যটা কে দিচ্ছে। আমি বলব গণমাধ্যম। যেমন ধরেন দুই পাশে রাস্তা নেই। মাঝখানে একটি ব্রিজ বানিয়ে কোটি কোটি টাকার অপচয় হয়েছে। কারা পরিকল্পনা করল, কারা বাস্তবায়ন করল। সবজায়গাই তো ত্রুটি ছিল। মাঠের মাঝখানে একটি ব্রিজ। এটা তো সরকারকে কেউ জানায়নি। এ খবরটা পত্রিকা তুলে ধরেছে। এটা তো সরকারের সহায়কশক্তি। এই সত্যটি আমরা সরকারকে বোঝাতে ব্যর্থ হয়েছি।

 

প্রশ্ন : সাংবাদিকতার কর্তৃত্ব-নেতৃত্ব কি পেশাদার সাংবাদিকদের কাছে আছে?

মাহফুজ আনাম : সাংবাদিকতার কর্তৃত্ব বা নেতৃত্ব পেশাদার সাংবাদিকদের হাতে আছে কি না তা গণমাধ্যম কর্মীদেরই নির্ধারণ করতে হবে। যারা সাংবাদিক সংগঠনগুলোর নেতৃত্ব দেন তারা কোন গণমাধ্যমে কাজ করছেন, সেই গণমাধ্যমের অবস্থান কী তাও দেখার বিষয়। কেউ যদি মূল ধারার প্রিন্ট মিডিয়ার কাগজে জড়িত না থাকেন বা টেলিভিশন চ্যানেলে না থাকেন তাহলে ওই প্রিন্ট বা ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সমস্যা ওই নেতা বুঝবেন না। প্রিন্ট মিডিয়ার লোকজন টেলিভিশনের সব সমস্যা বুঝতে পারবেন না। টেলিভিশনের লোকজনও প্রিন্ট মিডিয়ার সবকিছু বুঝতে পারবেন না। এ জন্য প্রিন্ট বা টেলিভিশনের সঙ্গে জড়িত না থেকেও প্রতিনিধিত্ব করছেন অনেকেই। এখানে তারা গণমাধ্যমের দাবি নিয়ে কতটুকু সফল হবেন সেটা বোঝা যায়।

 

প্রশ্ন : ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট নিয়ে এডিটরস কাউন্সিল, নোয়াবসহ কয়েকটি সংগঠন দীর্ঘদিন ধরে আপত্তি জানিয়ে আসছে। বর্তমান বাস্তবতায় এ নিয়ে কী বলবেন?

মাহফুজ আনাম : ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্টের খসড়া যখন করা হয় তখন আমরা এর সঙ্গে যুক্ত ছিলাম। সংসদে যখন গেল পার্লামেন্টারি স্ট্যান্ডিং কমিটির কাছে তখনো সাংবাদিক সংগঠনসহ কয়েকজন সম্পাদককে ডাকা হয়। আমরা তিনটি সেশনে অংশ নিয়েছিলাম। আমরা পদে পদে বলেছি, এই আইনগুলো স্বাধীন সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা হিসেবে কাজ করবে। চতুর্থ ধাপে ফাইনাল করার সময় আমাদের ডাকা হয়নি। তারপর স্ট্যান্ডিং কমিটি একটি মূল খসড়া আইন সংসদে পাঠিয়ে দিল। সেখানে আমাদের কোনো বক্তব্যের প্রতিফলন ঘটেনি। সংসদে যখন এই আইন পাস হয় তখন এটাকে আরও দৃঢ় করা হয়। এটা পাস হওয়ার পর আমরা আইনমন্ত্রী ও তখনকার তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনুর সঙ্গে আলাপ করি। তখন আইনমন্ত্রী কথা দিয়েছিলেন, আইনে যখন রুলস করা হবে তখন সাংবাদিকদের দাবিগুলো বিবেচনায় থাকবে।

আমরা বলেছিলাম, এটা ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট। এটা ডিজিটালের মধ্যেই থাকুক। এ জন্য বলেছিলাম, একটা লাইন লিখে দেওয়া হোক এটা প্রিন্ট মিডিয়া বা টেলিভিশন সাংবাদিকদের জন্য প্রযোজ্য নয়। এটা সাংবাদিকতার জন্যই যেন প্রযোজ্য না হয়। কারণ, এটা হলো সাইবার ক্রাইম। পৃথিবীতে অন্যান্য দেশেও এটা সাইবার ক্রাইম হিসেবেই আইন আছে। আমরা হলাম ডিজিটাল সিকিউরিটি। আমরা বারবার বলছি, এই আইনের উদ্দেশ্যটা কী? এর উদ্দেশ্য হচ্ছে সাইবার ক্রাইম যেন না হয়। পর্নোগ্রাফি না চলে। কেউ অযথা হয়রানির শিকার না হন। সেটা সেক্সুয়াল, সন্ত্রাসী বা অন্য কোনোভাবেই হোক না কেন। এর সঙ্গে সাংবাদিকতার কোনো সম্পর্কই নেই। গত আড়াই বছরে কয়জন সাইবার ক্রিমিনাল ধরা হয়েছে, কয়জন মত প্রকাশ বা সাংবাদিকতার জন্য ধরা হয়েছে। এই আইন বেশির ভাগই মত প্রকাশ বা সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হয়েছে। তাহলে আইনটার অপপ্রয়োগ হচ্ছে। এই আইনের অস্পষ্টতাও আছে। এই আইনের সাংঘর্ষিক ২০টি ধারা আছে। এর মধ্যে ১৮টি ধারা আছে অজামিনযোগ্য। এটা কি  সন্ত্রাসীদের জন্য করা হয়েছে, যাদের মুক্ত থাকা সমাজের জন্য হুমকিস্বরূপ। এটা অজামিনযোগ্য করার প্রয়োজন ছিল না। আমরা যে সন্দেহ প্রকাশ করেছিলাম, এখন সেটাই বাস্তবে পরিণত হয়েছে। তখনই আমরা বিভিন্ন ধারার পরিবর্তন চেয়েছিলাম। আমরা সম্পূর্ণ আইনের বাতিল চাইনি। আমরা মনে করি, সাইবার সিকিউরিটির প্রয়োজন আছে। এর নামে আপনি স্বাধীন সাংবাদিকতাকে ব্যাহত করতে পারেন না। এখন আইনমন্ত্রী ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন সংশোধনের কথা বলছেন। একটি অভিযোগ আসার পর তা তদন্ত করে খতিয়ে না দেখা পর্যন্ত গ্রেফতার করা যাবে না-এমনটা হলে অনেক সাংবাদিক গ্রেফতারের হয়রানি থেকে মুক্ত হবে। তারপরও এই আইনের অনেক অস্পষ্টতা আছে। এখন আমরা আইনমন্ত্রী কী উদ্যোগ নেন সেটা দেখার অপেক্ষায় আছি। 

 

প্রশ্ন : তথ্যপ্রযুক্তির এই যুগে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের জনপ্রিয়তায় সংবাদপত্র তথা প্রিন্টিং মিডিয়ার ভবিষ্যৎ কী। প্রযুক্তির এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রিন্ট মিডিয়ার করণীয় কী?

মাহফুজ আনাম : অনেকে জেনে খুশি হবেন যে, অতীতে নতুন কোনো মিডিয়া এলেও প্রিন্ট মিডিয়া কিন্তু বিলুপ্ত হয়নি। প্রথমে ছিল প্রিন্ট মিডিয়া। এরপর এলো রেডিও। এরপর এলো টেলিভিশন। প্রিন্টের পর যখন রেডিও এলো তখন অনেকেই মনে করল প্রিন্টের যুগ শেষ। সবাই রেডিওতে চলে যাবে, প্রিন্ট মিডিয়া থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে। এরপর যখন টেলিভিশন চলে এলো তখন অনেকেই বলল রেডিওর যুগ শেষ। প্রিন্ট কিংবা রেডিও কোনো মিডিয়াই বিলুপ্ত হয়নি। এই ডিজিটাল যুগেও প্রিন্ট মিডিয়া বিলুপ্ত হবে না। এখন যুক্ত হয়েছে সোশ্যাল মিডিয়া বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। এ জন্য পত্রিকাগুলো প্রিন্ট ভার্সনের সঙ্গে অনলাইন যুক্ত করেছে। প্রিন্ট মিডিয়াকে কিছু পরিবর্তন করতে হবে। আমি মনে করি, ডিজিটাল মিডিয়া, অনলাইন মিডিয়া বা সোশ্যাল মিডিয়া ভবিষ্যতে হয়ে যাবে সংবাদের উৎস। প্রিন্ট মিডিয়া হবে সোর্স অব ভিউজ অ্যান্ড এনালাইসিস। গবেষণা, মতামত দিয়ে পাঠকের মন জয় করতে হবে প্রিন্ট মিডিয়াকে। প্রিন্ট মিডিয়াকে বিশদ তথ্য উপাত্ত দিতে হবে। প্রিন্ট মিডিয়াকে সম্পূর্ণ একটি নিউজ পরিবেশন করতে হবে। তবে এটাও মনে রাখতে হবে, ডিজিটাল মিডিয়া যখন পূর্ণতা পাবে তখন সেও কিন্তু এনালাইসিসের দিকে যাবে। সুতরাং প্রিন্ট মিডিয়াকে নিউজ প্লাস তথ্য দিতে হবে। সেই চ্যালেঞ্জও প্রিন্ট মিডিয়ার সামনে।

 

প্রশ্ন : মানুষ এখন কি অনলাইন বা ডিজিটাল প্ল্যাটফরমের দিকে ঝুঁকছে? আবার সংবাদপত্রগুলো ভিডিও কন্টেন্ট ব্যবহার করছে। গণমাধ্যমে স্থিরতা কবে নাগাদ আসতে পারে বলে মনে করেন?

মাহফুজ আনাম : এই মুহূর্তে মানুষ অনলাইন বা সোশ্যাল মিডিয়ায় ঝুঁকছে। কিন্তু যারা ভালো সাংবাদিকতা করছে ওইসব পত্রিকার পাঠক কিন্তু কমেনি। বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কাগজ নিউইয়র্ক টাইমস। কিন্তু ওই কাগজ অনেক পাঠক হারিয়ে ফেলেছিল। এখন ওই কাগজ হারানো পাঠকসহ আরও বাড়তি পাঠক পেয়েছে। শিক্ষাটা হলো, সোশ্যাল মিডিয়াতে পাঠক হুরহুর করে গেছে। অনেকেই তখন মনে করছে, ছাপা কাগজ প্রয়োজন নেই। আমি অনলাইন বা সোশ্যাল মিডিয়ায় থাকব। কিন্তু ওই পাঠক দেখতে পাচ্ছে, তাৎক্ষণিক খবর পাচ্ছে কিন্তু পূর্ণাঙ্গ বা সব খবর পাচ্ছে না। তারা আবার চলে আসছে প্রিন্টে। তখন আস্থার পাত্র হয়ে উঠছে প্রিন্ট মিডিয়া। পত্রিকা যদি আস্থা বাড়াতে পারে, তখন পাঠক ডিজিটাল প্ল্যাটফরম দেখলেও পত্রিকা পড়বে বিশ্বাসের জায়গা থেকে। সেই জায়গাটা প্রিন্ট মিডিয়াকে তৈরি করতে হবে।

 

প্রশ্ন : পাঠকের আস্থার জায়গা কিংবা শেষ ভরসা কি প্রিন্ট মিডিয়া?

মাহফজু আনাম : আমি তো তাই মনে করি। পাঠক সব মিডিয়াতেই খবরের খোঁজে যাবে। যেমন আপনার বাগানে অনেক ফুল থাকতে পারে। কিন্তু শেষে গিয়ে গোলাপে থামবেন। কিন্তু পাঠককে ধরে রাখতে প্রিন্ট মিডিয়াকে সেই আস্থা, দৃঢ়তা ও গুণগত মান বজায় রাখতে হবে। এটা প্রতিদিনই করতে হবে। এক দিন গুণগত মানসম্পন্ন খবর দিয়ে আরেক দিন ভুল খবর দেওয়া যাবে না। মানুষ প্রতিদিন সংবাদপত্র পড়ে। সংবাদপত্র প্রতিদিন সঠিক খবর দিচ্ছে। কিন্তু এক দিন ভুল খবর দিলে মানুষ সেটাই মনে রাখবে। অন্য পেশায় ৯৯ ভাগ সঠিক হলেই চলে। কিন্তু গণমাধ্যমে আপনাকে শতভাগ সঠিক, গুণগত মানসম্পন্ন, নির্ভরযোগ্য তথ্য দিতে হবে। এগুলো বজায় রাখলে পাঠক সব মিডিয়া ঘুরে আবার প্রিন্ট মিডিয়াতে ফেরত আসবে। প্রিন্ট মিডিয়ার ভবিষ্যৎ খুবই উজ্জ্বল। কিন্তু গুণগত মান অনেক বাড়াতে হবে।

 

প্রশ্ন : বাংলাদেশের গণমাধ্যম নিজস্ব দায়বদ্ধতা কতটুকু অনুসরণ করছে?

মাহফুজ আনাম : বাংলাদেশের গণমাধ্যমগুলোর নিজস্ব দায়বদ্ধতা বোধ আছে। তবে আরও উন্নত করতে হবে। গণমাধ্যমকে আরও বেশি গণমুখী সাংবাদিকতা করতে হবে। মানুষের সমস্যা, আশা-আকাক্সক্ষা তুলে ধরতে হবে। এখানে দলীয় কিংবা পক্ষপাতিত্ব করা যাবে না। বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতা করতে হবে।

 

প্রশ্ন : নবীন সাংবাদিকদের উদ্দেশ্যে আপনার পরামর্শ কী?

মাহফুজ আনাম : নবীনদের উদ্দেশে আমি বলব, সাংবাদিকতা একটা মহান পেশা। এই পেশায় থেকে সমাজকে যেভাবে সেবা করা যায় তা অন্য পেশায় সম্ভব নয়। সব পেশার মানুষই জনগণের সেবা করছে। কিন্তু সাংবাদিকতার মাধ্যমে দেশের মানুষকে সেবা দেওয়ার ধরনটা ভিন্ন। সমাজের কোন জিনিসটা ভালোভাবে চলছে না সেটা বের করে আনতে হবে। নদী ধ্বংস হলে, ঠিকভাবে ব্রিজ তৈরি না হলে, পানি সংকট তৈরি হলে গণমাধ্যম তুলে ধরবে। প্রতিদিন সমাজের ঘটে যাওয়া অসংগতি তুলে ধরে সমাজের সেবা করতে হবে। এটা মূল্যবোধসম্পন্ন পেশা। সাংবাদিকদের ভিতরে একটা স্বাধীন চেতনার দৃঢ় অবস্থান থাকতে হবে। আমরা স্বাধীনভাবে জনগণের জন্য কাজ করব। কোনো প্রলোভন কিংবা রাজনৈতিক দলীয় মতে প্রভাবিত হব না। বর্তমানে সাংবাদিকতায় চেতনা, মূল্যবোধ, দেশপ্রেম ও নিজেকে স্বাধীনভাবে পরিচালনা করার যে ইচ্ছা সেখানে একটু অভাব দেখা যাচ্ছে।

 

প্রশ্ন : আপনি সাংবাদিকতায় কীভাবে এলেন?

মাহফুজ আনাম : আমার বাবা সাংবাদিক ছিলেন। তিনি আইনজীবী এবং রাজনীতিকও ছিলেন। আমি ছাত্রজীবনেই সাংবাদিকতা শুরু করি। ১৯৭২ সালের মার্চ মাস। আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিএ অনার্স পড়ি। তখন আমি মহসীন হল সংসদের সাধারণ সম্পাদক। দেশ স্বাধীন হয়েছে, মুক্তিযুদ্ধ থেকে ফিরেছি। আমার ব্যক্তিত্বের মধ্যেও একটা স্বাধীনচেতা ভাব এসেছে। আব্বা-আম্মার ওপর কতদিন থাকব? হলে থাকতেও একটা খরচ আছে। রোজগার করা দরকার। ভাবলাম, এমন কী চাকরি করা যায়, যাতে লেখাপড়াও চলে, আয়-রোজগারও হয়। তখন আবদুস সালাম সাহেব বাংলাদেশ অবজারভারের সর্বজন শ্রদ্ধেয় সম্পাদক। উনার সঙ্গে আমাদের পারিবারিক সম্পর্ক ছিল, উনি আব্বাকে খুব সম্মান করতেন। উনাকে বললাম, চাচা একটা চাকরি দেন। উনি বললেন, কালকেই চলে আসো। সেই যে সাংবাদিকতা শুরু করলাম আর বের হইনি।

 

প্রশ্ন : ডেইলি স্টার কীভাবে শুরু করলেন?

মাহফুজ আনাম : আমার পরিকল্পনা ছিল আমি ১০ বছর বিদেশে থাকব। দেশে ফিরে সাংবাদিকতা করব। ইউনেস্কোর চাকরির সুবাদে আমি বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ঘুরেছি। ইউনেস্কোতে আমি সাংবাদিকতা সম্পর্কিত কাজেই জড়িত ছিলাম। ইউনেস্কোতে তখন আন্তর্জাতিক সাংবাদিকতা বিকাশের জন্য সবচেয়ে ভালো কাজ হতো। আমি ওখানে আন্তর্জাতিক সাংবাদিকতার ইস্যুগুলো বুঝতে পারলাম। এরপর আমি দেশে ফিরে সাংবাদিকতায় যোগ দেওয়ার জন্য হামিদুল হক চৌধুরীর সঙ্গে চিঠি আদান-প্রদান শুরু করেছি। অবজারভারে যোগ দেওয়ার চেষ্টা করলেও সেটা হলো না। তখন আমি চিন্তা করলাম ইংরেজি ভালো কাগজ আর কোনটা আছে? তখন আমি নতুন কাগজ বের করার চিন্তা করলাম। কাকতালীয়ভাবে আমার স্টেশন তখন ব্যাংককে এবং এস এম আলী ভাই থাকতেন কুয়ালালামপুর। উনি ইউনেস্কোর রিজিওনাল কমিউনিকেশন অ্যাডভাইজার হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন। ওই সময়ে কয়েক বছর উনার সঙ্গে ডেইলি স্টার বের করা নিয়ে নিয়মিত পরিকল্পনা করি। অবশেষে বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নিই। আলী ভাই ইউনেস্কো থেকে অবসরে গেলেন। আমি পদত্যাগ করলাম। দেশে ফিরে আমরা বিনিয়োগকারীর খোঁজে নামলাম। আমরা চিন্তা করলাম বিনিয়োগকারীদের মধ্যে সবচেয়ে সৎ, নিষ্ঠাবান কারা। সাধারণত বিনিয়োগকারী সিদ্ধান্ত নেন তাঁর পত্রিকার সম্পাদক কে হবেন কিন্তু এক্ষেত্রে আমরা সাংবাদিকরা বিনিয়োগকারী কাকে নেব সেটা খুঁজতে লাগলাম। সৎ ব্যবসায়ী ও সমাজসেবার চেতনা আছে এমন পাঁচজন উদ্যোক্তার কাছে আমরা গেলাম। উনারা রাজি হলেন, বিনিয়োগ করলেন। এরপর এস এম আলী ভাই ও আমি দুজনে মিলে ডেইলি স্টার বের করলাম। আলী ভাই সম্পাদক, আমি নির্বাহী সম্পাদক। এভাবে ডেইলি স্টারের যাত্রা শুরু হলো।

 

প্রশ্ন : নারী সাংবাদিকতায় বাংলাদেশের অগ্রগতি কতদূর? এক্ষেত্রে কোনো প্রতিবন্ধকতা আছে কি? আপনার মূল্যায়ন জানতে চাই।

মাহফুজ আনাম : দেশের যে নারীরা সাংবাদিকতা করছেন তাঁদের আমি সাধুবাদ ও অভিনন্দন জানাই। তাঁরা অনেক প্রতিবন্ধকতার মধ্যে কাজ করছেন। প্রতিবন্ধকতা তো আছেই। সামাজিকভাবে নারীর সুরক্ষা নিয়ে এখনো আলোচনা আছে। তারপরেও নারীরা সাংবাদিকতায় আসছেন এবং ভালো কাজ করছেন। নারী ফটোসাংবাদিকরা অনেক ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও কাজ করছেন। অবশ্যই নারীরা সাহসী, মনোবল দৃঢ় এবং অন্তর থেকে সাংবাদিকতা পেশাকে ভালোবাসেন। আমি আপনাদের অভিবাদন জানাই।

 

প্রশ্ন : বাংলাদেশ প্রতিদিন একযুগে পা রাখছে। এ বিষয়ে আপনার মূল্যায়ন কী?

মাহফুজ আনাম : আপনাদের সাফল্য অসাধারণ। একযুগের মধ্যে বাংলাদেশ প্রতিদিন দেশের সবচেয়ে বেশি প্রচারিত কাগজ। সার্কুলেশনে আপনারা অসাধারণ সাফল্য অর্জন করেছেন। সংবাদের গুণগত মান বজায় রাখার সর্বোচ্চ চেষ্টাও আপনাদের আছে। তবে সর্বাঙ্গীনভাবে বলতে গেলে আমাদের সাংবাদিকতার অগ্রযাত্রা বহু বাকি। আমি বাংলাদেশ প্রতিদিনকে অভিনন্দন জানাই ও সাফল্য কামনা করি। এই পেশা অসাধারণ মূল্যবান সৃজনশীল পেশা। ধন্যবাদ।