শিরোনাম
প্রকাশ : শুক্রবার, ৯ এপ্রিল, ২০২১ ০০:০০ টা
আপলোড : ৮ এপ্রিল, ২০২১ ২২:৩৭

ইতিহাসের নিরিখে বাংলাদেশ

প্রকৌশলী জাহিদ আবছার চৌধুরী

দক্ষিণ এশিয়ার উত্তর-পূর্বে অবস্থিত বাংলাভাষী অঞ্চলের মানচিত্র অসংখ্যবার বদলেছে। বাংলাদেশে বহু ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাজ্যের উদ্ভব, সেসব রাজ্যের ওপর ঘন ঘন বহিরাক্রমণ, বহুবার সীমান্ত পরিবর্তন হওয়ায় বাঙালির কোনো রাজ্যিক বা রাজনৈতিক আনুগত্য বিকাশ লাভ করেনি। সমষ্টি চেতনার বড় অভাব ছিল বাঙালির।

বাঙালি চিন্তাবিদরা ইউরোপীয় মানবতাবাদ, মার্কসবাদ ও ব্যক্তিস্বাধীনতার দর্শন, ইতিহাস ও তার ধারাবাহিকতার বৃত্তান্ত চর্চা করেন, কিন্তু বাঙালির বা বাংলাদেশের স্বাধীন সত্তা ও স্বাধীনতার জন্য তেমন উল্লেখযোগ্য কোনো চিন্তাভাবনা করেননি। প্রফুল্লচন্দ্র রায়, প্রমথ চৌধুরী প্রমুখ স্বল্প কয়েকজন বাঙালির স্বার্থের কথা বললেও বাঙালির স্বাধীনতার কথা তেমন উচ্চকণ্ঠে কেউ বলেননি। তখন রাজনৈতিক চিন্তাভাবনা, যা ইউরোপীয় চিন্তাধারায় অনুপ্রাণিত ও জারিত ছিল সর্বভারতীয় পরিপ্রেক্ষিতে বিবেচনা করা হতো।

নিজেদের ‘বাংলা জাতি’ বলে উল্লেখ করলেও রবীন্দ্রনাথ কখনো কল্পনায়ও স্বতন্ত্র, স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলা জাতি বা রাষ্ট্রের কথা চিন্তা করেননি। দক্ষিণ এশিয়ায় নজরুল ইসলামই প্রথম সাহিত্যিক যিনি দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে স্বাধীনতার কথা বলেন এবং ঔপনিবেশিক শাসকদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের ডাক দেন। ‘জয় বাংলা’ বললেও নজরুলের ‘ভারতলক্ষ্মী’ বা ‘ভারতজননী’র প্রতি আনুগত্য ছিল অম্লান। তার স্বপ্ন ‘ভারত মহাভারত হবে’ এবং যেদিন পীড়িত মানুষের প্রতিকারে প্রাণে সাড়া জাগবে ‘মহামানুষের সেদিন সৃষ্টি হবে’।

প্রমথ চৌধুরী তাঁর ‘বাঙালির পেট্রিয়টিজম’-এ বাঙালির আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার প্রশ্নে উল্লেখ করেন যে ‘ইউরোপের কোনো জাতির সঙ্গে অপর জাতির সে-প্রভেদ নেই, আমাদের এক জাতির সঙ্গে অপর জাতির যে-প্রভেদ রয়েছে।’

১৯২৭ সালে সরাসরি স্বতন্ত্র বাঙালি রাষ্ট্র গঠনের কথা না বলে এয়াকুব আলী চৌধুরী প্রশ্ন করেন, ‘ভৌগোলিক সীমা, ভাষা, আবহাওয়া ও আহার-পরিচ্ছদের বিভিন্নতায় ভিন্ন ভিন্ন রাষ্ট্রমন্ডল গড়িয়া উঠিয়াছে। ...সুতরাং ভিন্ন ভিন্ন জাতি ও রাজ্য গঠনের এই স্বাভাবিক প্রক্রিয়া কি শুধু ভারতবর্ষে বিফল বলিয়া প্রমাণিত হইবে?’ এস ওয়াজেদ আলী তাঁর ‘ভবিষ্যতের বাঙালি’ গ্রন্থে স্বতন্ত্র বা স্বাধীন বাংলার ধারণার সবচেয়ে কাছাকাছি কিছু বক্তব্য দেন।

১৯৪৭ সালের আগেই বঙ্গ প্রদেশের হৃদয় দ্বিখন্ডিত হয়ে যায়। বৃহত্তর বঙ্গের প্রতি বাঙালির তেমন দরদ ও টান ছিল না। বঙ্গ প্রদেশের উল্লেখযোগ্য বুদ্ধিজীবী ও সমাজপতিরা বঙ্গ প্রদেশের বিভক্তির জন্য ব্রিটেনের সেক্রেটারি অব স্টেটের কাছে তারবার্তা পাঠিয়েছিলেন। বাংলার স্বাধীনতার কথা কেউ আগে উচ্চারণ করেননি। বাংলা ভাষায় স্বাধীনতার কথা লেখা হলেও সে স্বাধীনতা বাংলার স্বাধীনতা নয়। ১৯৪৭ সালের আগে মুসলমান বা হিন্দু যাঁরাই স্বাধীনতার কথা বলেছেন তাঁরা নিখিল ভারতের পরিপ্রেক্ষিতে তা বলেছেন। ইতিহাস পর্যালোচনা করে আমাদের দৃঢ়বিশ্বাস, এ বিষয়টি বঙ্গবন্ধুকে দারুণভাবে পীড়া দিয়েছিল। তাই তিনি স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের।

১১ আগস্ট, ১৯৪৭। দ্বিজাতিতত্ত্বের জনক জিন্নাহ বললেন, ‘পাকিস্তানকে একটা জাতি হতে হবে। রাজনৈতিক দিক থেকে হিন্দু আর হিন্দু থাকবে না, মুসলমান আর মুসলমান থাকবে না, সকলে মিলে হবে এক রাষ্ট্রের সাধারণ নাগরিক।’ রাষ্ট্রনায়কের মতো কথা। রাষ্ট্রীয় প্রয়োজনে দ্বিজাতিতত্ত্বের ইমারত পাকিস্তানের জন্মের আগেই পরিবর্তিত হয়ে গেল। জাতিসংঘ, কমনওয়েলথ ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থার সদস্য হিসেবে জোর গলায় পাকিস্তানের পক্ষে বলা অসম্ভব ছিল যে পাকিস্তান রাষ্টের মধ্যে হিন্দু ও মুসলমান দুই জাতি স্বতন্ত্রভাবে বিরাজমান।

২৫ আগস্ট, ১৯৫৫। পাকিস্তান গণপরিষদে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও পূর্ব বাংলার বেশির ভাগ নেতা ‘পূর্ব বাংলা’ নামের বিলুপ্তির বিরোধিতা করলেও মুসলিম লীগ ও নেজামে ইসলামপন্থিরা ‘পূর্ব পাকিস্তান’ নামের বিরোধিতাকে পাকিস্তান আদর্শ বর্জনের সমতুল্য বিবেচনা করে তুমুল হইচই করেন।

৫ ফেব্রুয়ারি, ১৯৬৬। লাহোরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছয় দফা দাবি উত্থাপন করেন।

১২ ফেব্রুয়ারি, ১৯৬৬। সংবাদপত্রে এ শাসনতান্ত্রিক প্রস্তাব প্রকাশিত হয়। পূর্ব পাকিস্তানের আইন ও পার্লামেন্টারি দফতরের মন্ত্রী আবদুল হাই চৌধুরী ছয় দফাকে ‘দেশদ্রোহিতার নামান্তর’ অভিহিত করেন।

১০ মাার্চ, ১৯৬৬। প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান হুমকি দিয়ে বলেন, ‘ছয় দফার ব্যাপারে আওয়ামী লীগ চাপাচাপি করলে অস্ত্রের ভাষায় জবাব দেওয়া হবে এবং দেশে গৃহযুদ্ধ বেধে যাবে।’

‘স্বাধীন পূর্ব বাংলা কি স্বাধীন থাকতে পারবে?’ - এমন সংশয় মনে থাকলেও স্বাধীনতাকামী বুদ্ধিজীবীদের চিন্তাধারা ক্রমে দেশে দ্রুত ব্যাপ্তি লাভ করে। বিদেশে লন্ডনে ইস্ট পাকিস্তান হাউসে স্বাধীনতার কথা প্রকাশ্যে আলোচিত হতো। সামরিক বাহিনীতে কয়েকজন বাঙালি কর্মকর্তাও পাকিস্তাননামীয় বিষবৃত্ত থেকে পরিত্রাণের পথ খুঁজছিলেন।

বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের স্বাধীনতা চান, কারণ বাংলাদেশ ছাড়া অন্য কোনো বিকল্প রাজনৈতিক কাঠামোয় বাঙালির মঙ্গল নেই। তাই তিনি সমগ্র দেশের মানুষকে দিতে চান স্বাধীনতার স্বাদ। সমগ্র দেশ চষে বেড়িয়ে তিনি মানুষকে প্রস্তুত করতে থাকলেন স্বাধীনতা সংগ্রামের জন্য।

১৯৭০-এর সাধারণ নির্বাচনে পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ তাদের স্বায়ত্তশাসনের জন্য আওয়ামী লীগকে ভোট দিলে আবার ষড়যন্ত্র শুরু হয়। ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঘোষণা করলেন, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ মূলত সেদিনই শুরু হয় স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার চূড়ান্ত অধ্যায়। বঙ্গবন্ধুর ডাকে শুরু হয় অসহযোগ আন্দোলন। চলে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি।

২৫ মার্চ পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যার পরিপ্রেক্ষিতে ২৬ মার্চ, ১৯৭১ প্রথম প্রহরে মহান নেতা ও বাংলাদেশের সর্বাধিনায়ক জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। শুরু হয় সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ। মুক্তিযুদ্ধ তীব্র থেকে তীব্রতর হয়। বীর মুক্তিযোদ্ধারা ১৬ ডিসেম্বর বিজয় ছিনিয়ে আনেন। জাতি পায় স্বাধীন রাষ্ট্র, নিজস্ব পতাকা ও জাতীয় সংগীত। বাঙালি জাতির এ বীরত্ব ও দেশাত্মবোধ বিশ্বে নতুন ইতিহাস সৃষ্টি করে।

লেখক : গবেষক ও প্রকৌশলী সংগঠক। 


আপনার মন্তব্য