শিরোনাম
প্রকাশ : শনিবার, ১৭ এপ্রিল, ২০২১ ০০:০০ টা
আপলোড : ১৬ এপ্রিল, ২০২১ ২৩:২০

শেখ হাসিনার সরকারে মোশতাকের অপচ্ছায়া

সৈয়দ বোরহান কবীর

শেখ হাসিনার সরকারে মোশতাকের অপচ্ছায়া

১৭ এপ্রিল, ১৯৭১। কুষ্টিয়ার মেহেরপুরের সীমান্তবর্তী গ্রাম বৈদ্যনাথতলা। এখানেই শপথ নেয় বাংলাদেশের প্রথম সরকার। জাতির পিতার নাম অনুসরণ করে এ স্থানটির নতুন নামকরণ হয় ‘মুজিবনগর’। এর আগে ১০ এপ্রিল গৃহীত হয় স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র। ১১ এপ্রিল জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ মন্ত্রিসভা ঘোষণা করেন। বাংলাদেশের প্রথম সরকারের শপথ অনুষ্ঠানের ৫০ বছর পূর্তি হলো। প্রথম সরকারে রাষ্ট্রপতি ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম। প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ। মন্ত্রিসভায় ছিলেন তিনজন। খন্দকার মোশতাক আহমদ পররাষ্ট্র, আইন ও সংসদবিষয়ক। এম মনসুর আলী অর্থ, বাণিজ্য, শিল্প। এ এইচ এম কামারুজ্জামান স্বরাষ্ট্র, ত্রাণ ও পুনর্বাসন, কৃষি ও খাদ্য। এ সরকারের নেতৃত্বে এ দেশের জনগণ মুক্তিযুদ্ধ করে। এক বীরত্বপূর্ণ সংগ্রামের মাধ্যমে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে। ’৭৫-এর ১৫ আগস্ট বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। জাতির পিতাকে হত্যার ধারাবাহিকতায় ’৭৫-এর ৩ নভেম্বর জেলখানায় নির্মমভাবে হত্যা করা হয় জাতীয় চার নেতাকে। অর্থাৎ মুজিবনগর সরকার বা প্রথম বাংলাদেশ সরকারের ছয়জন সদস্যের মধ্যে পাঁচজনই ’৭১-এর পরাজিত শক্তির কাছে নির্মমভাবে জীবন দিয়েছিলেন। শুধু একজন ছাড়া।

খন্দকার মোশতাক আহমদ। ’৭৫-এর খুনি, ষড়যন্ত্রকারী। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বিশ্বাসঘাতকতার প্রতীক নাম মোশতাক। ষড়যন্ত্রকারীর নাম মোশতাক। বাংলাদেশ যত দিন থাকবে তত দিন খন্দকার মোশতাকের নাম উচ্চারিত হবে ঘৃণাভরে। তাই রাজনীতিতে যখন কেউ বিশ্বাস ভঙ্গ করে, দুরভিসন্ধি করে, বিশ্বাসঘাতকতা করে তখন তাকে মোশতাকের সঙ্গে তুলনা করা হয়। ’৭৫-পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিভিন্ন সময়ে বারবার ‘মোশতাক’ নামটি এসেছে। বিশ্বাসঘাতক হিসেবে, প্রতারক হিসেবে। মোশতাক কিন্তু ষড়যন্ত্র শুরু করেছিল প্রথম দিনই। ১৭ এপ্রিল শপথ গ্রহণের পর থেকেই মোশতাক পাকিস্তান এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে গোপন যোগাযোগ রেখেছিল। বাংলাদেশকে পাকিস্তানের কনফেডারেশন বানাতে চেয়েছিল। সে সময় কর্মঠ, মেধাবী তাজউদ্দীন আহমদের জন্যই মোশতাকের ষড়যন্ত্র সফল হয়নি। কিন্তু স্বাধীনতার পর খোলস পাল্টায় মোশতাক। চাটুকারিতা, তোষামোদ আর মিথ্যাচার করে বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ হয়। উল্টো তাজউদ্দীন আহমদের সঙ্গেই বঙ্গবন্ধুর দূরত্ব তৈরি করে। তাজউদ্দীন আহমদই ছিটকে পড়েন বঙ্গবন্ধুর কাছ থেকে। ’৭১ থেকে ’৭৫ পর্যন্ত মোশতাক যে কাজগুলো করেছে তার বৈশিষ্ট্যগুলো মোটা দাগে হলো- ধূর্তামি, মিথ্যাবাদী, চাটুকার, সুযোগসন্ধানী, তোষামোদকারী, সত্য আড়াল করে ভুল তথ্য দেওয়া, গোপনে ষড়যন্ত্র এবং গ্রুপিং করা। মোশতাকরা এখনো একা থাকে না। একটু লক্ষ্য করলে দেখা যায় প্রথম বাংলাদেশ সরকারে মোশতাক ছিল পররাষ্ট্রমন্ত্রী, আরেক খুনি মাহবুবুল আলম চাষী ছিল পররাষ্ট্র সচিব। আবার মোশতাকের একান্ত সচিব ছিল কামাল সিদ্দিকী। অর্থাৎ ষড়যন্ত্রকারীরা শুরু থেকেই সংঘবদ্ধ থাকে। ঐক্যবদ্ধ হয়েই তারা ষড়যন্ত্রের জাল বিছায়। ’৭৫-পরবর্তী রাজনীতিতে তাই অতিভক্তি, চাটুকার, তোষামোদকারী দেখলেই ভয় হয়। মোশতাকের অপচ্ছায়ার আতঙ্ক পেয়ে বসে। এ যেন ঘর পোড়া গরু সিঁদুরে মেঘ দেখলেই ভয় পায়।

আজ যখন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের প্রথম সরকারের শপথের সুবর্ণজয়ন্তী তখন খুনি মোশতাক আমাদের আবার ইতিহাসের মুখোমুখি করে। মোশতাক যা করত এখন কি তেমন স্বভাবের লোক নেই ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগে? নির্মোহভাবে এ প্রশ্নের উত্তর খোঁজাটা জরুরি। মোশতাক ছিল চাটুকার, তোষামোদকারী। এখন সরকারের দিকে একটু ভালো করে তাকালে দেখা যায় চাটুকার, তোষামোদকারীতে ভরে গেছে। এরা কাজ করে কম, তোষামোদ করে বেশি। খুনি মোশতাক তোষামোদী করত কিন্তু বঙ্গবন্ধুর নির্দেশ মানত না। বঙ্গবন্ধুর নির্দেশনা আর অনুশাসনের বিরুদ্ধে কাজ করত। ’৭৫-পরবর্তী গবেষণায় দেখা গেছে বঙ্গবন্ধু যেসব নির্দেশনা দিয়েছিলেন সেগুলো বাস্তবায়নের কোনো উদ্যোগই নেয়নি মোশতাক গংরা। উদ্দেশ্যটা খুব সহজ। বঙ্গবন্ধু সরকারের সঙ্গে জনগণের দূরত্ব তৈরি। জনগণকে বঙ্গবন্ধু সরকারের বিরুদ্ধে খেপিয়ে তোলা। একটু থেমে আমরা যদি বর্তমান সময়ের পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করি তাহলে পরিস্থিতির অনেক মিল দেখতে পাই।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে টানা এক যুগের বেশি আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায়। বেশি দূরে যাওয়ার দরকার নেই। এক বছর আগে আমরা একটু ফিরে যেতে চাই। গত বছরের ৮ মার্চ বাংলাদেশে প্রথম করোনা সংক্রমণ ধরা পড়ে। ২৫ মার্চ থেকে সরকার সাধারণ ছুটি ঘোষণা করে। একদিকে করোনা মোকাবিলা অন্যদিকে অর্থনীতিকে সামাল দেওয়া। অসাধারণ দক্ষতায় প্রধানমন্ত্রী একাই হাল ধরেন। দেশের সব জেলার সঙ্গে যুক্ত হয়ে তিনি কর্মপন্থা দেন, নির্দেশনা দেন। ১ থেকে ২৭ এপ্রিল পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে বৈঠক করেন দেশের ৬৪ জেলার প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি এবং সর্বস্তরের মানুষের সঙ্গে। এসব বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী মোট ৭৪টি নির্দেশনা ও অনুশাসন দিয়েছিলেন। প্রধানমন্ত্রীর কয়টা অনুশাসন মেনেছে এ সরকার? যারা প্রধানমন্ত্রীকে ঘিরে আছেন তারা এসব নির্দেশনা বাস্তবায়নে কী উদ্যোগ নিয়েছেন? আসুন একটু দেখে নেওয়া যাক। ১ এপ্রিল, ২০২০ সালে প্রধানমন্ত্রী মোট ৩১ দফা নির্দেশনা দিয়েছিলেন। সব এখানে উল্লেখ করতে চাই না, শুধু প্রাসঙ্গিক ও গুরুত্বপূর্ণগুলো তুলে ধরছি। প্রধানমন্ত্রীর ৭ নম্বর অনুশাসন ছিল ‘নদীবেষ্টিত জেলাসমূহে নৌ-অ্যাম্বুলেন্সের ব্যবস্থা করতে হবে।’ হয়েছে? না। ৯ নম্বর নির্দেশনা ছিল ‘সারা দেশে পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত আরও জোরদার করতে হবে।’ সারা দেশের কথা বাদ দিলাম। ঢাকার পরিচ্ছন্নতার জন্য দুই সিটি করপোরেশন কী করল? ১১ নম্বর নির্দেশনা ছিল দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। ১৬ এপ্রিলে প্রধানমন্ত্রী ১০ দফা অনুশাসন জারি করেছিলেন। এর মধ্যে ৬ নম্বর অনুশাসনটি ছিল এ রকম- ‘সদ্য অবসরপ্রাপ্ত ডাক্তার ও নার্সদের তালিকা করে তাদের রিজার্ভ হিসেবে রাখার ব্যবস্থা করতে হবে।’ ২০ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রী আরও ১৩ দফা নির্দেশনা দিয়েছিলেন। এর মধ্যে ৭ নম্বর নির্দেশনায় প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, ‘গাজীপুর বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন নেছা মুজিব হাসপাতালটি কভিড হাসপাতাল হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে।’ ২৭ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রীর ৮ নম্বর অনুশাসন ছিল ‘প্রতিটি জেলায় আইসিইউর ব্যবস্থা করতে হবে।’ আমি শুধু পাঠকদের স্মৃতি ধুলো সরিয়ে দেওয়ার জন্য মাত্র কয়েকটি অনুশাসনের কথা উল্লেখ করলাম। এ অনুশাসনগুলো প্রতিপালিত হলে আজকে করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ে এ রকম জগাখিচুড়ি পরিস্থিতি তৈরি হতো না। সরকারে যারা প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অমান্য করেছেন, এ নির্দেশগুলো ফাইলবন্দী করে রেখেছেন, তাদের মধ্যে মোশতাকের অপচ্ছায়া রয়েছে। এরা করোনা মোকাবিলায় তথাকথিত সাফল্যের ডুগডুগি বাজিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীকে খুশি করতে নানারকম বিজ্ঞাপন আর কথার ফুলঝুরি ছড়িয়েছেন। কিন্তু যে কাজ করলে প্রধানমন্ত্রীর ওপর জনগণের আস্থা বাড়ত সেই কাজের কাজটি করেননি। এটা কি অযোগ্যতা না স্যাবোটাজ? শুধু আপৎকালীন নির্দেশনা নয়, প্রধানমন্ত্রীর অনেক নির্দেশনাই প্রতিপালিত হয় না। ২০১৮-এর নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ইশতেহারের শিরোনাম ছিল ‘সমৃদ্ধির অগ্রযাত্রায় বাংলাদেশ’। নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পর সব মন্ত্রণালয়ে ওই ইশতেহার পাঠানো হয়েছিল। বলা হয়েছিল, মন্ত্রণালয়ের কাজ নির্বাচনী ইশতেহারের সঙ্গে সমন্বয় করে করতে হবে। কিন্তু কয়টা মন্ত্রণালয় ওই নির্বাচনী ইশতেহার অনুসরণ করে কাজ করছে। কজন মন্ত্রী, সচিব ওই নির্বাচনী ইশতেহারে তার মন্ত্রণালয়ের কী লক্ষ্য নির্ধারিত আছে বলতে পারবেন?

মোশতাকের দ্বিতীয় বৈশিষ্ট্য ছিল আদর্শিক। মোশতাক বাঙালি জাতীয়তাবাদে বিশ্বাস করত না। সাম্প্রদায়িক অপশক্তির সঙ্গে প্রকাশ্যে-গোপনে সম্পর্ক রাখত। আওয়ামী লীগের আদর্শিক চিন্তার এক বিপরীত অবস্থান ছিল মোশতাকের। আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের মধ্যে এ নিয়ে ক্ষোভ ছিল, শঙ্কা ছিল। কিন্তু চাটুকারিতা দিয়ে মোশতাক একটা দেয়ালে এসব ক্ষোভকে আড়াল করেছিল। এখন আমরা একটু বর্তমান পরিস্থিতিটা মূল্যায়ন করি। ২০১৩ সাল থেকে হেফাজতের সঙ্গে সরকারের গোপন প্রেমের খেলায় মেতে উঠেছিল কারা? ২০১৩-এর ৫ মের তাণ্ডবের পরও হেফাজতের বিরুদ্ধে সরকারকে ব্যবস্থা নিতে দেয়নি কারা? কারা হেফাজতকে ‘ফ্রাঙ্কেনস্টাইনের দানব’ বানাল? ২৬ ও ২৭ মার্চ বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর সময় হেফাজতের তাণ্ডবের পরও আওয়ামী লীগের বেশির ভাগ নেতা ও মন্ত্রী নীরব কেন? প্রধানমন্ত্রী যখন সংসদে হেফাজতের বিরুদ্ধে কঠোর উচ্চারণ করলেন, তারপর আওয়ামী লীগ সরকারের দু-এক জন মন্ত্রী ছাড়া সবাই নীরব কেন? তারা হেফাজতকে ভয় পান, নাকি হেফাজতে বিশ্বাস করেন? গত এক যুগে স্যুট-টাই পরা ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের যারা ‘আলাদিনের চেরাগ’ পাওয়ার মতো মন্ত্রী হয়েছেন তারা কি টেকনোক্র্যাট মন্ত্রী? তা না হলে প্রায় সব রাজনৈতিক বিষয় এমনকি হেফাজতের বিষয় তারা এড়িয়ে যান কেন? যারা জাদুমন্ত্রবলে হঠাৎ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতা হয়েছেন, প্রেসিডিয়াম সদস্য হয়েছেন তারা হেফাজত ইস্যুতে কিছু বলতে ইতস্তত করেন! তাদের মধ্যেই মোশতাকের প্রেতাত্মা ভর করছে কিনা খোঁজ নেওয়া দরকার। কারণ এদের কারণেই আওয়ামী লীগের আদর্শ, মৌল চিন্তা-চেতনা প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে। যেমনটি হয়েছিল ’৭৫-পূর্ববর্তী সময়ে, খুনি মোশতাকের কারণে।

মোশতাকীয় চরিত্রের আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো ষড়যন্ত্র করে সত্যিকারের ত্যাগী, পরীক্ষিত মানুষদের ক্ষমতা কেন্দ্র থেকে সরিয়ে দেওয়া। চাটুকারিতা দিয়ে এরা ক্ষমতা কেন্দ্রের চারপাশে একটি ইন্দ্রজাল তৈরি করে। এর ফলে যারা সত্যিকথা বলে, বস্তুনিষ্ঠ সমালোচনাগুলো উপস্থাপন করে, সৎ পরামর্শ দেয় তারা অপ্রিয় ও অনাহূত হয়ে ওঠে। ক্ষমতা কেন্দ্রে এরা ‘বিরক্তিকর’ মানুষে পরিণত হয়। চারপাশে যখন কেবল প্রশংসা এবং স্তুতির আবেশ তখন শঙ্কা আর সমালোচনার কাঁটা কে সইতে চায়? খুনি মোশতাকের চাটুকারিতা কী বীভৎস পর্যায়ের ছিল যে ’৭৫-এ নারকীয় ঘটনার পরও আওয়ামী লীগের অনেকে বিশ্বাস করতে পারেননি মোশতাক এই জঘন্যতম ষড়যন্ত্রের অন্যতম হোতা। এখন যদি আমরা আওয়ামী লীগ সরকারের সাম্প্রতিক সময়টা বিশ্লেষণ করি তাহলে বিষয়টি পরিষ্কার হবে। ’৭৫-পরবর্তী আওয়ামী লীগের রাজনীতির সবচেয়ে কঠিন সময় তিনটি। প্রথমটি ২০০১ সালের অক্টোবর নির্বাচন- পরবর্তী সময়। যখন আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের ঘরে ঢুকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছিল। আওয়ামী লীগের সমর্থক এ অপরাধে ধর্ষিত হয়েছিলেন বহু নারী। বহু মানুষকে এক নিমেষেই উদ্বাস্তু করা হয়েছিল। সে সময় দলের জন্য যারা অসহনীয় নির্যাতন ভোগ করেছিলেন। আওয়ামী লীগ সভানেত্রীর নেতৃত্বে দলকে নতুন করে সংগঠিত করার জন্য এক কঠিন সংগ্রাম করেছিলেন। তাদের মধ্যে যাদের পদস্খলন হয়নি, যারা বিভ্রান্তির চোরাবালিতে আটকে যাননি তাদের কজন এখন সরকারের ক্ষমতা কেন্দ্রে আছেন?

আওয়ামী লীগের দ্বিতীয় কঠিন সময় ছিল ২০০৪-এর ২১ আগস্ট। ওই গ্রেনেড হামলার সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য ছিল আওয়ামী লীগ সভানেত্রীকে হত্যা করা। ওই সময় যারা জীবন দিয়েছিলেন তারা তো নতুন আওয়ামী লীগের স্মরণে নেই। আর যারা পঙ্গুত্বকে আলিঙ্গন করেছিলেন তাদের কজন সরকারের চারপাশে আছেন?

তৃতীয়টি, ২০০৭ সালের ওয়ান-ইলেভেন। যে সময় সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিরাজনীতিকরণ-তত্ত্ব বাস্তবায়নের জন্য আওয়ামী লীগ সভানেত্রীকে রাজনীতি থেকে মাইনাস করতে চেয়েছিল। গ্রেফতার করেছিল শেখ হাসিনাকে। সেই কঠিন সময়ে বিভক্ত আওয়ামী লীগে যারা হাল ধরেছিলেন, আওয়ামী লীগ সভানেত্রীর পক্ষে যারা নির্ভীক, সাহসী অবস্থান নিয়েছিলেন তারা কজন আছেন সরকারের কাছাকাছি?

দুঃসময়ের মানুষদের সরকারের কেন্দ্র থেকে শেখ হাসিনার দৃষ্টিসীমার মধ্য থেকে সরিয়ে দেওয়ার নিপুণ ষড়যন্ত্র সফল হয়েছে। নিজেরা ক্ষমতাবান হতে যারা এ কাজটি করেছেন তারাই একালের মোশতাক। দুঃসময়ের মানুষরা যখন সুসময়ে দূরে সরে যায় তখন ভাবতে হয়। কঠিন সময়ের যোদ্ধারা যখন অনাদরে, অনাহূত হয় তখন চিন্তা হয়। প্রতিকূল সময়ের সহযাত্রীরা সুসময়ে যখন অচেনা হয় তখন শঙ্কা হয়। পরীক্ষিত, ত্যাগী, দুঃসময়ের বন্ধুরা যখন দূরে চলে যায় তখনই ভিড় করে মোশতাকরা। সর্বনাশের সুযোগ খোঁজে। এরা পরিস্থিতির বাস্তবতা আড়াল করে। জনগণের ভাবনাগুলোকে ফুৎকারে উড়িয়ে দেয়। এরাই মোশতাক। এরা আর যাই হোক এ সরকারের শুভাকাক্সক্ষী হতে পারে না। এদের লক্ষ্য দুটি। প্রথমত তোষামোদ এবং চাটুকারিতা দিয়ে এরা নিজেদের আখের গোছাতে চায়। দ্বিতীয়ত খুনি মোশতাকের মতো এরা ষড়যন্ত্রের জাল বিস্তার করতে চায়।

বাংলাদেশের প্রথম সরকারের শপথের সুবর্ণজয়ন্তীর মহাক্ষণে আওয়ামী লীগই ক্ষমতায়। প্রথম সরকারের যেমন মোশতাক চক্র ছিল, এখন কি নেই?

একটি সরকারের সাফল্য-ব্যর্থতা দুটোই থাকবে। এ সরকারেরও আছে। ব্যর্থতাগুলো চিহ্নিত করে সামনে এগিয়ে যাওয়াই একটি গণতান্ত্রিক সরকারের প্রধান কাজ। যেমনটি বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন ২৬ মার্চ, ১৯৭৫ সালে। বঙ্গভবনে অনুষ্ঠিত বাকশালের কেন্দ্রীয় কমিটির প্রথম বৈঠকে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘আমি ভুল নিশ্চয়ই করব, আমি ফেরেশতা নই, শয়তানও নই। আমি মানুষ, আমি ভুল করবই। আমি ভুল করলে আমার মনে থাকতে হবে, আই ক্যান রেকটিফাই মাই সেলফ। আমি যদি রেকটিফাই করতে পারি, সেখানেই আমার বাহাদুরি।’ (সূত্র : শেখ মুজিব : বাংলাদেশের আরেক নাম, পৃষ্ঠা ২৭১)। কিন্তু এখন চাটুকার আর তোষামোদকারীরা দেশে এমন এক পরিস্থিতি তৈরি করেছে যা বঙ্গবন্ধুর এ চিন্তার বিপরীত। সরকারের মন্ত্রী এবং আমলারা এমন এক প্রচারণার আবহ তৈরি করেছেন যে, সরকারের কোনো ভুল নেই, ব্যর্থতা নেই, অপূর্ণতা নেই। সাফল্যের স্তুতিতে গোটা দেশ ধোঁয়াচ্ছন্ন। সরকারের সমালোচনা এখন ‘শাস্তিযোগ্য অপরাধ’! সব ঠিক আছে। ভুল বলে কিছু নেই, এটাই হলো মোশতাক সংস্কৃতি। চাটুকার সংস্কৃতি। এ সংস্কৃতি যখন ভর করে তখন সরকার শুধু সাফল্যের বুদবুদে ভাসে। সত্য শুনতে ভালো লাগে না। এ সময় জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় সরকার, তখনই মোশতাকরা আসল চেহারা প্রকাশ করে। প্রথম সরকারের শপথের সুবর্ণজয়ন্তীতে শেখ হাসিনার সরকারকে মোশতাকের অপচ্ছায়ামুক্ত করতে হবে। শেখ হাসিনার জন্য, এ দেশের জন্য এটা খুব জরুরি।

 

লেখক : নির্বাহী পরিচালক, পরিপ্রেক্ষিত।

[email protected]