শিরোনাম
প্রকাশ : শুক্রবার, ৩০ এপ্রিল, ২০২১ ০০:০০ টা
আপলোড : ২৯ এপ্রিল, ২০২১ ২৩:০৫

আইনগত সহায়তা প্রদান

ড. মো. রেজাউল করিম

আইনগত সহায়তা প্রদান

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মুক্তিযুদ্ধের চেতনার আলোকে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের  সংবিধানের প্রস্তাবনাতেই সব নাগরিকের জন্য আইনের শাসন, মৌলিক মানবাধিকার এবং রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সাম্য, স্বাধীনতা ও সুবিচার নিশ্চিত করার কথা সন্নিবেশ করে দেন। তিনি বিচার প্রক্রিয়ায় ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে সবাইকে আইনজীবীর সঙ্গে পরামর্শ করার বিধান সন্নিবেশিত করে দেন। এসব নীতি ও বিধান অন্তর্ভুক্তির মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের সংবিধানে ধনী বা আর্থিক সামর্থ্যবান নাগরিকদের পাশাপাশি দরিদ্র, অসহায় ও সুবিধাবঞ্চিত নাগরিকদের ন্যায়বিচারে প্রবেশাধিকার নিশ্চিত হলেও স্বাধীনতার পর প্রায় তিন দশকেও দরিদ্র, অসহায় ও সুবিধাবঞ্চিত নাগরিকদের ন্যায়বিচারে প্রবেশাধিকারে আইনগত সহায়তা প্রদানের প্রাতিষ্ঠানিক কোনো কাঠামো চালু হতে দেখা যায়নি। ধন্যবাদ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে। তিনি আর্থিকভাবে অসচ্ছল, সহায়সম্বলহীন ও নানাবিধ আর্থসামাজিক কারণে বিচার পেতে অসমর্থ বিচারপ্রার্থী জনগণকে সরকারি খরচে আইনগত সহায়তা প্রদানে জন্য ২০০০ সালে ‘আইনগত সহায়তা প্রদান আইন’ প্রণয়ন করে দেন। একই সঙ্গে সরকারি আইনি সহায়তা কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ‘জাতীয় আইনগত সহায়তা প্রদান সংস্থা’ নামে একটি সংবিধিবদ্ধ সংস্থা প্রতিষ্ঠা করেন। কিন্তু ২০০১ সালের নির্বাচনে সরকার পরিবর্তনের পর থেকে ২০০৮ পর্যন্ত প্রায় সাড়ে সাত বছর এ আইনের বাস্তবায়ন কার্যক্রম স্তিমিত থাকে। এরপর ২০০৯ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দ্বিতীয়বার সরকার গঠন করলে আইনি সহায়তা কার্যক্রমকে গতিশীল ও সেবাবান্ধব করার লক্ষ্যে ঢাকায় জাতীয় আইনগত সহায়তা প্রদান সংস্থার প্রধান কার্যালয় স্থাপন করা হয় এবং এর অধীনে প্রতি জেলায় লিগ্যাল এইড অফিস স্থাপনসহ বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট, চৌকি আদালত ও শ্রম আদালতে লিগ্যাল এইডের কার্যক্রম চালু করা হয়। জেলা লিগ্যাল এইড অফিসসমূহে একজন করে সিনিয়র সহকারী জজ/সহকারী জজকে লিগ্যাল এইড অফিসার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। আইনি সহায়তা কার্যক্রম গতিশীল ও দরিদ্রবান্ধব করার লক্ষ্যে জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে লিগ্যাল এইড কমিটি গঠন করা হয়। সরকারি আইনি সেবা প্রদান আরও বিস্তৃত ও সহজ করার লক্ষ্যে ২০১৬ সালে টোল ফ্রি জাতীয় হেল্পলাইন ১৬৪৩০ চালু করা হয়। মোবাইল ফোনের মাধ্যমে আইনি সেবা প্রদানের লক্ষ্যে ২০১৮ সালে বিডি লিগ্যাল এইড অ্যাপ চালু করা হয়। মামলাজট কমানোর লক্ষ্যে বর্তমানে জেলা লিগ্যাল এইড অফিসগুলোকে ‘এডিআর কর্নার’ বা ‘বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির কেন্দ্রস্থল’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। এজন্য ২০১৫ সালে ‘আইনি পরামর্শ ও বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি’ বিধিমালা প্রণয়ন করে লিগ্যাল এইড অফিসারদের এডিআর বা বিকল্প পদ্ধতিতে বিরোধ নিষ্পত্তির আইনি ক্ষমতা প্রদান করা হয়। এ ক্ষমতা আরও কার্যকর ও ফলপ্রসূ করার লক্ষ্যে ২০১৭ সালে দেওয়ানি কার্যবিধির সংশ্লিষ্ট ধারা সংশোধন করা হয়। এডিআর কার্যক্রম গতিশীল করতে জেলা লিগ্যাল এইড অফিসসমূহে নতুন করে ৯৬টি সহায়ক কর্মচারীর পদ সৃজন করা হয়েছে। সরকারি-বেসরকারি সংস্থার যৌথ উদ্যোগে সরকারি আইনি সেবার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারী, প্যানেল আইনজীবী ও অন্যদের জন্য নিয়মিত বিভিন্ন প্রশিক্ষণ, সেমিনার ও কর্মশালার আয়োজন করা হচ্ছে। সরকারি আইনি সেবার যাবতীয় তথ্য ও কার্যক্রম ডিজিটাল ডাটাবেজের মাধ্যমে সম্পন্ন করার লক্ষ্যে ২০১৮ সালে ‘লিগ্যাল এইড অফিস ম্যানেজমেন্ট সফটওয়্যার’ নির্মাণ করা হয়েছে। এ সফটওয়্যারে কাজের সুবিধার্থে প্রতিটি জেলা লিগ্যাল এইড অফিসে একটি করে ল্যাপটপ, প্রিন্টার, স্ক্যানার, ওয়েবক্যাম, প্রজেক্টর, কম্পিউটার টেবিল ও হটলাইন হিসেবে ব্যবহারের জন্য সিমকার্ডসহ একটি অত্যাধুনিক মোবাইল ফোন বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। সফটওয়্যারটি ব্যবহারে দক্ষতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে ১১৮ জন কর্মকর্তা/ কর্মকারীকে প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়েছে। ২০১৮ সালে সংস্থার প্রধান কার্যালয়সহ ৬৪ জেলা লিগ্যাল এইড অফিস, সুপ্রিম কোর্ট লিগ্যাল এইড অফিস এবং ঢাকা ও চট্টগ্রামে স্থাপিত দুটি শ্রমিক আইন সহায়তা সেলে বিটিসিএলের মাধ্যমে উচ্চগতিসম্পন্ন ইন্টারনেট সংযোগ প্রদান করা হয়েছে। সংস্থার সব অফিসের জন্য অফিশিয়াল ইমেইল তৈরি করা হয়েছে। সেরা লিগ্যাল এইড অফিস, সেরা প্যানেল আইনজীবী ও সেরা বেসরকারি সংস্থাকে উৎসাহ/প্রণোদনা হিসেবে পুরস্কার প্রদানের উদ্যোগ করা হয়েছে।

দেশের জনসাধারণের আইনি অধিকার নিশ্চিত করার সঙ্গে সঙ্গে দরিদ্র, অসহায় ও সুবিধাবঞ্চিত নাগরিককে সরকারি আইনি সহায়তা কার্যক্রম সম্পর্কে সচেতন করে তোলার লক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে ২০১৩ সালের ২৯ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে সরকার ‘আইনগত সহায়তা প্রদান আইন, ২০০০’ কার্যকরের তারিখ অর্থাৎ ২৮ এপ্রিলকে ‘জাতীয় আইনগত সহায়তা দিবস’ ঘোষণা করে। এর পর থেকে প্রতি বছর ২৮ এপ্রিল জাতীয়ভাবে আইনগত সহায়তা দিবস উদ্যাপন করা হচ্ছে। মূলত ছয়টি উদ্দেশ্যে জাতীয় আইনগত সহায়তা দিবস উদ্যাপন করা হয়, যথা- ১. সরকারি আইনি সেবা সম্পর্কে জনগণকে সচেতন করা ২. দরিদ্র ও অসহায় জনগণের ন্যায়বিচারে সহজ প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা ৩. জনগণকে আইনগত অধিকার বিষয়ে সচেতন করা ৪. সরকারি আইন সহায়তা কার্যক্রম আরও কার্যকর, বিস্তৃত ও শক্তিশালী করা ৫. সরকারি ও বেসরকারি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার (এনজিও) যৌথ উদ্যোগের মাধ্যমে আইনি সহায়তা কার্যক্রম আরও গতিশীল ও কার্যকর করা এবং ৬. লিগ্যাল এইড অফিসারের মধ্যস্থতায় গতানুগতিক আইনি প্রক্রিয়ার আনুষ্ঠানিকতা ও দীর্ঘসূত্রতা থেকে উত্তরণের লক্ষ্যে বিকল্প উপায়ে বিরোধীয় পক্ষগণের মধ্যকার বিরোধ বা মামলা বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির মাধ্যমে সম্পন্ন করে লিগ্যাল এইড অফিসকে ‘এডিআর কর্নার’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা এবং তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত সরকারি আইনি সেবার প্রচার ও প্রসার ঘটানো।

এ উদ্দেশ্যগুলো সামনে রেখে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে প্রতি বছর ২৮ এপ্রিল জাতীয় আইনগত সহায়তা দিবস উদ্যাপন করা হয়।

লেখক : গবেষক।