শিরোনাম
প্রকাশ : শুক্রবার, ২১ মে, ২০২১ ০০:০০ টা
আপলোড : ২০ মে, ২০২১ ২৩:০৯

কাল্পনিক ভাবনাগুলোই গবেষণার শক্তি

অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান চৌধুরী

কাল্পনিক ভাবনাগুলোই গবেষণার শক্তি
Google News

মানুষ যখন তার চিন্তার বাইরে গিয়ে খুব অদ্ভুত অথচ বিস্ময়কর চিন্তা করতে পারে ঠিক তখন গবেষণা তার যাত্রা করে। সে যাত্রার মূলশক্তিটা সেই মানুষগুলোর হাতে থাকে যাদের মধ্যে গবেষণা করার একটা হার না মানা মনোভাব থাকে। গবেষক হতে হলে আগে ভালো মানুষ হতে হয়। মানুষের ভিতরে যে মানুষটা থাকা দরকার সে মানুষটা থাকতে হয়। কারণ একজন ভালো মানুষের ভালো একটা মন থাকে। খুব কঠিন নয়, বায়বীয় নয়, তরল নয়, একটা মনের মতো মন। সে মনের বিশুদ্ধতার শক্তি মানুষের মধ্যে একটার পর একটা নতুন চিন্তার ক্ষেত্র তৈরি করে। মানুষ যেটা ভাববে না বলে মনে মনে ঠিক করেছিল তেমন এক একটা ভাবনা মানুষের মধ্যে তৈরি করে মানুষকে যেন তার ভিতরের অদেখা সত্তা বলে দেয় ‘সে-ই সত্য যা রচিবে তুমি, ঘটে যা তা সব সত্য নহে।’ আর্কিমিডিস কোনো কিছু আবিষ্কার করবেন বলে গবেষণা করেননি। নিজেও জানতেন না তিনি গবেষণা করছেন। অথচ দিনে দিনে তিনি বিখ্যাত গবেষকে পরিণত হয়েছেন। তিনি যা জানতে চেয়েছেন তা বুঝতে গিয়ে যা করেছেন সেটাই গবেষণার অমূল্য সম্পদে পরিণত হয়েছে। এ বিষয়টি উল্লেখ করে তাঁর মৃত্যুর ৩০০ বছর পর গ্রিক ইতিহাসবিদ প্লুটার্ক বলেছেন, ‘আর্কিমিডিসের অধিকাংশ চিন্তাভাবনা, গবেষণা আর কাজ ছিল তাঁর কৌতূহলের ফলাফল, জীবনের কোনো বিশেষ প্রয়োজনের কথা তিনি কখনো ভাবেননি।’ মৃত্যুর আগমুহূর্ত পর্যন্ত তিনি গবেষণা করে গেছেন। আর্কিমিডিস ২১২ খ্রিস্টপূর্বাব্দে এক রোমান সেনার হাতে নিহত হন। তখন রোমানরা গ্রিক সাম্রাজ্য বিজয় করেছিল। প্রচলিত আছে, রোমান সেনারা যখন আর্কিমিডিসকে বন্দী করতে এসেছিল তখনো আর্কিমিডিস তাঁর গবেষণার কাজে ডুবে ছিলেন। গবেষণায় ব্যাঘাত ঘটবে বলে তিনি রোমান সেনাদের সঙ্গে যেতে না চাইলে রাগের মাথায় এক সেনা তাঁর মুন্ডুচ্ছেদ করে। একজন গবেষকের কাছে মৃত্যুর চেয়ে তাঁর কাজ যে বেশি গুরুত্বপূর্ণ আর্কিমিডিস মরে তা প্রমাণ করেছেন। হয়তো তাঁর একটা নতুন আবিষ্কার পৃথিবীকে চমকে দেবে বলে প্রতীক্ষায় ছিলেন কিন্তু তা আর হয়ে ওঠেনি এমন একটা ঘটনায়। তবে তিনি তো মরেননি বরং মৃত্যুঞ্জয়ী হয়েছেন। গবেষকরা কখনো মরেন না। বরং তাঁরা যে গবেষণার ফলাফল রেখে যান তা পরবর্তী গবেষকদের গবেষণার বিষয়বস্তুতে পরিণত হয়। বিশ্ববিখ্যাত বাঙালি গবেষক আচার্য প্রফুল্লচন্দ্রের জীবনটাও অনেকটা আর্কিমিডিসের মতো তবে মৃত্যুটা একটু ভিন্ন। সারা দিন সারা রাত ছাত্রদের সঙ্গে নিয়ে গবেষণার পর গবেষণা করে গেছেন তিনি। কখনো নিজের জীবন নিয়ে ভাবেননি। ছাত্রদের গবেষণা শেখাবেন বলে বিয়ে থা করে সংসার পর্যন্ত করেননি। কলকাতার বাংলা কলেজের একটা ছোট কক্ষে তিনি বিশ্বজনীন গবেষণার ক্ষেত্র তৈরি করেছিলেন। কারণ তিনি জানতেন গবেষণা করতে বড় বড় যন্ত্রপাতি লাগে না বরং গবেষণা করতে লাগে একটা বিশুদ্ধ মন। যে বিশুদ্ধ মন একটার পর একটা সৃজনশীল চিন্তার জন্ম দিয়ে মানুষকে জানিয়ে দিতে পারে মানুষ যা ভাবছে মানুষ তার থেকেও বেশি অগ্রসরমান পৃথিবীর কথা ভাবতে পারে। গবেষণা করার সময় ছাত্ররা তাঁকে চারপাশ থেকে ঘিরে থাকত। খুব ভাগ্যবান একজন মানুষ ছিলেন তিনি। ছাত্রদের গবেষণা শেখাতে শেখাতে এক প্রিয় ছাত্রের বুকে মাথা রেখে কখন যে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছেন কেউ বুঝতেও পারেনি। এমন ভাগ্য নিয়ে সবাই জন্মে না তবে যাঁরা জন্মান তাঁরা ইতিহাস গড়েন না, ইতিহাস তাদের গড়ে। অটো হান স্বপ্নের পেছনে ছুটেছেন ক্রমাগতভাবে। কখনো ভেবেছেন তিনি সংগীতশিল্পী হবেন। আবার কখনো ভেবেছেন চিত্রশিল্পী হবেন। বাস্তবে কোনোটাই হতে পারেননি। কিন্তু মনের ভিতরে যার শিল্পরসকে আঁকড়ে ধরার চিন্তা তিনিই তো পারেন বিজ্ঞানকে শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে গিয়ে গবেষণা থেকে অভূতপূর্ব সৃজনশীলতাকে বের করে আনতে। তিনি থিওরি দিয়ে গবেষণার চিন্তাকে আটকে রাখতে চাননি বরং পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে সত্য উন্মোচন করতে চেয়েছেন। স্ট্রাসমানকে সঙ্গে নিয়ে অটো হান ইউরেনিয়াম-২৩৫ নিউট্রন কণা দিয়ে পরমাণু ভাঙতে সফল হলেন। ১৯৪৪ সালে তাঁরই হাতে তুলে দেওয়া হয়েছিল সে বছরের রসায়নশাস্ত্রে শ্রেষ্ঠ নোবেল পুরস্কার এবং বলা হয়েছিল ভারী কেন্দ্রকের ভাঙনের বিষয়ে গবেষণা আপনাকে চিরস্মরণীয় করে রেখেছে। তাঁর বাবা চেয়েছিলেন তিনি যেন স্থাপত্যকলায় লেখাপড়া করে অগাধ বিত্তবৈভবের অধিকারী হন। কিন্তু তিনি শিল্পরসায়নবিদ হিসেবে নিজেকে গড়ে তোলায় আগ্রহী হয়ে ওঠেন। রাসায়নিক বিক্রিয়ার অদ্ভুত খেলা তাঁর মধ্যে কৌতূহলের জন্ম দিয়ে তাঁর চিন্তার জগৎকেই বদলে দিয়েছে। তাঁর কাছে অর্থবিত্ত ছিল গৌণ, নতুন জ্ঞান সৃষ্টিই ছিল মুখ্য। গবেষকরা তো এমনই যাঁরা সবকিছু ত্যাগ করে জীবনবোধের চেতনায় মানুষের কল্যাণে কাজ করে যান। গবেষকরা বোকা হন। এখানে বোকা মানে বুদ্ধিমত্তার ঘাটতি নয় বরং যাঁরা সহজ-সরল জীবনযাপন করে তাঁদের সৃজনশীলতাকে প্রাধান্য দেন তাঁদের বোঝানো হয়েছে। আজকের পৃথিবীতে আমরা বড় বড় দুর্নীতিবাজ, ক্ষমতার অপব্যবহারকারী, তথাকথিত হোমরা-চোমরাদের বুদ্ধিমান বলে থাকি আর এসব থেকে যাঁরা নিজেদের সুরক্ষিত রেখে সততা ও নৈতিকতাকে প্রাধান্য দেন তাঁদের আমরা বোকা বলি। অনেক সময় ব্যাকডেটেড বলে ভর্ৎসনাও করি। অনেকে বলেন, সুযোগের অভাবে মানুষ সৎ থাকে। এ কথাটা সবার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। বিশেষ করে গবেষকদের ক্ষেত্রে। কারণ গবেষকরা তথাকথিত দুনিয়ার অতিচতুর রথী-মহারথী না হয়ে বোকা মানুষের জীবন বেঁচে নেন। এই রথী-মহারথীদের কাহিনির ব্যাপ্তি তাদের মৃতু্যুর সঙ্গে সঙ্গে শেষ হয়ে যায়। কিন্তু বোকা গবেষকদের কাহিনি সে সময় মানুষকে তথাকথিত দাপুটে মানুষের চেয়ে কম প্রভাবিত করলেও তাঁদের কীর্তি ইতিহাসের অংশ হয়ে যায়। সবচেয়ে অবাক করা বিষয় হলো বোকারাই পৃথিবীর পরিবর্তন আনে, সেটা ভোগে নয় ত্যাগের মাধ্যমে। গবেষকরা এমন কিছু ভাবেন যা সে সময়ের ভাবনা হয়তো নয়। যে ভাবনাটা অনেক অনেক যুগ পরের। গবেষকদের অদ্ভুত কল্পনাগুলোকে প্রথমে অবিশ্বাস-উপহাস করেছে মানুষ। কোনোভাবেই সেগুলো মানতে চায়নি। নতুন কল্পনা ও ধারণা সৃষ্টির মানুষগুলো ধিকৃত, অপমানিত, অবহেলিত হয়েছে। অনেক সময় প্রচলিত ধারণার বিপরীতে গিয়ে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়েছে, শাস্তি ভোগ করেছে। ফাঁসির দন্ডে দন্ডিত হয়েছে। কিন্তু মানুষের অনেক কল্পনা যেগুলো প্রথমে অসম্ভব স্বপ্ন বলে মানুষ উড়িয়ে দিয়েছে সেগুলোই একদিন সত্য বলে প্রমাণিত হয়েছে। এর অর্থ কী? এর অর্থ হচ্ছে, কল্পনা ও ভাবনাকে যখন অসম্ভব ও অবাস্তব বলে মনে হবে তখনই ধরে নিতে হবে নতুন কোনো ধারণা বা আবিষ্কার পৃথিবীতে আসার আগাম বার্তা ঘোষণা করছে। গবেষণার প্রথম ও শেষ কথাই হলো পৃথিবীতে অসম্ভব বলে কিছু নেই। পৃথিবীতে প্রাণীদের প্রাণ আছে; কিন্তু সবুজ লতাপাতায় জড়ানো উদ্ভিদের প্রাণ আছে এটা কি স্যার জগদীশচন্দ্র বসুর আগে কেউ ভেবেছেন? ভাবেননি। তিনি যদি না ভাবতেন হয়তো এখনো আমরা জানতাম উদ্ভিদ প্রাণহীন কিংবা জড়পদার্থ। উদ্ভিদেরও যে প্রাণ আছে আমাদের দেশে বসেই এই বিজ্ঞানী প্রমাণ করেছেন। সারা বিশ্বকে নতুন ধারণা দিয়ে বিজ্ঞান ও গবেষণার ইতিহাসকেই বদলে দিয়েছিলেন এই বাঙালি বিজ্ঞানী। কেবল মানসিক শক্তিকে আঁকড়ে ধরে তিনি এ ধরনের অনেক বিশ্বমানের গবেষণা করে গেছেন। তিনি তাঁরই আবিষ্কৃত ক্রেস্কোগ্রাফ যন্ত্রের সাহায্যে প্রমাণ করেছিলেন উদ্ভিদের প্রাণের অস্তিত্ব। এখন সারা পৃথিবীতে উদ্ভিদের জীবন আছে এ সত্যটি মেনে নানা ধরনের গবেষণা চলছে। আলবার্ট আইনস্টাইন বড় মাপের একজন বিজ্ঞানী হলেও তাঁর কোনো পরীক্ষাগার ছিল না। তিনি বিশ্বাস করতেন তিনটি জিনিস যদি মানুষের কাছে থাকে তবে গবেষণার মাধ্যমে মানুষ পৃথিবীকে বদলে ফেলতে পারে। এ তিনটি জিনিস হলো- কাগজ, কলম আর চিন্তাশক্তি। এর মানে হচ্ছে, মানুষ যদি চিন্তাশক্তিকে ব্যবহার করতে পারে তবে সে নতুন নতুন উপাদান সৃষ্টি করতে পারে।

মানুষ যখন বিভিন্ন আইডিয়া বা ধারণা নিয়ে ভাবতে থাকে তখন তার চিন্তাশক্তি গড়ে ওঠে। এ আইডিয়া কারও কারও কাছে রূপকথার গল্প মনে হতে পারে। কারও কাছে হাস্যকর বিষয় হতে পারে। কিন্তু পরনিন্দার ভয়ে মানুষ যদি আইডিয়া তৈরি করা বন্ধ করে দেয় তবে গবেষণার মাধ্যমে পৃথিবীর সমৃদ্ধি সম্ভব হবে না। আমাদের দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় আইডিয়া তৈরির মাধ্যমে কীভাবে চিন্তাশক্তিকে কাজে লাগানো যায় তা নিয়ে ভাবার সময় এসেছে। আমাদের তরুণ প্রজন্মকে বলব, তোমরা তোমাদের সৃষ্টিশীল দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে উদ্ভট কিংবা বাস্তব যে কোনো ধরনের ধারণা তৈরি করার মনোভাব গড়ে তোলো। কারণ ভাবনাটা উদ্ভট না হলে সৃষ্টিটাও নতুন হয় না। আজ যা নতুন ভাবনা, তা আগামী দিনের গবেষণার সম্ভাবনা। পাখি নিয়ে না ভাবলে উড়োজাহাজ কিংবা রকেট তৈরি হতো না। মনের টানকে অনুভব না করলে মানুষ তথ্য, প্রযুক্তি ও যোগাযোগের আধুনিক ধারণা তৈরি করতে পারত না। টিকটিকির দেয়াল বেয়ে চারপাশে ঘুরতে না দেখলে মানুষ রোবট কিংবা নিজেদের চারপাশে ঘোরানোর প্রযুক্তি তৈরি করতে সক্ষম হতো না। মানুষ চাঁদকে ভালো না বাসলে চাঁদে ও বিভিন্ন গ্রহে যাওয়ার মতো প্রযুক্তি গড়ে তুলতে পারত না। মানুষ পারে না এমন কিছু পৃথিবীতে নেই। যে যেভাবে পারি সেভাবে ভাবতে থাকি। হয়তো এ কাল্পনিক ভাবনাগুলো একদিন কালজয়ী বিজ্ঞান ও আবিষ্কার হয়ে সভ্যতাকে এগিয়ে নেবে।

 

লেখক : শিক্ষক, ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর।

                ইমেইল : [email protected]