ঢাকা-১৪ আসনের রাজনীতি এবার শুধু ভোটের হিসাবেই সীমাবদ্ধ নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে স্মৃতি, ক্ষোভ আর নীরব প্রত্যাশা। মাঠে নামলে বোঝা যায় এ আসনের নির্বাচন কাগজে-কলমে যতটা সরল দেখায়, বাস্তবে তার চেয়ে অনেক বেশি জটিল। সাভারের কাউন্দিয়া ও বনগাঁও ইউনিয়ন, মিরপুর-১, কল্যাণপুর, শাহআলী থানা নিয়ে গঠিত ঢাকা-১৪ আসন। এ আসনের মধ্যেই পড়েছে শাহআলী মাজার, গাবতলী বাস টার্মিনাল, টেকনিক্যাল, চিড়িয়াখানা, বোটানিক্যাল গার্ডেন ও মিরপুর স্টেডিয়াম। এখানকার ভোটার ৪ লাখ ৫৬ হাজার ৪৪ জন। এর মধ্যে ২ লাখ ৩২ হাজার ৬৬ জন পুরুষ, ২ লাখ ২৩ হাজার সাতজন নারী। চারজন আছেন তৃতীয় লিঙ্গের। মিরপুর থেকে সাভারের কাউন্দিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত এ আসনে তরুণ ভোটারের সংখ্যা বেশি। এ ছাড়া রয়েছে মধ্যবিত্ত, শ্রমজীবী, ভাড়াটে বাসিন্দা। কিশোর গ্যাং, মাদক ও নিরাপত্তা ইস্যু এ আসনের নির্বাচনি আলোচনায় প্রভাব ফেলছে।
সরেজমিন দেখা গেছে, মিরপুর-১ থেকে শুরু করে কল্যাণপুর, শাহআলী কিংবা গাবতলীর আশপাশ-সবখানেই আলোচনার কেন্দ্রে তিনটি নাম। বিএনপির প্রার্থী সানজিদা ইসলাম তুলি, জামায়াত জোটের ব্যারিস্টার মীর আহমদ বিন কাসেম আরমান এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে বহিষ্কৃত বিএনপি নেতা আবু বকর সিদ্দিক সাজু। চায়ের দোকান, বাসস্ট্যান্ড কিংবা বাজারে বসে মানুষ যখন কথা বলছে, তখন এই তিন নামই ঘুরেফিরে আসছে। অন্য প্রার্থীরা প্রচারে থাকলেও বিএনপির ধানের শীষ, জামায়াতের দাঁড়িপাল্লা ও স্বতন্ত্র প্রার্থী সাজুর ফুটবল মার্কা সবচেয়ে বেশি আলোচিত এ আসনে।
বিএনপির প্রার্থী তুলি এলাকায় পরিচিত মূলত গুমবিরোধী আন্দোলনের কারণে। তার ভাই বিএনপি নেতা সাজেদুল ইসলাম সুমন গুম হওয়ার পর তিনি যে আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন, সেটি অনেক ভোটারের মনে আলাদা জায়গা তৈরি করেছে। জামায়াত প্রার্থী আরমানের প্রচারও চোখে পড়ার মতো। তিনি নিজেই দীর্ঘ সময় গুম ও বন্দিত্বের শিকার ছিলেন। তা ছাড়া তিনি মানবতাবিরোধী অপরাধে ফাঁসি হওয়া জামায়াত নেতা মীর কাসেম আলীর ছেলে। ৬০ ফিট এলাকা, কল্যাণপুর, চিড়িয়াখানা কিংবা শাহআলীর অলিগলিতে নিয়মিত লিফলেট বিতরণ করছেন আরমানের সমর্থকরা। নারীকর্মীদের উপস্থিতিও লক্ষ করা গেছে। তবে এ দুই প্রার্থীর মাঝখানে নির্বাচনের সমীকরণ ওলটপালট করে দিচ্ছেন স্বতন্ত্র প্রার্থী সাজু। দারুসসালাম থানা বিএনপির সাবেক নেতা হওয়ায় এলাকাজুড়ে তার ব্যক্তিগত নেটওয়ার্ক এখনো সক্রিয়। তা ছাড়া তার পিতা এস এ খালেক একই আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ছিলেন। সরেজমিন কথা বলে বোঝা গেছে, বিশেষ করে নারী ভোটারদের মধ্যে তুলির প্রতি সহানুভূতি আছে। তারা প্রকাশ্যে খুব একটা কিছু বলছেন না, কিন্তু আলোচনায় বারবার তুলির নাম আসছে। আওয়ামী লীগ আমলে অনেক বিএনপি নেতা-কর্মী সাজুর মাধ্যমে সহায়তা পেয়েছেন। তাই তাকে মনোনয়ন না দেওয়ায় অনেক বিএনপি নেতা-কর্মীই ভিতরে ভিতরে ক্ষোভে ফুঁসছেন। তাই বিএনপির ভোট এ দুই প্রার্থীর মাঝে ভাগ হয়ে যেতে পারে। দলীয় শৃঙ্খলা আর সংগঠিত প্রচারের কারণে একটি স্থায়ী ভোটব্যাংকের ওপর ভরসা করছেন দাঁড়িপাল্লার সমর্থকরা। বিএনপির ভিতরের বিভাজন এ নির্বাচনের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হয়ে উঠেছে। একদিকে দলীয় প্রার্থী, অন্যদিকে বহিষ্কৃত হলেও জনপ্রিয় মুখ-এই দ্বন্দ্বে অনেক কর্মী কার্যত নীরব।
বিএনপির নেতা-কর্মীরা জানান, এলাকার প্রভাবশালী মহল থেকে শুরু করে বিএনপির অঙ্গসংগঠনের নেতা-কর্মীরা অধিকাংশই তুলির পক্ষে প্রচার চালাচ্ছেন। সাজুর পক্ষে প্রভাবশালী মহল বা দলের নেতারা প্রত্যক্ষভাবে কাজ করছেন না। তবে অর্থের প্রলোভনে স্থানীয় ওয়ার্ড বিএনপির অনেক নেতাই সাজুর পক্ষে প্রচার চালাচ্ছেন। দুই পক্ষে বিএনপির ভোট ভাগ হয়ে গেলে জামায়াতের প্রার্থী জিতে যেতে পারেন বলেও শঙ্কা করছেন বিএনপির তৃণমূলের নেতা-কর্মীরা।
স্থানীয় বিএনপি নেতা এহসানুল আপেল বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, এ আসন ঐতিহাসিকভাবেই বিএনপির দুর্গ। তবে এবার নির্বাচনে দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে সাজু ভাই স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন। বিএনপির প্রভাবশালী মহল থেকে শুরু করে তৃণমূল সবাই তুলি আপার পক্ষেই কাজ করছে। মুষ্টিমেয় কিছু লোক বিদ্রোহী প্রার্থীর পক্ষে কাজ করছে। এটা তেমন কোনো প্রভাব ফেলবে না।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় এক বিএনপি নেতা বলেন, একদিকে দলীয় সিদ্ধান্ত অন্যদিকে দলের পরীক্ষিত নেতা। আমরা আসলে দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভুগছি। দলীয় সিদ্ধান্ত মেনে ধানের শীষে প্রচারে নেতা-কর্মীরা মাঠে আছেন। তবে তৃণমূলের অনেকেই সাজুর পক্ষে কাজ করছে। আবার অনেক নেতা চুপ।
মাঠে থাকা অনেক ভোটারই বলছেন, বিএনপির ভোট ভাগ হলে জামায়াত প্রার্থী সুবিধাজনক অবস্থানে চলে যেতে পারেন।
ঢাকা-১৪ আসনে ভোটার ৪ লাখের বেশি, যার প্রায় অর্ধেক নারী। এই নারী ভোট, বিদ্রোহী প্রার্থীর প্রভাব, দলীয় শৃঙ্খলা আর নীরব সমর্থন-সব মিলিয়ে ফল নির্ধারণ হবে শেষ মুহূর্তের হিসাবেই।
এ আসনে অন্য প্রার্থীর মধ্যে আছেন বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) রিয়াজ উদ্দিন (কাস্তে), বাংলাদেশ সুপ্রিম পার্টির মো. ওসমান আলী (একতারা), জাতীয় পার্টির মো. হেলাল উদ্দীন (লাঙ্গল), বাংলাদেশ রিপাবলিকান পার্টির মো. লিটন (হাতি), গণফোরামের মো. জসিম উদ্দিন (উদীয়মান সূর্য), এলডিপির মো. সোহেল রানা (ছাতা), এবি পার্টির মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান (ঈগল), জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জেএসডির নুরুল আমিন (তারা) এবং ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মো. আবু ইউসুফ (হাতপাখা)।
বিডি প্রতিদিন/কেএইচটি