শিরোনাম
প্রকাশ : মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর, ২০১৫ ০০:০০ টা
আপলোড : ২৬ অক্টোবর, ২০১৫ ২১:৪৮

কাটছে না বাণিজ্যিক ছবির দুর্দিন

আলাউদ্দীন মাজিদ

কাটছে না বাণিজ্যিক ছবির দুর্দিন

আবারও গতি হারিয়েছে চলচ্চিত্র। নব্বই দশকের শেষ ভাগ থেকে ধস নামা বাণিজ্যিক চলচ্চিত্রের দুর্দিন যেন কাটছেই না। মাঝে মধ্যে কিছুটা আশার আলো দেখা দিলেও আবার অন্ধকারে তলিয়ে যায় এই শিল্প। চলতি বছরের কথা বলতে গেলে একদিকে নকলের দৌরাত্ম্য অন্যদিকে ব্যবসায়িক ব্যর্থতা। এতে আবার চরম হতাশা দেখা দিয়েছে চলচ্চিত্রাঙ্গনে। খরার কবলে পড়েছে চলচ্চিত্র শিল্প। জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত মুক্তি পাওয়া সিংহভাগ চলচ্চিত্রই সফল হয়নি। ‘গাড়িওয়ালা’ কিংবা ‘জালালের গল্প’র মতো ভিন্ন স্বাদের ছবিগুলোকে বিদেশি চলচ্চিত্র উৎসবে পুরস্কার আর প্রশংসার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকতে হচ্ছে। নির্মাণ ব্যয় আর ঘরে ফিরছে না। বাণিজ্যিক ছবির ব্যবসায় তো আকাল লেগেছে নব্বই দশকের শেষ ভাগ থেকেই। এবছর এ পর্যন্ত মুক্তি পাওয়া দুই ডজনেরও বেশি ছবির মধ্যে পুঁজি ফেরত আনা ছবির সংখ্যা একেবারেই নগণ্য। এক্ষেত্রে ‘লাভ ম্যারেজ’ আর ‘রাজাবাবু’ ছাড়া আর কোনো ছবির নাম জোর দিয়ে বলতে পারছে না নির্মাতা কিংবা প্রদর্শক সমিতি। সরকারি অনুদানের ছবির অবস্থাও করুণ। নানা প্রতিক‚লতায় সময়মতো নির্মাণ হয় না এসব ছবি। হলেও তা সিনেমা হল মালিকরা প্রদর্শন করতে চান না। চলচ্চিত্রকারদের মতে এর কারণ স্বল্প বাজেট। সীমিত খরচে এসব ছবি নির্মাণ হয় বলে সাদামাঠা গল্পে নির্মাণ করতে গিয়ে কোনো আঙ্গিকে এতে গ্লামার থাকে না। ফলে দর্শক এসব ছবি দেখতে সিনেমা হলে যায় না। তাই লোকসানের ভয়ে প্রদর্শকরা তা প্রদর্শনে অনীহা দেখায়।

নায়করাজ রাজ্জাক বলেন, মানসম্মত চলচ্চিত্র নির্মাণের পূর্বশর্ত হচ্ছে উন্নত চিত্রনাট্য এবং অভিনয়শিল্পী। যার অভাব এখন প্রকট। সিনিয়র চিত্রনাট্যকারদের বেশিরভাগই বেঁচে নেই। তা ছাড়া নির্মাতাদের নকলপ্রবণতা পরিস্থিতিকে ভয়াবহ করে তুলেছে। সীমিত বাজেট দিয়ে বলিউড বা তামিল ছবির নকল করাও যে সম্ভব নয়, তাও তারা বোঝে না। তা ছাড়া মনে রাখতে হবে, শুধু আধুনিক প্রযুক্তি দিয়ে দর্শকদের আকৃষ্ট করা যাবে না, প্রয়োজন সত্যিকারের বাংলা চলচ্চিত্র নির্মাণ।

আমজাদ হোসেন বলেন, ভালো গল্প আর অভিনয়শিল্পীর অভাব এখন প্রকট। সঙ্গে রয়েছে নকল ছবির ছড়াছড়ি। ঘরে বসে এখন সহজেই বিদেশের ছবি দেখা যায়। বলতে গেলে এমন অনেক কারণেই আবার আমাদের চলচ্চিত্র গতি হারিয়েছে।

ববিতা বলেন, শুধু প্রযুক্তিগত গ্লামার দিয়ে তো দর্শকমন জয় করা যাবে না। গল্প ও অভিনয়ে জোর থাকতে হবে। যা এখন নেই। এখনকার গল্প এবং শিল্পীর মধ্যে গভীরতা নেই। নির্মাতাদের মধ্যেও জ্ঞান ও গুণের অভাব রয়েছে। বোম্বে এবং তামিল ছবির নকল করতে অনেকে ব্যস্ত। কিন্তু আমাদের স্বল্প বাজেট দিয়ে তো তাদের ছবি নকলও সম্ভব নয়। দর্শক স্যাটেলাইট চ্যানেলে আসল ছবি দেখে এর তারতম্য সহজেই বুঝতে পারছে। তাই দর্শকদের বোকা ভাবা বা ধোঁকা দেওয়ার সুযোগ নেই। বুঝতে হবে আমাদের কৃষ্টি ও সংস্কৃতি ভিন্ন। ছবি হবে বিনোদনের জন্য।

চলচ্চিত্র গবেষক অনুপম হায়াৎ বলেন, ষাট-সত্তর বা আশির দশক থেকে এখন বিনোদনের মাধ্যম অনেক বেড়েছে। তাই নির্মাতাদের প্রয়োজন কীভাবে চলচ্চিত্রে পূর্ণমাত্রায় প্রাণসঞ্চার করা যায় সেই চিন্তা করা। প্রেক্ষাগৃহের উন্নয়ন ও চলচ্চিত্র নির্মাণসহ সব ক্ষেত্রে সময় উপযোগী সরকারি সহযোগিতা দরকার। তাছাড়া নিজ দেশের কৃষ্টি ও সংস্কৃতির প্রতি লক্ষ্য রেখে জীবনের গল্প বলতে হবে। মানে নকল নয়, আমাদের ঢংয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণ করতে হবে।

চলচ্চিত্র প্রদর্শক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মিয়া আলাউদ্দিন বলেন, এখনকার নির্মাতাদের মধ্যে নকলপ্রবণতা জেঁকে বসেছে। আগে ধ্যান-ধারণা ছিল শিল্প ও বাণিজ্যের সংমিশ্রণ। আর এখনকার দৃষ্টিভঙ্গি পুরোপুরি বাণিজ্যিক। ফলে দর্শক বড় পর্দায় জীবনের প্রতিচ্ছবি আর স্বপ্নের বাস্তবায়ন না পেয়ে হতাশ হচ্ছে। প্রযুক্তির উন্নয়ন হয়েছে কিন্তু এক বা দুই মাসের মধ্যে যেনতেনভাবে চলচ্চিত্র নির্মাণ করতে গিয়ে এর মান নষ্ট হচ্ছে। এভাবে দর্শকদের বোকা বানাতে গিয়ে চলচ্চিত্রকাররা তাদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছেন। এ অবস্থার উন্নতি তখনই ঘটবে যখন আমরা দর্শকদের এমন জিনিস দেব যা তারা আগে পায়নি। তা ছাড়া সেন্সর বোর্ডের উদার এবং সুস্থ নির্মাণের প্রতি নির্মাতাদের দায়িত্ববান হতে হবে।


আপনার মন্তব্য