শিরোনাম
প্রকাশ : বৃহস্পতিবার, ১৩ আগস্ট, ২০২০ ০০:০০ টা
আপলোড : ১২ আগস্ট, ২০২০ ২২:০৩

সাফল্যে নুসরাত থেকে রাহাত

সাফল্যে নুসরাত থেকে রাহাত
নুসরাত ফতেহ আলী খান - রাহাত ফতেহ আলী খান

উপমহাদেশের প্রখ্যাত সংগীতশিল্পী নুসরাত ফতেহ আলী খান। কাওয়ালি সম্রাটদের এ রাজা শাস্ত্রীয় সংগীতেও অনবদ্য। তার ভাতিজা রাহাত ফতেহ আলী খান পাকিস্তানের পাশাপাশি বলিউডের ছবিতে গান গেয়ে তুমুল জনপ্রিয়তা অর্জন করেছেন। সুফি ঘরানার এ শিল্পী তার কণ্ঠের জাদুতে প্রতিনিয়ত মাতোয়ারা করছেন সীমান্তের এপার-ওপার। এ দুই সংগীতশিল্পীকে নিয়ে লিখেছেন- পান্থ আফজাল

 

শাহেনশাহ এ কাওয়ালি

সত্তর দশকের শেষদিকে অনেকটা হঠাৎ করেই আবির্ভাব ঘটেছিল পাকিস্তানের কাওয়ালি গায়ক নুসরাত ফতেহ আলী খানের। যিনি পরবর্তী কয়েক বছরের মধ্যেই পরিণত হয়েছিলেন বিশ্বসংগীত জগতেরই এক তারকায়। প্রায় ৬০০ বছরের পারিবারিক কাওয়ালি ঐতিহ্যের মধ্য দিয়ে বেড়ে ওঠেন পাকিস্তানের কিংবদন্তিতুল্য সংগীতশিল্পী নুসরাত ফতেহ আলী খান। ইসলামের সুফিবাদের অবিচ্ছেদ্য অংশ আধ্যাত্মিক সংগীত কাওয়ালির জন্য বিশ্বনন্দিত তিনি। অসাধারণ কণ্ঠের ক্ষমতার জন্য তাকে রেকর্ডকৃত কণ্ঠে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠদের একজন হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তিনি একটানা কয়েক ঘণ্টা একই তালে কাওয়ালি পরিবেশন করতে পারতেন। কাওয়ালি সংগীতকে বিশ্বসংগীতে পরিণত করতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখেন তিনি। তাকে বলা হয় শাহেনশাহ এ কাওয়ালি, মানে কাওয়ালির রাজাদের রাজা! 

 

খান পরিবারের পঞ্চম সন্তান

ওস্তাদ নুসরাত ফতেহ আলী খান ১৯৪৮ সালের ১৩ অক্টোবর ফয়সালাবাদের পাঞ্জাবি পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা ফতেহ আলী খান একসঙ্গে একজন সংগীততাত্ত্বিক, গায়ক, বাদক এবং কাউয়াল। তার পঞ্চম সন্তান এবং ছেলে সন্তানদের মধ্যে প্রথম পুত্র সন্তান নুসরাত। এই খান পরিবারে রয়েছে চার বড় বোনসহ এক ছোট ভাই ফররুখ ফতেহ আলী।

 

বাবার স্বপ্ন ছিল ছেলে ডাক্তার হবে

প্রথমদিকে নুসরাতের পিতা চাননি ছেলে পারিবারিক পেশায় আসুক। তিনি চেয়েছিলেন নুসরাত সম্মানিত একটি পেশায় নিজেকে নিয়োজিত করুক এবং ডাক্তার হোক। কারণ তিনি মনে করতেন, কাওয়ালি শিল্পীরা নিম্ন সামাজিক মর্যাদার অধিকারী। তবে নুসরাতের কাওয়ালির প্রতি প্রবল প্রবণতা এবং আগ্রহের কাছে বাবা হার মানলেন।

 

ম্যাট্রিকের পর বাবাকে হারান

নুসরাত লেখাপড়ায় এভারেজ ছিলেন। তৎকালীন ম্যাট্রিক পাস করার পর তার বাবা মারা যান। বাধ্য হয়েই সংসারের খরচ চালাতে নুসরাত ভাবধারার সংগীতের জগতে পা রাখেন। নিজের কণ্ঠ ভালো না জেনে অমানুষিক পরিশ্রম করেন নিজেকে তৈরি করতে। গাওয়ার পাশাপাশি রেওয়াজ বাড়িয়ে দেন কয়েকগুণ। চেষ্টা করতে লাগলেন নিজের সংগীতে আরও কত রকম রং যুক্ত করে মানুষের কাছে আকর্ষণীয় করা যায়।

 

আইউবের হাত ধরে বার্মিংহামে

কাওয়ালির একজন ভবিষ্যৎ তারকা হিসেবে নুসরাত ফতেহ আলী খানের সম্ভাবনা প্রথম অনুভব করেছিলেন ইংল্যান্ডের বার্মিংহাম শহরের রেকর্ড ব্যবসায়ী মোহাম্মদ আইউব। বার্মিংহাম শহরে তার একটি দোকান ছিল, যেখান থেকে তিনি এশিয়ান মিউজিকের রেকর্ড বের করতেন। ১৯৭৭ সালে একদিন সকালে তার হাতে পৌঁছল কতগুলো টেপ, যাতে পাকিস্তানের কিছু নবীন গায়কের গান ছিল। গান শোনার সময় বিশেষ একটি কণ্ঠ তাকে চমকে দিল। এই কণ্ঠ ছিল নুসরাত ফতেহ আলী খানের। আইউব কালবিলম্ব না করে নুসরাত ফতেহ আলী খানের সঙ্গে চুক্তি করে ফেললেন, তার চারটি অ্যালবাম বের করার জন্য। তবে, আইউবের সঙ্গে নুসরাত ফতেহ আলী খানের মুখোমুখি সাক্ষাৎ হয় ১৯৮০ সালে, ইংল্যান্ডেই। নুসরাতকে আমন্ত্রণ জানানো হলো প্রথমবারের মতো ইংল্যান্ডে কিছু অনুষ্ঠান করার জন্য। এর মধ্যে একটি আয়োজন করা হয়েছিল বার্মিংহামে। তবে অনুষ্ঠানে বেশি লোক হয়নি তখন। তবে দ্বিতীয় অনুষ্ঠানে জোরেশোরে প্রচারে অনুষ্ঠানটির সব টিকিট বিক্রি হয়ে যায়। মিলনায়তন এমনভাবে ভরে গেল যে সবাই বসার সুযোগ পাননি। অনেককেই করিডরে দাঁড়িয়ে গান শুনতে হয়েছিল। এরপর নুসরাত ইংল্যান্ডের অন্য শহরগুলোতে গান করলেন। ১৯৮৫ সালে চিত্র গেল পাল্টে। সে বছর গ্রীষ্মকালে এসেক্সে অনুষ্ঠিত হয়েছিল ব্রিটিশ বিশ্বসংগীত উৎসব বা ওম্যাড। সেই উৎসবেই এক রাতে নুসরাত আর তার দল মঞ্চে উপস্থিত হলেন। বলা হয়, সেদিনের সেই অনুষ্ঠান নুসরাতের সংগীতজীবনের গতিধারাই বদলে দিয়েছিল।

 

হলিউডের ছবিতে গেয়েছেন

নুসরাত হলিউডের ছবিতেও গান গেয়েছিলেন। তিনি কাওয়ালি নিয়ে নিরীক্ষাধর্মী কিছু কাজেও হাত দেন। তিনি কাওয়ালির সঙ্গে পাশ্চাত্য সংগীতের মিশ্রণ ঘটান। ১৯৮৫ সালে পিটার গ্যাব্রিয়েলের সঙ্গে মিলে ‘দ্য লাস্ট টেম্পটেশন অব ক্রাইস্ট’ ছবিতে কাজ করেন। ১৯৯০ সালে কানাডীয় সংগীতজ্ঞ ও গিটারিস্ট মাইকেল ব্রুকের সঙ্গে ‘মাস্ত মাস্ত’ ও ১৯৯৬ সালে ‘নাইট সং’ অ্যালবামে কাজ করেন। ১৯৯৫ সালে ‘ডেড ম্যান ওয়াকিং’র সাউন্ডট্র্যাকে পার্ল জ্যামের প্রধান গায়ক এডি ভেডারের সঙ্গে কাজ করেন। এ আর রহমানের ‘বন্দে মাতেরম’ অ্যালবামে ‘গুরুস অব পিস’ গানে কণ্ঠ দেন।

 

সংগীতের নতুনত্বকে স্বাগত জানান

নুসরাত ফতেহ আলী যেখানেই যেতেন, সুফিদের গান গাইতেন। যে গানের মূল মর্ম হচ্ছে ভালোবাসা, মঙ্গল কামনা এবং সহমর্মিতা। নুসরাত মনে করতেন সংগীতকেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিবর্তিত হতে হয়। নিরীক্ষামূলক কাজ তিনি খুবই ভালোবাসতেন। সংগীতকে একটা ভিন্ন কাঠামোর মধ্যে ফেলে নতুন কিছু সৃষ্টির প্রক্রিয়ার সঙ্গে তিনি পুরোপুরি একাত্ম ছিলেন।

 

জনপ্রিয় গান ও অন্যান্য অর্জন

নুসরাত পাকিস্তানি ও ভারতীয় সিনেমায় অনেক গান করেছেন। এ ছাড়া অন্য অনেকের গলায় তার গান ব্যবহৃত হয়েছে। প্রকাশিত হয়েছে অসংখ্য অডিও-ভিডিও অ্যালবাম। তার জনপ্রিয় কয়েকটি গান হলো- আল্লাহ হু, ইয়ে জো হালকা হালকা, মাস্ত মাস্ত, হক্ব আলী আলী, শাহবাজ কালান্দার, ইয়া হাইয়ু ইয়া কাইয়ুম, কিনা সোনা, মোরা সাইয়া, নি মাই জানা জোগি যে নীল এবং তুমহে দিল্লাগি ভুল জানি পড়েগি। ১৯৮৭ সালে সংগীতে অবদানের জন্য পাকিস্তানের প্রেসিডেন্টের কাছ থেকে অ্যাওয়ার্ড ফর প্রাইস অব পারফরম্যান্স গ্রহণ করেন নুসরাত। ১৯৯৫ সালে পান ইউনেস্কো মিউজিক প্রাইস। ১৯৯৬ সালে মন্ট্রিয়েল ওয়ার্ল্ড ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে গ্র্যান্ড পিক্স ডেস আমেরিকাস পুরস্কার জিতেন। একই বছর পান ফুকুয়োকা এশিয়ান কালচারাল প্রাইস। এ ছাড়া আরও অনেক পুরস্কার ও সম্মাননা লাভ করেন। তার ওপর ৫টির মতো ডকুমেন্টারি নির্মিত হয়েছে।

 

মাত্র ৪৮ বছর বয়সে দেহত্যাগ

নুসরাতের জীবনযাত্রার প্রভাব তার শরীরের ওপর পড়তে শুরু করেছিল। তার ওজন খুব বেশি বেড়ে যায় এবং স্বাস্থ্যগত নানা সমস্যা দেখা দেয়। ১৯৯৭ সালের ১৬ আগস্ট মাত্র ৪৮ বছর বয়সে তিনি মারা যান। তার মৃত্যুর পর শুধু যে পাকিস্তানেই মানুষ শোকাহত হয়েছিলেন তা নয়, পৃথিবীর নানা দেশের মানুষ তার বিদায়ের শূন্যতাকে অনুভব করেছিলেন।

 

নুসরাতের উত্তরসূরি ভাতিজা রাহাত ফতেহ

রাহাত ফতেহ আলী খান ওস্তাদ নুসরাত ফতেহ আলী খানের ভাতিজা এবং ওস্তাদ ফররুখ ফতেহ আলী খানের পুত্র। এ ছাড়াও তিনি পুরাণখ্যাত কাওয়ালি শিল্পী ফতেহ আলী খানের নাতি হন। তার জন্ম ১৯৭৩ সালের ৯ ডিসেম্বর। এই পাকিস্তানি সংগীত শিল্পী প্রাথমিকভাবে মুসলিম সুফি হিসেবে ভক্তিমূলক গান গাইতেন। কাওয়ালি ছাড়াও রাহাত গজল গাইতেন এবং অন্যান্য মৃদু সংগীতেও খ্যাতি রয়েছে। তিনি বলিউডের জনপ্রিয় একজন প্লেব্যাক শিল্পী হিসেবে সবচেয়ে বেশি পরিচিত।

 

তিন বছর বয়স থেকে রাহাতের গান গাওয়া শুরু

রাহাতকে তার চাচা ওস্তাদ নুসরাত ফতেহ আলী খান কর্তৃক কাওয়ালি সংগীতের ঐতিহ্যকে ধারণ করার লক্ষ্যে তৈরি করেন। মাত্র তিন বছর বয়স থেকে রাহাত তার চাচা ও পিতার সঙ্গে গাওয়া শুরু করেন।

 

পাকিস্তানের শিল্পীর বলিউড জয়

বর্তমান সময়ে বলিউডের জনপ্রিয় একজন প্লেব্যাক শিল্পী হিসেবে নিজেকে পরিচিত করেছেন রাহাত ফতেহ আলী খান। পাকিস্তানের পাশাপাশি ভারতেও তিনি তুমুল জনপ্রিয়। বাংলাদেশি গানেও তিনি কণ্ঠ দিয়েছেন। তার প্রকাশিত অ্যালবামের সংখ্যা অনেক। বলিউড চলচ্চিত্র শিল্পে একজন প্লেব্যাক শিল্পী হিসেবে রাহাতের অসামান্য অবদান রয়েছে।

 

বাংলাদেশি গানে তার কণ্ঠ

উর্দু ও হিন্দির পাশাপাশি বাংলাতেও গান গেয়েছেন তিনি। বাংলাদেশের জনপ্রিয় শিল্পী রুনা লায়লার সুর ও সংগীত পরিচালনায় রাহাত ফতেহ আলী খান গেয়েছেন ‘ভালোবাসা আমার পর হয়েছে’ গানটি। কবির বকুলের কথায় এ গানের মিউজিক ভিডিওতে মডেল হয়েছেন কাজী নওশাবা আহমেদ। গানটিতে মডেল হিসেবে নওশাবার বিপরীতে ছিলেন আবু হুরায়রা তানভীর। মিউজিক ভিডিওটি পরিচালনা করেছেন শাহরিয়ার পুলক। গানটি প্রকাশের পর ব্যাপক প্রশংসিত হয়। ‘রুনা লায়লা ফিচারিং লেজেন্ডস ফরএভার’ অ্যালবামে আরও গেয়েছেন আশা ভোঁসলে, হরিহরণ, রুনা লায়লা ও আদনান সামী।

 

দ্বিতীয়বারের মতো বিয়ে

প্রথম স্ত্রীর সঙ্গে বিচ্ছেদ চূড়ান্ত হওয়ার পর প্রেমিকা ও মডেল ফালাককে বিয়ে করেছেন রাহাত। নুসরাত ফতেহ আলী খানের মেয়ে নিডাকে বিয়ে করেছিলেন রাহাত। রাহাত-নিডার তিন সন্তান। দুই মেয়ের নাম মাহিন খান ও ফিলজা খান এবং ছেলের নাম সাজমান খান। ঘর-সংসার থাকার পরও মডেল ফালাকের সঙ্গে প্রণয়ের সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন রাহাত। এক পর্যায়ে প্রথম স্ত্রীর সঙ্গে বিচ্ছেদের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করেন তিনি।

 

অক্সফোর্ডের ‘ডক্টরেট অব মিউজিক’ ডিগ্রি অর্জন

রাহাত ফতেহ আলী খান অর্জন করেন ডক্টরেট ডিগ্রি। সংগীতের ওপর তার দখল ও অনন্য অবদানের জন্য অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় তাকে এ সম্মাননা দেয়। এর আগে ২০১৬ সালে আজীবন সম্মাননা দিয়েছিল অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ মুসলিম সুফিদের ভক্তিমূলক গান ও কাওয়ালির কিংবদন্তি হিসেবেও অভিহিত করে পাকিস্তানের এই গায়ককে।

 

তার গানে সমৃদ্ধ যেসব ছবি

‘পাপ’, ‘ওমকারা’, ‘ওম শান্তি ওম’, ‘লাভ আজকাল’, ‘মাই নেম ইজ খান’, ‘ওয়ান্স আপন আ টাইম ইন মুম্বাই’, ‘রেডি’, ‘বডিগার্ড’, ‘জান্নাত-২’, ‘হিরোইন’, ‘দাবাং’, ‘দাবাং-২’, ‘ফাটা পোস্টার নিকলা হিরো’সহ এ যাবৎকালের প্রায় সব ছবির গানে তার গান যেন অন্যতম চমক সংগীতপ্রেমীদের কাছে।


আপনার মন্তব্য