শিরোনাম
প্রকাশ : বুধবার, ২৪ মার্চ, ২০২১ ০০:০০ টা
আপলোড : ২৩ মার্চ, ২০২১ ২৩:১৩

রূপনগরের রাজকন্যা শবনম এখন

আলাউদ্দীন মাজিদ

রূপনগরের রাজকন্যা শবনম এখন

‘আমি রূপনগরের রাজকন্যা রূপের জাদু এনেছি, ইরান-তুরান পার হয়ে আজ তোমার দেশে এসেছি’... কিংবদন্তি অভিনেত্রী শবনম এই গানে ঠোঁট মিলিয়ে এ দেশের চলচ্চিত্রে অভিনয় শুরু করেন। দর্শকমনে শিহরণ জাগান। এটি ছিল তাঁর অভিনীত প্রথম ছবি ‘হারানো দিন’-এর গান। প্রখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক মোস্তাফিজুর রহমান ১৯৬১ সালে পরিচালনা করেন ছবিটি। প্রথম ছবিই সুপারহিট। তারপর শুধুই দর্শকমন জয় করে এগিয়ে যাওয়া। নব্বই দশক পর্যন্ত পাকিস্তান আর বাংলাদেশে প্রায় ১৮৫টি ছবিতে অভিনয় করেন শবনম। তিনিই একমাত্র অভিনেত্রী, যিনি পাকিস্তান চলচ্চিত্রের সর্বোচ্চ সম্মাননা নিগার অ্যাওয়ার্ড লাভ করেন ১২ বার। এ ছাড়া বাংলাদেশ ও পাকিস্তান মিলিয়ে অসংখ্য নানা সম্মাননায় সমৃদ্ধ হয় তাঁর অর্জনের ঝুলি। ৪০ বছরের বর্ণাঢ্য চলচ্চিত্র জীবন তাঁর। ১৯৯৯ সালে সর্বশেষ অভিনয় করেছেন ‘আম্মাজান’ চলচ্চিত্রে।

পুরান ঢাকার নারিন্দায়   ১৯৪০ সালের ১৭ আগস্ট জন্মগ্রহণ করেন ঝর্ণা বসাক। বিখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক ক্যাপ্টেন এহতেশামের উর্দু ‘চান্দা’ ছবিতে ১৯৬২ সালে অভিনয় করেন শবনম। এই নির্মাতাই ‘হারানো দিন’ ছবিতে তাকে শবনম নামটি দেন। শবনম নামের অর্থ হলো- ফুলের মধ্যে বিন্দু বিন্দু শিশির ঝরে পড়া। চান্দা ছবিটিও দর্শক বিপুলভাবে গ্রহণ করলে অভিনেত্রী শবনমের শুরু হয় রুপালি পর্দায় শুধুই সাফল্যের সিঁড়িতে ওঠা। ১৯৬৪ সালের ২৪ ডিসেম্বর শবনম বিয়ে করেন খ্যাতিমান সংগীত পরিচালক রবীণ ঘোষকে। ২০১৬ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি পরলোকগমন করেন রবীণ ঘোষ। একমাত্র পুত্র রনি ঘোষকে নিয়ে ঢাকার বারিধারার ডিওএইচএসের বাসায় সময় কাটে শবনমের। শবনমের একমাত্র বড় বোন নন্দিতা দাস কলকাতার সিমলা রোডে বাস করেন। মাঝে মধ্যে বোনের কাছেও বেড়াতে যান। এই অভিনেত্রীর বাবা ননী বসাক ছিলেন একজন স্বনামধন্য স্কাউট প্রশিক্ষক ও ফুটবল রেফারি।

১৯৬৮ সালে তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানের করাচিতে স্থায়ীভাবে বাস করতে থাকেন। সত্তর দশকের শুরুতে শবনম ললিউডে (লাহোর) পাকিস্তানের ইতিহাসে সবচেয়ে জনপ্রিয় নায়িকা হিসেবে নিজের স্থান পাকাপোক্ত করেন। ১৯৮৮ সালে শবনম ঢাকা ও লাহোরের চলচ্চিত্রে একসঙ্গে অভিনয় করতে থাকেন। আশির দশকে ঢাকার শর্ত, সন্ধি, সহধর্মিণী, যোগাযোগ, আমার সংসার, চোর, জুলি ছবিতে অভিনয় করেন। নব্বই দশকের শেষভাগে ঢাকায় এসে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। ১৯৯৯ সালে সর্বশেষ কাজী হায়াৎ পরিচালিত ‘আম্মাজান’ চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন তিনি। ছবিটি তুমুল জনপ্রিয়তা পায় এবং শবনম এ প্রজন্মের দর্শকদের কাছেও সমান জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। এ প্রসঙ্গে শবনম বলেন, ‘আমার ভাগ্য ভালো যে, আমার অভিনীত প্রথম ও শেষ ছবি ছিল আমার ক্যারিয়ারের সেরা ছবি।’

 

যেভাবে সময় কাটছে এখন

চলতি বছরের জানুয়ারিতে পাকিস্তান বেড়াতে যান এই কিংবদন্তি। সেখানে তিনি টিভি সিরিয়ালে কাজ করেন। ১৯৯৯ সালে ‘আম্মাজান’ চলচ্চিত্রের পর শবনমকে আর এ দেশের ক্যামেরার সামনে দেখা যায়নি। তাঁর কথায় ‘কাজ করার যথেষ্ট সুযোগ আছে এমন ব্যাসিক চরিত্র পাইনি বলেই অভিনয় থেকে দূরে সরেছি। সৃষ্টিকর্তা আমাকে যে উচ্চাসন দিয়েছেন সেখানে বসে গতানুগতিক চরিত্রে তো আর অভিনয় করতে পারি না।’

সময় কীভাবে কাটে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘বই পড়ি, গান শুনি, টেলিভিশন দেখি, ঘরের কাজকর্ম করি। নিজের যত্ন নিই। এভাবেই দিন কেটে যায়।’ জীবনের এই পর্যায়ে এসে কোনো না পাওয়া কিংবা চাওয়ার কিছু আছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘অভিনয় জীবনে অনেক পেয়েছি। তেমন কিছু চাওয়ার নেই। তবে যতদিন বাঁচি যেন সুস্থ থাকি এটাই প্রত্যাশা করি। এ জীবনে কোনো আক্ষেপ নেই, কোনো ব্যথা নেই। অনেক পেয়েছি।’ তবে অভিনয়ের প্রতি এখনো আগ্রহ আছে। তিনি বলেন, ‘অভিনয়ই তো আমার পেশা। শিখেছি তো অভিনয়। অভিনয় করার ইচ্ছা আছে। তবে অভিনয় করতে না পারলে কোনো কষ্ট থাকবে না।’

করোনাকাল নিয়ে তাঁর কথা- ‘এই মহামারী পৃথিবীর সুস্থ চেহারা বদলে দিয়েছে। দুনিয়াজুড়ে এখন জীবন আর অর্থনীতি নিয়ে মানুষ চরম লড়াইয়ের মুখে। প্রকৃতির এমন বিরূপ আচরণ মানুষকে নতুন করে নিয়মতান্ত্রিক জীবনযাপনের চিন্তা এনে দিয়েছে। আর কতদিন এই মহামারীর সঙ্গে লড়তে হবে জানি না। এমন প্রতিকূলতাও কিন্তু জীবনকে থামাতে পারেনি, পারবেও না।’


আপনার মন্তব্য