বৃহস্পতিবার, ২৮ অক্টোবর, ২০২১ ০০:০০ টা

শুটিংয়েই চমক শেষ!

আলাউদ্দীন মাজিদ

শুটিংয়েই চমক শেষ!

‘আউটডোরেই ঘটনাটা বেশি ঘটে। তবে আগের আর এখনকার ঘটনার মধ্যে পার্থক্য আছে। বলতে গেলে নব্বইয়ের দশক পর্যন্ত একটি ছবির শুটিং হলে এফডিসি বা শুটিং হাউসে বহিরাগত কোনো মানুষ প্রবেশ করতে পারত না। আউটডোরে শুটিং চললে উৎসাহী লোকজনের ভিড় হতো কিন্তু তারা কোনো ছবি তুলতে পারত না বা তারকাদের কাছে সহজে ঘেঁষতে পারত না। আর এখন তো সবার হাতে হাতে মোবাইল। দূর থেকে স্টিল ছবি তুলে আর ভিডিও করে মুহুর্তেই তা ফেসবুক ও ইউটিউব চ্যানেলে ছেড়ে দিচ্ছে। এতে দর্শকরা সিনেমা হলে গিয়ে ছবিটি দেখার প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে। ফলে প্রযোজক পড়ছেন চরম আর্থিক ক্ষতির মুখে।’ এমন ক্ষোভ প্রখ্যাত সিনিয়র চিত্রপরিচালক আজিজুর রহমানের। তাঁর এমন ক্ষোভের কারণ হলো ইদানীং আমাদের দেশে কোনো ছবির শুটিং হলে দেখা যায় সঙ্গে সঙ্গে সেই ছবির দৃশ্যের ভিডিও আর স্থিরচিত্র ফেসবুক ও ইউটিউবসহ ইলেকট্রনিক আর প্রিন্ট মিডিয়ায় প্রকাশ পেয়ে যাচ্ছে। মানে দর্শকরা বলতে গেলে ছবিটি সম্পর্কে সহজেই সবকিছু জেনে যেতে পারছে। ফলে তারা সিনেমা হলে গিয়ে ছবিটি দেখার আগ্রহ দেখায় না বলে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে ছবির প্রযোজক ও সিনেমা হল মালিকরা। এর সাম্প্রতিক উদাহরণ হচ্ছে গত মাস থেকে জামালপুরে শুটিং চলছে খোরশেদ আলম খসরু প্রযোজিত, এস এ হক অলিক পরিচালিত এবং শাকিব খান ও পূজা চেরী অভিনীত ‘গলুই’ ছবির। শুটিং শুরু হওয়ার পর থেকেই প্রতিদিন ছবিটির নানা ভিডিওচিত্র ও স্থিরচিত্র ফেসবুক পেজ আর ইউটিউব চ্যানেলে ভাইরাল হচ্ছে। ‘গলুই’ ছাড়াও মৌসুমী, ওমর সানী ও জায়েদ খান অভিনীত ‘সোনার চর’ শিরোনামের একটি ছবির আউটডোর শুটিং চলছে গত মাস থেকে। এ ছবিটিরও ভিডিও এবং স্থিরচিত্র এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। একই সঙ্গে অপু বিশ্বাস ও জয় অভিনীত ‘প্রেম বন্ধন’ শীর্ষক একটি ছবির শুটিং হয়েছে গত মাসে আউটডোরে। এ ছবির নানা দৃশ্য ও গল্প ছবির অভিনয়শিল্পীরাই। আজিজুর রহমান বলেন, আশির দশকে ‘জনতা এক্সপ্রেস’ নামে একটি ছবির শুটিং করতে যাই সান্তাহার রেল স্টেশনে। সেখানে অভিনয়শিল্পী হিসেবে যান ফারুক, রোজিনা, জুলিয়াসহ অনেকে।

শুটিংয়ের খবর পেয়ে দূর-দূরান্ত থেকে হাজার হাজার মানুষ এসে ভিড় করে। এমনও হয়েছে এক দিন শুটিংয়ের সময় সান্তাহারের কাছেই তৎকালীন রাষ্ট্রপতির একটি জনসভা ছিল। কিন্তু জনগণ শুটিং দেখতে এমনই উন্মাতাল হয়ে পড়েছে যে, জনসভায় মানুষ খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। সবমিলিয়ে মানুষ যাতে ছবিটির দৃশ্য ও তারকাদের দেখে ফেলতে না পারে তার জন্য বারবার শুটিং প্যাকআপ করেছি। তখন লোকজন শুটিং দেখতে এলেও মোবাইল ছিল না, ক্যামেরায় কেউ যাতে ছবি তুলতে না পারে সেদিকে লক্ষ্য রাখা হতো। ফলে শুটিংয়ে আর চমক শেষ হতো না।

প্রখ্যাত চলচ্চিত্রকার কাজী হায়াৎ আক্ষেপ করে বলেন, আসলেই এখন উন্নত প্রযুক্তির যাচ্ছেতাই ব্যবহারের কারণে চলচ্চিত্রেরই ক্ষতি হচ্ছে। ছবির দৃশ্যগ্রহণের সঙ্গে সঙ্গে তা ছড়িয়ে পড়ছে ইউটিউব, ফেসবুকসহ নানা সাইটে। এতে ছবিটি সম্পর্কে আগেই সব জেনে যাওয়ায় দর্শক সিনেমা হলে গিয়ে ছবিটি দেখতে চায় না। শুটিংয়ে অনেক ফলস জিনিস ব্যবহার করা হয়। এগুলো দর্শকরা শুটিং দেখতে এসে দেখে ফেলছে। এ কারণে ছবিটির প্রতি দর্শকের আকর্ষণ থাকে না বলে চরম আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন নির্মাতারা। ছবির ইউনিটে অনেকের মেহমান আসার কারণে ছবির অনেক দৃশ্য ও তথ্য ফাঁস হয়ে যায়। এখন সবার হাতে মোবাইলে ক্যামেরা, প্রায় সবার রয়েছে ব্যক্তিগত ইউটিউব চ্যানেল। তাই ইনডোর বা আউটডোরে শুটিং চলার সময় সহজেই ছবিটির চিত্র ও তথ্য প্রকাশ পেয়ে যায়। এ অবস্থা রোধে ছবির পুরো ইউনিটের সতর্ক হওয়া উচিত। কাজী হায়াৎ বলেন, একবার আমার একটি ছবির জনপ্রিয় এক নায়িকাকে দেখতে আমার এক ঘনিষ্ঠ বন্ধু আবদার জানালে বাধ্য হয়ে এফডিসির মেকআপ রুমে সেই নায়িকাকে দেখাই। পরদিন আমার বন্ধুটি আমাকে বলেন, ‘আমি চরম হতাশ হয়েছি ভাই, কারণ পর্দায় অপরূপা দেখে তাঁকে স্বপ্নের মানুষ ভাবতাম। আর বাস্তবে তাঁকে দেখে রুপালি পর্দা আর আমার স্বপ্নের সঙ্গে তাঁকে মেলাতে পারিনি। সরাসরি দেখা এমন একটি কালো কুৎসিত মেয়ে কোনোভাবেই আমার স্বপ্নের নায়িকা হতে পারে না।’

কাজী হায়াৎ বলেন, তারপর থেকে আমার বন্ধু এখন পর্যন্ত ওই নায়িকার কোনো ছবি আর দেখেন না। তাই স্বপ্নের মানুষকে অন্তরালেই থাকতে হয়, রাখতে হয়।

কাজী হায়াৎ বলেন, আরেকটি ঘটনার কথা বলি, আমার এক ছবির নায়িকা ছিল কবিতা নামের একটি মেয়ে। এক দিন সে মেকআপ ছাড়া একটি মেক্সি পরে ছবিটির ডাবিংয়ে চলে আসে। আমি তাকে এ অবস্থায় দেখে রেগে গিয়ে বলি, ‘তুমি এখনই বাড়ি চলে যাও। আর কখনই এ অবস্থায় ছবির কাজে আসবে না বা বাইরেও বের হবে না। কারণ তোমাকে এমন সাধারণ অবস্থায় যদি মানুষ দেখে ফেলে তাহলে তোমার প্রতি তাদের আগ্রহ নষ্ট হয়ে যাবে এবং দর্শক আর  তোমার অভিনীত ছবি দেখবে না। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন নির্মাতা।

কাজী হায়াৎ অভিনয়শিল্পীদের উদ্দেশ করে বলেন, ‘তোমাদের বেডরুম আর ওয়াশরুম ছাড়া পার্সোনাল বিষয় বলে কিছু নেই। দয়া করে এটি মেনটেইন কর। না হলে চলচ্চিত্রের ক্ষতি হবে।’ চলচ্চিত্র প্রযোজক খোরশেদ আলম খসরু বলেন, শুটিংয়ের সময় যদি একটি ছবির সবকিছু ফাঁস হয়ে যায়, তাহলে ছবিটি দর্শক আগ্রহ হারাবে আর ক্ষতির মুখে পড়বেন নির্মাতা। আসলে এখন আউটডোরে শুটিং করতে গেলে মানুষকে কন্ট্রোল করা মুশকিল হয়ে পড়ে। উন্নত প্রযুক্তির এ যুগে সবার হাতে মোবাইল। অনেকদূর থেকেও জুম সিস্টেমে ভিডিও করে তা যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেয় তারা। ফলে আগেই সব জেনে যাওয়ায় ছবিটির প্রতি দর্শক আগ্রহ হারিয়ে যায়। খসরু দুঃখ করে বলেন, আমার ‘গলুই’ ছবির আউটডোর শুটিংয়ে জনতার ভিড় সামলাতে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের কাছে আবেদন করে ১৫ জন পুলিশের ব্যবস্থা করেছি। এ ছাড়া ১০০ জন স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীও নিয়োগ করেছি। তারপরও জনতার চাপ ঠেকাতে পারছি না। শুধু ছবি নয়, কোন তারকা কোন শটে কি কস্টিউম পরিধান করছে তাও ছবি তুলে ফাঁস করে দিচ্ছে জনতা। এতে ক্ষতি হচ্ছে প্রযোজকের। অনেক শিল্পীও ছবি ও ভিডিও প্রকাশ করে দেয়। এতে তারা প্রচার পেলেও ক্ষতি হয় লগ্নিকারকের।

তাই শিল্পীদের বলব, আপনাদের কাজ হচ্ছে অভিনয় করা, আর প্রচারের দায়িত্ব নির্মাতার। সুতরাং না বুঝে একজন নির্মাতাকে এ ধরনের কাজের মাধ্যমে ক্ষতির মুখে ফেলবেন না, প্লিজ।

এই রকম আরও টপিক

সর্বশেষ খবর