শিরোনাম
প্রকাশ : শুক্রবার, ১২ জুলাই, ২০১৯ ০০:০০ টা
আপলোড : ১১ জুলাই, ২০১৯ ২৩:৫৫

কিশোররা কেন হত্যাকাণ্ডের শিকার

সিনিয়র-জুনিয়র দ্বন্দ্ব, প্রেমঘটিত বিরোধ, আর্থিক ও মাদকসংক্রান্ত কারণে হত্যাকাণ্ড বেশি নিহত হচ্ছে ১২-১৭ বছর বয়সী শিশুরাই

জিন্নাতুন নূর

কিশোররা কেন হত্যাকাণ্ডের শিকার

বেশ কিছুদিন আগে কুমিল্লায় মডার্ন স্কুলের মোন্তাহিন ইসলাম মিরন নামে অষ্টম শ্রেণির এক ছাত্রকে তার সহপাঠীরা ছুরিকাঘাতে খুন করে। একটি অনুষ্ঠানে আসন গ্রহণ নিয়ে মিরনের সঙ্গে স্থানীয় কিশোরদের বিরোধ হয়। গত এপ্রিলে শবেবরাতে মিরনকে সেই কিশোররা হত্যা করে। একইভাবে গত মার্চে পুরান ঢাকায় কিশোর গ্যাং কালচারের জেরে ১৫ বছরের সিজান নামের আরেক কিশোরকে স্থানীয় কিশোররা হত্যা করে। সাম্প্রতিক সময়ে মিরন ও সিজানের মতো আরও অনেক কিশোর সহিংসতার শিকার হয়ে প্রাণ হারিয়েছে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে পরকীয়ায় প্রমাণ না রাখতে কিশোরদের হত্যা করা হয়। তবে কিশোর হত্যাকান্ডের ধরনগুলো বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই সিনিয়র-জুনিয়র দ্বন্দ্ব, প্রেমঘটিত বিরোধ, আর্থিক ও মাদকসংক্রান্ত কারণে কিশোররা হত্যাকান্ডের শিকার হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে পাড়ায় আধিপত্য বিস্তার নিয়ে কিশোর গ্রুপগুলোর মধ্যে সংঘর্ষের জের ধরে উল্লেখযোগ্য হত্যাগুলো ঘটছে।

বয়স বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ১২ থেকে ১৭ বছর বয়সী শিশুদেরই বেশি প্রাণ যাচ্ছে। যারা হত্যাকান্ডের শিকার বেশির ভাগই নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবারের। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই কিশোর হত্যাকা-গুলোয় চাকু ও ধারালো অস্ত্র ব্যবহার করা হচ্ছে।

বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরামের দেওয়া তথ্যে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন এ ছয় মাসে মোট ২০৫ জন শিশু-কিশোরকে হত্যা করা হয়। এর মধ্যে মা-বাবার নির্যাতনে ১৮, শারীরিক নির্যাতনের পর ৩ ও দুর্বৃত্তদের ছুরিকাঘাতে ৩ শিশু হত্যাকান্ডে র শিকার হয়। তবে বাস্তবে এবং গণমাধ্যম থেকে প্রাপ্ত খবরে আরও বেশি শিশু-কিশোর হত্যাকান্ডের শিকার হয়েছে। পিরোজপুরের মঠবাড়িয়ায় প্রতিপক্ষের ছুরিকাঘাতে আরিফ হাওলাদার (১৬) নামে এক কিশোরকে গত ২ জুন হত্যা করে স্থানীয় যুবকরা। খেলা নিয়ে বিরোধের জেরে আরিফকে গলায় চাকু মেরে হত্যা করা হয়। চলতি বছরের ২৯ জানুয়ারি ফেনী শহরের পাঠানবাড়ী সড়কে আরাফাত হোসেন নাহিদ (১২) নামের এক কিশোরকে হত্যা করে মাটিতে পুঁতে রাখে স্থানীয় কিশোরদের একটি গ্রুপ। স্থানীয় সেই কিশোর গ্রুপকে ভয় না পাওয়া ও মর্যাদা না দেওয়ায় গ্রুপটির দলনেতাসহ অন্যরা আরাফাতকে হত্যা করে। প্রেমিকাকে ভাগিয়ে নেওয়ায় চুয়াডাঙ্গায় গত মে মাসে মমিন নামের ১৬ বছরের কিশোরকে তারই বন্ধু সাফায়েত গলায় ধারালো ছুরি চালিয়ে হত্যা করে। সিলেটে প্রেমঘটিত বিরোধের জেরে ১৫ মার্চ মোস্তাফিজুর রহমান (১৫) নামে এক কিশোরকে বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে তার কিশোর বন্ধুরা পাথর দিয়ে তার মুখম ল থেঁতলে তাকে হত্যা করে। এ ছাড়া সম্প্রতি পিরোজপুরে ৫ লাখ টাকা মুক্তিপণ না পেয়ে সালাউদ্দিন (১৩) নামে এক স্কুলছাত্রকে হত্যা করে একদল কিশোর। এর আগে কিশোরগঞ্জেও আর্থিক কারণে এক কিশোরকে তার তিন সহপাঠী হত্যা করে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রাজধানীতে বহু খুন, ধর্ষণ, মাদকসহ নানা ধরনের অপরাধে শিশু-কিশোররা জড়িয়ে পড়ছে। এর আগে রাজধানীর উচ্চবিত্ত এলাকার কিশোরদের ‘গ্যাং কালচারে’ উদ্বুদ্ধ হতে দেখা গেলেও বর্তমানে পুরান ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় যেমন বংশাল, চকবাজার, সুরিটোলা, চানখাঁরপুল ও মালিটোলায়ও এ ধরনের অনেক গ্রুপ শনাক্ত করছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। আর তাদের হাতে বিগত সময়ে অনেক শিশু-কিশোরকে হত্যাকান্ডের শিকার হতেও দেখা যায়।

মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক মনোচিকিৎসক ডা. হেদায়েতুল ইসলাম বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর শিথিল ভূমিকার কারণেই কিশোর হত্যার মতো ঘটনাগুলো ঘটছে। পারিবারিক বন্ধন শিথিল হয়ে যাওয়াও এ ধরনের অপরাধ বৃদ্ধির পেছনে আরেকটি কারণ। কিশোররা এখন নিয়মশৃঙ্খলা মানতে চাচ্ছে না। সুস্থ বিনোদন ও খেলাধুলার অভাবে কিশোররা এখন নানা ধরনের অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। তুচ্ছ কারণে এক কিশোর আরেক কিশোরকে হত্যা করছে। এ ছাড়া মাদকের বিস্তার ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিভিন্ন কনটেন্ট দেখেও পাড়ায় পাড়ায় এখন কিশোর অপরাধী তৈরি হচ্ছে। তারা কোনো কিছু না ভেবেই সামান্য ঘটনায় সহপাঠী ও বন্ধুর ওপর সহিংস আক্রমণ চালাচ্ছে।

বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরামের পরিচালক আবদুছ সহীদ বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘পর্যবেক্ষণে আমরা দেখতে পাই যে, বড় বড় শহরেই এখন কিশোর হত্যার ঘটনাগুলো বেশি ঘটছে। হত্যাকা গুলোর সঙ্গে জড়িত শিশু-কিশোররা অনেকেই সচ্ছল ও শিক্ষিত পরিবারের সন্তান। এরা অ্যাডভেঞ্চারের বশে এলাকার সিনিয়র ভাইদের দেখে এ ধরনের অপরাধে উৎসাহিত হয়। অপরাধ করেও পার পেয়ে যাওয়া যায়- এমন ধারণা থেকেই কিশোর অপরাধীরা তাদের সমবয়স্কদের হত্যায় জড়াচ্ছে। এ ক্ষেত্রে পেশাজীবীদের দিয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয় কাউন্সেলিং করানোর পাশাপাশি আইনের যথাযথ প্রয়োগ আবশ্যক।’


আপনার মন্তব্য

এই বিভাগের আরও খবর