শিরোনাম
প্রকাশ : রবিবার, ১১ আগস্ট, ২০১৯ ০০:০০ টা
আপলোড : ১০ আগস্ট, ২০১৯ ২৩:৫৪

পবিত্র হজ পালিত

মোস্তফা কাজল, আরাফার ময়দান থেকে

পবিত্র হজ পালিত

আরাফার ময়দানে পৌঁছেই বুকটা হাহাকার করে উঠল। হৃদয় চিরে স্বতঃস্ফূর্তভাবে বেরিয়ে এলো লাব্বাইক...। অনবরত শুধু বলতে লাগলাম, ‘লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক। ইন্নাল হামদা ওয়ান নি’মাতা, লাকা ওয়াল মুলক; লা শারিকা লাক।’ লাখ লাখ হাজির কণ্ঠ চিরে বারবার একই ধ্বনি একইভাবে চারিদিকে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। ‘আমি হাজির, হে আল্লাহ আমি  হাজির, তোমার কোনো শরিক নেই, সব প্রশংসা ও নিয়ামত শুধু তোমারই, সব সাম্রাজ্যও তোমার।’ সবার চোখের কোণ বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে অশ্রু। সবার চোখ জাবালে রহমতের দিকে। প্রায় দেড় হাজার বছর আগে হিজরি ১০ সালে (৬৩২ খ্রিস্টাব্দে) হজের দিনে এই আরাফার ময়দানে জাবালে রহমতে দাঁড়িয়ে প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) শেষ হজের দিন ঐতিহাসিক এক ভাষণ দিয়েছিলেন, ইতিহাসে যা বিদায় হজের ভাষণ হিসেবে উল্লেখ আছে। এই ভাষণে মুসলমানদের করণীয় সম্পর্কে বিশেষ করে ইসলামে মানুষের মর্যাদা, নারীর অধিকার, পারস্পরিক সম্পর্ক ও মানবিক মূল্যবোধ সম্পর্কে চূড়ান্ত দিকনির্দেশনা দিয়েছিলেন। সেই থেকে প্রতি বছর ৯ জিলহজ আরাফার ময়দানে হজের খুতবা দেওয়া হয়। তবে তা দেওয়া হয় মসজিদে নামিরা থেকে। গতকাল দুপুরে মসজিদে নামিরায় হজের খুতবা দেন সৌদি আরবের গ্রান্ড মুফতি ড. মুহাম্মদ বিন হাসান আল-শাইখ। দীর্ঘ লিখিত খুতবায় তিনি মুসলিম উম্মাহকে সঠিক ইসলামের পথে ফিরে আসার আহ্বান জানান। আমলের ত্রুটির কারণে মুসলিমরা দুর্যোগের শিকার হবে বলে খুতবায় সতর্কতা অবলম্বনের কথা বলা হয়। এ জন্য মুসলমানদের আমল পরিশুদ্ধ করার তাগিদ দেওয়া হয়। কোরআন ও হাদিসের উদ্ধৃতি দিয়ে মুসলিম উম্মাহকে তাকওয়া অবলম্বনের আহ্বান জানানো হয়। খুতবায় হারামাইন শরিফাইনের মর্যাদা ও সম্মান রক্ষার আহ্বান জানানো হয়। খুতবায় মুহাম্মদ বিন সালমানের কথাও উল্লেখ করা হয়। তার দীর্ঘ হায়াত ও কল্যাণের জন্যও দোয়া করা হয়। সৌদি রাজপরিবারের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানানো হয়। এবার সৌদি বাদশা সালমান বিন আবদুল আজিজসহ রাজপরিবারের সদস্যদের অনেকে হজ পালন করছেন। খুতবার পর সৌদি বাদশা সালমান বিন আবদুল আজিজ বিশ্বের মুসলমানদের ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, যে কোনো পরিস্থিতিতে মুসলমানদের এক ও অভিন্ন থাকতে হবে। এক না থাকলে সমস্যার সৃষ্টি হবে। শত্রুরা সুযোগ নেবে। এ সময় তিনি আগামীতে হজের সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধির আশ্বাস দেন। তিনি বলেন, সব হাজী সমান। সবাই সমান মর্যাদার অধিকারী। হজের খুতবা শোনার পর আমরা আরাফার ময়দানে জোহর ও আসরের নামাজ একসঙ্গে আদায় করি। এরপর মোনাজাতে বিশ্বের নির্যাতিত মুসলমানদের মুক্তি ও মুসলিম উম্মাহর শান্তি ও কল্যাণ কামনা করা হয়। বাংলাদেশ টেলিভিশন গতকাল হজ সরাসরি সম্প্রচার করেছে। আল্লাহর অনুগ্রহ পাওয়ার জন্য আরাফার ময়দানে হাজির হয়ে খুতবা শোনার মধ্য দিয়ে শেষ হয় হজের মূল আনুষ্ঠানিকতা। খুতবার পরপরই মসজিদে নামিরায় এক আজানে জোহর এবং আসরের নামাজ আদায় করি। স্থানীয় সময় দুপুর আড়াইটা পর্যন্ত ছিল প্রচ  গরম। হাজীরা গরমে হাঁসফাঁস করছিলেন। এর মধ্যে হঠাৎ আকাশ কালো হয়ে শুরু হয় ঝড়-বৃষ্টি। এই বৃষ্টিকে অনেকেই রহমতের বৃষ্টি বলে শোকরিয়া জ্ঞাপন করেন। এর মধ্যেই সূর্যাস্ত পর্যন্ত আরাফাতের ময়দানে অবস্থান করেন হাজীরা। এখন বাকি রয়েছে আরও দুটি প্রধান আনুষ্ঠানিকতা। শয়তানকে পাথর মারা এবং কোরবানি করা। গতকাল সূর্যাস্ত পর্যন্ত আরাফাতের ময়দানে অবস্থান করে সূর্যাস্তের পর মাগরিবের নামাজ আদায় না করে রওনা হই মুজদালিফার উদ্দেশ্যে। সেখানে পৌঁছানোর পর খোলা আকাশের নিচে একসঙ্গে মাগরিব ও এশার নামাজ আদায় করি। শয়তানের ধোঁকা থেকে বাঁচার জন্য হজরত ইব্রাহিম (আ.)-এর নির্দেশে তার পুত্র হজরত ইসমাইল (আ.) যেভাবে পাথর ছুড়ে মেরেছিলেন, তা পালন করার জন্য আমরা এখান থেকে ৪৯টি ছোট আকারের কঙ্কর সংগ্রহ করি। রবিবার ফজরের নামাজ আদায়ের পর হাজীরা ফিরে যাবেন মিনার তাঁবুতে। আজ ১০ জিলহজ (সৌদি আরব) সূর্যোদয়ের পর  জামারাতে আকাবায় (বড় শয়তানকে) ৭টি কঙ্কর মারতে যাব। তারপর আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে পশু কোরবানি করা হবে। আমার ইচ্ছা আছে কোরবানির সময় নিজে উপস্থিত থাকার। কোরবানির পর পুরুষরা মাথা মু ন করবেন। এরপর সব হাজীর সঙ্গে আমরা মক্কায় ফিরে আল্লাহর ঘর বায়তুল্লাহ শরিফে সাতবার তাওয়াফ করব এবং পরে মা হাজেরা (আ.)-এর পুণ্য স্মৃতির বরকত পাওয়ার আশায় সাফা-মারওয়া দুই পাহাড়ের মাঝে সাতবার সায়ী করব। এরপর মিনায় নিজ নিজ তাঁবুতে ফিরে আসব। ১১ ও ১২ জিলহজ প্রতিদিন ২১টি করে কঙ্কর মারতে যাব তিন শয়তানকে। প্রথমে ছোট, তারপর মাঝারি ও সবশেষে বড় জামারাতে শয়তানের প্রতি পর্যায়ক্রমে কঙ্কর ছুড়ব। এরই মাধ্যমে হাজীরা একদিকে সুন্নাত পালন করেন, অপরদিকে শয়তানের প্ররোচনা থেকে বেঁচে থাকার শপথ নেন। হজব্রত পালনের আগে বা পরে হাজীরা আল্লাহর প্রিয় হাবিব রসুলুল্লাহ (সা.)-এর রওজা মুবারক জিয়ারত করার জন্য মদিনা শরিফ সফর করে থাকেন। আমি হজ শেষ করেই যাব প্রিয় নবী (সা.)-এর জিয়ারতে মদিনায়।


আপনার মন্তব্য