Bangladesh Pratidin || Highest Circulated Newspaper

শিরোনাম
প্রকাশ : সোমবার, ২১ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:০০ টা
আপলোড : ২০ অক্টোবর, ২০১৯ ২৩:৩৬

টং দোকানদার থেকে কয়েকশ কোটি টাকার মালিক রাজীব

অঢেল সম্পদ জি কে শামীমের ৬ দিনেও করা যায়নি তালিকা

নিজস্ব প্রতিবেদক

টং দোকানদার থেকে কয়েকশ কোটি টাকার মালিক রাজীব
কাউন্সিলর রাজীব

বাবা রড মিস্ত্রি, চাচা রাজমিস্ত্রি। নিজে ছিলেন টং দোকানদার। করতেন যুবলীগ। নাম তার তারেকুজ্জামান ওরফে রাজীব। রাজধানীর মোহাম্মদপুরে সশস্ত্র সন্ত্রাসী বাহিনী গড়ে তুলে শুরু করেন চাঁদাবাজি, দখলবাজি, টেন্ডারবাজি, মাদক ব্যবসা। এরপর পদ পান। হয়ে ওঠেন মোহাম্মদপুর থানা যুবলীগের যুগ্ম আহ্বায়ক। এক মুক্তিযোদ্ধাকে লাঞ্ছিত করার অভিযোগে তাকে সংগঠন থেকে বহিষ্কার করা হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে দেড় কোটি টাকায় আবারও যুবলীগে ফিরে আসেন। ঢাকা মহানগর উত্তর যুবলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হন তিনি। আসে নির্বাচন। ২০১৫ সালে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে কাউন্সিলর নির্বাচিত হন। পেছনে ফিরে আর তাকাতে হয়নি রাজীবের। যেন আলাদিনের চেরাগ পেয়ে গেলেন হাতে।

কাউন্সিলর হওয়ার আগ পর্যন্ত রাজীবের দৃশ্যমান কোনো ধরনের ব্যবসা বা পেশা ছিল না। বর্তমানে সিটি করপোরেশন থেকে যে সম্মানি পান সেটা তার একমাত্র প্রধান আয়। যুবলীগের সাইনবোর্ড আর কাউন্সিলরের পদটি ব্যবহার করে হয়ে ওঠেন ডন। বিগত চার বছরে আট থেকে ১০টির বেশি নামিদামি ব্র্যান্ডের গাড়ি কিনেছেন। গুলশান ও মোহাম্মদপুরে আটটি ফ্ল্যাট রয়েছে তার। মোহাম্মদীয়া হাউজিং সোসাইটির ১ নম্বর রোড এলাকায় পানির পাম্পের জন্য নির্ধারিত জায়গায় বাড়ি বানিয়েছেন। বাড়ির জায়গাটির দামই প্রায় সাড়ে তিন কোটি টাকা। তার যে একটি রাজকীয় বাড়ি রয়েছে সেটির বাজারমূল্য প্রায় ১০ কোটি টাকা। বাড়ির আসবাবপত্র থেকে শুরু করে প্রতিটি জিনিস তিনি বিদেশ থেকে আমদানি করে এনেছেন। বেশ কিছুদিন ধরে আলোচনার মধ্যেই শনিবার রাতে ভাটারা থানা এলাকার এক বন্ধুর বাসায় আত্মগোপনে থাকা ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ৩৩ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর তারেকুজ্জামান রাজীবকে গ্রেফতার করে র‌্যাব। এ সময় ওই বাসা থেকে সাতটি বিদেশি মদের বোতল, একটি পিস্তল, একটি ম্যাগাজিন, তিন রাউন্ড গুলি, নগদ ৩৩ হাজার টাকা ও একটি পাসপোর্ট জব্দ করা হয়। গ্রেফতারের পর তাকে গতকাল রাতে ভাটারা থানায় হস্তান্তর করে র‌্যাব। তার বিরুদ্ধে অস্ত্র ও মাদকের দুটি মামলা করা হয়েছে। শনিবার রাতে ভাটারায় একটি বাসা থেকে গ্রেফতারের পর তাকে নিয়ে মোহাম্মদপুরের বাসা ও কার্যালয়ে তল্লাশি চালায় র‌্যাব। রাতভর এ অভিযানে শুধু পাঁচ কোটি টাকার চেক ছাড়া আর কিছুই পাওয়া যায়নি। র‌্যাবের ধারণা, আগে থেকেই সতর্ক থাকায় কাউন্সিলর রাজীব আর্থিক লেনদেনের আলামত সরিয়ে ফেলেছেন। র‌্যাব জানায়, সন্ত্রাসবাদ, চাঁদাবাজি এবং দখলদারিত্বের মতো সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে রাজীবকে গ্রেফতার করা হয়েছে। মোহাম্মদপুরের বাসায় অভিযান শেষে র‌্যাবের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সারওয়ার আলম বলেন, ‘আমরা মোহাম্মদপুরে তার বাসা এবং অফিসে তল্লাশি করেছি। সেখানে তেমন কিছু পাইনি। কারণ আমরা যা বুঝতে পেরেছি, তার বাড়িতে আর্থিক লেনদেন-সংক্রান্ত যেসব ডকুমেন্ট ছিল সেগুলো সরিয়ে ফেলা হয়েছে। তবে তারই একজন সহযোগীর আত্মীয়ের বাড়ি থেকে একটি চেকবই উদ্ধার করা হয়েছে। বইটিতে দেখা গেছে, ব্র্যাক ব্যাংকের একটি অ্যাকাউন্টে একদিনে (তিনটি চেকের মাধ্যমে) পাঁচ কোটি টাকা জমা দেওয়া হয়েছে। আমরা এগুলো তদন্ত করে দেখছি কোথায় টাকা জমা দিয়েছেন, টাকাগুলো কোথায় গিয়েছে।’ আপাতত তার বিরুদ্ধে অস্ত্র ও মাদক আইনে দুটি মামলা হয়েছে উল্লেখ করে র‌্যাবের অপর এক কর্মকর্তা জানান, অর্জিত আয়ের উৎস এবং অর্থ পাচারের বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে। অবৈধভাবে সম্পদ অর্জন এবং এই অর্থ তিনি কোথায় খরচ করেছেন তাও দেখা হবে। যদি এখানে মানি লন্ডারিংয়ের কোনো বিষয় থাকে তখন তার বিরুদ্ধে মানি লন্ডারিং মামলা হবে। ম্যাজিস্ট্রেট সারওয়ার আলম বলেন, ‘রাজীবের সহযোগী এবং তার সঙ্গে জড়িত এমন আত্মীয় বা অনাত্মীয় প্রত্যেকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আমরা তো আসলে তার বৈধ আয়ের কোনো কিছুই দেখতে পাচ্ছি না।’ সারওয়ার আলম বলেন, ‘তার যে একটি রাজকীয় বাড়ি রয়েছে এ বাড়িটির বাজারমূল্য প্রায় ১০ কোটি টাকা। বাড়ির আসবাবপত্র থেকে শুরু করে প্রতিটি জিনিস তিনি বিদেশ থেকে আমদানি করে এনেছেন। এসব জ্ঞাত আয়বহির্ভূত বলে আমাদের মনে হয়েছে।’ তিনি বলেন, কাউন্সিলর হওয়ার আগ পর্যন্ত তার দৃশ্যমান কোনো ধরনের ব্যবসা বা পেশা ছিল না। বর্তমানে সিটি করপোরেশন থেকে যে সম্মানি তিনি পান সেটা তার একমাত্র প্রধান আয়। এ ছাড়া যে অবৈধ লেনদেনের বিষয়গুলো রয়েছে, সেসব তদন্ত সাপেক্ষে বেরিয়ে আসবে। উল্লেখ্য, ২০১৫ সালে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ৩৩ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার আগে দৃশ্যমান কোনো ব্যবসাই ছিল না মোহাম্মদপুরের সুলতান তারেকুজ্জামান রাজীবের। বর্তমানেও কাউন্সিলর হিসেবে সরকারি সম্মানির বাইরে কোনো আয়ের উৎস নেই তার। তবু সম্পদের পাহাড় গড়েছেন স্বঘোষিত ‘জনতার কাউন্সিলর’ রাজীব। ২০১৫ সালে কাউন্সিলর নির্বাচনে তিনি ছিলেন আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী। দলীয় প্রার্থী ও মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহসভাপতি শেখ বজলুর রহমানকে হারিয়ে নির্বাচিত হন তিনি।

অঢেল সম্পদ জি কে শামীমের, ৬ দিনেও করা যায়নি তালিকা : টেন্ডার মাফিয়া জি কে শামীমের সম্পদের তালিকা তৈরি করা যায়নি ছয় দিনেও। সম্পদের ২ হাজারের বেশি ডকুমেন্ট যাচাই-বাছাই করতেই সময় চলে যাচ্ছে সিআইডি কর্মকর্তাদের। চলমান ক্যাসিনোবিরোধী অভিযানের মাধ্যমে আলোচনায় আসেন যুবলীগ নেতা ‘টেন্ডার মাফিয়া’ খ্যাত গোলাম কিবরিয়া শামীম ওরফে জি কে শামীম। আটকের পর তার বিরুদ্ধে মানি লন্ডারিং আইনে মামলা হয়। এই মামলার তদন্তে নেমে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে তার স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের তথ্য চেয়ে চিঠি দেয় পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। জি কে শামীমের সম্পদের তথ্য গত ১৫ অক্টোবর সিআইডির কাছে পাঠিয়েছে ১২টি সংস্থা। তার সম্পদের ব্যাপ্তি এতটাই যে, সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে ২ হাজার ডকুমেন্ট পাঠাতে হয়েছে সিআইডিতে। সিআইডি রাত-দিন কাজ করে চলেছে এই টেন্ডার মাফিয়ার সম্পদের হিসাব করতে। তবে গতকাল পর্যন্ত ৬ দিনেও সব ডকুমেন্ট পড়ে তার সম্পদের তালিকা করা সম্ভব হয়নি। সিআইডির অর্গানাইজড ক্রাইমের ডিআইজি ইমতিয়াজ আহমেদ বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, মানি লন্ডারিং মামলাগুলোর তদন্তে অনেক গভীরে যেতে হয়। এ জন্য সময়ের প্রয়োজন। জি কে শামীমের স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের বিবরণ আমরা পাচ্ছি। এছাড়া দেশের বাইরে তার সম্পদের বিষয়ে খোঁজ নেওয়া হচ্ছে। বিভিন্ন সংস্থার কাছ থেকে সিআইডির প্রাপ্ত তথ্য এবং গ্রেফতারকৃত জি কে শামীমের দেওয়া তথ্য মিলিয়ে দেখা হবে। কোথায় কোথায় গরমিল আছে সেগুলো খুঁজে বের করা হবে। গত ২০ সেপ্টেম্বর রাজধানীর নিকেতনে ৫ নম্বর সড়কের ১৪৪ নম্বর ভবনে জি কে শামীমের কার্যালয়ে অভিযান চালায় র‌্যাব। তার অফিস থেকে বিপুল অর্থ ও মদসহ তাকে গ্রেফতার করা হয়। তার বিরুদ্ধে অবৈধ অস্ত্র, বিপুল পরিমাণ টাকা রাখার অভিযোগে পৃথক দুটি মামলা করে র‌্যাব।

২১ সেপ্টেম্বরে অস্ত্র ও মাদক মামলায় তাকে ১০ দিনের রিমান্ডে পাঠায় আদালত। দুই মামলায় পাঁচ দিন করে রিমান্ড মঞ্জুর হয় তার। এছাড়া শামীমের সাত দেহরক্ষীকে অস্ত্র মামলায় চার দিনের রিমান্ড দেওয়া হয়। এরপর গত ২ অক্টোবর জি কে শামীমকে আদালতে হাজির করে আবারও রিমান্ড চাওয়া হয়। দ্বিতীয় দফায় দুই মামলায় জি কে শামীমের ৯ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করে আদালত।


আপনার মন্তব্য

এই বিভাগের আরও খবর