শিরোনাম
প্রকাশ : মঙ্গলবার, ১৯ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ টা
আপলোড : ১৮ নভেম্বর, ২০১৯ ২৩:৩২

চ্যালেঞ্জে সড়ক আইন

একদিকে সংশোধনের চাপ মালিক-চালকদের, অন্যদিকে বিধিমালা না হওয়ায় বেকায়দায় প্রয়োগকারীরা

আরাফাত মুন্না

চ্যালেঞ্জে সড়ক আইন
নতুন পরিবহন আইন কার্যকরের প্রথম দিনে গতকাল রাজধানীতে ছিল পরিবহন সংকট। ফাঁকা ছিল অনেক রাস্তা -বাংলাদেশ প্রতিদিন

নতুন সড়ক পরিবহন আইনের ৪ নম্বর ধারাটি ড্রাইভিং লাইসেন্স সংশ্লিষ্ট। এ ধারার ৩ নম্বর উপধারায় বলা হয়েছে, ‘মোটরযানের শ্রেণি বা ক্যাটাগরি ও আনুষঙ্গিক অন্যান্য বিষয় বিধি দ্বারা নির্ধারিত হইবে।’ ঠিক একইভাবে মোটরযানের নিবন্ধন, ফিটনেস সনদের মেয়াদ, গণপরিবহনের চলাচলের অনুমতি (রুট পারমিট)সহ আরও বেশ কিছু ধারায়ও বিধির কথা বলা আছে। তবে গত বছর ১৯ সেপ্টেম্বরে সংসদে আইন পাস করার পর গতকাল পর্যন্ত এ আইনের অধীনে কোনো বিধিমালা হয়নি। ফলে পূর্ব প্রস্তুতি ছাড়া নতুন সড়ক পরিবহন আইন কার্যকর করতে গিয়ে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো। অন্যদিকে কয়েকটি বিধান সংশোধনের জন্য চাপ রয়েছে মালিক-চালক-শ্রমিকদের পক্ষ থেকে। দেশের বিভিন্ন স্থানে গতকাল ধর্মঘটও পালন করেছেন তারা। নতুন আইন ও পুরনো বিধিমালার গোঁজামিলেই চলছে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) দৈনন্দিন কাজকর্ম। আর এই আইন কার্যকরে বড় ভূমিকায় থাকা পুলিশও সফটওয়্যার আপডেট না হওয়া ট্রাফিক আইন ভঙ্গে জরিমানা বা মামলা করতে পারছে না। তবে নতুন সড়ক পরিবহন আইন অনুযায়ী বিভিন্ন অপরাধের সাজা উল্লেখ করে রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে ঢাকা মহানগর পুলিশের পক্ষ থেকে বিলবোর্ড লাগানো হয়েছে। মাইকে প্রচারও চালানো হচ্ছে। আইনজ্ঞরা বলছেন, বিধিমালা হচ্ছে আইনের চালক। আইনের অস্পষ্ট বিষয়গুলো স্পষ্ট করার জন্য বিধিমালা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই বিধিমালা প্রণয়ন ছাড়া এই আইন পুরোপুরি কার্যকর করা সম্ভব নয়। তারা আরও বলেন, এক বছর আগে সংসদে আইনটি পাস হওয়ার পর এ পর্যন্ত বিধিমালা না হওয়াটা চরম ব্যর্থতার প্রমাণ দেয়। এ এক বছরে নতুন আইন সম্পর্কে জনসচেতনতা তৈরিতেও কাজ করা যেত বলে মত তাদের। এই পরিস্থিতিতে ১ নভেম্বর কার্যকর হওয়া নতুন সড়ক আইন অনেকটা কাগজেই রয়ে গেছে।

জনসচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের আইনটির প্রয়োগ এক সপ্তাহ পিছিয়ে দিয়েছিলেন। এই নির্ধারিত সময় শেষ হওয়ার প্রাক্কালে গত ৭ নভেম্বর বনানীর বিআরটিএ কার্যালয়ে কর্মকর্তাদের নিয়ে সভা করেন ওবায়দুল কাদের। ওই বৈঠকে নতুন আইন কার্যকর করার সময় আরও এক সপ্তাহ বাড়ানোর ঘোষণা দেন মন্ত্রী। মৌখিক ঘোষণা অনুযায়ী সেই সময় শেষ হয়েছে। বিআরটিএ সূত্র বলছে, আইনের বিধিমালা প্রণয়নের কাজ চূড়ান্ত পর্যায়ে। তবে এটি গেজেট আকারে প্রকাশ করতে আরও কয়েক দিন সময় লাগবে। এখন যানবাহনের নিবন্ধন, ফিটনেস সনদ প্রদান, চালকের লাইসেন্স দেওয়াসহ দৈনন্দিন নানা কাজ আগের বিধিমালা মেনে করা হচ্ছে। সংস্থাটি ঢাকাসহ সারা দেশে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে থাকে। নতুন আইন কার্যকর হওয়ার পর ভ্রাম্যমাণ আদালতের কার্যক্রম বন্ধই ছিল। গত রবিবার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় মোবাইল কোর্ট আইন-২০০৯ এর তফসিল সংশোধন করে সড়ক পরিবহন আইনের সংশ্লিষ্ট ধারা পুনঃস্থাপন করার পর গতকাল রাজধানীতে কয়েকটি স্থানে মোবাইল কোর্ট পরিচালনার খবর পাওয়া গেছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. শাহদীন মালিক বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, যে কোনো আইনের কোনো ধারায় যদি বলা থাকে বিধি দ্বারা নির্ধারিত হবে, তবে বিধি প্রণয়ন ছাড়া ওই ধারাগুলো কার্যকর করা যাবে না। তিনি বলেন, যেমন নতুন সড়ক পরিবহন আইনে ড্রাইভিং লাইসেন্সের কথা উল্লেখ আছে, তবে কোন প্রক্রিয়ায় বা কীভাবে এই ড্রাইভিং লাইসেন্স পাওয়া যাবে, তা কিন্তু আইনে উল্লেখ নেই। সেখানে বলা আছে বিধি দ্বারা নির্ধারিত হবে। ফলে এই বিধি প্রণয়নের আগ পর্যন্ত এই ধারাটিও কার্যকর হবে না। তিনি আরও বলেন, আইনটি এক বছরেরও বেশি সময় আগে সংসদে পাস হয়েছে। এই সময়ের মধ্যে এই বিধিমালা প্রণয়ন করতে না পারা দুঃখজনক ও চরম ব্যর্থতা। এটা অদক্ষতারও প্রমাণ দেয়। তিনি আরও বলেন, আইন কার্যকরে গেজেট প্রকাশের পর জনসচেতনতা তৈরির জন্য সময় নেওয়া হচ্ছে। এই জনসচেতনতা তো গত এক বছরেই করা যেত। বিধি প্রণয়নের বিষয়ে একই ধরনের মতামত দিয়েছেন নতুন এ আইন কার্যকর করতে হাই কোর্টে রিটকারীর আইনজীবী মনজিল মোরসেদও। হিউম্যান রাইটর্স অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশের এই সভাপতি বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, নতুন সড়ক পরিবহন আইনের যেসব ধারায় বিধি প্রণয়নের কথা বলা আছে, সেই সব ধারা বিধি প্রণয়ন ছাড়া কার্যকর করা যাবে না। আইনের অস্পষ্টতা দূর করতে বিধি প্রণয়ন অত্যন্ত জরুরি। বিধি হচ্ছে আইনের চালক। তিনি বলেন, নতুন সড়ক পরিবহন আইনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অনেকের কাছ থেকে শুনেছিলাম, আইনের সঙ্গে সঙ্গেই বিধির খসড়া করেও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া হয়েছে। এখন সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয় কেন বিধিমালার গেজেট প্রকাশ করছে না, সেটাই জানার বিষয়। এখানে মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের কারসাজি থাকতে পারে।

নতুন আইনে যত অস্পষ্টতা : পুরনো আইনে চালকের লাইসেন্স পাওয়ার পরীক্ষার সিলেবাস ও ফি বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা ছিল। কিন্তু নতুন আইনে এই দুটি বিষয়ের উল্লেখ নেই। তবে নতুন আইন অনুযায়ী চালকের লাইসেন্স পাওয়ার সর্বনিম্ন শিক্ষাগত যোগ্যতা অষ্টম শ্রেণি বা সমমানের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার বিষয়টি বিআরটিএ কার্যকর করছে। সূত্র জানায়, কিন্তু চালকের লাইসেন্স পরীক্ষা এখনো আগের আইন অনুযায়ী হচ্ছে। প্রাইভেট কার ও মোটরসাইকেল ছাড়া সব যানবাহন চলাচলের জন্য প্রতি বছর ফিটনেস সনদ নিতে হয়। পুরনো আইনে তা স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকলেও নতুন আইনে ফিটনেসের মেয়াদ কত দিনের হবে, তা বলা নেই। ফলে বিআরটিএ এখনো পুরনো আইনেই ফিটনেস সনদ দিচ্ছে। এ ছাড়া গণপরিবহন চলাচলের অনুমতি দেওয়ার জন্য মহানগর ও জেলাগুলোতে পরিবহন কমিটি রয়েছে। পুরনো আইনে কমিটি তিন বছরের জন্য চলাচলের অনুমতি দিতে পারে। এরপর তা নবায়ন করতে হয়। তবে নতুন আইনে অনুমোদনের মেয়াদ উল্লেখ নেই। নতুন আইনে মোটরযানের নিবন্ধন দেওয়ার বিষয়েও জটিলতা আছে। পুরনো আইনে নিবন্ধন নম্বরের আগে সংশ্লিষ্ট জেলা বা মহানগরের নাম জুড়ে দেওয়ার বিধান রয়েছে। যেমন ঢাকা মহানগরের জন্য নিবন্ধন চিহ্ন হচ্ছে ‘ঢাকা মেট্রো’, চট্টগ্রাম মহানগরের জন্য ‘চট্টঃ মেট্রো’। কিন্তু নতুন আইনে এই বিষয়টি উল্লেখ নেই। ফলে বিআরটিএ এখন নিবন্ধন দিচ্ছে আগের আইনের নির্দেশনা মেনে। এ ছাড়া পুরনো ও নতুন, দুই আইনেই মোটরযান চালানোর নিয়ম মেনে চলার কথা বলা হয়েছে। তবে নতুন আইনে সেই নিয়ম কী কী, তা উল্লেখ নেই। পুরনো আইনে নবম তফসিল নামে কয়েক পাতার নির্দেশনা রয়েছে। এগুলোর মধ্যে ট্রাফিক সিগন্যাল ও সাইনের ছবি দিয়ে কোনটি মানতে হবে এবং কীভাবে তা ব্যবহার করা হবে, এর নির্দেশনা রয়েছে। নতুন আইনে তা নেই।


আপনার মন্তব্য

এই বিভাগের আরও খবর