শিরোনাম
প্রকাশ : শুক্রবার, ১০ জুলাই, ২০২০ ০০:০০ টা
আপলোড : ৯ জুলাই, ২০২০ ২৩:৫৪

কীভাবে বাতিল হবে পাপুলের এমপি পদ

নাগরিক নন জানিয়েছে কুয়েত সরকার

আরাফাত মুন্না

কীভাবে বাতিল হবে পাপুলের এমপি পদ

বহুল আলোচিত এমপি শহীদ ইসলাম পাপুলের কুয়েতের নাগরিকত্ব নিয়ে নানা আলোচনা-সমালোচনার পর গতকাল কুয়েত সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়ে দিয়েছে, পাপুল সে দেশের নাগরিক নন। এখন পাপুলের সংসদ সদস্য পদের কী হবে, বিদেশে সাজা হলে এ দেশের এমপি পদ বাতিল হবে কি না- এমন প্রশ্নই সব মহলে। আইনজ্ঞরা বলছেন, সংবিধানে নৈতিক স্খলনজনিত অপরাধে ন্যূনতম দুই বছর সাজায় এমপি পদ খারিজ হওয়ার বিধান থাকলেও, সাজা দেশে হবে, না বিদেশে, তা অস্পষ্ট। ফলে কুয়েতে সাজা হলেও বাংলাদেশের সংসদে পাপুলের পদ খারিজ হবে বলেই মত তাদের। তবে এ ক্ষেত্রে কুয়েতের আদালতের রায়ের অনুলিপি পাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে- মত আইনজ্ঞদের। মারাফি কুয়েতিয়া কোম্পানির অন্যতম মালিক লক্ষ্মীপুর-২ আসন থেকে নির্বাচিত স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য শহীদ ইসলাম পাপুলকে ৬ জুন রাতে কুয়েতের মুশরিফ এলাকা থেকে গ্রেফতার করা হয়। পাচারের শিকার পাঁচ বাংলাদেশির অভিযোগের ভিত্তিতে মানব পাচার, অর্থ পাচার ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের শোষণের অভিযোগ আনা হয় তার বিরুদ্ধে। প্রবাসী উদ্যোক্তাদের প্রতিষ্ঠিত এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংকেও পাপুলের বড় অঙ্কের শেয়ার রয়েছে। কুয়েতে গ্রেফতার হওয়ার পর তাকে ওই ব্যাংকের ভাইস চেয়ারম্যানের পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। পাপুল ও তার কোম্পানির ব্যাংক হিসাব ইতোমধ্যে জব্দ করেছে কুয়েত কর্তৃপক্ষ। বাংলাদেশেও তার বিষয়ে তদন্ত শুরু করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ। সংবিধানে সংসদ সদস্যপদ বাতিল-সংক্রান্ত অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘কোনো ব্যক্তি সংসদের সদস্য নির্বাচিত হইবার এবং সংসদ-সদস্য থাকিবার যোগ্য হইবেন না, যদি কোনো উপযুক্ত আদালত তাকে অপ্রকৃতিস্থ বলিয়া ঘোষণা করেন; তিনি দেউলিয়া ঘোষিত হওয়ার পর যদি দায় হইতে অব্যাহতি লাভ না করেন; তিনি কোনো বিদেশি রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব অর্জন করেন কিংবা কোনো বিদেশি রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য ঘোষণা বা স্বীকার করেন; তিনি নৈতিক স্খলনজনিত কোনো ফৌজদারি অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হয়ে কমপক্ষে দুই বছরের কারাদন্ডে দন্ডিত হন; তিনি যদি প্রজাতন্ত্রের কোনো লাভজনক পদে অধিষ্ঠিত থাকেন; সংসদের অনুমতি ছাড়া তিনি যদি একটানা নব্বই বৈঠকে অনুপস্থিত থাকেন।’ এ ছাড়া সংবিধানের বহুল আলোচিত ৭০ অনুচ্ছেদের আলোকে যদি তার দল থেকে পদত্যাগ করেন অথবা সংসদে ওই দলের বিপক্ষে ভোট দেন তাহলে একজনের সংসদ সদস্য পদ বাতিল হতে পারে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে সংবিধানের অন্যতম প্রণেতা জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ব্যারিস্টার এম আমীর-উল ইসলাম বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘এমপি পাপুলের বিষয়ে আমি যতটুকু জানতে পেরেছি তা সংবাদপত্রে প্রকাশিত খবর থেকেই। কিন্তু এর প্রকৃত ঘটনা কী হয়েছে, সেটি নিশ্চয়ই কুয়েতে থাকা বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত সরকারকে অবহিত করেছেন বা করবেন। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে তদন্ত করে পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারেন। তবে এ ক্ষেত্রে তাকে (পাপুল) কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়ে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়া উচিত।’ তিনি বলেন, ‘কারাদন্ড হলেও এমপি পদ খারিজ হওয়া-সংক্রান্ত আইনে কিছুটা অস্পষ্টতা রয়েছে। এ জন্য আমি মনে করি, একজন জনপ্রতিনিধি হিসেবে তারও দেশের জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতা রয়েছে।’ কুয়েতে সাজা হলে পাপুলের এমপি পদ থাকে কি না, এমন প্রশ্নে সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ বলেন, ‘একজন সংসদ সদস্য যদি ফৌজদারি অপরাধ করেন, সাজা পৃথিবীর যেখানেই হোক, তাহলে তার এমপি পদ থাকবে না। এমপি পদ খারিজের জন্য শুধু প্রমাণ হতে হবে, তিনি ফৌজদারি অপরাধ করেছেন, সেই অপরাধের জন্য তার সাজা হয়েছে।’ জানতে চাইলে সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. শাহদীন মালিক বলেন, ‘আমাদের সংবিধানে বলা আছে দুই বছরের অধিক কারাদন্ড হলে সংসদ সদস্য পদ বাতিল হয়ে যাবে। বিচার দেশীয় আইনে হতে হবে কি না, এখানে এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। আমার মত হবে, শাস্তি হওয়া, জেল খাটা কয়েদিকে তো আর কেউ এমপি হিসেবে রাখতে চাইবেন না।’ তিনি বলেন, ‘পাপুলের এ বিষয়টি একেবারেই নতুন। এমন প্রশ্ন এর আগে আসেনি। আমি মনে করি এর ব্যাখ্যা জানতে যদি আদালতেও যেতে হয়, তাহলে আদালতও বলবেন, যিনি জেল খেটেছেন, তিনি খারাপ লোক। ফলে তার এমপি পদ থাকতে পারে না।’ স্পিকার ও নির্বাচন কমিশন এ বিষয়ে ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন বলেও জানান তিনি। এ বিষয়ে হাই কোর্টের সাবেক বিচারপতি ব্যারিস্টার এ বি এম আলতাফ হোসেন বলেন, ‘একজন এমপি যে দেশেই গ্রেফতার হোক, যদি নৈতিক স্খলনজনিত অপরাধের দায়ে তার দুই বছরের বেশি কারাদন্ড হয়, তাহলে তার সংসদ সদস্য পদ খারিজ হবে। কারণ আইনে কোথাও দেশি আইনে বিচারের বিষয়ে বাধ্যবাধকতা নেই।’

পাপুল কুয়েতের নাগরিক নন : অর্থ ও মানব পাচারের অভিযোগে গ্রেফতার এমপি শহীদ ইসলাম পাপুল কুয়েতের নাগরিকত্ব পাননি বলে জানিয়েছে কুয়েতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। গতকাল এক বিবৃতিতে বলা হয়, গ্রেফতার ওই বাংলাদেশি কুয়েতের নাগরিকত্ব নিয়েছেন বলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যে কথা আসছে, তা ‘সঠিক নয়’। ফরেনার্স রেসিডেন্টশিপ আইনে তিনি এখানে বসবাস করছেন এবং একাধিক মামলার আসামি হওয়ায় তাকে পাবলিক প্রসিকিউশনের হেফাজতে পাঠানো হয়েছে।

 কুয়েতে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত এস এম আবুল কালাম বলেন, ‘কুয়েতের নাগরিকত্ব আইন অনেক কড়া। আমার জানা মতে, তার (পাপুল) নাগরিকত্ব নেই। গত কয়েক বছরে এশিয়ার কেউ কুয়েতের নাগরিকত্ব পেয়েছেন বলে আমার জানা নেই। দীর্ঘদিন ধরে তিনি এখানে রেসিডেন্সি পারমিট নিয়ে থাকেন। এ পারমিট কয়েক বছর পর পর নবায়ন করা লাগে।’


আপনার মন্তব্য

এই বিভাগের আরও খবর