শিরোনাম
বুধবার, ২ সেপ্টেম্বর, ২০২০ ০০:০০ টা
বিশেষ কলাম

বর্মের বদলে খড়ের পোশাক পরে কেন এ যুদ্ধযাত্রা?

এম জে আকবর

বর্মের বদলে খড়ের পোশাক পরে কেন এ যুদ্ধযাত্রা?

দিনটা ছিল সোমবার। শান্ত সুন্দর ভোরবেলায় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি একটি থালা থেকে আদার তুলে হাত দিয়ে সেগুলো ময়ূরকে খাওয়াচ্ছিলেন। ঠিক ওই সময়টায় রাজনৈতিক দিল্লির শব্দতেজ হঠাৎ লাফ দিয়ে বেড়ে গেল। আসলে বাড়িয়ে দিল কংগ্রেস দলের একটা বিদ্রোহ। দুটি চিত্র ধরা পড়ল এখানে। পাখিকে সাদরে খাওয়ানো আর ক্ষোভের ক্রুদ্ধ প্রকাশ। কোনো কোনো সময় কাকতাল থেকে পৃথক পৃথক মানস বাক্সময় হয়ে ওঠে। কংগ্রেসের ২৩ জন সিনিয়র নেতা তাঁদের অন্তর্বর্তী সভানেত্রী সোনিয়া গান্ধীর কাছে কিছু গুরুতর সমস্যার প্রতিকার বিধানের আবেদন জানিয়ে একটি চিঠি পাঠিয়েছেন। এই চাওয়াকে বলা হয়েছে বিদ্রোহ। পত্র লেখকদের মন অবশ্যই খচখচ করছিল। কারণ দল নেতিয়ে পড়ছে, ভুগছে সিদ্ধান্তহীনতায় এবং সরকারকে যিনি অকেজো বারুদ দিয়ে কামান দাগেন, সেই রাহুল গান্ধীকে উত্তরাধিকারী মেনে নেওয়ার জন্য অনিষ্টকর চাপাচাপি চলছিল। ২৩ নেতার চিঠিতে সংঘাত নয়, স্বচ্ছতা চাওয়া হয়েছে। বিদ্রোহ নয়, চাওয়া হয়েছে পুনরুজ্জীবন। কংগ্রেসের কায়েমি স্বার্থবাদীরা পত্র লেখদের হাত মোচড়ানো শুরু করে দিলেন। ‘গেল গেল’ রোয়াব তুলতে লাগলেন। চিঠিখানা যে বারতা বহন করছিল, সেই বারতা থেকে অন্যদিকে দৃষ্টি ফেরানোর মতলবেই ওরা হই হই করে উঠেছিল। বারতা ছিল- ‘আশু সংস্কার প্রয়োজন।’ সংস্কারের প্রয়োজন তখনই অনুভূত হয় যখন আকার গলিত বস্তুর মতো দেখায়। বস্তুনিষ্ঠ যে কোনো মূল্যায়নই দেখিয়ে দেবে যে কংগ্রেসের কংকালের হাড়গুলো খটরখটর করতে শুরু করেছে। চিঠিতে স্বাক্ষরকারী ২৩ নেতা যথার্থভাবেই সরাসরি বলেছেন, দলে চাই স্বচ্ছতা এবং দৃঢ়-বলিষ্ঠ নেতৃত্ব। কারণ নিশ্চিত হয়েছেন যে তাদের সংগঠন বিভ্রান্তিতে ভুগছে। অসার দুর্বোধ্য আওয়াজ তুলতে তুলতে দলটি হয়ে পড়েছে হইচই-সর্বস্ব প্রতিষ্ঠান। এটা মজার ব্যাপার যে, সোনিয়া গান্ধী কংগ্রেসের সভাপতি হয়েছেন তাঁর পূর্বসূরি সীতারাম কেশরীর ব্যর্থতার পরিণতিতে। ১৯৯৮-এর সাধারণ নির্বাচনে কেশরীর নেতৃত্বে কংগ্রেস মাত্র ১৪০টি আসনে জিতেছিল। এতে কুপিত হয়ে কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটি চটজলদি সিদ্ধান্ত নেয়- ‘এঁকে দিয়ে কিস্সু হবে না।’ পরবর্তী দুটি সাধারণ নির্বাচনে কংগ্রেস ওই ১৪০-এর অর্ধেকের চেয়েও কম আসনে জয়ী হয়েছে। তবু এজন্য জবাবদিহির সামনে পড়ল না কেউ। দলের কাজকর্মের ব্যাপারেও কোনোরকম পরিবর্তন আনা হয়নি। এ দুই নির্বাচনে নেতৃত্বের ভার রাহুল গান্ধীকেই অর্পণ করেছিলেন সোনিয়া গান্ধী। পত্র লেখকরা পরিষ্কার বুঝতে পেরেছিলেন যে, তারা এখনই যদি কাজে না নেমে পড়েন তাহলে ২০২৪-এর সাধারণ নির্বাচনে দলের ঘটবে মহাবিপর্যয়। রাজনীতি এক কঠিন কর্ম। লন্ড্রিতে দিলাম, ওরা সাবান ঘষল, আছড়া-আছড়ি করল, ব্যস্ সাফসুতরো কাপড় পেয়ে গেলাম! বিষয়টা তেমন নয়। পরিচ্ছন্নতা প্রাপ্তির প্রক্রিয়াটি দীর্ঘ ও অগোছালো। সে কারণে, ইতোমধ্যে সংস্কার উদ্যোগকে ঘিরে কতগুলো প্রশ্ন উঠেছে। যারা পাশে দাঁড়িয়ে বিদ্রোহটা দেখেছেন তারা জানতে আগ্রহী : গন্তব্য কোথায় সে বিষয়ে মতৈক্যে না পৌঁছে ভ্রমণ শুরু করার মানে কী? যারা এত অভিজ্ঞ, দলে যাদের এত অবদান, তারা প্রথম সড়ক প্রতিবন্ধক দেখে কেন পাশের সড়কে নেমে পড়লেন? বর্মের বদলে খড় দিয়ে তৈরি পোশাক পরে কেন এ যুদ্ধযাত্রা? বংশকে কেন চ্যালেঞ্জ করা হলো, যদি এক কাপ কফিতেই হয়ে যায় রফা? রাজনীতি বিচিত্র এক কারবার। সাফল্য কখন আসবে কেউই তা বলতে পারে না। কিন্তু ব্যর্থতার মূল্য দিতে হয় অ-নে-ক। তবে রাজা হলে রক্ষে! যুদ্ধে জিতলে সব গৌরব তার ওপর বর্তায়। পরাজয় ঘটলে সব দোষ অযোগ্য সেনাপতিদের ঘাড়ে গিয়ে পড়ে।

সর্বশেষ খবর