শিরোনাম
প্রকাশ : শনিবার, ৫ ডিসেম্বর, ২০২০ ০০:০০ টা
আপলোড : ৪ ডিসেম্বর, ২০২০ ২৩:১৯

ভাসানচরে নতুন ঠিকানায় রোহিঙ্গারা

নতুন ঘরে ১৬৪২ জন, পর্যায়ক্রমে আরও স্থানান্তরের আশা

জুলকার নাইন, ভাসানচর থেকে

ভাসানচরে নতুন ঠিকানায় রোহিঙ্গারা

ভাসানচরে নতুন জীবন শুরু করেছে রোহিঙ্গারা। কক্সবাজার ক্যাম্প থেকে ১ হাজার ৬৪২ জনকে স্থানান্তরের মধ্য দিয়ে রোহিঙ্গারা পেল এক নতুন ঠিকানা। গতকাল ছয়টি জাহাজে করে চট্টগ্রাম থেকে তাদের নিয়ে আসা হয় নোয়াখালীর ভাসানচরে। থাকার পরিবেশ ও নতুন ঘর পেয়ে আনন্দিত স্বেচ্ছায় ভাসানচরে আসা রোহিঙ্গারা। এদের মাধ্যমে সুযোগ-সুবিধা সম্পর্কে জেনে খুব শিগগির আরও রোহিঙ্গারা আসবেন ভাসানচরে।

রোহিঙ্গাদের প্রথম দলটি গতকাল সকাল সাড়ে ১০টার দিকে চট্টগ্রাম বোট ক্লাব থেকে তিনটি, আরআরবি জেটি থেকে একটি ও কোস্টগার্ড থেকে একটিসহ মোট ছয়টি জাহাজ ভাসানচরের উদ্দেশে রওনা দেয়। এর মধ্যে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর পাঁচটি ও সেনাবাহিনীর একটি জাহাজে রোহিঙ্গাদের আনা হয় ভাসানচরে। রোহিঙ্গাদের বহনকারী জাহাজগুলোকে নিরাপত্তা দিয়ে নিয়ে আসে বিভিন্ন নিরাপত্তা সংস্থা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোর ১২টি বিভিন্ন ধরনের বোট। এরপর বেলা ২টার দিকে ভাসানচরের নৌবাহিনীর ফরওয়ার্ড জেটিতে রোহিঙ্গাদের নিয়ে প্রথম জাহাজ স্পর্শ করে। জেটি থেকে হাত নেড়ে তাদের স্বাগত জানানো হয়। রোহিঙ্গারা প্রতি উত্তর জানায়। পরে ভাসানচরে একটি একটি করে জাহাজ ভিড়তে থাকে। তারপর তাদের নিয়ে ওয়্যারহাউসে সমবেত হয়। পরে রোহিঙ্গাদের একজন আলেমের মাধ্যমে দোয়া ও মোনাজাত করানো হয়। এ সময় রোহিঙ্গাদের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে অভিনন্দন জানানো হয়। পরে রোহিঙ্গাদের বুঝিয়ে দেওয়া হয় রুমের চাবি। তবে বৃহস্পতিবার নৌবাহিনীর দুটি জাহাজে করে রোহিঙ্গাদের মালামাল আগেই পাঠানো হয়। জানা যায়, ভাসানচরে আসা রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে এখানে থাকা ১২০টি ক্লাস্টারের মধ্যে ৪টিতে তোলা হয়েছে। ৭, ৮, ৯ ও ১০ নম্বর ক্লাস্টার ব্যবহার হচ্ছে। এ চারটি ক্লাস্টারে মোট ৪৮টি বাড়ি। এ ৪৮টি বাড়িতে ৭৬৮টি রুম। বৃহস্পতিবার রুমগুলো আগেই বরাদ্দ করা হয়েছে। প্রত্যেক মাঝিকে (দলনেতা) রুমের চাবিগুলো বুঝিয়ে দেওয়া হয়। কক্সবাজার বালুখালি ৯ নম্বর ক্যাম্প থেকে আসা মো. হাবিবুল্লাহ বলেন, ‘আমরা ভালো থাকার আসায় স্বেচ্ছায় ভাসানচরে এসেছি। বাংলাদেশ সরকার ভাসানচরে আমাদের যে সুযোগ-সুবিধা দিয়েছে তা দেখে আমরা অনেক আনন্দিত। এ জন্য বাংলাদেশের সরকারপ্রধান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মনের ভিতর থেকে ধন্যবাদ জানাই। তবে আমাদের নিজ দেশে মিয়ানমারে সরকার সেখানে আমাদের অনেক নির্যাতন করেছে। হত্যা করেছে। আমাদের ঘরছাড়া করেছে। আর বাংলাদেশের সরকার আমাদের নতুন জীবন দিয়েছে। ভাসানচরে আমাদের নতুন ঘর দিয়েছে। আমরা আশা করি বাংলাদেশ সরকার ভালোভাবে দেখাশোনা করে আমাদের নিজ দেশ মিয়ানমারে পাঠানোর ব্যবস্থা করবে।’ কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্প থেকে ভাসানচরে আনা রমজান আলী বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘আমি আমার স্ত্রী ও ছেলেমেয়ে মোট ছয়জন ভাসানচরের নতুন শহরে এসেছি। এখানে সবাই আমাদের অনেক ভালোভাবে স্বাগত জানিয়েছে। তারা আমাদের জন্য থাকার ঘর দিয়েছে। যা কক্সবাজারে চিন্তাও করা যায় না। এমন ঘর দিয়েছে যা আমাদের মিয়ানমারের শহরেও নেই।’

ভাসানচর আবাসন প্রকল্পের পরিচালক নৌবাহিনীর কমডোর আবদুল্লাহ আল মামুন চৌধুরী বলেন, ‘অত্যান্ত পরিকল্পিতভাবে বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতিতে এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। পরিবেশ ও অন্যসব বিষয়ে আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখা হয়েছে। এ প্রকল্প আমাদের অত্যন্ত পরিশ্রমের ফসল। নৌবাহিনীর সদস্যসহ সংশ্লিষ্টরা সব ধরনের ত্র“টি এড়িয়ে দিনরাত কাজ করে এ পর্যন্ত নিয়ে এসেছেন। প্রথম পর্যায়ে ১ হাজার ৬৪২ জন রোহিঙ্গা নিজ ইচ্ছায় এসেছে। পর্যায়ক্রমে আরও আসবে।’ আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থার নেতিবাচক ধারণার ওপর তিনি বলেন, ‘গত দুই বছরে দুটি বড় ঝড় মোকাবিলা করা হয়েছে। এ চরে কাজ করেছে ১৪ হাজার শ্রমিক, তখন তাদের কোনো ধরনের সম্যসা হয়নি। আশা করি রোহিঙ্গাদেরও কিছু হবে না। আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধিরা এখানে এসে ঘুরে গেলে তারাও কাজ দেখে সন্তুষ্টি প্রকাশ করবে।’ অতিরিক্ত শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মোহাম্মদ সামছু-দ্দৌজা বলেন, ‘আপাতত ২২টি এনজিওর মাধ্যমে তাদের খাদ্য, স্বাস্থ্য ও অন্যান্য প্রয়োজন মেটানো হবে। প্রথম সাত দিন তাদের রান্না করা খাদ্য পরিবেশন করা হবে। এর মধ্যে প্রতি পরিবারকে এলপিজি দেওয়া হবে। পরে তারা রান্না করে খাবে। আর রান্না করার উপকরণগুলো বেসরকারি সংস্থা প্রদান করবে। পাশাপাশি তাদের ননফুড আইটেমও দেওয়া হবে।’

সরেজমিনে পরিদর্শন করে দেখা গেছে, মূলত ক্লাস্টার হাউস, শেল্টার স্টেশন বা গুচ্ছগ্রামকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে এ নগর। প্রকল্পে রয়েছে মোট ১২০টি ক্লাস্টার হাউস। পরিকল্পিত নকশায় ভূমি থেকে প্রতিটি ক্লাস্টার হাউস ৪ ফুট উঁচু করে নির্মিত হয়েছে। প্রতিটি হাউসে ১২টি ঘর ও প্রতি ঘরে ১৬টি রুম। প্রতিটি রুমে পরিবারের চারজন করে থাকতে পারবে। নারী-পুরুষের জন্য রয়েছে আলাদা টয়লেট ও গোসলখানা। এ ছাড়া দুর্যোগ থেকে রক্ষায় প্রতিটি ক্লাস্টার হাউসের সঙ্গে রয়েছে একটি করে সাইক্লোন শেল্টার। দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় রোহিঙ্গারা সেখানে আশ্রয় নিতে পারবে। এ ক্ষেত্রে প্রতিটিতে ১ হাজার করে ১২০টি সেন্টারে ১ লাখ ২০ হাজার মানুষ আশ্রয় নিতে পারবে। এ ছাড়া প্রতিটি সাইক্লোন শেল্টারের নিচতলায় আশ্রয় নিতে পারবে ২০০ করে গবাদি পশু। এখানে জীবনমানে রয়েছে আধুনিক সুবিধা। আবাসন এলাকা পরিবেশসম্মত করা এবং বাতাস ঠা-া রাখার জন্য রয়েছে পর্যাপ্ত জলাধার। প্রতিটি ক্লাস্টার হাউসের সামনে একটি করে পুকুর। জ্বালানির জন্য রান্নাঘরে গ্যাস সিলিন্ডারের সুবিধা রাখা হয়েছে। ২৪ ঘণ্টাই রাখা হয়েছে বিদ্যুতের ব্যবস্থা। এ ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয়ভাবে ১ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ এবং আরও ১ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনসহ ২ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহের ব্যবস্থা রয়েছে। এর বাইরে প্রতিটি ক্লাস্টার হাউসে সৌরবিদ্যুতের ব্যবস্থা রয়েছে। কেন্দ্রীয়ভাবে করা হয়েছে বায়োগ্যাস প্লান্ট। জাতিসংঘ, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা এবং সরকারের শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনের (আরআরআরসি) জন্য রয়েছে আলাদা ভবন। খাদ্য মজুদের জন্য এখানে সুবিশাল গোডাউন নির্মাণ করা হয়েছে। রয়েছে চারটি সুরক্ষিত ওয়্যারহাউস (খাদ্য গুদাম)। এসব গুদামে ১ লাখ মানুষের তিন মাসের খাবার মজুদ রাখা যাবে। নামাজ আদায়ের জন্য তৈরি করা হয়েছে তিনটি মসজিদ। স্বাস্থ্যসেবায় রয়েছে দুটি ২০ শয্যার হাসপাতাল ও চারটি কমিউনিটি ক্লিনিক। এসব হাসপাতাল থেকে রোগীদের ২৪ ঘণ্টা চিকিৎসা ও ফ্রি ওষুধ সেবা দেওয়া হবে।

সরকারের প্রচেষ্টাকে ভুলভাবে ব্যাখ্যা না করার আহ্বান পররাষ্ট্রমন্ত্রীর : মিয়ানমার সেনাবাহিনীর নির্যাতনে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের ভাসানচরে স্থানান্তর করার বিচক্ষণ ও দৃঢ় পদক্ষেপ নেওয়ায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আবদুল মোমেন। ভাসানচরে সফলভাবে রোহিঙ্গাদের প্রথম ব্যাচ স্থানান্তরের পর তিনি বলেন, বিশ্ব নেতৃত্ব ও জাতিসংঘের সংস্থাগুলো মিয়ানমারের নিপীড়িত জনগণের জন্য কার্যকর কোনো পদক্ষেপ না নিলেও তারা বারবার বিবৃতি দিচ্ছে। তারা শুধু প্রতিশ্রুতিই দিয়ে যাচ্ছে। তাদের (রোহিঙ্গা) স্থানান্তর বা তাদের নিজ দেশ মিয়ানমারে ফেরত পাঠানোর ব্যবস্থা করতে কেউই এগিয়ে আসেনি।

 গতকাল পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে বলেছে, রোহিঙ্গাদের ভাসানচরে স্থানান্তর নিয়ে সরকারের প্রকৃত প্রচেষ্টাকে দুর্বল বা ভুলভাবে ব্যাখ্যা না করতে সবাইকে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করতে আহ্বান জানিয়েছে বাংলাদেশ।

ড. মোমেন বলেন, আন্তর্জাতিক সংস্থা রোহিঙ্গা শিবির বা ভাসানচরের সুবিধা নিয়ে উচ্চৈঃস্বরে কথা বলছে। কিন্তু রোহিঙ্গাদের নিরাপদে ও মর্যাদার সঙ্গে নিজ দেশে প্রত্যাবাসনের অনুকূল পরিবেশ তৈরি করতে মিয়ানমারের কাছে যাওয়ার সাহস বা আন্তরিকতা কারও নেই। গত তিন বছরে মিয়ানমারে মানবাধিকার লঙ্ঘন সত্ত্বেও দেশটিতে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, আসিয়ান, চীন, জাপান, যুক্তরাজ্যের বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বহুগুণ বেড়েছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর কোনোটিই মিয়ানমারে প্রচুর পরিমাণে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বাধার সৃষ্টি করছে না, ঠিক যেমনটি করেছিল দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদীদের ক্ষেত্রে। রোহিঙ্গা সমস্যা মিয়ানমার তৈরি করেছে এবং তারাই কেবল এর সমাধান করতে পারে।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, যত দ্রুত সম্ভব বিশ্বের সব আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং গুরুত্বপূর্ণ দেশগুলোকে এই সংকট সমাধানের জন্য অর্থবহ উপায়ে মিয়ানমারের কাছে যাওয়ার জন্য নিজেদের প্রতিশ্রুতিবদ্ধ করতে হবে। কক্সবাজার ক্যাম্পগুলোতে নানান ঝুঁকি এড়াতে বাংলাদেশ সরকার পর্যায়ক্রমে ১ লাখ রোহিঙ্গাকে ভাসানচরে স্থানান্তর করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, ১৩ হাজার একর ভাসানচর দ্বীপে বছরব্যাপী মিঠাপানি, চমৎকার হ্রদ ও যথাযথ অবকাঠামো ও আধুনিক সব সুযোগ-সুবিধা রয়েছে। এর মধ্যে বিদ্যুৎ ও পানির নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ, কৃষি জমি, ঘূর্ণিঝড় আশ্রয় কেন্দ্র, দুটি হাসপাতাল, চারটি কমিউনিটি ক্লিনিক, মসজিদ, গুদাম, টেলিযোগাযোগ পরিষেবা, থানা, বিনোদন ও শিক্ষা কেন্দ্র, খেলার মাঠ ইত্যাদি রয়েছে। এটি কক্সবাজারের ক্যাম্পগুলোর অস্থায়ী কাঠামোগুলোর মতো নয়, ভাসানচরের আবাসনটি কংক্রিট দিয়ে নির্মাণ করা, যা ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের মতো প্রাকৃতিক বিপর্যয়েও অক্ষত থাকবে।

বিবৃতিতে বলা হয়, রোহিঙ্গারা মিয়ানমারের নাগরিক এবং তাদের অবশ্যই মিয়ানমারে ফিরে যেতে হবে। বাংলাদেশ সরকার অস্থায়ীভাবে আশ্রয়প্রাপ্ত মিয়ানমার নাগরিকদের আশ্রয় ও নিরাপত্তার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করছে। রোহিঙ্গাদের অধিকার, দ্রুত, নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের জন্য মিয়ানমারের অভ্যন্তরে অনুকূল পরিবেশ তৈরিতে প্রচেষ্টা চালিয়ে যাওয়ার জন্যও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে আহ্বান জানিয়েছে বাংলাদেশ। জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় মিয়ানমারের সঙ্গে প্রত্যাবাসন শুরু করার কাজে জড়িত, যা এই সংকটের একমাত্র স্থায়ী সমাধান।


আপনার মন্তব্য

এই বিভাগের আরও খবর