শিরোনাম
প্রকাশ : সোমবার, ৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২১ ০০:০০ টা
আপলোড : ৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২১ ২৩:১৬

শুরু হলো টিকার যুগ

নিলেন প্রধান বিচারপতি মন্ত্রী-এমপি সচিবসহ নানা শ্রেণি-পেশার ৩১ হাজার ১৬০ জন

নিজস্ব প্রতিবেদক

শুরু হলো টিকার যুগ
করোনার ভ্যাকসিন গ্রহণ করেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক, ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী, প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন -বাংলাদেশ প্রতিদিন

প্রাণঘাতী করোনাভাইরাস রুখতে দেশব্যাপী শুরু হলো গণ টিকাদান। গতকাল টিকাদান শুরুর দিন টিকা নিয়েছেন প্রধান বিচারপতি, স্বাস্থ্যমন্ত্রীসহ সরকারের বেশ কয়েকজন মন্ত্রী, এমপি, জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। দেশের ১ হাজার ৫টি কেন্দ্রে সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হয়েছে গণ টিকাদানের প্রথম দিন। এর মধ্য দিয়ে দেশে শুরু হলো টিকার যুগ। 

স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক গতকাল মহাখালী স্বাস্থ্য ভবনে ভার্চুয়ালি দেশব্যাপী টিকাদান কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন। এরপর শেখ রাসেল জাতীয় গ্যাস্ট্রোলিভার ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে গিয়ে টিকা নেন তিনি। এ সময় তিনি বলেন, ‘আজ আমাদের আনন্দের দিন। এই দিনের অপেক্ষায় ছিলাম। এই টিকা নিয়ে যেন কোনো গুজব না ছড়ায়।’ ঢাকার ৫০টি হাসপাতালে ও ঢাকার বাইরে সারা দেশে ৯৫৫টি হাসপাতাল কেন্দ্রে একযোগে শুরু হয়েছে টিকাদান কর্মসূচি। গতকাল রাজধানীর কেন্দ্রগুলোতে টিকা নিয়েছেন ৫ হাজার ৭১ জন। সারা দেশে টিকা নিয়েছেন ৩১ হাজার ১৬০ জন। রাজধানীর শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে টিকা নিয়েছেন প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন। শেখ রাসেল জাতীয় গ্যাস্ট্রোলিভার ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে টিকা নিয়েছেন কৃষিমন্ত্রী ড. আবদুর রাজ্জাক, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী শ ম রেজাউল করিম, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী স্থপতি ইয়াফেস ওসমান, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক মন্ত্রী মো. শাহাব উদ্দিন। জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে টিকা নেন বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী গোলাম দস্তগীর গাজী বীরপ্রতীক। টিকা নিয়েছেন রেলমন্ত্রী নুরুল ইসলাম সুজন, জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী ডা. মো. এনামুর রহমান, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মাহবুব আলী, শিক্ষা উপমন্ত্রী ব্যারিস্টার মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল।

আপিল বিভাগের বিচারপতি মোহাম্মদ ইমান আলী, বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী, বিচারপতি মির্জা হোসাইন হায়দার, বিচারপতি জিনাত আরা, বিচারপতি আবু বকর সিদ্দিকী, বিচারপতি ওবায়দুল হাসান, হাই কোর্ট বিভাগের বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম, বিচারপতি শেখ হাসান আরিফ, বিচারপতি মো. নজরুল ইসলাম তালুকদারসহ মোট ৫৫ জন বিচারপতি রাজধানীর বিভিন্ন হাসপাতালে করোনার টিকা নিয়েছেন। কুষ্টিয়াতে টিকা নিয়েছেন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল আলম হানিফ এমপি, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে টিকা নিয়েছেন বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি ঢাকা-৮ আসনের এমপি রাশেদ খান মেনন। টিকা নিয়েছেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম, স্থানীয় সরকার বিভাগের সিনিয়র সচিব হেলালুদ্দীন আহমদ, অর্থ বিভাগের সিনিয়র সচিব আবদুর রউফ তালুকদার, কৃষি মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মো. মেসবাহুল ইসলাম, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব ড. মো. আবু হেনা মোস্তফা কামাল, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সচিব তোফাজ্জল হোসেন মিয়া, বিদ্যুৎ বিভাগের সচিব মো. হাবিবুর রহমান। টিকা নিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামান, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম। গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ও ট্রাস্টি ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী, স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. এ বি এম খুরশীদ আলম, অতিরিক্ত মহাপরিচালক মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা। রাজারবাগ পুলিশ লাইনস মাঠে টিকা নিয়েছেন ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার মোহা. শফিকুল ইসলাম, অতিরিক্ত কমিশনার মো. মনিরুল ইসলাম। কভিড-১৯ বিষয়ক জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটির সভাপতি অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ, স্বাচিপ (স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদ) সভাপতি অধ্যাপক ডা. ইকবাল আর্সালান, বিএমএ সভাপতি ডা. মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন, মহাসচিব ডা. ইহতেশামুল হক চৌধুরী, শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের সমন্বয়ক অধ্যাপক ডা. সামন্ত লাল সেন টিকা নিয়েছেন। সংসদ সদস্যদের অনেকে মানুষকে উৎসাহিত করতে নিজেদের নির্বাচনী এলাকায় টিকা নিয়েছেন। করোনা প্রতিরোধী টিকা গ্রহণের পর স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক বলেছেন, ‘টিকা নিয়ে আমরা ভালো আছি, কারও কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা যায়নি। ৭০ লাখ টিকা এখন হাতে আছে, আগামীতে কোভ্যাক্সের মাধ্যমে ৬ কোটি টিকা পাওয়া যাবে। এই টিকা দিতে আইসিটি মন্ত্রণালয় অ্যাপ তৈরি করেছে। জেলায় জেলায় ৭ হাজারের বেশি টিম কাজ করছে। কোনো জেলা থেকে বিরূপ মন্তব্য পাওয়া যায়নি।’ বিশ্বে যত টিকা আবিষ্কার হয়েছে তার মধ্যে অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার কোভ্যাক্স টিকা সবচেয়ে ভালো মন্তব্য করে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ‘কারও কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দিলে তার জন্যও ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। আমরা করোনা নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হয়েছি। টিকা নেওয়ার পরও মাস্ক পরতে হবে, স্বাস্থ্যবিধি মানতে হবে, এক মাস পর দ্বিতীয় ডোজ নিতে হবে। দুই ডোজ  নেওয়ার পর পুরোপুরি সুরক্ষিত থাকব। দেশবাসীর জীবন রক্ষার্থে এই টিকা  দেওয়া হচ্ছে। আমরা নিজেরা নিচ্ছি, দেশের অনেক গুরুত্বপূর্ণ মানুষ টিকা নিচ্ছেন, তাদের দেখে সাধারণ মানুষও উৎসাহিত হচ্ছেন।’

টিকা নেওয়ার পর কৃষিমন্ত্রী ড. আবদুর রাজ্জাক বলেন, ‘করোনাভাইরাসের টিকা এই মহামারীর বিরুদ্ধে মানবজাতির একটা বড় অর্জন। এই অর্জন বিজ্ঞান-প্রযুক্তি ব্যবহার করে হয়েছে। আমি টিকা নেওয়ার পর ভালো আছি। টিকা নিয়ে যারা গুজব ছড়াচ্ছে তারা উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে তা করছে।’

 

টিকা নেওয়ার পর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ইয়াফেস ওসমান দুই লাইন কবিতা পড়ে শোনান। তিনি বলেন, ‘আপনারা জানেন আমাকে মন্ত্রিসভায়ও কবিতা পড়তে হয়। বঙ্গবন্ধুকন্যা জিজ্ঞেস করেন কবিতা আছে কিনা। এটা আমার স্বভাবজাত প্রবণতা। টিকা নেওয়ার প্রতিক্রিয়ায় আপনাদের দুই লাইন কবিতা শোনাই। ‘যদি বেঁচে যাও করোনার কালে, যদি কেটে যায় মৃত্যুর ভয়। জেনো বিজ্ঞান লড়ে গেছে সদা, নেই ভয়, হবে মানুষের জয়।’ শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের সমন্বয়ক অধ্যাপক ডা. সামন্ত লাল সেন বলেন, ‘টিকা নেওয়ার পর মনে হচ্ছে আমি যেন সাহস  পেলাম। আমি মনে করি টিকা নেওয়ার পরও সাবধানে থাকতে হবে।’

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের কনভেনশন সেন্টারের ৮টি বুথে টিকা নিয়েছেন ৫৬০ জন। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ২৭০ জন এবং শেখ হাসিনা বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে ৮২ জন টিকা নিয়েছেন। সচিবালয় ক্লিনিকে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ ১৬৭ জন টিকা নিয়েছেন।

বাংলাদেশে দেওয়া হচ্ছে ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউটে তৈরি অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার করোনাভাইরাসের টিকা। সবাইকে এ টিকার দুটি ডোজ নিতে হবে। প্রথম ডোজের চার সপ্তাহ পর দ্বিতীয় ডোজ নিতে হবে। এই টিকার ৩ কোটি ডোজ পেতে সেরাম ইনস্টিটিউটের সঙ্গে চুক্তি হয়েছে বাংলাদেশের, যার মধ্যে ৫০ লাখ ডোজ হাতে পাওয়ার পর জেলায় জেলায়  পৌঁছে দেওয়া হয়েছে আগেই। এ ছাড়া ভারত সরকারের উপহার হিসেবে পাওয়া গেছে আরও ২০ লাখ ডোজ টিকা। প্রতিদিন সকাল ৮টা থেকে বেলা আড়াইটা পর্যন্ত এসব কেন্দ্রে টিকা দেওয়া হবে।

এ ছাড়া সারা দেশে একযোগে শুরু হয়েছে টিকাদান কর্মসূচি। আমাদের নিজস্ব প্রতিবেদক ও প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর অনুযায়ী, গতকাল চট্টগ্রাম, বরিশাল, রংপুর, রাজশাহী, সুনামগঞ্জ, বাগেরহাট, নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজার, চুয়াডাঙ্গা, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, চাঁদপুর, বগুড়া, সিলেটের বিশ্বনাথ, ময়মনসিংহের ভালুকা, দিনাজপুর, ফেনী, পটুয়াখালীর গলাচিপা, যশোর, ঝালকাঠি, ঝিনাইদহ, জয়পুরহাট, খাগড়াছড়ি, কুড়িগ্রাম, কুষ্টিয়া, লক্ষ্মীপুর, মাগুরা, মানিকগঞ্জ, মেহেরপুর, মুন্সীগঞ্জ, নরসিংদী, ফরিদপুরের সদরপুর, নীলফামারী, নোয়াখালী, পঞ্চগড়, শরীয়তপুর, শেরপুর, সিরাজগঞ্জ, গাজীপুরের শ্রীপুর, কালিয়াকৈর, গাইবান্ধা, গোপালগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ, লালমনিরহাট, পাবনা, ময়মনসিংহ, ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট, খুলনা, কুমিল্লা, গাজীপুর, নাটোর, রাঙামাটি, যশোরের বেনাপোল, মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, বাউফল, কক্সবাজার, নেত্রকোনায় টিকা দেওয়া হয়।