শিরোনাম
প্রকাশ : শুক্রবার, ২৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২১ ০০:০০ টা
আপলোড : ২৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২১ ২৩:৩১

টাকা বানানোর মেশিন ছাত্রদল

ভালুকায় টাকা নেওয়ার ভিডিও ভাইরাল হওয়ায় ময়মনসিংহের দুই শীর্ষ নেতাকে অব্যাহতি । কেন্দ্রে অভিযোগের পাহাড় । বিএনপির সিনিয়র নেতারা হতবাক

মাহমুদ আজহার

টাকা বানানোর মেশিন ছাত্রদল

ভালুকা উপজেলা, পৌর ও কলেজ শাখা জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের কমিটি গঠনে টাকা নেওয়ার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। এ কারণে ছাত্রদলের ময়মনসিংহ দক্ষিণ জেলা শাখার শীর্ষ দুই নেতা মাহবুবুর রহমান রানা ও আবু দাউদ রায়হানকে সম্প্রতি সংগঠনের নেতৃত্ব থেকে সাময়িক অব্যাহতি দিয়েছে। কিন্তু ছাত্রদলের বাইরে থেকেও তারা ময়মনসিংহ জেলা দক্ষিণ শাখার ১৮টি ইউনিটের কমিটি গঠনে ভূমিকা রাখেন। অভিযোগ উঠেছে, দক্ষিণ শাখার ১৮টি ইউনিট কমিটিতে অযোগ্য, বিবাহিত, হত্যা ও ধর্ষণ মামলার আসামি, চাকরিজীবী ও অন্য দলের নেতাদের গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে আর্থিক সুবিধার বিনিময়ে। এ নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করেছে বিএনপির হাইকমান্ড। ময়মনসিংহ বিএনপি নেতা-কর্মীদের মুখে মুখে আলোচনা আছে, শুধু দক্ষিণ শাখার ১৮টি ইউনিটের কমিটি করতে প্রায় দুই কোটি টাকার আর্থিক লেনদেন হয়। এর মধ্যে শুধু ভালুকায় প্রায় অর্ধকোটি টাকার কমিটি বাণিজ্য হয়। এই টাকার ভাগ ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় শীর্ষ নেতৃত্ব, বিভাগীয় টিমের নেতারা ছাড়াও জেলা পর্যায়ের নেতাদের পকেটে গেছে। সম্প্রতি ময়মনসিংহ মহানগর শাখায় পাঁচটি ও উত্তর শাখায় ২০টি ইউনিটের কমিটি ঘোষণা দেওয়া হয়। সেখানেও কয়েকটি ইউনিটের নেতৃত্বের বিরুদ্ধে আর্থিক লেনদেনসহ নানা অভিযোগ পাওয়া গেছে। তবে বিভিন্ন ইউনিটের কমিটি কেন্দ্রীয় দফতর শাখার স্বাক্ষরে অনুমোদন দেওয়া হয়। জেলার দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতাদের কোনো মতামত বা স্বাক্ষর নেওয়া হয়নি। শুধু ময়মনসিংহ জেলায় নয়, সারা দেশেই ইউনিট কমিটি গঠন

করতে গিয়ে আর্থিক কেলেঙ্কারিতে জড়িয়ে পড়ছেন দায়িত্বপ্রাপ্ত ছাত্রনেতারা। এ নিয়ে বিস্মিত ও হতবাক বিএনপির সিনিয়র নেতারা। কমিটি গঠনে স্থানীয় বা কেন্দ্রীয় বিএনপি নেতাদের মতামতকে পাত্তাই দেওয়া হচ্ছে না। জানা যায়, সম্প্রতি কক্সবাজারের চকরিয়ায় ছাত্রদলের কমিটি গঠনে ভারতের শিলংয়ে থাকা বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাউদ্দিন আহমদকে না জানিয়েই দেওয়া হয়। এতে তিনি ক্ষুব্ধ হয়ে বিএনপির সব পদ থেকে পদত্যাগ করার অভিপ্রায় ব্যক্ত করেন। পরে শীর্ষ নেতৃত্ব আশ্বস্ত করলে পদত্যাগের সিদ্ধান্ত থেকে তিনি সরে আসেন। বিএনপির সিনিয়র কয়েকজন নেতা বাংলাদেশ প্রতিদিনকে জানিয়েছেন, ছাত্রদল এখন টাকা বানানোর মেশিনে পরিণত হয়েছে। ছাত্রদলের এসব নেতা কাউকে পাত্তাই দিচ্ছেন না। তাদের এই শক্তির উৎস কোথায় তা জানাতে অপারগতা জানান সিনিয়র নেতারা। তবে নেতারা আশঙ্কা প্রকাশ করে বলছেন, এসব ছাত্রনেতা যখন বিভিন্ন অঙ্গসংগঠন কিংবা বিএনপির নেতৃত্বে আসবে, তখন তারা টাকা ছাড়া কিছুই বুঝবে না। এদেরকে এখন টাকা কামানোর একটি লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে। এদের লাগাম টেনে ধরা না হলে ভবিষ্যতে বিএনপির আদর্শিক অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যাবে। ময়মনসিংহ জেলা দক্ষিণ, মহানগর ও উত্তর শাখায় কমিটি ঘোষণার পর বিক্ষোভ হয় বিভিন্ন থানায়। কমিটিকে প্রত্যাখ্যান করে মিছিল বের করেন পদবঞ্চিতরা। গত দুই দিন আগে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে ভালুকা উপজেলা, পৌর ও কলেজ শাখার নেতা-কর্মীরা কমিটি বাতিলের দাবিতে বিক্ষোভ প্রদর্শন করে। এ সময় তারা বিভিন্ন নেতার বিরুদ্ধেও স্লোগান দেন। বিবাহিত, অযোগ্য, বিতর্কিতদের কমিটি মানি না মানবো না বলেও স্লোগান দেন বিক্ষুব্ধরা। বুধবার দুপুরে ময়মনসিংহে কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের ময়মনসিংহ বিভাগীয় টিম প্রধান ও কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সহসভাপতি প্রধান মাজেদুল ইসলাম রুমন এবং মহানগর ছাত্রদলের সভাপতি ও বিভাগীয় ছাত্রদলের সহসাংগঠনিক সম্পাদক নাইমুল করীম লুইনের কুশপুত্তলিকা দাহ করেছে ছাত্রদলের একাংশ। কমিটি ঘোষণার পর ময়মনসিংহ, মুক্তাগাছা, ত্রিশাল, ভালুকা, গফরগাঁওসহ বিভিন্ন ইউনিটে বিক্ষোভ প্রদর্শন করছেন ছাত্রদলের নেতা-কর্মীরা। অবিলম্বে ঘোষিত কমিটি বাতিলের দাবিও জানান তারা। ছাত্রদলের দফতর শাখা জানায়, বিভিন্ন ইউনিট কমিটি গঠনে ছাত্রদলকে কয়েকটি বিধিমালা অনুসরণ করতে বলা হয়েছে। এর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ বিধি হলো, বিবাহিত, হত্যা বা ধর্ষণ মামলার আসামি, চাকরিজীবী, বিতর্কিত ও বয়স্করা ছাত্রদলের কমিটিতে ঠাঁই পাবে না। কমিটিতে মামলা হামলায় জর্জরিত থাকা ছাত্রনেতারা গুরুত্ব পাবে বেশি। কিন্তু বিভিন্ন জেলায় ইউনিট কমিটিতে ঘটছে তার উল্টো। অভিযোগ রয়েছে, সদ্য ঘোষিত ময়মনসিংহ কোতোয়ালি ছাত্রদলের আহ্বায়ক সুলেমান হোসেন রুবেল শুধু বিবাহিতই নন, তার সাত বছর বয়সের একটি মেয়ে সন্তানও রয়েছে। গফরগাঁও উপজেলা ছাত্রদলের আহ্বায়ক মোক্তার হোসেন বিবাহিত। তার ছাত্রত্ব নেই। তিনি ঢাকায় মুরগির ব্যবসা করেন। তিনি একাধিক ডাকাতি ও মাদক মামলার গফরগাঁও থানার ওয়ারেন্টভুক্ত আসামি। ওই ইউনিটে যাকে সদস্য সচিব করা হয়েছে অপু রায়হান একটি ওষুধ কোম্পানিতে চাকরি করেন। তার পুরো পরিবার আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। তার বাবা স্থানীয় একটি ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি। অভিযোগ আছে, মুক্তার হোসেনের আপন ছোট ভাই নবী হোসেনকে যুগ্ম আহ্বায়ক করা হয়েছে। তিনি ছাত্রদলের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত নন। এ ছাড়া যুগ্ম আহ্বায়ক মাজহারুল ইসলাম, সাদেকুর রহমান, আজিজুল ইসলাম, আশরাফুল ইসলাম, তারিকুল ইসলাম রিয়াদ, আরিফুল ইসলাম, সাদেকুল ইসলাম, ইসমাইল হোসেন বিবাহিত। তাদের কেউ চাকরি করেন কেউ বা ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। পাগলা থানা ছাত্রদলের আহ্বায়ক মাজহারুল ইসলামের বিরুদ্ধে মাদক ও সন্ত্রাসী কর্মকান্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ আছে। আর্থিক অনিয়মের মাধ্যমে কমিটি গঠনের ভিডিও ভাইরাল হয়েছে। ওই ইউনিটের সদস্য সচিব সোখেন আকন্দও বিবাহিত। এ ছাড়া যুগ্ম আহ্বায়ক আবু সায়েম ফরহাদ, শামীম আজাদ, ইসমাইল হোসেন, আবু নাইম বিবাহিত বলে জানা গেছে। অভিযোগ আছে, ময়মনসিংহের মুক্তাগাছা পৌর ছাত্রদলের দুই নম্বর যুগ্ম আহ্বায়ক সমর আলী পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি, নোয়াখালীতে কর্মরত। যুগ্ম আহ্বায়ক লিমন আহমেদ ও রাজিব মিয়া বিবাহিত। যুগ্ম আহ্বায়ক হৃদয় চন্দ্র দে ও মো. অলি আহমেদের বিরুদ্ধে ছাত্রলীগের রাজনীতি করার অভিযোগ আছে। মুক্তাগাছা উপজেলা ছাত্রদলের কমিটিতে যুগ্ম আহ্বায়ক আসাদুজ্জামান দিপুর বিরুদ্ধে মাদক ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিযোগ রয়েছে। যুগ্ম আহ্বায়ক আফ্রিদি হাসান মানিক বিবাহিত ও এক সন্তানের জনক। আরেক যুগ্ম আহ্বায়ক মাহমুদুল হাসান হত্যা ও ধর্ষণ মামলার আসামি। জানা গেছে, ময়মনসিংহ মহানগর পূর্ব থানার আহ্বায়ক রিপন মিয়া গরু চুরি মামলার আসামি। সদস্য সচিব সাজ্জাদ হোসেন বিবাহিত ও পেশায় চাকরিজীবী এবং সাজ্জাদ ইসলাম মুকুল মাদকাসক্ত। গফরগাঁও পৌর ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক মোস্তাফিজুর রহমান শুভ ও খলিলুর রহমান বিবাহিত। ত্রিশাল উপজেলা ছাত্রদলের আহ্বায়ক সাব্বির আহমেদ রনি একটি বেসরকারি ব্যাংকে কর্মরত। ওই ইউনিটের সদস্য সচিব আবু সালেম বিদ্যুৎ অফিসের কম্পিউটার অপারেটর। ত্রিশাল পৌর ছাত্রদলের আহ্বায়ক আমিরুল ইসলাম বিবাহিত ও মাছ ব্যবসায়ী এবং সদস্য সচিব মানিক মিয়া এক সন্তানের জনক ও একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত। ওই ইউনিটের যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার জাহান ছারু দুই সন্তানের জনক। জানা গেছে, কমিটি গঠনের নানা অভিযোগ এরই মধ্যে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের কাছে অভিযোগ আকারে পাঠানো হয়েছে। তিনি বিষয়টি গোপনে তদন্ত করছেন। এ ছাড়া খুলনা, চট্টগ্রাম মহানগর, ফেনীর ফুলগাজী ও দাগনভূঞা, সিলেট, ঝিনাইদহ, মুন্সীগঞ্জসহ বেশ কয়েকটি জেলার বিভিন্ন ইউনিটের কমিটি গঠনকে কেন্দ্র করেও নানা অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। কমিটি বাতিলের দাবিতে এসব এলাকায় বিক্ষোভ মিছিলসহ নানা কর্মসূচি পালন করছেন স্থানীয় নেতা-কর্মীরা। এ প্রসঙ্গে ময়মনসিংহ জেলা দক্ষিণ শাখার ভারপ্রাপ্ত সভাপতি তাপস সরকার বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘বিভিন্ন ইউনিট কমিটি গঠনে আমাদের কোনো ভূমিকা ছিল না। আমরা নতুন দায়িত্বপ্রাপ্ত হয়েছি। কমিটি গঠনের কাজ আগে থেকেই শুরু হয়েছে। তবে কেন্দ্রীয় দফতর শাখা কমিটি ঘোষণা করেছে। অনেকের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ এসেছে। এক্ষেত্রে আমি বলব, যা রটে তা কিছু না কিছু ঘটে।’ ওই শাখার সাধারণ সম্পাদক মাসুদ মিয়াও একই অভিযোগ করেন। তিনি বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘বিভিন্ন ইউনিট কমিটিতে কিছু অভিযোগ ছিল। আমরা বিষয়টি রিভিউ করতে চেয়েছি। কিন্তু আমাদের সেই সুযোগ দেওয়া হয়নি। আমরা কমিটিতে স্বাক্ষরও করিনি। আগের কমিটি ও কেন্দ্র এসব ইউনিট কমিটি গঠন করেছে।’ এ বিষয়ে ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সভাপতি ফজলুর রহমান খোকন ও সাধারণ সম্পাদক ইকবাল হোসেন শ্যামল ও ময়মনসিংহ বিভাগীয় টিম প্রধান মাজেদুল ইসলাম রুমনের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তা সম্ভব হয়নি।


আপনার মন্তব্য