শিরোনাম
প্রকাশ : শুক্রবার, ২৩ এপ্রিল, ২০২১ ০০:০০ টা
আপলোড : ২২ এপ্রিল, ২০২১ ২৩:০৮

ভয়াবহতার দিকে পরিস্থিতি

টিকার সংকট, পর্যাপ্ত নেই দ্বিতীয় ডোজ, বাড়ছে রোগী, আইসিইউর সংকটে বাড়ছে মৃত্যু ঘনিয়ে আসছে অক্সিজেন সংকট, অনেকেই মানছে না স্বাস্থ্যবিধি

জয়শ্রী ভাদুড়ী

ভয়াবহতার দিকে পরিস্থিতি
গতকাল নারায়ণগঞ্জ থেকে আসা এক করোনা রোগী অ্যাম্বুলেন্স থেকে ঢাকা মেডিকেলে নামানোর আগেই মৃত্যুবরণ করেন। স্বজনদের আহাজারি -বাংলাদেশ প্রতিদিন

করোনা সংক্রমণের দ্বিতীয় ঢেউয়ে আশঙ্কা বাড়াচ্ছে ঊর্ধ্বমুখী সংক্রমণ ও মৃত্যুহার। হাসপাতালে আইসিইউ শয্যার জন্য হাহাকার। আক্রান্ত বাড়ায় হাসপাতালগুলোয় বেড়েছে অক্সিজেনের চাহিদা। ফলে ঘনিয়ে আসছে অক্সিজেনের সংকট। এর মধ্যে ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউট থেকে টিকার নতুন চালান না আসায় অল্প দিনেই ফুরিয়ে যাবে সংরক্ষিত টিকা। চারদিক থেকে সংকট ঘনিয়ে আসায় ভয়াবহতার দিকে যাচ্ছে করোনা পরিস্থিতি।

স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী জাহিদ মালেক বলেছেন, ‘স্বাস্থ্যবিধি না মানলে আগামী দিনগুলোয় করোনা পরিস্থিতি আরও ভয়ানক হতে পারে। সংক্রমণ থেকে রক্ষা পেতে হলে অবশ্যই সবাইকে স্বাস্থ্যবিধি পুরোপুরি মেনে চলতে হবে। এর কোনো বিকল্প নেই। লকডাউন কার্যকর করে মানুষকে সংক্রমণ থেকে রক্ষার জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কাজ করছে। তার পরও মানুষ বিভিন্ন অজুহাতে বের হচ্ছে। অনেকে মাস্ক পর্যন্ত পরতে চাইছে না। এমন অবস্থা চলতে থাকলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হবে। তখন আমাদের পক্ষে পরিস্থিতি সামাল দেওয়াও কঠিন হয়ে পড়বে।’ গতকাল পুষ্টি সপ্তাহ উপলক্ষে আলোচনা সভায় ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে প্রধান অতিথির বক্তব্যে স্বাস্থ্যমন্ত্রী এসব কথা বলেন।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের পাঠানো তথ্যে জানা যায়, গতকাল ২৭ হাজার ৪২৯ জনের করোনা টেস্ট করে ৪ হাজার ১৪ জনের শরীরে করোনার জীবাণু পাওয়া গেছে। গতকাল মারা গেছেন ৯৮ জন। দেশে এ পর্যন্ত করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন ৭ লাখ ৩৬ হাজার ৭৪ জন। এ পর্যন্ত মারা গেছেন ১০ হাজার ৭৮১ জন। প্রতিদিন ৪ হাজারের বেশি মানুষ করোনা আক্রান্ত হচ্ছেন। এক সপ্তাহ ধরে ৯০ জনের বেশি মানুষ প্রতিদিন মারা যাচ্ছেন। শয্যা না পাওয়ায় বাড়িতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যাচ্ছেন রোগী। গতকাল বাড়িতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ছয় রোগী মারা গেছেন। আক্রান্তদের চিকিৎসা দিতে হিমশিম খাচ্ছে হাসপাতালগুলো। করোনা আক্রান্তদের সেবা দিতে চাহিদা বেড়েছে অক্সিজেনের। এতে দেশে যে কোনো সময় অক্সিজেনের ভয়াবহ সংকট সৃষ্টি হতে পারে। বন্ধ হয়ে যেতে পারে মেডিকেল গ্রেড অক্সিজেনের মূল জোগানদাতা লিন্ডের দুটি প্লান্ট। পাশাপাশি করোনা পরিস্থিতিতে ভারতে অক্সিজেনের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় দেশটি অক্সিজেন রপ্তানি বন্ধ করে দিতে পারে। এসব আশঙ্কা বাস্তবে রূপ নিলে চলমান করোনা সংক্রমণে প্রতিদিন যে পরিমাণ অক্সিজেনের প্রয়োজন তার চার ভাগের এক ভাগও সরবরাহ করা সম্ভব হবে না। ভয়াবহ সমস্যায় পড়তে পারেন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন কভিড আক্রান্তরা। সম্প্রতি অক্সিজেন সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষ থেকে স্বাস্থ্য অধিদফতরকে এসব তথ্য জানানো হয়েছে।

প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, দেশে বর্তমানে অক্সিজেনের চাহিদা দৈনিক ১৫০ টন। এর মধ্যে লিন্ডে সরবরাহ করছে দৈনিক ৮০ টন আর স্পেকট্রা ৩৮ টন। সব মিলিয়ে ১১৮ টন। কিন্তু লিন্ডের দুটি ইউনিট যে কোনো সময় বন্ধ হয়ে যেতে পারে। সেজন্য অধিদফতর তিনটি নতুন উৎসের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। এসব উৎস থেকে পাওয়া যাবে মোট ৭৫ টন। তবে বর্তমানে এ তিনটি প্রতিষ্ঠান মাত্র ৩৫ টন অক্সিজেন দিতে পারবে বলে জানিয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কভিড পরিস্থিতির আগে দেশে দৈনিক ১০০ টন মেডিকেল গ্রেড অক্সিজেনের চাহিদা ছিল। কভিড আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ায় হাইফ্লো নেজাল ক্যানুলা, ভেনটিলেটর ও আইসিইউর চাহিদা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় অক্সিজেনের চাহিদা বাড়ছে, যা বর্তমানে ১৫০ টনে পৌঁছেছে। এ চাহিদা আরও বাড়তে পারে। গত সোমবার স্বাস্থ্য অধিদফতরে পরিচালক হাসপাতাল, লাইন ডিরেক্টর, অক্সিজেন সরবরাহকারী কোম্পানিগুলোর প্রতিনিধিরা আলোচনা করেন। সেখানে তারা তাদের সামগ্রিক অবস্থা তুলে ধরেন।

সে সভায় জানানো হয়, লিন্ডে বাংলাদেশ দেশের সব সরকারি হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনীয় অক্সিজেনের বড় অংশ সরবরাহ করে। এর মধ্যে নারায়ণগঞ্জে অবস্থিত প্লান্ট ৬০ আর চট্টগ্রামে অবস্থিত প্লান্ট ২০ টন অক্সিজেন উৎপাদন করে। চট্টগ্রামের প্লান্ট যে কোনো সময় বন্ধ হয়ে যেতে পারে বলে তারা জানিয়েছে। ৩ থেকে ১২ ডিসেম্বর পর্যন্ত এ প্লান্ট বন্ধ ছিল। স্পেকট্রা অক্সিজেন লি. প্রতিদিন ৩৮ টন অক্সিজেন সরবরাহ করছে। তারা স্থানীয়ভাবে ২০ আর ভারত থেকে ১৮ টন আমদানি করছে। সেখানে আরও বলা হয়, ভারত থেকে লিকুইড অক্সিজেন আনা সময়সাপেক্ষ হওয়ায় এবং সাপ্তাহিক ছুটির দিনে পরিবহন বন্ধ থাকায় অক্সিজেনের সংকট তৈরির আশঙ্কা থাকে। এ ছাড়া লিন্ডের দুটি প্লান্টই যে কোনো মুহূর্তে বন্ধ হয়ে যেতে পারে। তাই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সংক্রমণ ও মৃত্যুহার কমানোর চেষ্টা চলছে। মৃতের অধিকাংশের বয়স ষাটোর্ধ্ব। তাই ৪০-ঊর্ধ্বদের জন্য গণটিকাদান কর্মসূচি শুরু করেছে সরকার। এ ছাড়া টিকা দেওয়া হচ্ছে ১৮ বছরের ঊর্ধ্বে থাকা সম্মুখসারির কর্মীদেরও। টিকা দিলে মৃত্যুহার কমার আশায় জোর দেওয়া হয়েছে এ কর্মসূচিতে। কিন্তু ভারত থেকে চুক্তি অনুযায়ী সময়মতো করোনার টিকা পাচ্ছে না বাংলাদেশ। এর ফলে যারা ইতিমধ্যে টিকার প্রথম ডোজ নিয়েছেন সময়মতো তাদের দ্বিতীয় ডোজ পাওয়া কিছুটা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। এ পর্যন্ত নিজেদের কেনা ও ভারতের উপহার হিসেবে দেশে এসেছে ১ কোটি ২ লাখ ডোজ টিকা। স্বাস্থ্য অধিদফতরের কাছে গতকাল পর্যন্ত টিকা মজুদ ছিল ২৪ লাখ ৫৩ হাজারের কিছু বেশি। এখন প্রতিদিন দেড় থেকে ২ লাখ টিকা দেওয়া হচ্ছে। এ হারে টিকা দেওয়া চলতে থাকলে খুব অল্প সময়ে টিকা ফুরিয়ে যাবে। শিগগির টিকার নতুন চালান না এলে প্রথম ডোজ পাওয়া অনেকেই টিকা পাবেন না। এ ছাড়া ইতিমধ্যে নিবন্ধন করেছেন এমন অনেককে টিকার অপেক্ষায় থাকতে হবে। ত্রিপক্ষীয় চুক্তির আওতায় ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউট ৩ কোটি ডোজের মধ্যে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ৭০ লাখ টিকা দিয়েছে বাংলাদেশকে। প্রতি মাসে ৫০ লাখ করে টিকা দেওয়ার কথা থাকলেও এরপর বাংলাদেশে আর কোনো টিকার চালান আসেনি। বিকল্প টিকার খোঁজে ‘স্পুটনিক ভি’ উৎপাদনে রাশিয়ার সঙ্গে চুক্তি করেছে বাংলাদেশ। পাশাপাশি দেশটি থেকে নগদ অর্থে কিছু টিকা কেনা হবে। এ ছাড়া চীনের উদ্ভাবিত টিকাও বাংলাদেশ কিনবে বলে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আবদুল মোমেন জানিয়েছেন।

এই বিভাগের আরও খবর