শিরোনাম
প্রকাশ : শুক্রবার, ২৮ মে, ২০২১ ০০:০০ টা
আপলোড : ২৭ মে, ২০২১ ২৩:৪৪

অধ্যাপক আফতাবের খুনি শনাক্ত, ১৪ বছর পর চার্জশিট

মাহবুব মমতাজী

অধ্যাপক আফতাবের খুনি শনাক্ত, ১৪ বছর পর চার্জশিট
আফতাব আহমাদ
Google News

প্রায় ১৪ বছর পর জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. আফতাব আহমাদের খুনিকে শনাক্ত করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকদের আবাসিক কোয়ার্টারে খুন হন অধ্যাপক আফতাব। তিনি বিএনপিপন্থি শিক্ষক হিসেবে পরিচিত ছিলেন।

গত বছর ৫ আগস্ট ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার কেরানীগঞ্জে একজন ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে আয়োজিত টিআই প্যারেডের (টেস্ট ইন আইডেনটিফিকেশন প্যারেড) মাধ্যমে খুনি শীর্ষ সন্ত্রাসী ইমনকে শনাক্ত করেন অধ্যাপক আফতাবের বাসার সেই সময়ের গৃহকর্মী কুলসুম। খুনি শনাক্তের পর দীর্ঘ তদন্তের সমাপ্তি টানে সিআইডি।

চলতি বছর ২২ এপ্রিল মামলার চার্জশিট জমা দেন তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডির পরিদর্শক সুব্রত কুমার সাহা। এই কর্মকর্তা সদ্য পদোন্নতি পেয়ে এখন পুলিশের এএসপি। এর আগে এ মামলায় অন্তত ১২ জন তদন্ত কর্মকর্তা পরিবর্তন হয়। তাদের কেউ এর কূলকিনারা করতে পারেননি। সিআইডি সূত্র জানায়, অধ্যাপক আফতাব হত্যার ঘটনায় ২০০৬ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর রাজধানীর শাহবাগ থানায় একটি মামলা হয়। মামলাটির তদন্ত এক যুগেরও বেশি সময় ধরে থানা পুলিশ ও গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) কাছে ন্যস্ত ছিল। মামলার বাদী ছিলেন অধ্যাপক আফতাবের স্ত্রী নূরজাহান আফতাব। তিনি ২০১৫ সালের ২ ডিসেম্বর মারা যান। তারা ছিলেন নিঃসন্তান। মামলার বাদীপক্ষের কেউই না থাকায় রাষ্ট্রপক্ষ মামলাটি পরিচালনা করছে। এ বিষয়ে সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার (মেট্রো সাউথ) মোহাম্মদ কামরুজ্জামান এ প্রতিবেদককে বলেন, “যেদিন অধ্যাপক আফতাব খুন হন এর আগে এক ব্যক্তি তার বাসায় আসেন। কলবেলের শব্দে বাসার গৃহকর্মী দরজা খুলে দেন। এরপর ওই ব্যক্তি ভিতরে ঢুকেই বলেন, ‘আফতাব, তোর এত বড় সাহস!’ বলার পরই অধ্যাপক আফতাবের মাথায় পিস্তল ঠেকিয়ে গুলি করে চলে যান সেই ব্যক্তি। আর এ ঘটনা ঘটে বাসার গৃহকর্মীদের সামনেই। সিআইডিতে মামলার তদন্ত এলে আমরা ওই বাসায় থাকা তিন গৃহকর্মী কুলসুম, রেবেকা ও হালিমাকে খুঁজে বের করি। তাদের মধ্যে যে কলবেলের শব্দ শুনে দরজা খুলে দেন তাকে আমরা জিজ্ঞাসা করি যে তিনি খুনিকে চেনেন কি না। তবে তিনি খুনিকে চেনেন না বলে জানান। এরপর আমরা তাকে বলি, খুনিকে দেখলে চিনবেন কি না। তখন তিনি বলেন, চিনবেন।”

সিআইডির এ কর্মকর্তা বলেন, ওই খুনের ঘটনায় জড়িত সন্দেহে ভারত থেকে ফিরিয়ে আনা শীর্ষ সন্ত্রাসী সানজিদুল হাসান ইমন এক জবানবন্দিতে বলেছিলেন, ভারতে থাকাবস্থায় অপর শীর্ষ সন্ত্রাসী তানভীরুল ইসলাম জয়ের সঙ্গে তার পরিচয় হয়েছিল। তখন জয় তার লোকজনকে দিয়ে খুনের ঘটনাটি ঘটিয়েছেন বলে তিনি শুনেছিলেন। এ তথ্যের ভিত্তিতে জয় ছাড়াও ইমনকেও সন্দেহ করেছিল সিআইডি। তাই বান্দরবান কারাগার থেকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার কেরানীগঞ্জে আনা হয় তাকে। সেখানে কারা কর্তৃপক্ষ টিআই প্যারেডের আয়োজন করে। কারাগারে ইমন ছাড়াও আরও কয়েকজন সন্দেহভাজনকে দাঁড় করানো হয়। এ সময় একজন ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে খুনের ঘটনায় ইমনকে অধ্যাপক আফতাবের বাসার গৃহকর্মী কুলসুম শনাক্ত করেন। এ খুনের নেপথ্যে চাঁদাবাজিসহ নানা ধরনের বিরোধ ছিল। জানা যায়, ২০০৬ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর রাত পৌনে ৮টার দিকে ফুলার রোডে বিশ্ববিদ্যালয় কোয়ার্টারের চতুর্থ তলায় নিজ বাসায় অধ্যাপক আফতাবকে গুলি করা হয়। সেদিনই কলবেলের শব্দে গৃহকর্মী দরজা খুলে দিলে জিন্সের প্যান্ট ও মাথায় ক্যাপ পরা একজন দ্রুত ভিতরে ঢুকে তাকে তিনটি গুলি করে পালিয়ে যান। তার এক সহযোগী ছিলেন সিঁড়ির নিচে। তিন দিন পর সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় অধ্যাপক আফতাব মারা যান।

ইমন ছাড়াও এ ঘটনায় সন্দেহভাজন ছিলেন শীর্ষ সন্ত্রাসী তানভীরুল ইসলাম জয়। এ হত্যার কয়েক দিন পর ভারত থেকে বিভিন্ন গণমাধ্যমে পাঠানো ফ্যাক্সবার্তায় শীর্ষ সন্ত্রাসী তানভীরুল ইসলাম জয়ের নামে হত্যার দায় স্বীকার করা হয়। গণমাধ্যমে বিষয়টি প্রকাশও হয়েছিল। অবশ্য ভারত থেকে ফেরত আনা শীর্ষ সন্ত্রাসী ইমন ২০০৮ সালে এ হত্যার ঘটনায় নিজেকে না জড়িয়ে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন।

তদন্ত নিয়ে মামলার নথিতে উল্লেখ করা হয়, ইমনের জবানবন্দিতে যাদের নাম এসেছে, তাদের মধ্যে তানভীরুল এখনো ভারতে পলাতক। খোকন ২০০৬ সালে রমনায় পুলিশের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হন। আবলান ২০০৮ সালের নভেম্বরে মোহাম্মদপুরে খুন হন। রফিক, এতিম বেলাল ও মাহাবুবের পুরো ঠিকানা পাওয়া যায়নি। ২০০৮ সালের আগেই সোয়েব সাইফ এবং আরও দুই সন্দেহভাজন হুমায়ুন কবীর মুন্না ও সালেহ আহম্মদ সুজনকে গ্রেফতার করে জিজ্ঞাসাবাদ করলে তারা এ বিষয়ে তেমন কিছু বলেননি।

সূত্র জানায়, ইমনের জবানবন্দির সূত্র ধরে ২০১৮ সালের ৭ আগস্ট আফতাব হত্যা মামলায় বিএনপির সাবেক দফতর সম্পাদক মফিকুল হাসান তৃপ্তিকে রাজধানীর বনানীর ন্যাম ভবনের বাসা থেকে গ্রেফতার করে সিআইডি।