শিরোনাম
প্রকাশ : বৃহস্পতিবার, ৩ জুন, ২০২১ ০০:০০ টা
আপলোড : ২ জুন, ২০২১ ২৩:২৯

নারী পাচারের রোমহর্ষক কাহিনি

সাতক্ষীরা বেনাপোল সীমান্ত দিয়ে দেড় হাজার নারী পাচার, হোটেল ও বাসাবাড়িতে দেহব্যবসা ভারতের বেঙ্গালুরুতে হাজারো নারীর কান্না, টিকটক হ্যাংআউট পুলপার্টি করে নারী সংগ্রহ

নিজস্ব প্রতিবেদক

নারী পাচারের রোমহর্ষক কাহিনি
Google News

একে একে বেরিয়ে আসছে নারী পাচারের রোমহর্ষক কাহিনি। ভারতে পাচার হওয়ার ৭৭ দিন পর কৌশলে দেশে ফেরা এক কিশোরী পুলিশের কাছে আঁতকে ওঠার মতো তথ্য দিয়েছে। সে জানিয়েছে, ভারতের বেঙ্গালুরুতে পাচার সিন্ডিকেটের বিভিন্ন আস্তানায় বন্দী রয়েছে হাজারো নারী। সেখানে তাদের আটকে রেখে শারীরিক ও যৌন নির্যাতন করা হচ্ছে। টিকটকের স্টার বানানো কিংবা পারলার বা সুপার শপে চাকরির কথা বলে ভারতে নিয়ে দেহ ব্যবসা করতে বাধ্য করা হচ্ছে। নারী পাচারের এমন তথ্য পেয়ে পুলিশ সাতরীক্ষায় অভিযান চালায়। সেখান থেকে গ্রেফতার করে সিন্ডিকেটের তিন সদস্যকে।

পুলিশ জানতে পেরেছে, সাতক্ষীরা বেনাপোল সীমান্ত পথে দেড় হাজার নারী তারা পাচার করেছে। সীমান্ত এলাকায় রয়েছে পাচারকারীর সেফ হোম। ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থান থেকে নারীদের নিয়ে যেখানে রাখা হয়। এরপর সেখান থেকে মোটরসাইকেলে করে ভারতীয় সীমানার ভিতরে নিয়ে ভারতীয়দের হাতে তুলে দেওয়া হয়। টিকটক হ্যাংআউট পুলপার্টি করে নারী সংগ্রহের কাজটি করত টিকটক হৃদয় বাবু। এরপর চাকরির প্রলোভনে নিয়ে যেত ভারতে। ভারতের বেঙ্গালুরুতে রয়েছে পাচারকারীদের বেশ কয়েকটি বাসা। সেখানে তাদের রাখা হয়। সেই বাসা থেকে তাদের বিভিন্ন হোটেল ও বাসাবাড়িতে দেহব্যবসা করাতে বাধ্য করা হতো। এভাবেই ভারতের  বেঙ্গালুরুর বন্দীদশায় হাজারো বাংলাদেশি নারী আটকে আছে। তাদের কান্নার শব্দ চার দেয়ালের বাইরে আর আসে না।

পুলিশ জানায়, দেশে ফিরে আসা ওই কিশোরীর দায়ের করা মামলায় ১২ জনকে আসামি করা হয়। এদের মধ্যে সাতক্ষীরা থেকে তিনজনকে গ্রেফতার করা হয়। পুলিশ বলছে, এই চক্রের মাধ্যমে প্রায় দেড় হাজার নারী পাচারের শিকার হয়েছেন। সম্প্রতি ভারতে গ্রেফতার মগবাজারের ‘টিকটক’ হৃদয় বাবু এই চক্রের সমন্বয়ক। ভারতফেরত পাচার ওই কিশোরী নিজের ওপর নির্যাতনের করুণ কাহিনি পুলিশকে শুনিয়েছে। গ্রেফতারকৃত তিনজন হলো- মেহেদী হাসান বাবু, আবদুল কাদের ও তার ছেলে মহিউদ্দিন। আর এই মেহেদী হাসান বাবু একাই পাচার করেছে এক হাজার নারী। গত সোমবার গ্রেফতারকৃত বস রাফি, ম্যাডাম সাহিদাসহ চারজন এই সিন্ডিকেটের সদস্য।

গতকাল সকালে শ্যামলীর নিজ কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান ঢাকা মহানগর পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের উপকমিশনার মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ।

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, পাচারের শিকার কিশোরীর সঙ্গে ২০১৯ সালে হাতিরঝিলে মধুবাগ ব্রিজে টিকটক হৃদয় বাবুর পরিচয় হয়। কখনো টিকটক স্টার বানাতে চেয়ে বা ভালো বেতনের চাকরির অফার দিয়ে কিশোরীকে প্রলুব্ধ করার চেষ্টা করে হৃদয় বাবু। ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে নারায়ণগঞ্জের অ্যাডভেঞ্চার ল্যান্ড পার্কে ৭০-৮০ জনকে নিয়ে ‘টিকটক হ্যাংআউট’ এবং ২০২০ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর গাজীপুরের আফরিন গার্ডেন রিসোর্টে ৭০০-৮০০ জন তরুণ-তরুণীকে নিয়ে পুল পার্টির আয়োজন করে হৃদয় বাবু। এ বছর ১৯ ফেব্রুয়ারি কুষ্টিয়ায় বাউল লালন শাহ মাজারে আয়োজিত টিকটিক হ্যাংআউটে নিয়ে যাওয়ার কথা বলে আন্তর্জাতিকভাবে সক্রিয় এই মানব পাচারকারী চক্রের অন্যান্য সহযোগীদের সহায়তায় কৌশলে ওই কিশোরীকে ভারতে পাচার করে হৃদয় বাবু। পাচারকারী চক্রের খপ্পরে পড়ার পর থেকে পালিয়ে দেশে ফেরা পর্যন্ত তার অপর লোমহর্ষক নির্যাতন চালানো হয়। পুলিশের ডিসি শহীদুল্লাহ সাংবাদিকদের বলেন, ভারতে পাচারের পর কিশোরীটিকে বেঙ্গালুরুর আনন্দপুর এলাকায় পর্যায়ক্রমে কয়েকটি বাসায় রাখা হয়। বাসাগুলোতে হাতিরঝিল এলাকার আরও কয়েকজন তরুণী ও কিশোরীর সঙ্গে দেখা হয় ওই কিশোরীর। এদের মধ্যে সম্প্রতি ভাইরাল হওয়া ভিডিওর নির্যাতিত তরুণীও ছিলেন, যাদের সুপার মার্কেট, সুপার শপ বা বিউটি পারলারে ভালো বেতনে চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে পাচার করা হয় বলে তিনি জানান। ভারতের বেঙ্গালুরুতে সম্প্রতি বাংলাদেশের এক তরুণীকে বিবস্ত্র করে নির্যাতনের ভিডিও ভাইরাল হয়। শারীরিক নির্যাতনের সময় ২২ বছরের ওই তরুণীকে দল বেঁধে ধর্ষণও করা হয় বলে এনডিটিভি জানায়। ওই ঘটনায় ভারতের বেঙ্গালুরু পুলিশ ছয়জনকে গ্রেফতার করে। এদের মধ্যে টিকটক হৃদয় বাবুসহ দুজন পালানোর সময় গুলিবিদ্ধ হয়েছে বলে জানিয়েছে ভারতের পুলিশ।

মানব পাচারের এই চক্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট চারজনকে সম্প্রতি ঝিনাইদহ সদর, যশোরের অভয়নগর ও বেনাপোল থেকে গ্রেফতার করেছে র‌্যাব।

শহীদুল্লাহ বলেন, বেঙ্গালুরুতে পৌঁছার কয়েক দিন পরই ভিকটিম কিশোরীকে চেন্নাইয়ের একটি হোটেলে ১০ দিনের জন্য পাঠানো হয়। ওই হোটেলে রেখে তার ওপর অমানবিক শারীরিক ও বিকৃত যৌন নির্যাতন চালানো হয়। কৌশলে নেশাজাতীয় দ্রব্য খাইয়ে কিংবা জোরপূর্বক বিবস্ত্র করে ভিডিও ধারণ করে পরিবারের সদস্য ও পরিচিতদের তা পাঠিয়ে দেওয়ার হুমকি দিয়ে জিম্মি করে রাখা হয়। ভারতে পাচারের ৭৭ দিন পর সম্প্রতি ভাইরাল হওয়া নির্যাতিত ওই তরুণীর সহায়তায় আরও দুজন বাংলাদেশিসহ এই কিশোরী পালিয়ে বাংলাদেশ আসতে সক্ষম হয়। পুলিশ কর্মকর্তা শহীদুল্লাহ বলেন, আসামি মেহেদী হাসান বাবু প্রায় ৭-৮ বছর ধরে মানব পাচারে জড়িত। মামলার ভিকটিমসহ ১ হাজারের বেশি নারী পাচারের সঙ্গে জড়িত বলে সে স্বীকার করেছে। তার কাছ থেকে উদ্ধারকৃত মোবাইল ও ডায়েরিতে হৃদয় বাবু, সাগর, সবুজ, ডালিম ও রুবেলের ভারতীয় মোবাইল নম্বর পাওয়া গেছে। সেখানে বেঙ্গালুরুতে নির্যাতিত তরুণীর ‘আধার নম্বর’ ও ভারতে পাচারকৃত উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ভিকটিমের নাম ও মানব পাচারে জড়িত ব্যক্তিদের ‘ডিটেইল’ তথ্য পাওয়া গেছে।’ তিনি বলেন, অপর দুই আসামি মহিউদ্দিন ও আবদুল কাদের আলোচ্য ভিকটিমসহ পাঁচ শতাধিক ভিকটিমকে সীমান্তবর্তী এলাকায় পাচার করেছেন বলে স্বীকার করেছেন। এসবের জন্য ওই এলাকায় একটি ঘর তৈরি করেছেন তারা, সীমান্তে যাতায়াতের জন্য রয়েছে মোটরসাইকেল। এ রকম দুটি মোটরসাইকেল জব্দ করেছে পুলিশ। উপ-কমিশনার বলেন, সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী এই কিশোরী ও তরুণীরা সবাই ‘অবৈধভাবে’ ভারতে প্রবেশ করেছেন। ওখানে তারা কৌশলে ভারতীয় পরিচয়পত্র (আধার কার্ড) তৈরি করে ভিতরে ঘোরাফেরা করছেন। পুলিশ হেফাজতে থাকা আবদুল কাদের বলেন, তার ছেলে সীমান্তে ‘এপার-ওপার’ করে। মানুষ পারাপারের চুক্তি নেয়। তবে তিনি এসবের সঙ্গে যুক্ত নন, তিনি চাষবাস করেন।