সোমবার, ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২১ ০০:০০ টা

থামছেই না মাদকের স্রোত

মালয়েশিয়া মডেল প্রয়োগ করে নিয়ন্ত্রণের সুপারিশ ডিএমপি কমিশনারের

সাখাওয়াত কাওসার

থামছেই না মাদকের স্রোত

থামছেই না মাদকের স্রোত। বানের জলের মতোই দেশে ঢুকছে ভয়ংকর সব মাদক। কোনোভাবেই ঠেকানো যাচ্ছে না মাদকের আগ্রাসন। ফেনসিডিল ইয়াবার পাশাপাশি এখন আইস নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য হচ্ছেন আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যরা। তবে মাদক নিয়ে কাজ করেন এমন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সীমান্ত এলাকার মাদক ব্যবসায়ীদের কঠোর নজরদারির মধ্যে রাখা হলে কোনোভাবেই মাদকে ছেয়ে যেত না দেশ।

অন্যদিকে, দেশের মাদক নিয়ন্ত্রণের জন্য কর্তৃপক্ষকে ‘মালয়েশিয়ান মডেল’ নিয়ে কাজ করার কথা বলেছেন ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার মোহাম্মদ শফিকুল ইসলাম। তিনি বলেছেন, হুবহু সেরকম না হলেও কর্তৃপক্ষ চাইলে সেই মডেল সামনে রেখে আমাদের দেশের উপযোগী করে আরও ইমপ্রুভাইজড মডেল তৈরি করতে পারে।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের মহাপরিচালক আবদুস সবুর মন্ডল বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, আসলে আমরা আমাদের সর্বোচ্চটা দিয়ে কাজ করে যাচ্ছি। দায়িত্ব নেওয়ার পর আমি কয়েকটি সীমান্তবর্তী জেলায় গিয়েছি। সেখানকার মানুষের মতামত নিচ্ছি, জেলা প্রশাসকদের মতামত নিচ্ছি। মাদক নিয়ন্ত্রণে আমরা বিশেষ কিছু করে দেখানোর চিন্তা করছি। দেখা যাক ভালো কিছু হবে। গতকাল ভোরে দেশের কক্সবাজারে র‌্যাব-১৫ এর মেজর নূর ই শহীদ ফারাবীর নেতৃত্বে একটি দল কক্সবাজারের হইংকং বাজার থেকে ৩ লাখ পিস ইয়াবাসহ দুজনকে গ্রেফতার করে। এর মাত্র দুই দিন আগে একই ব্যাটালিয়নের স্কোয়াড্রন লিডার তানভীর ও মেজর ইউসুফের নেতৃত্বে একটি দল ৪ লাখ ৩০ হাজার পিস ইয়াবা উদ্ধার করে। বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) লে. কর্নেল আলী হায়দার আজাদ আহমেদের নেতৃত্বে ২৪ সেপ্টেম্বর কক্সবাজারের ৩৪ বিজিবি উখিয়া উপজেলার ৪ নম্বর রাজাপালং ইউপির উখিয়া হিন্দুপাড়া এলাকা থেকে ১ লাখ ৫০ হাজার পিস ইয়াবা উদ্ধার করে। এর আগে ২০ সেপ্টেম্বর উখিয়া ৪ নম্বর রাজাপালং ইউপির ঠান্ডার মিয়ার বাগান পূর্ব দরগারবিল এলাকা থেকে ১ লাখ ৬০ হাজার পিস ইয়াবাসহ সাদ্দাম হোসেন (১৮) নামের একজনকে গ্রেফতার করা হয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধ বিজ্ঞান বিভাগের প্রধান অধ্যাপক খন্দকার ফারজানা রহমান বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, মাদকের বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রীর ‘জিরো টলারেন্স’ ঘোষণা বাস্তবায়নের জন্য আইন প্রয়োগকারী সংস্থার বিভিন্ন স্তরে থাকা তদারকি কর্মকর্তারা যদি আন্তরিক না হন তাহলে তা কাগজেকলমেই থেকে যাবে। আবার দেখুন, বিভিন্ন মেকানিজমে কিংবা টেকনিক্যাল মিটিংয়ে একাডেমিশিয়ানদের ডাকা হয় না। এখানেও একমুখী আচরণ। তিনি আরও বলেন, মাদক উদ্ধার হয় মাত্র ১০ শতাংশ। আর ৯০ শতাংশ অধরাই থাকে। তাই সময় এসেছে বিষয়টি নিয়ে আন্তরিকভাবে খতিয়ে দেখার। আর সেজন্য প্রয়োজন বিভিন্ন বাহিনীকে নিয়ে সমন্বিত উদ্যোগ অর্থাৎ মাস্টার প্ল্যান। এক্ষেত্রে বাস্তবায়নে জড়িত বাহিনীর সদস্যদেরও রাখতে হবে কঠোর নজরদারিতে। অনুসন্ধান বলছে, ইয়াবা, ফেনসিডিল ছাড়াও দেশে নতুন মাদক হিসেবে আইস ও এলএসডির বিস্তার ঘটছে। ৩২ সীমান্ত জেলার মাদকের পয়েন্টগুলো চিহ্নিত হলেও মাদক প্রবেশ কোনোভাবেই বন্ধ করা যাচ্ছে না। দেশে এগুলোর উৎপাদন না হলেও প্রতিবেশী দেশ থেকে তা ঢুকছে অবাধে। করোনাকালেও নানা কৌশলে সীমানা থেকে তা ছড়িয়ে পড়ছে দেশের সব প্রান্তে। আর এখন কক্সবাজারের বিভিন্ন রোহিঙ্গা ক্যাম্প হয়ে উঠছে মাদক কারবারিদের ‘সেফ জোন’। সমুদ্রপথে বড় বড় চালান আনার পর তা প্রথমে ক্যাম্পের নিরাপদ জায়গায় নেওয়া হয়। দেশে এভাবে মাদকের রমরমা কারবার চললেও ঝিমিয়ে পড়েছে মাদকবিরোধী অভিযান। আর এর প্রভাব পড়েছে ইয়াবা ও ফেনসিডিলের মতো মাদক জব্দ ও মামলায়। কমছে মাদক জব্দ ও আসামি গ্রেফতারের সংখ্যা।

মাদক নিয়ে কাজ করেন এমন অনেক বিশেষজ্ঞ বলছেন, সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে শীর্ষ থেকে মধ্যম মানের মাদক ব্যবসায়ী হবে সর্বোচ্চ ১০ হাজার। তাহলে আমাদের এতগুলো বাহিনীর সদস্যরা কী করছেন? আমরা ১০ হাজার মাদক ব্যবসায়ীকে কঠোর নজরদারির মধ্যে রাখতে পারছি না? এটা সত্যিই আমাদের ভয়াবহ রকমের ব্যর্থতা। তবে কক্সবাজারে মেজর (অব.) সিনহা হত্যাকান্ড এবং পরবর্তীতে ওসি প্রদীপকে গ্রেফতারের পর কোথাও যেন ছন্দের অমিল দেখতে পাচ্ছেন তারা। 

তবে সীমান্তে নজরদারির অভাবের সঙ্গে কিছুটা দ্বিমত পোষণ করেছেন ডিএমপি কমিশনার মোহাম্মদ শফিকুল ইসলাম। তিনি বলেন, আমি নিজে চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি ছিলাম। আমি দেখেছি কক্সবাজারের ওপর বেশি নজর দিলে তখন ব্যবসায়ীরা গহিন পাহাড়ি অঞ্চল বেছে নেয়। পার্বত্য অঞ্চলে এমনও জায়গা রয়েছে যেখানে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যরা যেতেই পারেন না। সেখানে অভিযান পরিচালনা করা খুবই দুরূহ। তারপরও অনেক সফলতা আসছে।

তবে তিনি মাদক নিয়ন্ত্রণের জন্য মালয়েশিয়ান সরকারের সফলতাকে ভেবে দেখা যেতে পারে বলে মনে করেন। প্রয়োজনে আমাদের দেশের মতো করে মডেল তৈরি করে দেখতে পারে কর্তৃপক্ষ। তিনি বলেন, প্রথমে মালয়েশিয়ান সরকার মাদকসেবীদের সরকারের পক্ষ থেকে মাদক সরবরাহ করেছে। মাদক গ্রহণে সেবীদের জন্য বিভিন্ন এলাকায় আলাদা কেন্দ্রও তৈরি করেছিল। তখন দেখা গেল ব্যবসায়ীদের ব্যবসায় ভাটা। একটা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত সেবীদের মাদক দেওয়া হয়েছে। তবে ধীরে ধীরে তার পরিমাণ কমিয়ে দেওয়া হয়েছিল। মাঝেমধ্যে মাদকের আদলে তৈরি বস্তুতে মাদক না দিয়ে অন্য কিছু দেওয়া হতো। এভাবে ধীরে ধীরে সেবীরা মাদক গ্রহণ থেকে বেড়িয়ে এসেছে। আবার ব্যবসায়ীরাও মাদক বিক্রি করতে না পেরে পেশা পরিবর্তন করেছে। তবে নির্দিষ্ট সময় পর মাদকসেবী এবং ব্যবসায়ীদের জন্য কঠোর আইন করেছে সেখানকার সরকার।

সম্প্রতি ইয়াবা মামলার তদন্তে উঠে এসেছে, মাদকের টাকা হুন্ডির মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচার করছেন মুস্তাক নামের এক ব্যবসায়ী। তিনি মিয়ানমারের নাগরিক, থাকেন সৌদি আরব। কক্সবাজার ও আশপাশের এলাকার সৌদি প্রবাসীদের তালিকা বাংলাদেশি এজেন্টের কাছ থেকে সংগ্রহ করেন মুস্তাকের এজেন্টরা। প্রবাসীরা দেশে অর্থ পাঠাতে চাইলে ইয়াবা কেনাবেচার টাকা থেকে তা দেশে তাদের পরিবারের সদস্যদের পরিশোধ করে মুস্তাকের এজেন্টরা। এর বিনিময়ে প্রবাসীদের কাছ থেকে অর্থ নেন মুস্তাক। অনেক দিন ধরে বাংলাদেশে অবস্থানরত মো. শরীফ সহায়তা করেছেন মুস্তাককে। তিনিও এক সময় সৌদি আরবে ছিলেন। মাদক মামলায় গ্রেফতার হয়ে শরীফ বর্তমানে কারাগারে।

র‌্যাবের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপস্্) কর্নেল কে এম আজাদ বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, আমরা আমাদের সর্বোচ্চটা দিয়ে মাদক নির্মূলের চেষ্টা করছি। দেশবাসী তা প্রত্যক্ষ করছে। মাদকের ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রীর ‘জিরো টলারেন্স’ ঘোষণা বাস্তবায়নে বদ্ধপরিকর র‌্যাব।

২০২০ সালে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর, বাংলাদেশ পুলিশ, বিজিবি, র‌্যাব ও কোস্টগার্ডের অভিযানে মামলা হয়েছে ৮৫ হাজার ৭১৮টি, আসামি ১ লাখ ১৩ হাজার ৫৪৩ জন। ইয়াবা জব্দ হয়েছে ৩ কোটি ৬৩ লাখ ৮১ হাজার ১৭ পিস, হেরোইন ২১০ কেজি ৪৩৮ গ্রাম, কোকেন ৩ কেজি ৮৯৩ গ্রাম, আফিম ৭১ কেজি ৬০০ গ্রাম, গাঁজা ৫০ হাজার ৭৮ কেজি ৫৪৯ গ্রাম, ফেনসিডিল ১০ লাখ ৭ হাজার ৯৭৭ বোতল, ফেনসিডিল ১২৯ দশমিক ৪ লিটারসহ অন্যান্য মাদক।

চলতি বছরের জুলাই পর্যন্ত মামলা হয়েছে ৫১ হাজার ৭৫৩টি, আসামি ৬৮ হাজার ৫ জন। ইয়াবা জব্দ হয়েছে ২ কোটি ৫৮ লাখ ৩৮ হাজার ২৬৯ পিস, হেরোইন ২৪৬ কেজি ২২৪ গ্রাম, কোকেন ৫৮ গ্রাম, আফিম ৫৩ কেজি ৬৯৬ গ্রাম, গাঁজা ৪২ হাজার ৭৯৪ কেজি ৫৬৭ গ্রাম, ফেনসিডিল ৩ লাখ ৬৫ হাজার ৪৫৭ বোতল, ফেনসিডিল ৯৯.৬০৮ লিটারসহ অন্যান্য মাদক।

জানা গেছে, সম্প্রতি আইস ভাবিয়ে তুলছে সংশ্লিষ্টদের। তারা বলছেন, ইয়াবা ব্যবসায়ীরাই এখন আইস আনছে। ২২ সেপ্টেম্বর কক্সবাজারের টেকনাফ থানার মিঠাপানিছড়া থেকে ১০ কোটি টাকার মূল্যের ২ কেজি আইসসহ মুজিব নামে একজনকে গ্রেফতার করে টেকনাফ ব্যাটালিয়ন (২ বিজিবি)। ২২ ও ২৩ সেপ্টেম্বর রাজধানীর রমনা, বারিধারা, নিকুঞ্জ ও জোয়ারসাহারা এলাকা থেকে ৫৬০ গ্রাম আইস, ১ হাজার ২০০ পিস ইয়াবা ও দুটি প্রাইভেট কারসহ পাঁচ মাদক ব্যবসায়ীকে গ্রেফতার করে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর (ডিএনসি)। এর আগে গত ২০ ও ২১ আগস্ট রাজধানীর বনানী, বারিধারা, বনশ্রী ও খিলগাঁও এলাকা থেকে ৫০০ গ্রাম আইস এবং ৫ হাজার পিস ইয়াবাসহ ১০ জনকে গ্রেফতার করে ডিএনসি। ১২ সেপ্টেম্বর র‌্যাব-৭ এর একটি দল ফিশারি ঘাট এলাকা থেকে ৯৭৫ গ্রাম আইসসহ তিনজনকে গ্রেফতার করে। এর আগে ২৪ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রামে প্রথমবারের মতো ১৪০ গ্রাম আইসসহ দুজনকে গ্রেফতার করে র‌্যাব। সম্প্রতি র‌্যাব-১৫ কক্সবাজার এলাকা থেকে দুই কেজির একটি চালান জব্দ করেছে। তবে ফেনসিডিল বন্ধ হয়ে গেছে এমনটা কিন্তু নয়। আর তা বলে দিচ্ছে জব্দের পরিসংখ্যানই। ৮ সেপ্টেম্বর রাজশাহীর বাঘা থানার বারশিপাড়া নদীর পাড় থেকে ১ হাজার ৪৮৫ বোতল ফেনসিডিল উদ্ধার করে বিজিবির রাজশাহী ব্যাটালিয়ন।

বিজিবি সদর দফতর সূত্রে জানা গেছে, বিজিবির অভিযানে ২০১৭ সালে প্রায় ৪০ লাখ বোতল, ২০১৮ সালে প্রায় ৩৩ লাখ বোতল, ২০১৯ সালে প্রায় ৪০ লাখ এবং ২০২০ সালে প্রায় ৪৬ লাখ বোতল ফেনসিডিল জব্দ হয়।

এই রকম আরও টপিক

সর্বশেষ খবর