রাজধানীর বিজয়নগরে গতকাল জাতীয় পার্টি ও গণঅধিকার পরিষদের নেতা-কর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষ ঘটেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে লাঠিচার্জ করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এ ঘটনায় গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুর, সাধারণ সম্পাদক রাশেদ খানসহ অনেকেই আহত হন। নুরকে রক্তাক্ত অবস্থায় স্থানীয় একটি বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে যান নেতা-কর্মীরা। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে তাঁকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়।
রাতে ঢাকা মেডিকেলে নুরকে দেখতে ছুটে যান আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল, প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম, জামায়াত নেতা নূরুল ইসলাম বুলবুল, জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক আন্দোলনের চেয়ারম্যান ববি হাজ্জাজ। এ সময় আসিফ নজরুলকে উদ্দেশ করে ‘ভুয়া ভুয়া’ স্লোগান দিতে থাকেন গণঅধিকার পরিষদের নেতা-কর্মীরা। সেখানে কিছুক্ষণ তিনি অবরুদ্ধ থাকেন। নুরুল হক নুরকে দেখে আসার পর প্রেস সচিব শফিকুল আলম গণমাধ্যমকর্মীদের বলেন, ‘তাঁর আঘাত খুব গুরুতর। নাকে এবং চোখে আঘাত লেগেছে। মাথা ফেটে গেছে। তাঁর অবস্থা মুমূর্ষু বলে জানিয়েছেন ডাক্তাররা। তাঁকে পর্যবেক্ষণের জন্য আইসিইউতে নেওয়া হবে বলেও ডাক্তাররা জানিয়েছেন। এটা খুবই ন্যক্কারজনক একটি ঘটনা। আমরা এর নিন্দা জানাই। এ পুরো বিষয়টা আমরা তদন্ত করব।’
গণঅধিকার পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রাশেদ খান বলেন, ‘আওয়ামী লীগ আমলেও সেনাবাহিনী বুট জুতা দিয়ে আমাদের লাথি মারেনি। আমাদের কার্যালয়ে পুলিশ-সেনাবাহিনী এসব কাজ করার সাহস করেনি। আজ সেনাবাহিনী-পুলিশ আমাদের কার্যালয়ে ঢুকে লাঠিচার্জ করেছে! নুরের মাথা ফেটে গেছে। চোখে আঘাত লেগেছে। তিনি বাঁচবেন কি না আমরা জানি না।’
তিনি বলেন, ‘আজ এ ঘটনায় যারা জড়িত সবার স্পষ্ট ভিডিও ফুটেজ আমাদের কাছে আছে। যারা জড়িত তাদের শাস্তির আওতায় আনতে হবে। জাতীয় পার্টির প্রতি সরকারের কেন এত মায়া আমরা জানি না। আপা যেদিকে গেছে, জাপাও সেদিকে যাবে।’
এদিকে গতকাল মধ্যরাতে আন্তবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তরের (আইএসপিআর) সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, প্রথমে পুলিশ ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে। তবে একপর্যায়ে সংঘর্ষ বেড়ে গেলে তারা সেনাবাহিনীর সহযোগিতা কামনা করে। বারবার অনুরোধ সত্ত্বেও কতিপয় নেতা-কর্মী তা উপেক্ষা করে মব ভায়োলেন্সের মাধ্যমে পরিস্থিতি অশান্ত করার চেষ্টা করে। জননিরাপত্তা রক্ষায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বলপ্রয়োগে বাধ্য হয়। এ ঘটনায় সেনাবাহিনীর পাঁচ সদস্য আহত হন বলে বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়।
এদিকে নুরুল হক নুরের ওপর হামলার প্রতিবাদে রাত সাড়ে ১১টার দিকে বাংলামোটর থেকে বিক্ষোভ মিছিল বের করে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। মিছিলে দলটির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সদস্যসচিব তাসনিম জারা, জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক আবদুল হান্নান মাসউদসহ অন্য নেতা-কর্মীদের দেখা গেছে। এ ছাড়া নুরের ওপর হামলার প্রতিবাদে দেশের বিভিন্ন জায়গায় বিক্ষোভ মিছিল করেছেন দলটির নেতা-কর্মীরা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্য ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে বিক্ষোভ করেন শিক্ষার্থীরা। রাত ১১টার দিকে চট্টগ্রাম মহানগরের ২ নম্বর গেটের মূল সড়ক অবরোধ করে টায়ারে আগুন জ্বালিয়ে বিক্ষোভ করেন গণঅধিকার পরিষদের নেতা-কর্মীরা। কক্সবাজার শহরেও বিক্ষোভ মিছিল বের করা হয়।
প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, গতকাল সন্ধ্যার দিকে গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুর ও সাধারণ সম্পাদক রাশেদ খানের নেতৃত্বে বিজয়নগর হয়ে দলীয় মিছিল কাকরাইলের দিকে যাচ্ছিল। এ সময় জাতীয় পার্টির কয়েকজন নেতা-কর্মী দলীয় কার্যালয়ের সামনে অবস্থান করলে দুই পক্ষে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। পরে দুই পক্ষে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও ইটপাটকেল নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে। এতে উভয় পক্ষের বেশ কয়েকজন আহত হন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ উভয় পক্ষের কর্মীদের সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে। পরে পুলিশের সঙ্গে সেনাসদস্যরা যুক্ত হয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন। এরপর রাত ৮টার দিকে বিজয়নগর কার্যালয়ে যান জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জি এম কাদের। সাড়ে ৮টার দিকে দ্বিতীয় দফায় জাপা কার্যালয়ের সামনে জড়ো হন গণঅধিকার পরিষদের নেতারা। পরে পুলিশ ও সেনাবাহিনী তাদের জাতীয় পার্টির অফিসের সামনে থেকে ধাওয়া দেয়। গণঅধিকারের নেতা-কর্মীরা তখন কাকরাইলে নিজেদের কার্যালয়ে অবস্থান নেন। সেখানে সংবাদ সম্মেলনের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন নুর-রাশেদসহ নেতাকর্মীরা। তাঁদের সরিয়ে দিতে লাঠিচার্জ করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এতে গুরুতর আহত হন নুর।