শিরোনাম
প্রকাশ : সোমবার, ১৮ জানুয়ারি, ২০২১ ০০:০০ টা
আপলোড : ১৭ জানুয়ারি, ২০২১ ২৩:৩১

দেশের মাটিতেই উৎপাদন ২০ ধরনের বিদেশি ফল

প্রশিক্ষণের অভাব ও প্রয়োজনীয় প্রকল্প না থাকাসহ কিছু প্রতিবন্ধকতা দূর করতে পারলে উৎপাদন আরও বাড়ানো সম্ভব

শফিকুল ইসলাম সোহাগ

দেশের মাটিতেই উৎপাদন ২০ ধরনের বিদেশি ফল

দেশে ড্রাগন ফলের চাহিদার ৩০ শতাংশই পূরণ হচ্ছে দেশীয় উৎপাদনে। চাহিদার ৭০ শতাংশই পূরণ হচ্ছে থাই পেয়ারায়। সারা বছর পাওয়া যাচ্ছে সবুজ ছোট তরমুজ। শুধু ড্রাগন, থাই পেয়ারা বা ছোট তরমুজ নয়, দেশের মাটিতেই এখন বাণিজ্যিক ভিত্তিতে চাষ করা হচ্ছে মাল্টা, কমলা, থাই কুল, থাই পেঁপে, স্ট্রবেরি, ড্রাগন, মেলন, অ্যাভোকাডো, রামবুটানসহ অন্তত ২০ ধরনের বিদেশি ফল। স্বাদ ও ফলন ভালো পাওয়ায় আমদানি করা ফলের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে ১৫-২০ শতাংশ পর্যন্ত বাজার দখল করে নিয়েছে এসব ফল। আমদানি ও দেশে উৎপাদন মিলিয়ে এসব ফল পাওয়া যায় বারো মাস। দামও মধ্যবিত্তের নাগালের মধ্যে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সংরক্ষণ ব্যবস্থার অপ্রতুলতা, আস্থার ঘাটতি, পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের অভাব ও প্রয়োজনীয় সংখ্যক প্রকল্প না থাকাসহ কিছু প্রতিবন্ধকতা রয়েছে বিদেশি ফল উৎপাদন খাতে। এগুলো দূর করতে পারলে এসব ফলের উৎপাদন ও বাজার আরও বাড়ানো সম্ভব। জানা যায়, গত এক দশকে এ দেশে অন্তত ২০টি বিদেশি ফলের আগমন ঘটেছে। এগুলো হলো স্ট্রবেরি, ড্রাগন ফ্রুট, মাল্টা, রামবুটান, সাওয়ার সপ বা টক আতা, আলুবোখারা, ম্যাঙ্গোস্টিন, ক্যানিস্টেল বা জামান ফল, প্যাশন ফ্রুট, পার্সিমন, অ্যাভোকাডো, কোকো, আঙুর, পিচ, চেরি, লংগান, সৌদি খেজুর, ব্রেডফ্রুট, শানতোল, রক মেলন ইত্যাদি। এর আগেও এসেছে কাজুবাদামসহ অনেক বিদেশি ফল। এ ছাড়া এমন কিছু ফল, যা এ দেশে ছিল, কিন্তু সেগুলোর বেশ কিছু নতুন জাতের আগমন ঘটায়, সেসব ফল চাষে ও উৎপাদনে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। থাই পেয়ারা এর অন্যতম উদাহরণ। থাইল্যান্ড থেকে পেয়ারার এ জাতগুলো আসায় এখন আমরা সারা বছরই সুস্বাদু পেয়ারা খেতে পারছি। একইভাবে এসেছে প্রায় সারা বছর বা অ-মৌসুমে ধরা সুস্বাদু সুমিষ্ট আমের জাত কাটিমন, দুই-তিন কেজি ওজনের আম ব্রুনাই কিং, লাল টুকটুকে বাহারি আম আমেরিকার পালমার, হলদে রঙের কলার মতো লম্বা জাতের আম ব্যানানা ম্যাংগো, এমনকি দেশের মাটিতে সয়লাব হয়ে যাওয়া আম্রপালি, থাই জামরুল, মিষ্টি অরবরই, মিষ্টি তেঁতুল, মিষ্টি করমচা, মিষ্টি কামরাঙা, রঙিন শরিফা, ডোয়ার্ফ নারিকেল, অ-মৌসুমি তরমুজ ইত্যাদি।

লিচুকে আমরা বলি দেশি ফল। কিন্তু এই লিচু এসেছিল একসময় চীন থেকে, এমনকি লিচু নামটাও চীনা শব্দ। এভাবে এখন আমরা যেসব ফলকে দেশি ফল বলে চিনি, এর অনেক ফলই বিদেশ থেকে এসে আমাদের দেশের মাটিতে ঠাঁই করে নিয়েছে। ধীরে ধীরে সেগুলো জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। সে ধারা অব্যাহত আছে, ভবিষ্যতেও থাকবে।

জানা যায়, দেশে ২৫-৩০ জাতের বিদেশি ফল আমদানি হয়। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি আমদানি হয় খেজুর, আপেল, আঙুর, কমলা, মাল্টা, আনার ও নাশপাতি।  দেশে উৎপাদন শুরু হওয়ায় অনেক বিদেশি ফলের দাম মধ্যবিত্তের নাগালের মধ্যে আসছে। ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. আবদুস সাত্তার মন্ডল বলেন, দেশে আশাব্যঞ্জক হারে বিদেশি ফল উৎপাদন হচ্ছে। তরুণ প্রজন্মের কর্মসংস্থানের সঙ্গে সঙ্গে আমদানিনির্ভরতাও কমছে। তবে এ খাতে উৎপাদন বাড়াতে এবং উদ্যোক্তাদের উৎসাহ দিতে কিছু নীতিগত সহায়তা দিতে হবে সরকারকে। এখনো ফল সংরক্ষণ, বাজারজাতকরণ ও প্যাকেজিং ব্যবস্থা আধুনিক হয়নি। এজন্য সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগ প্রয়োজন।

জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার হিসাবে, বাংলাদেশে বছরে ১২ শতাংশ হারে ফলের উৎপাদন বাড়ছে। আর বছরে ১০-১১ শতাংশ হারে বাড়ছে ফল চাষের জমি। একই সঙ্গে বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ চারটি ফলের মোট উৎপাদনে বাংলাদেশ শীর্ষ ১০ দেশের তালিকায় উঠে এসেছে। কাঁঠাল উৎপাদনে বিশ্বের দ্বিতীয়, আমে সপ্তম, পেয়ারা উৎপাদনে অষ্টম ও পেঁপেতে চতুর্দশতম স্থানে আছে বাংলাদেশ। আর মৌসুমি ফল উৎপাদনে বাংলাদেশের অবস্থান বর্তমানে দশম।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের গত বছরের হিসাব অনুযায়ী, এক যুগ আগেও দেশে ৫৬ জাতের ফলের চাষ হতো। বর্তমানে ৭২ জাতের ফল চাষ হচ্ছে। আরও ১২ জাতের ফল বাংলাদেশে চাষ উপযোগী করার জন্য গবেষণা চলছে। নতুন করে চাষ শুরু হওয়া ফলের মধ্যে ড্রাগনের ২৩টি প্রজাতি, খেজুরের ১৬টি, নারিকেলের দুটি প্রজাতি, কাঁঠালের একটি, আমের তিনটি নতুন প্রজাতি চাষের প্রাথমিক সফলতা পাওয়া গেছে। ফলের এসব জাতের সবই থাইল্যান্ড, ভিয়েতনামসহ বিভিন্ন দেশ থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে। জানা যায়, এখন সারা বছর ২২ জাতের ফল নিয়মিত খেতে পারে। দেশে থাই পেয়ারা উৎপাদন এর পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৩৬ হাজার টনে। মাল্টা ও কমলার পুরো চাহিদার দেশীয় উৎপাদনে ১৫-২০ শতাংশ চাহিদা পূরণ হচ্ছে। আগামী কয়েক বছরে প্রায় ৪০ শতাংশ পূরণ সম্ভব বলে মনে করছেন কৃষিবিদরা। দেশে ড্রাগন ফলের চাহিদার ৩০ শতাংশই পূরণ হচ্ছে দেশীয় উৎপাদনে। প্রতি বছর দেশে গড়ে ৩৫ টন ড্রাগন, ৫৪ টন স্ট্রবেরি, ৪১ হাজার টন মেলন, ১ লাখ ৩৬ হাজার টন পাকা পেঁপে উৎপাদন হচ্ছে। বিদেশি ফলের মধ্যে রামবুটান নরসিংদী, সিলেট, খাগড়াছড়িসহ বিভিন্ন অঞ্চলে উৎপাদন হচ্ছে। থাইল্যান্ডের উচ্চ ফলনশীল আম, লিচু ও শরিফা, স্টার ফুড, আঠা ছাড়া লাল কাঁঠাল, উন্নত জাতের জাম্বুরা দেশে অল্প বিস্তর উৎপাদন হচ্ছে। কেউ কেউ বাণিজ্যিক ভিত্তিতেও চাষ শুরু করেছেন। কয়েক বছরের মধ্যে বিদেশি আরও কয়েকটি ফল দেশীয় উৎপাদনের তালিকায় যোগ হবে বলে আশা করা হচ্ছে।


আপনার মন্তব্য

এই বিভাগের আরও খবর