একটি বৈষম্য মুক্ত, গণতান্ত্রিক, অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ বিনির্মাণের লক্ষ্যে জাতীয় কবিতা পরিষদ জাতীয় পর্যায়ে ধারাবাহিকভাবে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের সঙ্গে বৃহত্তর জাতীয় ঐক্য গঠনের প্রয়াসে যৌথ মতবিনিময় সভার উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।
এরই ধারাবাহিকতায় শুক্রবার সন্ধ্যায় 'গণসংহতি আন্দোলন'-এর নেতৃবৃন্দের সঙ্গে এক বিশেষ মতবিনিময় সভা গণসংহতি আন্দোলন কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত হয়েছে।
মতবিনিময়ের শুরুতে জাতীয় কবিতা পরিষদের সভাপতি কবি মোহন রায়হান বলেন- ১৯৮৭ সালে সামরিক স্বৈরাচারবিরোধী গণতান্ত্রিক আন্দোলনের সর্বদলীয় প্ল্যাটফর্ম হিসেবে জাতীয় কবিতা পরিষদ সৃষ্টি হলেও আওয়ামী লীগ ক্ষমতাসীন হলে আওয়ামী ফ্যাসিবাদী কবিরা সংগঠনটিকে দলীয় লেজুরবৃত্তিতে পরিণত করে। নিজেদের সুযোগ-সুবিধা- অর্থ-বিত্ত, চাককি, ব্যবসা, পদ-পদবি পুরস্কার বাগানোর হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে। হাসিনার সীমাহীন দুর্নীতি, লুটপাট, জুলুম-নির্যাতন, গুম, খুনের সাফাই গায়। হাসিনার পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার সংগঠনটি পুনর্গঠন করে রাষ্ট্রযন্ত্রটিকে কবি লেখকদের ভূমিকা পালনে গাম্বীর্য বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। সেই ধারাবাহিকতায় আজকের এই মতবিনিময় সভা।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন ছাড়া রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক মুক্তি সম্ভব নয়। সেই লক্ষ্যকে সামনে রেখেই আমরা এদেশের রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর সঙ্গে ধারাবাহিকতাকে মতবিনিময় করছি। দলগুলোর অন্যান্য কর্মসূচির পাশাপাশি তাদের সাংস্কৃতিক চিন্তা চেতনা কি, আগামী দিনে একটি বৈষম্যমুক্ত, গণতান্ত্রিক, অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গঠনে তাদের কি ভূমিকা, কি প্রতিশ্রুতি? সেটা আমরা জানতে চাই এবং আমাদের চিন্তা ভাবনাগুলোও তাদের কাছে তুলে ধরতে চাই। একটি পারস্পরিক সমঝোতার মাধ্যমে বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির রূপরেখা তৈরি করা যায় কিনা, সেই তাগিদ থেকেই আমরা এই মতবিনিময় সভাগুলো আয়োজন করছি। আমরা এ পর্যন্ত বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি, নাগরিক ঐক্য, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল-বাসদ, বাংলাদেশ জাসদ এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)'র সঙ্গে মত বিনিময় করেছি। আজকে গণসংহতির সঙ্গে এই মত বিনিময়ের ধারাবাহিকতায় আমরা বাংলাদেশের অন্যান্য গণতান্ত্রিক উদারনৈতিক, প্রগতিশীল রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গেও মতবিনিময় করে একটি ঐকমত্য তৈরির চেষ্টা করব।"
কবিতা পরিষদের অন্যতম উপদেষ্টা দেশের অন্যতম জ্যেষ্ঠ কবি মহিন বৈরাগী বলেন, দেশের সাধারণ মানুষেরা বরাবরই ন্যায্য অধিকার বঞ্চিত হয়েছে। জুলাই-এর গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে এই বঞ্চনা কিছুটা হলেও দূর হবে এমন আকাঙ্ক্ষা ছিল, এই সরকার আমাদের সেই প্রত্যাশা পূরণের পথ সুগম করতে পারবে কিনা তা নিয়ে সন্দেহ দেখা দিয়েছে।
গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক জোনায়েদ সাকী বলেন, রাজনৈতিক বন্দোবস্তের একটা প্রচারক হিসেবে আমরা অনেকদিন ধরে আছি। আমরা নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের কথা বলি এটা তো এদেশের কেউ সেভাবে গ্রহণ করে না। তবে ছাত্ররা এটাকে গ্রহণ করেছে। এদেশের রাজনীতি কলোনিয়াল ছিল। এদেশের রাজনীতি কখনও জাতিগত কখনও রাজনৈতিক। বামপন্থীরা শ্রেণিভিত্তিক রাজনীতি করেছে। জাতীয় রাজনীতি ও ধর্মীয় রাজনীতিকেও গুরুত্ব দেয়নি। ধর্মীয়, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য এক না হলে মানুষ আসলে এগোতে পারবে না। ৯২-এর কবিতা উৎসবে আমিও ছিলাম। তখন কবিতা উৎসবে সবাই যেত। পরে আওয়ামী ফ্যাসিবাদী আমলে অনেকেই যাওয়া বন্ধ করে দেয়। ধর্মীয় আইডেন্টিটিকে সামনে আনাটা ভুল। বামপন্থীদের অনেকগুলো ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে। বামপন্থীদের অনেকেই সাংস্কৃতিক জায়গায় অতিক্রম করে যেতে পারেনি। ধর্মের দোহাই তুলে কেন আমরা দুটো অংশে ভাগ হয়ে যাচ্ছি। দক্ষিণ পন্থার উত্থান নিয়ে আপনারা চিন্তিত, এটা নতুন নির্মাণেরও আহ্বান। বামপন্থীরা এতদিন যে ভাষায় তাদের দলিল লিখত তাদের ভাষা এখন বদলাতে হবে। নতুন প্রজন্মের যে ভাষা তাদের আকৃষ্ট করে সে ভাষায় লিখতে হবে। শ্রেণি সংগ্রাম হারিয়ে যাচ্ছে। এমন রাজনৈতিক দল দরকার যারা সাধারণ জনগণের অধিকার নিয়ে কথা বলবে। এতদিনকার যে আওয়ামী ডিসকোর্স- আওয়ামী লীগ ও বামপন্থা মিলেমিশে চলছিল সেটা থেকে উত্তরণ দরকার।
মতবিনিময় সভায় অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন গণসংহতি আন্দোলনের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য তাসলিমা আখতার, সদস্য বাচ্চু ভূঁইয়া, সদস্য দীপক রায় এবং জাতীয় কবিতা পরিষদের সাংগঠনিক সম্পাদক কবি মুজতবা সউদেল, শান্তি ও শৃঙ্খলা সম্পাদক কবি ইফসুফ রেজা, আইন সম্পাদক কবি শিমুল পারভীন, নির্বাহী সদস্য কবি সবুজ মনির, কবি কাঙাল রাসেল, কবি তাহমিনা ইয়াসমিন ও কবি নাহিদ হাসান এবং সদস্য কবি রফিক চৌধুরী, কবি প্রভাতী চক্রবর্তী, কবি মরিয়ম আক্তার প্রমুখ।
বিডি প্রতিদিন/জুনাইদ