Bangladesh Pratidin || Highest Circulated Newspaper
শিরোনাম
প্রকাশ : ২৬ জুন, ২০১৯ ১৪:৪৮
আপডেট : ২৬ জুন, ২০১৯ ১৫:০১

বাংলাদেশে আজ সবাই ডাক্তার

ডা. এ কে এম মহিউদ্দিন ভুঁইয়া মাসুম

বাংলাদেশে আজ সবাই ডাক্তার
প্রতীকী ছবি

বাংলাদেশের চিকিৎসক ও চিকিৎসা ব্যবস্থার অনিয়ম নিয়ে বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়ায় আলোচনা ও সমালোচনার ঢেউ বয়ে যাচ্ছে। আবার বরগুনাসহ দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসকদের উপর হামলা শুরু হয়েছে। চিকিৎসকদের উপর হামলা যেমন মেনে নেওয়া যায় না, তেমনি আমরা যারা চিকিৎসক তাদের মেডিকেল ইথিকস্ লঙ্ঘন করে চিকিৎসা সেবা দেওয়াও মানা যায় না। আনইথিক্যাল চিকিৎসা সেবা বন্ধ করতে হবে। চিকিৎসা সেবা আইনের বিষয় নয়। চিকিৎসক ও চিকিৎসা সেবা মেডিকেল ইথিকসের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত মানবিক বিষয়। প্রত্যেক চিকিৎসক মেডিকেল ইথিকস্ মেনে চলতে বাধ্য। 

কিন্তু আমরা চিকিৎসকরা মেডিকেল ইথিকস্ কি সেটাই ভুলে গিয়েছি। বাংলাদেশের চিকিৎসকরা দেশ-বিদেশে আজ প্রশংসিত, কিন্তু আমাদের কতিপয় চিকিৎসকের আনইথিক্যাল কাজের জন্য আমাদের পুরো চিকিৎসা ব্যবস্থাই সমালোচনার মুখে। আমাদের চিকিৎসকদের ত্যাগ, সুনাম, সব হারিয়ে যাচ্ছে এই সব সমালোচনার জন্য। উন্নত বিশ্বে আমাদের চিকিৎসকদের সুনাম ও সুখ্যাতিতে আমরা গর্ববোধ করি। আমাদের চিকিৎসকরা উন্নত বিশ্বে সুনাম অর্জন করতে পারলে, নিজ দেশে কেন পারবেন না?

আমার বিশ্বাস আমাদের হেলথ সিস্টেমকে ঢেলে সাজাতে পারলে আমরা দেশীয় চিকিৎসকরা আরো বেশী দক্ষতা ও সুনাম অর্জন করতে পারবে। 

প্রত্যেক প্রাণীকে মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে- আল কোরআন।
আমার হুকুম ছাড়া মৃত্যু হয়না- আল কোরআন।

এটা যেমন চিরসত্য, আবার কাউকে ইচ্ছাকৃতভাবে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়া যাবে না। আলেকজেন্ডার দি গ্রেটের মৃত্যুর পর তার শেষ  ইচ্ছানুযায়ী শবদেহ বহন করেছিলেন তার ব্যক্তিগত চিকিৎসকরা, কারণ তিনি পৃথিবীর মানুষকে শিক্ষা দিতে চেয়েছিলেন যে- চিকিৎসকরা কোন মানুষের জীবন দান করতে পারেন না। এটা সবার বুঝতে হবে। তাই বলে চিকিৎসকরা চিকিৎসায় অবহেলা করবেন তা হবে না। 

আমাদের চিকিৎসকরা সীমিত সামর্থের মধ্যে জাতিকে যে সেবা দিয়ে আসছেন তা সারা বিশ্বে প্রশংসিত। তারপরেও চিকিৎসকরা তীব্র সমালোচনার মুখে। এর জন্য দায়ী কে? চিকিৎসক নাকি চিকিৎসা ব্যবস্থা?

আমাদের বলতে লজ্জা হয়, এদেশে এখনো একটা জাতীয় স্বাস্থনীতি প্রণীত হয়নি। প্রণীত হয়নি সার্বজনীন মেডিকেল শিক্ষা ব্যবস্থা। এ সুযোগে একটি মহল চিকিৎসা ব্যবস্থাকে বাণিজ্যকরণ করে দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়। 

দেশে এখন ৪ ধরনের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা বিদ্যমান:
১। গ্রামীন স্বাস্থ্য ব্যবস্থা: যা ফার্মেসী ম্যান বা পল্লী চিকিৎসক নিয়ন্ত্রিত।
২। উপজেলা ও জেলা স্বাস্থ্য ব্যবস্থা: যা সরকারী-বেসরকারি চিকিৎসক ও হাসপাতাল দ্বারা নিয়ন্ত্রিত।
৩। মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিকেল কলেজ পর্যায়ের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা: যা সরকারী মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় ও সরকারী-বেসরকারি মেডিকেল কলেজ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত।
৪। ফাইভ স্টার স্বাস্থ্য ব্যবস্থা- যা রাজধানী ও বিভাগীয় শহরে গড়ে উঠা ফাইভ স্টার হোটেলের মতো হাসপাতাল দ্বারা নিয়ন্ত্রিত।

এক এক স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় এক এক রকম সেবা প্রদান করা হয়, তবে সব ধরনের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা বেসরকারিভাবে নিয়ন্ত্রিত।

একটি দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা থাকবে সম্পূর্ণ সরকারের নিয়ন্ত্রণে, সারা বিশ্বে সরকারী বেসরকারি সব ধরনের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা সরকারের নিয়ন্ত্রণে থাকে, কিন্তু আমাদের দেশে কার নিয়ন্ত্রণে আছে তা বোঝা কষ্টকর। এক এক জায়গায় চিকিৎসা সেবা ও ব্যয় এক এক রকমের। কোন জায়গায় কারো কোন নিয়ন্ত্রণ নেই।
 
ফাইভ স্টার হোটেল সদৃশ বেসরকারী হাসপাতালের চিকিৎসা সেবার মান ও খরচ নিয়ে কারো কোন প্রশ্ন নেই। কেন তারা একটা সিজারের বিল ২ লাখ টাকা নেন, কেউ কি কোনদিন জিজ্ঞেস করেছেন।

দেশের প্রত্যন্ত এলাকায় কেন ব্যাঙের ছাতার মত মানদণ্ডহীন বেসরকারী ক্লিনিক ও হাসপাতালের অনুমোদন দেওয়া হচ্ছে। ডাক্তার নার্স ছাড়া কিভাবে বেসরকারী হাসপাতাল ও ক্লিনিক অনুমোদন পায়?

দেখলাম একজন আইনজীবি রীট করেছেন সিজার বন্ধ করার জন্য, এটার জন্য আইনজীবিকে রীট করতে হবে কেন?
 
ইন্ডিকেশন ছাড়া কেন সিজার হবে? ইন্ডিকেশন ছাড়া সিজার অবশ্যই বন্ধ করতে হবে। এটা যারা মনিটর করার কথা তারা করছেন না কেন? কেন এন্টিবায়োটিক প্রেসক্রিপশন ছাড়া বিক্রি করা যাবে না তা আজ হাইকোর্ট কে বলতে হয়? প্রসক্রিপশন ছাড়া এন্টবায়োটিক পৃথিবীর কোন দেশে বিক্রি হয় না, শুধু হয় বাংলাদেশে। বাংলাদেশে আজ সবাই ডাক্তার। রাষ্ট্র ব্যবস্থাপকদের সবার আগে বুঝতে হবে কে চিকিৎসক, আর কে চিকিৎসক না। একজন ঔষধ ব্যবসায়ী কি চিকিৎসক? অথচ সবচেয়ে বেশী ঔষধ প্রেসক্রাইব তারা করে থাকেন। তারপর করে থাকেন পল্লী চিকিৎসকরা। এমন তো হবার কথা নয়। হচ্ছে এই জন্যই “আমারা এখনো জানিনা চিকিৎসক কাদের বলে।”

মফস্বলের সরকারী হাসপাতালের চিকিৎসক ভালো চিকিৎসা দিলে ঔষধ ব্যবসায়ী, পল্লী চিকিৎসক বা কোন মফস্বল পত্রিকার সাংবাদিক  কিভাবে বলেন যে চিকিৎসা ভুল দিয়েছেন।

ভুল চিকিৎসায় রোগীর মৃত্যু বা ক্ষতি হয়েছে কিনা তা নির্ধারণ করবেন কোন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক টিম। আমি একজন সাবেক মন্ত্রীকে চিনি যিনি এখনো তার গ্রামের পল্লী চিকিৎসকের মাধ্যমে চিকিৎসা নিয়ে থাকেন। যারা চিকিৎসক নন তারা হয়তো বুঝবেন না চিকিৎসক হবার কি জ্বালা এদেশে।

এদেশের চিকিৎসা ও চিকিৎসা ব্যবস্থা জিম্মি হাতেগোনা কয়েকজন চিকিৎসক, বেসরকারী হাসপাতালের মালিক ও ঔষধ ব্যবসায়ীর হাতে। বেসরকারি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার কেন দালাল নিয়োগ করবে? কেন তারা ডাক্তার ও চিকিৎসকদের কমিশন দেবেন। কেন এক এক হাসপাতালের চিকিৎসা ব্যয় এক এক রকম? সরকারী হাসপাতালের ৩-৪ গুন বেশী কেন নেবে ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলো। এই সব ক্লিনিকে সদ্য পাশ করা ডাক্তার চেম্বার করতে গেলেই তাকে কমিশন প্রথা শিখিয়ে দেওয়া হয়। তাইতো টাকার লোভে অনেক চিকিৎসক অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নীরিক্ষা করিয়ে থাকেন। এটা বন্ধ করা জরুরী।

দেশের সকল হাসপাতালের পরীক্ষার ফি এর একটা লিমিট নির্ধারণ করা জরুরী। আইসিডিডিআরবিসহ সব প্রতিষ্ঠানকে বিএসএমএমইউর মানদণ্ডে এনে  বিএসএমএমইউ চিকিৎসা সেবায় যে ফি নেয়, সবার বেলায় তা চালু করতে হবে। ফাইভ স্টার হাসপাতালগুলোর সেবার ফি নির্ধারণ করা জরুরি।

সারা বিশ্বে চিকিৎসকরা অতি সম্মানীয়। আমাদের দেশে কেন হবে না? আমাদের এ পেশার গৌরব ফিরে পেতে হলে রাষ্ট্র্রযন্ত্র ও চিকিৎসকদের একযোগে কাজ করতে হবে। 

রাষ্ট্রকে কিছু দৃঢ পদক্ষেপ নিতে হবে, তেমনি আমরা যারা চিকিৎসক তাদের এই মহান পেশার ইথিকস্ মেনে চলতে হবে। 

রাষ্ট্রকে চিকিৎসা পেশায় জড়িতদের নিরাপত্তা প্রদানের পাশাপাশি, চিকিৎসকদের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ পরিহার করে এই পেশার জন্য জাতীয় নীতিমালা বা জাতীয় স্বাস্থ্যনীতি প্রনয়ণ করে এর দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে।

আসুন, আমরা বদলে যাই। আমরা মানবিক হই। 
মানবিকতাই হল চিকিৎসা পেশা।

লেখক: হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ।

বিডি প্রতিদিন/হিমেল


আপনার মন্তব্য