শিরোনাম
প্রকাশ : ২৬ অক্টোবর, ২০২০ ০৮:৪৯

যুদ্ধটা আসলে নিজের সাথেই; অন্যরা স্রেফ দর্শক!

বাণী ইয়াসমিন হাসি

যুদ্ধটা আসলে নিজের সাথেই; অন্যরা স্রেফ দর্শক!
বাণী ইয়াসমিন হাসি

মাঝে মাঝেই ইচ্ছে করে একটা ট্রেনে চেপে বসি। একটা অজানা স্টেশনে নেমে পড়ি। তারপর হেঁটে হেঁটে নাম না জানা এক নদীর ধারে বসে বাকি জীবনটা কাটিয়ে দিই। একই শহরে থাকি আমরা। সুযোগ এবং ইচ্ছে থাকার পরও এই যে আমি তোমাকে দেখতে যাই না; আমার কাছে এটাই আমার প্রেম। গভীরতম ভালোলাগা ছুয়ে দেখতে নেই। আমার মন কেমন করা দিনে; আমার নির্ঘুম রাতে অথবা যেকোন সংকটে আমি জানি তুমি আছো। কোথাও না থেকেও অনেকটা জুড়ে থাকা যায়। জীবন কখনো কখনো এত বেশি অদ্ভুত!

আমাদের সময়ে স্লেটে চক দিয়ে লেখা হতো। শুরুতে বাবা মা বা শিক্ষক স্লেটে অ আ ক খ লিখে দিতেন। সেই লেখার উপর হাত ঘুরিয়ে বাচ্চারা লেখা শিখতো। একটু বড় হয়ে মায়ের কাছে শুনেছি- বই দেখে আমি নিজে নিজে লিখতে শিখেছি। আমার স্লেটে কেউ লিখে দিলে আমি কাঁদতাম। কারো লেখার উপর হাত ঘুরাতাম না। কাঁদতে কাঁদতে চোখের পানিতে স্লেট মুছে নিজে লিখতাম।

আমার বাবা মা আমাকে নিজেকে মানুষ ভাবতে শিখিয়েছিলেন। ছোটবেলা থেকেই আমি বেশ স্বাধীনচেতা। মন যা চাই তাই করি, কোন হিসেব নিকেষ ছাড়াই। বাকি জীবনটাও আমি আমার মত করেই কাটাতে চাই। আমার এই পথচলায় আমার সাথে কে থাকলো বা না থাকলো সেটা আলাদা কোন গুরুত্ব বহন করে না আমার কাছে। আমার স্কুলবেলায় নাইন টেনে আমি খুব সমরেশ পড়তাম। নকশালবাড়ি মাথায় গেথে আছে সেই থেকে। আমার এলাকায় একসময় চরমপন্থীদের দোর্দণ্ড প্রতাপ ছিল। কত রাত স্বপ্ন দেখেছি পালিয়ে যেয়ে বিপ্লব করবো। আমি ব্যক্তিজীবনে চরমপন্থী। আমার জীবনে মাঝামাঝি বলে কোন শব্দ নেই। আমার না মানে না। আমার হ্যাঁ মানে হ্যাঁ। হ্যাঁ আর না এর মাঝামাঝি আমি কখনো থাকি না।

এই জীবনে অনেকের ভালোবাসা পায়ে ঠেলেছি। আবার যাকে ভালোবেসেছি কোন এক অজানা অভিমানে ছুঁয়ে দেখা হয়নি তাকে। জীবনে আর যাই হোক কারো অনুভূতিকে আহত করা উচিত না। কারো ভালোবাসার প্রতিদানে তাকে ভালোবাসতে না পারেন ক্ষতি নেই কিন্তু সেটা যেন কোনভাবেই ঐ ব্যক্তির অসম্মান বা ক্ষতের সৃষ্টি না করে। কখনোই কারো পাঁজর ভাঙার কারণ হওয়া উচিত না। নিজের জীবনের না পাওয়ার হিসেব মেলাতে গিয়ে অন্যের জীবনের বঞ্চনার উপলক্ষ্য বা একমাত্র কারণ না হওয়া।

এমন তো হতেই পারে আপনি যাকে চেয়েছেন তার সাথে কখনোই একসাথে হাঁটা হয়নি। তার বারান্দায় কখনো শুকানো হবে না আপনার শাড়ি জামা। কিন্তু যে মানুষটা একান্ত ভালোবেসে এসেছে আপনার জীবনে; নিজের ভালো থাকার একচ্ছত্র ইজারা তুলে দিয়েছে আপনার হাতে। একবার চোখ টা বন্ধ করে নিজেকে সমর্পণ করেন সেই মানুষটার কাছে। বিশ্বাস করেন-ঠকবেন না। ভালোবাসা এমনই সর্বগ্রাসী; যা কেড়ে নেয় ফিরিয়ে দেয় তারচেয়ে কয়েক গুণ বেশি। ভালোবেসে নিজেকে কাঁদান তাতে আপত্তি নেই কিন্তু সেই আঁচে নিজের মানুষটাকে পুড়তে দিয়েন না। শক্ত করে ভালোবাসার মানুষটার হাতটা ধরে রাখেন। বুকের সাথে লেপটে থাকেন। প্রতিটা হার্টবিট যেন আপনার উপস্থিতির জানান দেয়।

তীব্র ভালোবাসার থেকেই তো অভিমানের জন্ম হয়। অভিমানের দেয়ালটা কাউকে না কাউকে তো ডিঙাতেই হবে। না হয় আপনিই এগিয়ে আসেন। বিশ্বাস করেন এই পরাজয়ে কোন লজ্জা নেই বরং সবটাই প্রাপ্তি। নিজের মানুষটাকে আগলে রাখেন। তার আত্মা কি চায় সেটা বোঝার চেষ্টা করেন।আপনার ঘরটাই তখন স্বর্গ হয়ে উঠবে।

প্রতিটা মানুষের একটা নিজস্ব আকাশ থাকে। সেখানে কখনো মেঘ জমে আবার কখনো বা রৌদ্র খেলা করে। প্রতিটা মানুষের একটা নিজের বারান্দা থাকে। ঘরে যখন দমবন্ধ লাগে তখন মানুষ সেই বারান্দাতে গিয়ে শ্বাস ফেলে। এই আকাশ এই বারান্দা খুব নিজের। এখানে অন্য কারো বিচরণ নেই। কেউ যদি ভুল করে ঢুকে পড়ে সেটা একান্তই তার সমস্যা।
বারান্দা ভালো থাকুক
আকাশ ভালো থাকুক ...

মনের দাবির চেয়ে বড় কোন দাবি পৃথিবীতে নেই। মনের বিনিময় তো শুধু মনের সাথেই হয়। অধিকাংশ মানুষই জীবনভর হাতড়িয়ে মরে। পাওয়া টা আর হয়ে ওঠে না। বড় কোন আবেগ, প্রেম কিংবা সহমর্মিতা হৃদয়ে শুধু রক্তই ঝরায়। গন্তব্যহীন, ঠিকানাহীন, দায়বদ্ধতাহীন কোন বিনিময়কে আমি সম্পর্ক বলতে নারাজ। হৃদয় দিয়ে হৃদি অনুভব। এটা ছাড়া শুধুই যন্ত্রণা, শুধুই অপমান।

বেলাশেষে ফিরে এসে পাইনি তোমায় ...
কথাটা সবসময় সত্যি নয়। যে থাকার সে থেকেই যায়। এক পৃথিবী দূরে থেকেও সাথে থাকা যায়। সাথে থাকা মানে একছাদের নিচে থাকা নয়। তারে দেখি না নয়নে, তবু সে থাকে পরাণে। বাকি সব শুধুই লৌকিকতা!

যার কাছে আপনার আকাশ সমান প্রত্যাশা থাকবে; তার কাছ থেকে যন্ত্রণা ছাড়া কিছুই পাবেন না। কিন্তু এমন কেউ আপনার পাশে দাঁড়িয়ে যাবে; যার কাছে আপনি কখনোই কোন দাবি রাখেননি। বড্ড অদ্ভুত এই সমীকরণ! ফোনের ওপাশে কারো একটা হ্যালো শোনার জন্য আপনার কলিজা ফেটে যাবে। ফোন হাতে নিয়ে দীর্ঘক্ষণ বসে থাকবেন। মুখস্থ নাম্বার চেপে ডায়াল করে রিং হওয়ার আগেই কেটে দেবেন। এটাই হলো অপ্রেম অথবা মন্দবাসার গল্প। যার শেষটায় থাকে পাঁজর ভাঙা ব্যথা।

রবি বাবুর পূজা পর্বের গানগুলো আমার সবচেয়ে প্রিয়। সব প্রেম তো আসলে ঈশ্বরে যেয়েই শেষ হয়। সবদেশে, সবকালে প্রেমের ধরণ একই। প্রেম মানেই তো সমর্পণ। প্রেম মানেই ঈশ্বরজ্ঞানে প্রার্থনা। চাওয়ার তীব্রতা যখন বেশি থাকে, তখন হাহাকার থাকে। পাওয়ার পর সেটার আবেদন হারাতে থাকে।

শুধু চুপচাপ পাশে বসে থেকেও বুঝিয়ে দেওয়া যায়, ‘আমি আছি’। মন চাইলেই কথা বলা যায় তার সাথে, ডাকলেই দেখা হওয়া সম্ভব। এমনকি ইচ্ছে হলে দূরে কোথাও চলে যাওয়া যায়। 
সময়, সুযোগ এবং ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও এগুলোর কোনটাই যখন আপনি করবেন না, তখন বুঝবেন আপনি বড় হয়ে গেছেন।

জীবনে টানাপোড়ন থাকবে, না পাওয়া থাকবে, পাঁজর ভাঙ্গা হাহাকার থাকবে। সবকিছু ছাপিয়ে ছোট ছোট প্রাপ্তি গুলোর মাঝে যে আনন্দ লুকিয়ে থাকে সেটাকে আস্বাদন করতে পারার নামই সুখ। সারা দুনিয়া আঙ্গুল তুললেও লাগে না। কিন্তু যাকে ‘টেকেন ফর গ্রান্টেড’ ধরে নেওয়া হয়; তার ছুঁড়ে দেওয়া প্রশ্ন রক্তাক্ত করে। যে মানুষটা গোটা পৃথিবীর সমান দামী আপনার কাছে; তার জীবনের কোথাও হয়তো আপনি নেই ! কি নির্মম তাই না?  আর এই  গল্পের সবচেয়ে কঠিন সত্য হলো, এ ব্যথার কোন নালিশ নেই।

প্রতিটা মানুষেরই কোন না কোন ‘না পাওয়া’ থাকে। এই না পাওয়াটা খুব আপন আর নিজের। অনেকটা তুলে রাখা শাড়ি বা জামা কাপড়ের মতন। মাঝে মাঝে বের করে ভাঁজ ভেঙে নেড়েচেড়ে দেখতে ভালো লাগে। পৃথিবীর সবচেয়ে কঠিন, হৃদয়হীন বা বাস্তববাদী মানুষটাও কখনো কখনো নিজের সেই একান্ত শূন্যতার হাহাকারে ক্ষণিকের জন্য হলেও থমকে দাঁড়ায়। যুদ্ধটা আসলে নিজের সাথেই। অন্যরা স্রেফ দর্শক !

লেখক: সম্পাদক, বিবার্তা২৪ডটনেট।

বিডি-প্রতিদিন/সালাহ উদ্দীন


আপনার মন্তব্য