শিরোনাম
প্রকাশ : ২৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২১ ২২:৫২
প্রিন্ট করুন printer

মানুষের ভালোবাসাটা এভাবেই ভালো থাক চিরকাল

অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান চৌধুরী:

মানুষের ভালোবাসাটা এভাবেই ভালো থাক চিরকাল
অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান চৌধুরী

পৃথিবীতে সবাই ভালোবাসার মূল্য দিতে পারে না। কারণ ভালোবাসার মূল্য দিতে হলে একটা ভালো মন থাকতে হয়। যে মনটা স্বচ্ছ স্ফটিকের মতো হতে হয়। স্বার্থরা যখন ভালো মনকে আক্রমণ করে তখন সে ভালো মনের  স্বার্থদের সাথে জীবনবাজি রেখে লড়াই করার মতো শক্তি অর্জন করতে হয়। মানুষের তো মন থাকে। মানুষের স্বার্থও থাকে। 

তবে স্বার্থপরতা মানুষের অস্তিত্বের একটা অংশ। কোথাও কম কোথাও বেশি। এটা কি শূন্যে নামিয়ে আনা সম্ভব। মনস্তত্বের গবেষণা এটা নিয়ে ভাবতে পারে তবে সেটার সংখ্যাগত মান পরিমান করা হয়তো কঠিন। মনের ভালো মন্দ থাকলেও স্বার্থের ভালো নেই,  মন্দ আছে। যদিও ব্যাপক অর্থে বিবেচনা করলে স্বার্থেরও হয়তো ভালো একটা দিক কোনো না কোনো জায়গায় থাকে। যেমন একটা নতুন আবিষ্কারের পর বিজ্ঞানীরা বিনীতভাবে বলেন মানুষের কল্যাণের স্বার্থে আমাদের এই নতুন আবিষ্কার। তাহলে স্বার্থটা যখন নিজের না হয়ে অন্যের ভালোর জন্য হয় তখন সেটা স্বার্থ না হয়ে  ভালোবাসা হয়ে যায়। কি অদ্ভুত রূপান্তর। ভাবতেও শরীর শিহরিত হয়ে যায়। অন্যের স্বার্থে যদি কেউ ত্যাগ করে তবে তা ভালোবাসা, নিজের স্বার্থে কেউ যদি ভোগ করে  তবে তা স্বার্থপরতা। রক্তের সম্পর্কের বাইরেও ভালোবাসা বাসা বাধে। অচিনপুরের অদেখা একটা মানুষের প্রতিও ভালোবাসা তৈরী হতে পারে। আবার যোজন যোজন দূরের দুই ভুবনের দুই বাসিন্দার মধ্যেও ভালোবাসা গড়ে উঠতে পারে। সেই মানুষটা যখন কাছে আসে তখন একটা ভালোবাসার টান মনকে আকুলি বিকুলি করে। সবটাই হয়তো কল্পনা, তারপরও মনে হয় কল্পনাটা স্বপ্নের ঘুম ভাঙিয়ে বাস্তবতাকে টেনে হেঁচড়ে এনেছে ভালোবাসার কাঙাল মানুষটার কাছে। প্রাণের আকুলতা ও মনের ব্যাকুলতা দিয়ে যে মানুষটাকে মানুষ ভালোবাসে তার কাল্পনিক কিংবা বাস্তব উপস্থিতি মানুষের হৃদয়ের শূন্যতাকে  অপার আনন্দের ঝিকিমিকি আলোয় ভরিয়ে দেয়। চোখের পলকেই ভালোবাসার প্রার্থনায় বসে থাকা মানুষটার অসম্পূর্ণ সত্ত্বাকে ভালোবাসার আকাঙ্খিত মানুষটা  সঙ্গ দিয়ে  করে তোলে পরিপূর্ণ।  এ মানুষটিকেই প্লেটোর দর্শন নাম দিয়েছে  সোলমেট। 

সোলমেটের সান্নিধ্য কেন মানুষের  হৃদয়কে উদ্বেলিত করে তোলে। বিন্দু বিন্দু জলকণা আগুনের তীব্র দহনে যেমন বুদ্ বুদ্ করে উঠে তেমনি তা মানুষের মনে শ্রাবনের বৃষ্টি হয়ে পরিপূর্ণতার অনুভূতি জাগ্রত করে। সোলমেটকে মানুষ  কেন বেটার হাফ হিসেবে পেতে আগ্রহী হয়? এ প্রশ্নগুলোর উত্তর দর্শনতত্ত্বের ভিত্তিতে দিয়েছেন  গ্রিক দার্শনিক প্লেটো।  এই সোলমেটকে খুঁজতে গিয়ে প্লেটো  বলেছেন আরো বিচক্ষণতার সাথে আমাদের ভালোবাসতে হবে। প্লেটো মানবিক  সম্পর্কগুলোকে তাত্ত্বিকভাবে বিচার করার চেষ্টা করেছে। তার সিম্পোজিয়াম বইটিতে  ভালোবাসা আসলে কি  সেটা তিনি বুঝানোর চেষ্টা করেছেন। একটি গল্পকে উপজীব্য করে তিনি এটির  ব্যাখ্যা দিয়েছেন। প্লেটো মানবিক সম্পর্কগুলোকে তাত্ত্বিকভাবে বিচার করার চেষ্টা করেছে | তার সিম্পোজিয়াম বইটিতে ভালোবাসা আসলে কি সেটা তিনি বুঝানোর চেষ্টা করেছেন। একটি গল্পকে উপজীব্য করে তিনি এটির ব্যাখ্যা দিয়েছেন। এখানে সুদর্শন কবি আগাথনের একটি নৈশভোজের দৃশ্যের অবতারণা করা হয়েছে। মূলত আগাথন এই ভোজে বন্ধুদের আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন খাওয়া, পান করা ও ভালোবাসা সম্পর্কে তাদের দৃষ্টিভঙ্গি বোঝার জন্য। মূলত আগাথন এই ভোজে বন্ধুদের আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন খাওয়া, পান করা ও ভালোবাসা সম্পর্কে তাদের দৃষ্টিভঙ্গি বোঝার জন্য। 

ভালোবাসা কি সে বিষয়ে একেকজনের দৃষ্টিভঙ্গি একেকরকম ছিল। সেখানে প্লেটোর শিক্ষক সক্রেটিসের ভালোবাসা সংক্রান্ত দর্শন তত্ত্বটি অন্যদের চিন্তাধারা থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন ছিল। সক্রেটিস ভালোবাসা সমন্ধে যা বলতে চেয়েছেন তা হলো একজন মানুষ আরেকজন মানুষকে তখনই ভালোবাসে যখন সে মানুষটির মধ্যে ভালো কিছু গুণাবলী লক্ষ্য করে যা তার মধ্যে অনুপস্থিত থাকে। ভালোবাসার অন্তর্নিহিত সত্যটি  হচ্ছে সেই  মানুষটির সংস্পর্শে আসার মাধ্যমে যে মানুষটি তাকে ভালোবাসে সে  কিছুটা তার মতো হয়ে উঠতে পারে। সে মানুষটির গুণাবলী ভালোবাসার জড়তায় আক্রান্ত অপূর্ণ মানুষটির বিকাশের সম্ভাবনাকে বাস্তবে পরিণত করে। অন্যদিকে প্লেটো ভালোবাসাকে একধরণের শিক্ষা বলেছেন। মানুষ তখনই আরেকটি মানুষকে ভালোবাসতে পারে যখন সে তার দ্বারা নিজের ঘাটতিগুলো পুষিয়ে উঠে চায় এবং ক্রমান্বয়ে নিজের বিকাশকে নিশ্চিত করতে আগ্রহী হয়। ভালোবাসা হওয়া দরকার দুটি মানুষের  একে অন্যকে সহযোগিতা করার মাধ্যমে একসাথে বেড়ে উঠার প্রচেষ্টা। এর অর্থ হচ্ছে মানুষকে এমন কোনো মানুষের কাছাকাছি আসতে হবে যে কিনা তার বিবর্তন  বা পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজন অনুপস্থিত অংশটিকে ধারণ করে। যেমন একজন মানুষের নতুন ধারণা তৈরির সক্ষমতা আছে কিন্তু সেটি আরেকজন মানুষের মধ্যে নেই। যে মানুষটির নতুন ধারণা তৈরির গুণাবলী নেই সে মানুষটি যে মানুষটির এই গুণাবলী আছে  তাকে ভালোবেসে বা তার সান্নিধ্যে এসে এই গুণাবলীটি অর্জনের চেষ্টা করবে। আবার যে মানুষটির জীবনবোধ নেই, সে মানুষটি যে মানুষটির জীবনবোধ আছে তাকে ভালোবেসে তার জীবনবোধের ঘাটতি পূরণের প্রচেষ্টা চালাবে। এমন অসংখ্য উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। তবে সব মানুষ সব বিষয়ে পূর্ণতা অর্জন করতে পারেনা। এই সীমাবদ্ধতার জায়গাটিতে এসে মানুষ তার প্রয়োজনের পরস্পর পরস্পরকে ভালোবেসে ও সাহচর্যে এসে নিজেদের মধ্যকার অনুপস্থিত গুণাবলীকে অর্জনের চেষ্টা চালিয়ে পরস্পরের উন্নতি সাধনে ভূমিকা রাখবে। প্লেটো সম্পর্কে জড়ানোর ক্ষেত্রে সহনশীল হবার কথা বলেছেন। যেখানে অহংকার ও আগ্রাসী মনোভাব পরিত্যাগ করাকে উপযুক্ত উপাদান হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। কোনো মানুষই সম্পূর্ণ নয়। যে মানুষটাকে মানুষ ভালোবাসবে তার কাছ থেকে শেখার মতো একটা সৃজনশীল মন থাকতে হবে। সেটা থাকলে  মানুষ তার অপূর্ণতাকে পূরণ করতে সক্ষম হবে। 

মানুষ ভালোবাসার মানুষটির কাছ থেকে শিখতে শিখতে একদিন তার সেরা সংস্করণে পরিণত হবে। এটি সহজে অর্জিত হবেনা বরং ভালোবাসার মানুষটির সাথে প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হয়ে তা অর্জন করতে হবে। এ যাত্রাপথ খুব জটিল ও বিপদসংকুল। তবে তা অসাধ্য নয়। মানুষ মানুষকে ভালোবাসবে মানুষের প্রয়োজনে।  মানুষ মানুষকে ভালোবাসবে মানুষের নিজের  প্রয়োজনে।  সক্রেটিস ও প্লেটোর ভালোবাসার দর্শনেও তাই স্বার্থের পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়। তবে সে স্বার্থের ভিতরে নিঃস্বার্থ শক্তি  হচ্ছে ভালোবাসার উদার মানুষটি। যে জানেনা তাকে যে ভালোবেসেছে সে ভালোবাসার অন্তরালে তার কোনো কোনো ভালো গুনকে চুরি করে নিচ্ছে। মানুষ যদি মানুষকে ভালোবেসে তার কাছ থেকে শিখতে পারে তবে তা দোষের কিছু নয়। বরং তা অনেক মহত্বের। তবে অসম্পূর্ণ মানুষটি যখন সব শিখে গিয়ে সম্পূর্ণ হয়ে উঠে তখন যদি সে ভালোবাসার মানুষটিকে আঘাত দেয় তখন সে ভালোবাসার আর মূল্য থাকেনা। ভালোবাসায় কৃতজ্ঞতা থাকতে হয়। ভালোবাসায় প্রতিদান থাকতে হয়। কাটার সাথে ফুল থাকতে হয়। ফুলের সাথে ফুলের সুগন্ধ থাকতে হয়। 

ভালোবাসাকে ঘাতকেরা যতবার আঘাত করে ভালোবাসা তত মৃত্যুঞ্জয়ী হয়ে উঠে। প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ বলেছেন, বাস্তবতা এতই কঠিন যে কখনও কখনও বুকের ভিতর গড়ে তোলা বিন্দু বিন্দু ভালবাসাও অসহায় হয়ে পড়ে। যেমন অসহায় হয় সময়। যেমন অসহায় হয় প্রকৃতি। যেমন অসহায় হয় মানুষ। তবুও দর্শন, মনস্তত্ব, বিজ্ঞান, অর্থনীতি সব পরীক্ষায় জিততে জিততে ভালোবাসা শক্ত শেকড়ের উপর মেরুদন্ড শক্ত করে দাঁড়াক। মা আর প্রেয়সীর বাস্তবতার টানাপোড়েন ভালোবাসার শক্তির  কাছে পরাভূত হোক। ভোগবাদী চরিত্র ভালোবাসার শক্তিতে ত্যাগের কাছে আত্মসমর্পণ করুক। সূর্যের আলো ভালোবাসার শক্তিতে নেমে আসুক পৃথিবীতে। মাটির গন্ধে সে সূর্যের আলো  মোহিত হয়ে মানুষের অন্তরে ঢেলে দিক অলৌকিক চিন্তার আনন্দ। যে চিন্তার আনন্দ ভালোবাসা হয়ে মানুষকে আবার মানুষ করে তুলবে। নগরের ইট পাথর ভেঙে গড়ে তুলবে  ভালোবাসার এক মাটির পৃথিবী। যার জন্ম আছে মৃত্যু নেই। মানুষের ভালোবাসাটা এভাবেই ভালো থাক চিরকাল।


বিডি প্রতিদিন/হিমেল


আপনার মন্তব্য

এই বিভাগের আরও খবর