শিরোনাম
প্রকাশ : ৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ১৪:১৮

বৃষ্টির ছোঁয়া

আব্দুল্লা রফিক

বৃষ্টির ছোঁয়া

ওটা শফিক না! এই শফিক! এই শফিক! 
বিদ্যুৎ তরঙ্গ যেন সারা শরীর অবশ করে ফেললো…!
সেই পরিচিত কণ্ঠ যার খোঁজে বছরের পর বছর অপেক্ষা করছে, ১৪ বছর পেরিয়ে গেছে, মনে হয় এইতো সেদিন!
মুহূর্তে হাঁপাতে হাঁপাতে শফিকের সামনে এসে দাঁড়ালো, ‍‌‌‌‍'কেমন আছো?’ দু চোখের চশমার ভিতর গভীর দৃষ্টি যেন 
শফিকের উপর আছড়ে পড়লো...!
কি হলো? কেমন আছো? আবারো প্রশ্ন আসলো কেয়ার কাছ থেকে!
শফিকের হৃৎপিণ্ডের স্পন্দন বেড়ে গেলো এবং ভাবছে, এই সেই কেয়া চৌধুরী, ১৪ বছর আগে যাকে হারিয়ে ফেলেছে!

শফিক এবং কেয়া চৌধুরী দুজনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এক সঙ্গে পড়তো আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগেl একসঙ্গে পাঁচ বছর কাটিয়েছে গভীর সম্পর্কের বেড়াজালে, দুজন দুজনার, একজনকে ছাড়া আরেকজনের চলতোই না, চাওয়া পাওয়া মধ্যে কত না মিল ছিলI
কেয়ার চোখের দিকে তাকিয়ে শফিক উত্তর দিলো, ‘ভালো! তুমি কেমন? প্রায় চৌদ্দ বছর পর দেখা তাই না?' 
‘চৌদ্দ বছর তিন মাস সতেরো দিন', কেয়ার উত্তর।
'তুমি তো একদম আগের মতোই আছো - দিন ক্ষণ গণনা মাথার ভিতর রেখেছো!'
কেয়া তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে চোখের দিকে তাকিয়ে বলে উঠলো ‘আমি কি তোমার মতো সবকিছু ভুলে গেছি? আমার হৃদয়ে রক্তক্ষরণ করে সেই যে হারিয়ে গেল...!'

শফিক প্রসঙ্গ অন্য দিকে নিয়ে বললো, 'তোমার কি বিশ্ববিদ্যালয়ে আমাদের প্রথম কথা বলার স্মৃতি মনে আছে?'
'মনে থাকবে না আবার? প্রচণ্ড লাজুক প্রকৃতির একটি বালক? ক্লাস শেষে বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছো'... কেয়া গরগর করে বলতে লাগলো
'আমি বললাম - তোমার নাম কি?'
আমতা আমতা করতে থাকলে...!
'আমি আবারো বললাম - শুধু নামই তো জিজ্ঞেস করেছি?'
খুব নিচু স্বরে বলেই ফেললে ‘শফিক‘ 
'আমি বললাম - আমাকে একটু সাহায্য করবে?'
'তুমি আবারো আমতা আমতা করতে থাকো...!'
'আমি বললাম - কালকে নীলক্ষেত থেকে আসার সময় এই নোটটা একটু ফটোকপি করে নিয়ে আসবে?'
'তুমি মনে হলো স্বস্থির নিঃশেষ নিয়ে বলে উঠলে - পারবো!'
কেয়া বলে উঠলো,  'যাই হোক আমার একটা প্রশ্নের উত্তর আজো পাইনি?'
‘বলতো শফিক তুমি আমাকে ছেড়ে গেলে কেন?’
‘থাকনা ওসব প্রসঙ্গ - তোমার কথা বলো’। 
'থাকবে কেন? এতো বছর শুধু অপেক্ষায় আছি ওই প্রশ্নটির উত্তরের অপেক্ষায়?'
তোমার কি মনে আছে তৃতীয় বর্ষের পড়ার সময় বুড়িগঙ্গা নদী ভ্রমণে যেয়ে ঝড়ের কবলে পড়ার কাহিনী? – শফিক প্রসঙ্গ পরিবর্তন করলো l
কেয়া যেন এক নিঃশেষে বলা শুরু করল, 'হাঁ, সব চোখের সামনে, মনে হচ্ছে এইতো সেদিন তৃতীয় বর্ষের সমাপনী পরীক্ষার পর ছেলে মেয়ে মিলে প্রায় ৫০ জনের টিম, একটি ডাবল ডেকার লঞ্চ ভাড়া নিয়ে সারাদিনের খাবার, পানি নিয়ে সদরঘাট থেকে সকাল বেলায় নদী ভ্রমণ শুরু করলাম, প্রচুর আনন্দ ফুর্তি করছিলাম, আমরা নদীর ভাটির দিকে যাচ্ছিলাম ... দুপুর নাগাদ নদীর ধারে খেলার মাঠ দেখে থামলাম, খেলাধুলার পাশাপাশি প্রচুর আনন্দ করলাম, খাওয়া/দাওয়া সেরে ফেললাম l পড়ন্ত বিকেল বেলায় রওয়ানা হলাম ফিরতি পথে, যাত্রা শুরুতে লঞ্চ চালক খুব সতর্ক করছিলো আবহাওয়া খারাপের দিকেই যাচ্ছে প্রচণ্ড বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা, লঞ্চ দুলবে আপনারা সবাই শান্তভাবে যে যার জায়গায় বসে থাকবে, ভয় পাওয়ার কিছুই নেই! যাত্রার প্রায় এক ঘণ্টা পর ঝোড়ো হওয়ার সাথে প্রচণ্ড বেগে বৃষ্টি শুরু... মনে হচ্ছে যেকোনো সময় লঞ্চটি ডুবে যাবে, আমি তো আবার সাঁতার পারি না - তোমাকে জাপটে ধরলাম- ভয়ে কান্নাকাটি শুরু করলাম - আমাকে শান্ত রাখার জন্য তুমি খুব দুষ্টমি করছিলে- টাইটানিক জাহাজ ডুবার সময় নায়ক/নায়িকার কথা মনে করিয়ে দিয়েছিলে! আমাদের বান্ধবীরা সবাইতো কাঁন্নাকাটি শুরু করেছে- সবার নড়াচড়ায় লঞ্চটি ডুবে যাওয়ার উপক্রম - এই অবস্থায় খুবই অভিজ্ঞ চালক নদী তীরের দিকে নিয়ে ইঞ্জিন বন্ধ করে দিতে নোঙ্গর ফেললোl এতক্ষণে আমরাতো ভিজে গেলাম, তবে তোমায় উষ্ণতায় আমি কিন্তু বেশ মজাই পাচ্ছিলাম - তোমার এই গুণটি আমার খুব ভালো লাগতো ‘বিপদে স্বাভাবিক থাকা’। আরও ঘণ্টা দুয়েক পর আবহাওয়া স্বাভাবিক হয়ে আসলে আবার রওয়ানা হলাম! বাসায় ভিজে কাপড়ে যাওয়ার পর মার সেকি অস্থিরতা- আর বাবা তো প্যারাসিটামল খাইয়ে আমাকে শুইয়ে দিলো l
শফিক, দেখতে দেখতে কত দিন পার হয়ে গেলো, আর একবার স্নাতকোত্তর সমাপনীর আগে বেশ কয়েক জন মিলে গেলাম এক আন্তর্জাতিক সেমিনারে যোগ দিতে চিটাগং, তুমিও আমার পীড়াপীড়িতে তোমার বাবা-মাকে রাজি করে আমাদের টিমে গেলে সেখান থেকে গেলাম কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতেI'

'মনে আছে তুমি আমাকে প্রতিজ্ঞা করিয়েছিলে, তোমার খুব কাছাকাছি যেন না ভিড়ি, অন্যায় আবদার না করি ...ইত্যাদি। কিন্তু কক্সবাজার পৌঁছার পর তুমি নিজেই সেই প্রতিজ্ঞা ভাঙার ব্যবস্থা করলে... তোমার কি মনে আছে কেয়া?'

কেয়া: মনে থাকবে না, তুমি তো ভীষণ পাজি ছিলে... আমি এক বললে তুমি দুই ধরে নাও.... আমার কোনো নিষেধ শুনেছ?  তবে এটা সত্য আমরা আমাদের শ্রেষ্ঠ সময়টিই ওখানে কাটিয়েছি...!

কেয়া: তোমার সাথে আমার কেন দেখা হলো বলতো? ভীষণ অস্থিরতা লাগছে কাটা ঘায়ে মরিচ ছিটাতে এসেছো 
এবার বলতো কি দোষ ছিলো আমার? কেন আমাকে ফেলে চলে গেলে?

শফিক: কেন তুমি সত্যি সত্যিই জানো না? কারণটা হচ্ছে তোমার বাবা! সে তো ঐসময় একদিন তার অফিসে ডেকে নিয়ে বলেছিল, তুমি রাজি হয়েছো আমার জীবন থেকে সরে যাওয়ার। তার এক বন্ধুর আমেরিকা প্রবাসী ছেলের সঙ্গে তোমার বিয়ে ঠিক করে রেখেছে। আমাকে খুব অনুনয়-বিনয় করে তোমার জীবন থেকে সরে যেতে বললো...!

কেয়া: তুমি তাই পালিয়ে গেলে তোমার ভালোবাসাকে ফেলে... একবারও আমার কথা ভাবলে না আমাকে কোথায় রেখে গেলে?

কেয়ার দু'চোখ পানিতে ভোরে উঠলো, মুখে আর কোনো কথা বলতে পারছে না…!
'ওই সময়ের প্রেক্ষাপটে আমার মানসিক অবস্থা এমন অবস্থায় গেলো, তোমাকে ধরে রাখার সাহস পুরোটাই হারিয়ে ফেললাম', শফিক খুব নিচু গলায় উত্তর দিলো I
শফিকের চোখ বার বার ভিজে উঠছে...!
শফিক কেয়ার কাছাকাছি যেয়ে হাত দুটো ধরে বললো, 'এবার আর তোমাকে কোনো ভাবেই হারাতে চাই না, যত বাধাই আসুক, ধরে রাখবোI'
কেয়া শুধু ভেজা চোখে শফিকের দিকে নির্বিকারভাবে তাকিয়েই আছে... এক সময় হাত ছেড়ে দিলো .... কোনো কথাই মুখ দিয়ে উচ্চারিত হচ্ছে না...!
শফিকের পিছন দিক থেকে এক ভরাট কণ্ঠে ডেকে উঠলো...
“কেয়া চলো যাই” বলেই ভদ্রলোক শফিক কেয়ার মাঝামাঝি এসে পড়লো।
কেয়া মিন মিন করে বলে উঠলো, 'আমার স্বামী'।  
ভদ্রলোকটি নিজেই তার হাত শফিকের দিকে বাড়িয়ে দিলো করমর্দন করলো এবং বলে উঠলো, 'শফিক সাহেব? রাইট?’
ভদ্রলোক কেয়াকে নিয়ে আস্তে আস্তে হাঁটা শুরু করলো।
শফিক তাদের চলে যাওয়ার পথে তাকিয়ে, অঝোর ধারায় চোখের জল গড়িয়ে পড়ছে… আর বিড়বিড় করে বলছে, 'l lost her twice,  আমি কেয়াকে দ্বিতীয়বার হারিয়ে ফেললাম I বৃষ্টির ছোঁয়ার মতোই আবারো হারিয়ে গেলো…!”

বিডি প্রতিদিন/ফারজানা

 


আপনার মন্তব্য