শিরোনাম
প্রকাশ : ২৯ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ২১:১৪

মন খারাপের ট্রানজিট

নাইম আবদুল্লাহ

মন খারাপের ট্রানজিট

কুয়ালালামপুর এয়ারপোর্টের ট্রানজিট লাউঞ্জ। দেশে ফিরছি। আমার হাতে দুই ঘণ্টা সময় আছে। কিন্তু তেমন কিছু করার নেই। কিছুক্ষন পায়চারি করার পর এক জায়গায় বসে পড়লাম। এই সময় একজন মধ্যবয়স্ক ভদ্রলোক একটি ট্রলি হাতে আমার পাশের সিটে এসে বসলন। তিনি হাতের পানির বোতলটা থেকে পানি খাওয়ার সময় পাশে রাখা তার ট্রলিটা চাকা পিছলে এক পাশে ছিটকে পড়লো। আমি তাকে ট্রলিটা উঠাতে সাহায্য করলাম।

তিনি কৃতজ্ঞতার হাসি দিয়ে বললেন, থ্যাঙ্কস এ লট। আমি প্রতি উত্তরে বললাম, ইটস মাই প্লেজার।

আমি সময় কাটানোর জন্য একটি বাংলা বইয়ের পাতা উল্টাতে শুরু করলাম। ভদ্রলোক সম্ভবত আমাকে লক্ষ্য করছিলেন। মিষ্টি হেসে জিজ্ঞেস করলেন, আপনি বাংলাদেশি?

আমি করমর্দন করে পরিচয় দিলাম। ভদ্রলোকের পরিচয় শুনে অবাক হয়ে তার দিকে তাকিয়ে রইলাম। ভদ্রলোকের নাম তানভীর আলম। তিনি চায়নার একটি এয়ারলাইন্সের একজন সহকারী পাইলট ছিলেন। সম্প্রতি করোনা ভাইরাসের কারনে ফ্লাইট বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তিনি চাকরি  হারিয়েছেন।

আমি জানতে চাইলাম, তাহলে এখন কোথায় যাচ্ছেন?

কুয়ালালামপুরে এসেছিলাম ওদের একটা ডোমেস্টিক এয়ার লাইনসে চাকরির ইন্টারভিউ দিতে। তারপর কিচ্ছুক্ষন থেমে থেকে মাথা নামিয়ে বললেন, এখন মনে হচ্ছে খামোখা বাড়তি কিছু টাকা টিকেটের পিছনে খরচ হয়ে গেলো। কারন প্রায় প্রতিটি দেশ করোনা ভাইরাসের কারনে তাদের ফ্লাইট কমিয়ে দিয়েছে। তাই নিজ দেশের বেকার হয়ে যাওয়া পাইলটদের চাকরি দিতেই তারা হিমসিম খাচ্ছে। তার উপর ওরা আমার চাকরি দিবে কোথা থেকে? আমি বেকুবের মতো ইন্টারভিউ দিতে এসেছিলাম।

আমি তাকে সান্ত্বনা দিয়ে বললাম, ভাগ্যে থাকলে হতেও তো পারে।

তিনি জানালেন, ওরা না করে দিয়েছে।

তারপর কিছুক্ষন আর কথা এগুলো না। আমিই নীরবতা ভাঙ্গার জন্য বললাম,

পরিবারে কে কে আছেন?

আমার স্ত্রী আর এক ছেলে এক মেয়ে। মেয়েটা ইন্ডিয়ায় ডাক্তারি পড়ে। ছেলেটা একটা প্রাইভেট ইউনিভার্সিটিতে বিবিএ করছে। কথায় কথায় তিনি আরও জানালেন, স্ত্রীর টাকায় ফ্লাটের ভাড়া আর ছেলেমেয়েদের পড়াশোনার খরচ চালানো সম্ভব হচ্ছে না। দেশে ভালো কোন যোগাযোগ না থাকায় চাকুরীও হচ্ছে না।

আমি ভদ্রলোকের দিকে তাকাতে পারছিলাম না। উঠে গিয়ে দু'জনের জন্য কফি নিয়ে এলাম। উনি কফি নিতেও বিব্রতবোধ করছিলেন। আলম সাহেবের কাছে তার যোগাযোগের নম্বর চাইতে ইচ্ছে করলো না। আমার মতো সামান্য মানুষ তার কোন কাজে আসবে না। তিনিও আমার যোগাযোগের নম্বর চাইলেন না।

আমার ফ্লাইটের সময় হয়ে যাওয়ায় আমি উঠে দাঁড়িয়ে তার কাছ থেকে বিদায় চাইলাম। হঠাৎ আমরা দু'জন দু'জনকে জড়িয়ে ধরলাম। আমার বুকে তার বুকের উঠানামার শব্দ টের পেলাম। তারপর ভদ্রলোকের দিকে মুখ না ফিরিয়ে দ্রুত গতিতে সামনের দিকে এগিয়ে গেলাম।

 

বিডি প্রতিদিন/সিফাত আব্দুল্লাহ 


আপনার মন্তব্য