শিরোনাম
প্রকাশ : ১ মার্চ, ২০২০ ১৪:৩৮

এক কাপ চা

আব্দুল্লা রফিক

এক কাপ চা
প্রতীকী ছবি

প্রতি বছরের মতো এবারেও ভালোবাসা দিবসে অঞ্জন চৌধুরী তার খুব প্রিয় জায়গা ঢাকা ইউনিভার্সিটির টিএসসি চত্বরে একা একা বসে বসে একুশের বই মেলার অসংখ্য মানুষের আনাগোনা দেখছে। অঞ্জন ফরাসী একটি মাল্টি ন্যাশনাল কোম্পানিতে চাকরির সুবাদে গত দশ বছর ধরে প্যারিসে বসবাস করে, আর প্রতি বছর ফেব্রুয়ারী মাসের প্রথম সপ্তাহে প্রায় দুই/তিন সপ্তাহের জন্য ছুটি নিয়ে ঢাকায় আসে। 

স্মৃতিকোঠায় জমে থাকা অসংখ্য স্মৃতির ভান্ডার থেকে একের পর এক চোখের সামনে ভেসে উঠছে, মনে হয় এইত সেদিন ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে অথনীতি বিভাগে ভর্তি হয়েছে, তারুণ্যের উচ্ছাস, বন্ধুদের সাথে আড্ডা দেওয়া, বিকেল বেলা টিএসসি চত্বরে, রাতে হলের ক্যান্টিনে অনেক রাত পর্যন্ত, তারপর রাতে তাসের আড্ডায়। ক্লাসে যেতে খুব ভালো লাগত, মফস্বল শহর থেকে আসা অঞ্জনের মনে হত তার ক্লাস এ সবাই তার চেয়ে স্মার্ট প্রকৃতির, আর মেয়েরা তো সবাই অসম্ভব সুন্দরী, কেমন এক ধরনের ভালোলাগার অনুভূতি, টকবগে তরুণের যা হওয়ার কথা অঞ্জন তার বাইরে নয়। 

প্রায় বিশ বছর আগের কথা: একদিন ক্লাস থেকে বেরিয়ে রাস্তার ধারে চায়ের দোকানে দাঁড়িয়ে চা খাচ্ছে, হঠাৎ তাদের ক্লাসের একটি মেয়ে তার পাশ দিয়ে হেটে যেতে যেতে থামল এবং বলল এই "তুমি আমাদের ক্লাসের না?"
অঞ্জন থতমত খেয়ে বলল "হা"
মেয়েটি বলল "তোমার নাম কি?"
"অঞ্জন" প্রচন্ড নার্ভাস অনুভুতির উপর দাঁড়িয়ে মুখ দিয়ে কোনো কথা বের হচ্ছে না।
"সুন্দর নাম ! কি কাচুমাচু করছ কেন? এক কাপ চা তো খাওয়াও, একই ক্লাসে পড়ি, তুমি কোন হলে থাক?" মেয়েটি গরগর করে অনেকগুলো কথা বলে একটু থামল।
অঞ্জন তার জরতা কিছুতেই কাটাতে পারছে না, শুধু চা বিক্রেতাকে এক কাপ চা দিতে বলে আবার চুপ।
"কথা না বললে আমি কিন্তু চা খাব না" কিছুটা অধিকার নিয়ে বলল। 
"সরি! আমি মহসীন হলে থাকি।"

এভাবে আরো ১৫/২০ মিনিট কথা বলে মেয়েটি একটি রিক্সা ডেকে উঠতে যাওয়ার আগে বলল, "অঞ্জন তুমি আমার নাম জানো? শীলা! তুমি সত্যিই ভিশন লাজুক, হাহহাহাহাহ!", বলে মেয়েটি চলে গেল।

অঞ্জন অনেকক্ষণ তার যাওয়ার পথের দিকে চেয়ে রইলো, আর মনের ভিতর কেমন জানি এক অনুভূতির সৃষ্টি হচ্ছে, মনে মনে ঠিক করলো যখন দেখা হবে তাকে অনেক কথা বলবে, হেটে হেটে হলে চলে এলো এবং সোজা রুমে চলে এলো, আজকে বন্ধুদের অনেক ডাকাডাকিতেও আড্ডায় গেল না সে।

পরদিন যথারীতি হলের কেন্টিন এ নাস্তা করে কাম্পাসে, এখনো ৩০ মিনিট বাকি ক্লাস শুরু হওয়ার, অপেক্ষার সময় যেন কিছুতেই যাচ্ছে, মনে মনে ঠিক করে এসেছে মেয়েটিকে কি কি বলবে। তারপর যথারীতি ক্লাস শুরু হলো দেখতে দেখতে তিনটে ক্লাস শেষ হয়ে লাঞ্চ এর সময় হয়ে গেল, মেয়েটি আজ ক্লাসে আসেনি, ঐদিন সে আর ক্লাসে আসল না। অঞ্জন ভাবছে যে মেয়েটি সম্পর্কে সে কিছুই জানে না তাকে নিয়ে এত কেন ভাবছে?

তারপর আরো তিন দিন সে ক্লাসে আসল না, চতুর্থ দিন ক্লাসে আসার পর অঞ্জন তাকে নতুন ভাবে আবিষ্কার করলো- যেন তাকে চিনেই না অঞ্জনের মনটা খুব খারাপ হয়ে গেল, মনকে বার বার সান্তনা দিচ্ছে এই ভেবে যে ওর সাথে এমন কিছু ঘটেনি যার জন্য মন খারাপ করতে হবে। লাঞ্চের সময় ওই চায়ের দোকানে অর্ডার দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, হঠাৎ করে পিছন থেকে অঞ্জন ডাক শুনে তাকাতেই দেখে হাসতে হাসতে তার দিকে এগিয়ে আসছে, আর এসেই চায়ের অর্ডার দিতে বলল, চায়ের কাপ হাতে নিয়ে সে বলল, "অঞ্জন তুমি এত লাজুক কেন? তোমার কি কিছুই বলার নেই?" বলেই হাসতে লাগলো। অঞ্জন আগের মতই তার জমানো কথার কোনটাই বলতে পারল না।
"তুমি কি আমার নামটা মনে রেখেছ"
"শীলা"
"যাক ভালো লাগলো যে নামটা মনে আছে"
"তুমি কাকে সবচেয়ে বেশি ভালবাস"
"মাকে" অঞ্জন উত্তর দিল।
"আর কোনো মেয়ে নেই যাকে তুমি অনেক ভালোবাস"
"হাহাহা! আমি কি ভালোবাসার মত মানুষ নাকি? আচ্ছা তুমি গত তিন দিন ক্লাস এ আসলে না কেন?"
"আরেক দিন বলব, আজকে আমার মন খুউউব ভালো তোমার সঙ্গে অনেকক্ষন কাটাব, চল তোমাকে আমি রেস্টুরেন্ট খাওয়াব, কোথায় যাওয়া যায় বলত?"
"চল নিরব হোটেলে যাই I" 
"না নিরব হোটেলে প্রচন্ড ভীর, চল বলাকা সিনেমা হলের পার্শ্বে চাইনিজে যাই I"
ঢাকা শহর তখনও অতটা পরিচিত হয়ে ওঠেনি, চাইনিজে পৌঁছার পর একগাদা খাবারের অর্ডার দিল।
"এত খাবার কে খাবে" অঞ্জন বলল।
"কেন তুমি খাবে আর আমি চেয়ে চেয়ে দেখব, মানুষকে খাওয়াতে আমার ভিশন পছন্দ, আজ আমরা অনেকক্ষন এখানে থাকব কাজেই ধীরে ধীরে খাও এবং তোমার কথা বল"
"তোমার ভালবাসার মানুষটির কথা বল" অঞ্জন প্রশ্ন করলো 
"আরে বুদ্ধু, আমার ভালোবাসার কেউ থাকলে তোমাকে এখানে আনতাম।  জীবনের কতুকুই বা পার করেছি এখন যদি হঠাৎ জীবন থেমে যায় তাইলে" শীলা বলল।
"তুমিতো কেবল অন্যকে তোমার জীবনের দিকে অগ্রসর হওয়ার সুযোগ করে দিচ্ছ, আর এই মুহূর্তে তোমার থেমে যাওয়ার প্রশ্নই ওঠে না" অঞ্জন বলল।
"তুমি তো খুব সুন্দর করে কথা বল, আরো বল শুনি-ভালো লাগছে আমাদের তো খুউব অল্প দিনের পরিচয় কিন্তু আমি যদি হঠাৎ হারিয়ে যাই তুমি কি আমাকে খুজবে?"
"অবশ্যই বিশ্ব সংসার তন্ন তন্ন করে খুঁজে তোমার জন্য আনব একশ আটটি নীল পদ্ম, কোথায় যাবে তুমি? দুরন্ত ঘোড়ার মাথায় নীল কাপড় বেধে সারা পৃথিবীর আনাচে কানাচে যাব তোমার জন্য- আমি আসলে ঠাট্টা করছিলাম"

"না না বল আমার তো শুনতে খুব ভালো লাগছে, থামবে না প্লিজ" 
এভাবে কখন যে সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসল অঞ্জন শীলা কেউই বুঝে ওঠেনিI 
"এবারে বিদায়ের পালা, কিছুতেই যেতে ইচ্ছে করছে না" শীলা বলে উঠলো।
"তুমি থাকতে চাইলে আরো কিছুক্ষণ থাকতে পারো" অঞ্জন উত্তর দিল।
"না, মা নিশ্চয়ই খুব চিন্তা করছে।"

এরপর বিদায় নিয়ে শীলা চলে গেল তার চলে যাওয়ার পর অঞ্জনের মনে হলো তার বাড়ির ঠিকানা, টেলিফোন নম্বর কিছুই নেওয়া হয়নি। এক ধরনের মিশ্র প্রতিক্রিয়া নিয়ে হলে ফিরে আসল।
এর পরদিন শীলা ক্লাস এ আসল না, এক দিন, দুই দিন, তিন দিন, এভাবে দু সপ্তাহ কেটে গেল তার কোনো হদিস নেই। কোথায় শীলাকে খুঁজব, ক্লাস এর কেউই তার কোনো খবর জানে না।
প্রায় দুমাস পর ক্লাস থেকে বের হওয়ার পর একজন লোক এসে জিজ্ঞেস করলো, "আপনি কি অঞ্জন?"
"হা কেন বলুন তো ?" 
"এদিকে আসুন একজন ভদ্রমহিলা আপনার সঙ্গে কথা বলতে চায়"
কাছাকাছি আসতেই মহিলা বলে উঠলো,"বাবা তুমি অঞ্জন, আমি শীলার মা, ও তো অনেক দিন ধরে লিভার ক্যান্সার এ ভুগছিল, কিছুদিন যাবত কেমোথেরাপি চলছিল এখন তো বাবা ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট এ, আমরা কয়েক দিন পর সিঙ্গাপুরে নিয়ে যাব, কিন্তু ও তো কিছুতেই যাবে না তোমার সঙ্গে দেখা না করে তুমি, বাবা আমর সাথে একটু হাসপাতাল এ যাবে?"
অঞ্জন এর মুখ থেকে কোনো কথা বের হচ্ছে না, হাসপাতাল এ গেল এবং ওর বেড এর কাছে দাঁড়িয়ে অঞ্জন কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারছে না এই সেই শীলা!

সে চোখ মেলে শুধু তাকিয়ে আছে, দুচোখ দিয়ে শুধু পানি গড়িয়ে পরছে অঞ্জন যখন চেয়ারে বসে তার মাথার কাছাকাছি গেল তখন খুব মৃদু শব্দে বলে উঠলো " I love you too much, will you keep me with you, please don’t let me go!” অঞ্জন তার দুহাত অনেক্ষণ জড়িয়ে ধরে থকলো, মুখ দিয়ে কোনো কথা বের হলো না, একসময় অনুভব করলো তার গাল বেয়ে পানি গড়িয়ে পরছে !
হঠাৎ শীলার শাসকষ্ট বেড়ে যাওয়ায় নার্স, ডাক্তার এসে ওকে ভিতরে নিয়ে গেল, ভোর রাতে সে মারা গেল !

স্যার এক কাপ চা দিব? আপনি তো কাঁদছেন! অঞ্জন সম্ভিত ফিরে পেয়ে দেখলো একটি বালক তাকে চা দিতে চাচ্ছে, সে অনুভব করছে তার চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পরছে! আজ প্রায় বিশ বছর পেরিয়ে গেছে, প্রতি বছর এই সময় টিএসসিতে আসে অঞ্জন। 
বার বার মনে হয় "শীলা যদি পিছন থেকে ডেকে বলে এক কাপ চা খাওয়াও না প্লিজ!"

বিডি প্রতিদিন/হিমেল


আপনার মন্তব্য