শিরোনাম
প্রকাশ : মঙ্গলবার, ৮ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:০০ টা
আপলোড : ৭ অক্টোবর, ২০১৯ ২৩:১৬

হাসতে ভুলে গেছে নগরের মানুষ

জয়শ্রী ভাদুড়ী

হাসতে ভুলে গেছে নগরের মানুষ
শরীর-মন চাঙ্গা রাখতে আয়োজন করে হাসির অনুশীলনে সচেতন মানুষ। রাজধানীর রমনা পার্ক থেকে তোলা ছবি : জয়ীতা রায়

‘রামগরুড়ের ছানা/ হাসতে তাদের মানা/ হাসির কথা শুনলে বলে/ হাসব না-না না-না।’ সুকুমার রায়ের এ কবিতার সাদৃশ্য মেলে ঢাকার পথে-ঘাটে গোমরা মুখের ভিড়ে। শেষ কবে প্রাণ খুলে হেসেছেন- এ জিজ্ঞাসার জবাবে মেগাসিটি ঢাকার অসংখ্য নাগরিক ঠিক দিনক্ষণ স্মরণ করতে পারেন না। পথে-ঘাটে, বাসে-ট্রেনে এখন শুধু গোমরামুখো মানুষের দেখা মেলে। যাপিত জীবনের উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা, হতাশা-আতঙ্কে হাসতে ভুলে গেছে নগরের মানুষ। স্বতঃস্ফূর্ত নির্মল হাসির দিন বুঝি শেষ হয়ে গেল। এখন প্রশান্তির খোঁজে আয়োজন করে হাসির অনুশীলন করে মানুষ। সকালে ব্যায়ামের পাশাপাশি প্রাণ খুলে হাসার অভ্যাসও গড়ে তুলছেন অনেকে। হাসি শুধু মানসিক নয়, শারীরিক সুস্থতারও বার্তা দেয়। সেই বার্তা নিয়েই অক্টোবরের প্রথম শুক্রবার পালিত হলো বিশ^ হাসি দিবস।

ঘড়ির কাঁটায় সময় সকাল সাড়ে ৬টা। রাজধানীর রমনা পার্কে হাঁটছেন, ব্যায়াম করছেন শত শত মানুষ। হঠাৎ হো হো করে হাসির শব্দ ভেসে আসে। এগিয়ে গিয়ে দেখা যায়, প্রায় ৫০ জন মানুষ ব্যায়ামের জন্য পেতে রাখা মাদুরে বসে হাসছেন। বিভিন্ন রকমের কৌতুক বলে একে অন্যকে হাসানোর চেষ্টা করছেন। সবসময় যে একইভাবে হাসছেন তা নয়। কিছুক্ষণ পর পর বদলাচ্ছে হাসির ধরন। পাঁচ মিনিট পরে হাসি থামিয়ে তারা গল্পগুজবে মেতে ওঠেন।

হাসির কারণ জানতে গিয়ে পরিচয় হয় আলফা ইয়োগা সোসাইটির সাংগঠনিক সম্পাদক প্রকৌশলী মাইনউদ্দিন মিয়ার সঙ্গে। তিনি বলেন, আমরা ব্যায়াম শেষে প্রতিদিন পাঁচ মিনিট প্রাণ খুলে হাসি। হাসি-আনন্দে দিন শুরু করলে সারা দিন অনেক প্রাণবন্ত লাগে। স্ট্রেসের পরিমাণ কমে, শারীরিক ও মানসিক প্রশান্তি অনুভব করি। হৃদরোগ থেকে শুরু করে বিভিন্ন মানসিক রোগে জর্জরিত মানুষের জীবন। তাই সুস্থ থাকতে ব্যায়ামের পাশাপাশি হাসি মোক্ষম ওষুধ। 

তিনি আরও বলেন, আমাদের সংগঠনে ২০০ সদস্য রয়েছেন। আমরা ইয়োগা করি, ব্যায়াম করি, হাঁটাহাঁটি করি। এরপর সবাই মিলে মন খুলে হেসে দিন শুরু করি। পার্কে হাঁটতে এসে সবার সঙ্গে পরিচিত হয়ে সংগঠন গড়ে উঠেছে। ২০১৬ সালে ১১ জন সদস্য নিয়ে আমাদের এ সংগঠন যাত্রা শুরু করে। ইউরোপ-আমেরিকাতেও মানুষের জীবনকে সহজ করে তুলতে গড়ে উঠেছে লাফিং ক্লাব। 

ইনস্টিটিউট অব কনফ্লিক্ট ল অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট স্টাডিসের রিসার্চ অফিসার সাবিলা নাসরিনের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল, ‘আপনি সর্বশেষ কখন প্রাণ খুলে হেসেছেন?’ অনেকক্ষণ ভেবেও মনে করতে পারলেন না এই গবেষক। অনেক চেষ্টার পরেও যখন মনে পড়ল না, শরণাপন্ন হলেন তার স্বামী সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী এম পারভেজের। এ দম্পতি অনেক কসরত করেও মনে করতে পারলেন না তারা কবে প্রাণ খুলে হেসেছেন। সাবিলা নাসরিন বলেন, রাস্তায় বের হলে যানজট, ধুলা, দূষণে মানুষের হাসি উধাও হয়ে যায়। সবাই গোমরা মুখে ঘুরে বেড়ায়। চারদিকের চাপে মানুষ হাসতে ভুলে যাচ্ছে। হেসে কথা বললে অনেক জটিলতার সমাধান হয়। সামাজিক অস্থিরতায় মানুষের মনে অসহিষ্ণুতা দানা বেঁধে উঠেছে। প্রাণ খুলে হাসতে পারলে আরও বেশি দিন বাঁচতে পারতাম। 

এ সময় পারভেজ আরও যোগ করেন, সবাই যেন এক প্রতিযোগিতায় নেমেছে। ভ্রু কুচকে, মুখে কাঠিন্যের ছাপ ফেলে অন্যকে পাশ কাটিয়ে চলে যাচ্ছে। আর ভুলেও যদি ধাক্কা লাগে তাহলেই বাধে সংঘর্ষ। মানুষের হাসিমুখ দেখলে কঠিন কথাও সহজ লাগে, মিষ্টি লাগে। হাসি সংক্রমিত হয়। ধরুন আপনি প্রাণ খুলে হাসছেন। এই হাসি দেখে অন্যের মুখে হাসি ফুটবেই।

গবেষণায় দেখা যায়, শরীরকে চাঙা ও সুস্থ রাখতে হাসি ভীষণ জরুরি। হাসলে শরীরে টি-সেলের ক্ষমতা বাড়ে। এই বিশেষ ধরনের কোষের শক্তি বাড়লে শরীর ভিতর থেকে শক্তিশালী হয়ে ওঠে। টি-সেলের ক্ষমতা বাড়ানোর সহজ উপায় মন খুলে হাসা। হাসার সময় শরীরে রক্ত চলাচল বেড়ে যায়। রক্তনালি প্রসারিত হতে শুরু করে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই শিরা-ধমনীর ওপর চাপ কম পরে। আর এমনটা হলে ব্ল­াড প্রেসার কমতেও সময় লাগে না। হার্ট অ্যাটাকের আশঙ্কাও কমে যায়।

কথাসাহিত্যিক মনোরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. মোহিত কামাল বলেন, মানুষকে নিঃশেষ করে অন্তর্ঘাতি চাপ। চাপ থেকে তৈরি হয় বিষণ্নতা। বিষণ্নতা মন ও শরীরকে রোগাক্রান্ত করে তোলে। প্রাণ খুলে হাসতে পারলে মন চাপশূন্য হয়, প্রফুল্ল হয়। মানসিক অস্থিরতা থেকে মুক্তি পেতে হাসির বিকল্প নেই।


আপনার মন্তব্য