শিরোনাম
প্রকাশ : মঙ্গলবার, ১৩ এপ্রিল, ২০২১ ০০:০০ টা
আপলোড : ১২ এপ্রিল, ২০২১ ২২:৫৯

আতঙ্কের কেনাকাটায় নগরবাসী

জয়শ্রী ভাদুড়ী

আতঙ্কের কেনাকাটায় নগরবাসী
লকডাউন ও রমজান সামনে রেখে ‘প্যানিক বায়িং’-এ মেতে উঠেছে নগরবাসী। আশঙ্কায় মজুদ বাড়াচ্ছে ঘরে ঘরে। রবিবার রাজধানীর কারওয়ান বাজার থেকে তোলা ছবি : রোহেত রাজীব
Google News

কঠোর লকডাউনের আগে বৈশাখ আর ঈদের কেনাকাটার হিড়িক পড়েছে রাজধানীর বিপণিবিতান ও শপিংমলগুলোতে। কাঁচাবাজার, মুদি দোকান, সুপারশপে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কিনতে ভিড় করছেন মানুষ। এই কেনাকাটার ভিড়ে উধাও স্বাস্থ্যবিধি। মুখে মাস্ক নেই ক্রেতা-বিক্রেতা কারও। গাদাগাদি করে মার্কেটগুলোতে দরদাম করছেন মানুষ। ঊর্ধ্বমুখী সংক্রমণে দিন দিন দেশের করোনা পরিস্থিতির অবনতি হলেও তা যেন নাড়া দিচ্ছে না সাধারণ মানুষকে। ভিড় ঠেলে প্রয়োজনীয় কেনাকাটা করতে বিভিন্ন দোকানে ছুটছেন ক্রেতারা। গাদাগাদি করে কার আগে কে কিনবেন পছন্দের সামগ্রী, চলছে তারই প্রতিযোগিতা।

গত শনিবার নিউমার্কেট এলাকার ফুটপাথের ভ্রাম্যমাণ দোকান ও বিপণিবিতানে দেখা যায় বিপুল ক্রেতা সমাগম। নূরজাহান মার্কেটের গেট দিয়ে সারি সারি ঢুকছে মানুষ। সরু গলিতে গায়ে গায়ে ধাক্কা লাগিয়ে পার হতে হচ্ছে। বদ্ধ জায়গায় শত শত মানুষ অলিগলিতে ঘুরছেন মাস্ক ছাড়াই। বিক্রেতার মুখেও নেই কোনো মাস্ক। কেউ কিনছেন ফতুয়া, কেউ কিনছেন শার্ট। দোকানগুলোতে ঝুলছে পয়লা বৈশাখের বিভিন্ন থিমে আঁকানো পোশাক। লকডাউন দীর্ঘ হতে পারে- এ শঙ্কায় অনেকে কিনছেন ঈদের পোশাকও। ছেলের সঙ্গে মার্কেটে এসেছিলেন ফরিদ হোসেন। তিনি বলেন, ছেলের জন্য নববর্ষ উপলক্ষে একটা পাঞ্জাবি কিনতে এসেছি। লকডাউনে মার্কেট বন্ধ থাকবে এজন্য আজকেই ছেলেকে নিয়ে আসলাম। করোনার ঝুঁকি আছে কিন্তু প্রয়োজনীয় সামগ্রী তো কিনতে হবে। মাস্ক পরেছি, পকেটে স্যানিটাইজার আছে।

বেলা বাড়তেই নিউমার্কেটে বাড়তে থাকে ক্রেতার চাপ। ফুটওভার ব্রিজ পার হতেই রীতিমতো ধাক্কাধাক্কি অবস্থা। একে তো মানুষের ভিড়, তার মধ্যে অর্ধেক জায়গা দখল করে পসরা সাজিয়ে বসেছেন হকার। অনেকে বসে কিংবা দাঁড়িয়ে তাদের পণ্য দেখতে শুরু করলেই ভিড় আরও বাড়ছে। তিন ফুট দূরত্ব তো দূরের কথা, তিন সেন্টিমিটারের দূরত্ব নেই মানুষের চলাফেরায়। মার্কেটের প্রবেশপথে জীবাণুনাশক টানেল থাকলেও তা ব্যবহারে চরম অনীহা দেখা যায় ক্রেতা-দর্শনার্থীদের। আবার বিপণিবিতানের ভিতরে মাস্ক ছাড়া দেখা যায় বিক্রয় কর্মীদেরও।

হাসান গার্মেন্টসের বিক্রয় কর্মী ফিরোজ আলী বলেন, ‘সকাল সাড়ে ৯টায় দোকান খুলেছি। ক্রেতার প্রচ- চাপ। মাস্ক পরে কতক্ষণ থাকা সম্ভব, গরম লাগে। মাস্ক পরে কথা বললে মানুষ দাম বুঝতে পারে না। করোনার ঝুঁকির বিষয়ে বললে বলেন, আমরা খেটে খাওয়া মানুষ। আমাদের করোনা হবে না। আর হলেও করার কিছু নাই। ব্যবসা তো করতে হবে। ঈদের আগে লকডাউন দেওয়ায় এমনিতেই আমাদের ব্যবসায় অনেক ক্ষতি হয়েছে। গত বছরের ক্ষতিই এখনো কাটিয়ে উঠতে পারিনি। এর মধ্যে আবার লকডাউন।’

দুই-তিন সপ্তাহ ধরেই শাক-সবজির বাজার চড়া। আগে থেকেই চালের দাম বাড়তি ছিল। তবে পণ্য সংকট নেই বাজারে। কিন্তু এক সপ্তাহের লকডাউনের ঘোষণায় হঠাৎ করে প্রতি কেজি চাল এক থেকে দুই টাকা বেশি দামে বিক্রি শুরু হয়েছে। বাজারে চাল-ডালসহ বাড়তি চাহিদার কারণে বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে বলে জানান খুচরা ব্যবসায়ীরা। তবে পাইকাররা বলছেন দাম বাড়েনি। কিছু মানুষ অযথা বেশি করে চাল, ডালসহ নিত্যপণ্য কিনছে। আতঙ্কের কেনাকাটায় মেতে উঠেছে নগরবাসী।

মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেট ঘুরে দেখা গেছে, লোকজন চালসহ অন্যান্য পণ্য রিকশায়, ভ্যানে, মোটরসাইকেলে এবং ব্যক্তিগত গাড়িতে করে নিয়ে যাচ্ছে। মোহাম্মদপুর টাউন হল, সাত মসজিদ কাঁচাবাজারসহ আশপাশের বাজারে ক্রেতাদের বাড়তি পণ্য কিনতে দেখা গেছে।

রিকশায় বস্তা ভরে চাল, ময়দা, চিনি ও সবজি নিয়ে যাচ্ছিলেন তৌফিক হোসেন। এত পণ্য কেনার কারণ জানতে চাইলে বলেন, লকডাউনের সময়সীমা যদি বাড়ে, তাই বেশি করে কিনেছি। করোনার মধ্যে বারবার বের হওয়াও ঝুঁকিপূর্ণ। তবু সবজি কেনার জন্য তো বের হতেই হবে। সবাই বেশি করে পণ্য কেনায় দাম বেশি রাখছেন ক্রেতারা। রিকশাচালক শরিফুল ইসলাম বলেন, ‘লোকজন বেশি করে কিনে রিকশায় নিয়ে যাচ্ছেন। প্রতিদিন যা কেনেন তার কয়েক গুণ কিনছেন। প্রায় সবাই এমনভাবেই কিনছেন।’ খুচরা চাল-ডাল ব্যবসায়ী আলী হোসেন বলেন, লকডাউনের খবর শুনে মানুষ বেশি কেনাকাটা করছেন। ফলে পাইকারি বাজরে চালের দাম কেজিতে ১ টাকা থেকে ২ টাকা বেশি দিয়ে কিনতে হচ্ছে। বাজারে চালের কোনো সংকট নেই। কিন্তু পাইকারি ও খুচরা দোকানে ক্রেতাদের ভিড় সকাল থেকেই।

সুপারশপেও ছিল ক্রেতার উপচেপড়া ভিড়। ট্রলি ভর্তি করে কেনাকাটা করছেন মানুষ। সকাল থেকে বন্ধ হওয়ার আগ পর্যন্ত কমছে না ভিড়। উত্তরায় সুপারশপ স্বপ্নতে কেনাকাটা করতে আসা মনসুর আলী বলেন, সবজি, মাছ, মুরগি প্রত্যেক কাউন্টারে ভীষণ ভিড়। মাছ কিনতে এসেছিলাম। প্রায় আধা ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থেকে তবেই মাছ কিনতে পেরেছি। লকডাউনের খবর শুনে মানুষ বেশি করে পণ্য মজুদ করছেন। নগরবাসী ‘প্যানিক বায়িং’ এ মেতে উঠেছেন। পরে যদি কিনতে না পাওয়া যায়, সেই আতঙ্কে নিত্যপণ্য মজুদ করছেন অনেকেই।